বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মে মাস ছিল রক্ত, আগুন আর মানুষের অসীম বেদনার মাস। একের পর এক জনপদে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকাররা চালিয়েছিল ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ। ২৩ মে ছিল তেমনই এক বিভীষিকাময় দিন। এদিন নড়াইলের ইতনা এবং বাগেরহাটের লক্ষ্মীখালী ও দামেরখণ্ডে সংঘটিত হয় নির্মম গণহত্যা। নিরস্ত্র মানুষ, নারী, শিশু, বৃদ্ধ সহ কেউই রেহাই পায়নি হানাদারদের বর্বরতা থেকে।
ইতনা গণহত্যা:
নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার মধুমতি নদীতীরবর্তী ইতনা ও চরভাটপাড়া গ্রাম ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। এখান থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণের পরিকল্পনা করতেন। এই খবর পেয়ে পাকিস্তানি সেনারা গ্রাম দুটিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
১৯৭১ সালের ২২ মে পাকিস্তানি বাহিনী চরভাটপাড়ায় হামলা চালায়। মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তুললে প্রায় দুই ঘণ্টা যুদ্ধ চলে। একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। কিন্তু সেই ঘটনার পরই তারা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। চরভাটপাড়ার সাহসী যুবক অনিল কাপালি এক পাকিস্তানি সেনার রাইফেল কেড়ে নিয়ে মধুমতি নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন। তাকে ধরতেই হানাদার বাহিনী ইতনার দিকে নজর দেয়।
২৩ মে ভোরে, ফজরের আজানের সময়, গানবোটে করে পাকিস্তানি সেনারা ইতনা গ্রামে প্রবেশ করে। শুরু হয় ইতিহাসের এক ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞ। ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়া আর মানুষের আর্তচিৎকার। নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় শিশুসহ ৭৫ জন মতান্তরে ৫৮ জন জন নিরীহ মানুষকে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন শেখ হাফিজুল ইসলাম হিরু মাস্টার, সৈয়দ শওকত আলী, সৈয়দ কাওছার আলী, সৈয়দ এছমত আলী, সৈয়দ মোশারফ আলী, সফিউদ্দিন মোল্যা, তবি শেখ, হাদি সিকদার, নালু খানসহ আরও অনেকে।
অনেকের মরদেহ জ্বলন্ত ঘরের আগুনে ফেলে উল্লাস করেছিল পাকিস্তানি সেনারা। পুরো ইতনা গ্রাম মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল এক প্রেতপুরীতে। এতটাই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল যে, নিহতদের দাফন করার মতো মানুষও গ্রামে ছিল না। পরে আত্মীয়স্বজনেরা গণকবর দিয়ে প্রাণভয়ে অন্যত্র চলে যান।
স্বাধীনতার এত বছর পরও ইতনা গণহত্যার শহীদদের স্মরণে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়নি। স্থানীয়দের উদ্যোগে প্রতিবছর ২৩ মে গণহত্যা দিবস পালন করা হলেও গণকবরগুলোর অনেক চিহ্ন আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। ইতিহাসের এই বেদনাময় অধ্যায় এখনও অনেকটাই উপেক্ষিত।
লক্ষ্মীখালী গণহত্যা:
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের লক্ষ্মীখালী ছিল মতুয়া ধর্মসম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আশপাশের এলাকা থেকে অসংখ্য মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় সেখানে এসে জড়ো হন। কিন্তু সেই আশ্রয়স্থলই একসময় পরিণত হয় মৃত্যুকূপে।

২৩ মে কুখ্যাত রাজাকার রজ্জব আলী ফকিরের নেতৃত্বে একদল রাজাকার বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে জিউধরা ইউনিয়নের লক্ষ্মীখালী গ্রামে শ্রীধাম গোপালচাদ সাধু ঠাকুরের সেবাশ্রমে রাজাকাররা ১৮০ জনকে গুলি ও জবাই করে গণহত্যা চালিয়েছিল। তাদের সঙ্গে ছিল নরপিশাচ আকিজউদ্দিন ও মজিদ কসাইয়ের মতো কুখ্যাত ঘাতকরা।
সাধুবাড়িতে ঢুকেই তারা শুরু করে লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ। মতুয়া ভক্ত হীরামন সরকার মন্দির ছেড়ে পালাতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি মন্দিরে বসে ভক্তিগান গাইছিলেন। রাজাকাররা তাকে ধরে মন্দিরের সামনেই জবাই করে হত্যা করে। তার রক্ত মন্দিরের দেয়ালে ছিটকে পড়ে। সেই দৃশ্য আজও মুক্তিযুদ্ধের বর্বরতার এক ভয়ংকর অধ্যায় হয়ে আছে।
অনেক নারী, পুরুষ ও শিশু দিঘির পাড়ের ঝোপঝাড়ে লুকিয়েছিলেন। রাজাকাররা তাদের টেনে বের করে হত্যা করতে থাকে। কেউ গুলিতে মারা যায়, কেউ ধারালো অস্ত্রের আঘাতে। শিশুদের পর্যন্ত রেহাই দেওয়া হয়নি। এক মায়ের কোল থেকে দুই শিশুকে ছিনিয়ে নিয়ে গাছের সঙ্গে আছড়ে হত্যা করা হয়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ইয়াকুব আলী মেম্বর কিছু মানুষ নিয়ে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু রাজাকারদের গুলিতে তিনিও নিহত হন।
বিকেলে মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে পৌঁছালে রাজাকাররা পালিয়ে যায়। পরে গ্রামবাসীরা অসংখ্য মরদেহ একত্র করে গণকবর দেন। ধারণা করা হয়, ওই হত্যাযজ্ঞে প্রায় অর্ধশত মানুষ নিহত হন।
দামেরখণ্ড গণহত্যা:
ডাকরা গণহত্যার পর বাগেরহাট অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের বহু মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মংলার দামেরখণ্ড গ্রামে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আশ্রয়ও শেষ পর্যন্ত নিরাপদ হয়নি।
২৩ মে কুখ্যাত রাজাকার রজ্জব আলী ফকিরের নেতৃত্বে রাজাকার বাহিনী বড় লঞ্চে করে এলাকায় আসে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় স্থানীয় রাজাকাররা। অস্ত্র আর মশাল হাতে তারা ‘নারায়ে তকবির’ ধ্বনি দিয়ে গ্রামে হামলা চালায়।
প্রথমেই তারা এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে হত্যা করতে শুরু করে। শশীভূষণ মণ্ডল, সতীশ চৌকিদার, রসিকলাল রায়সহ অনেককে গুলি করে হত্যা করা হয়। যারা পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন, তাদেরও ছাড় দেওয়া হয়নি। ঝোপঝাড়, খালবিল কিংবা পুকুরে লুকানো মানুষদের টেনে এনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
দামেরখণ্ড, মৌখালি, নিতাখালি, ঢালিরখণ্ডসহ আশপাশের এলাকায় সেদিন শতাধিক মানুষ নিহত হন। অনেক নারীর ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। তরু শীলসহ বহু নারীকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। কেউ আর ফিরে আসেননি।
রাজাকারদের ভয়াবহ দাপটের কারণে সেদিন এলাকায় কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। ফলে অসহায় মানুষগুলো মৃত্যুর মুখে একা পড়ে যায়। আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় অসংখ্য বাড়িঘর।
আজও দামেরখণ্ড গণহত্যার শহীদদের স্মরণে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো বড় স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়নি। স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে একটি নামফলক স্থাপন করা হলেও ইতিহাসের এই ভয়ংকর অধ্যায় এখনও জাতীয়ভাবে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
ইতনা, লক্ষ্মীখালী ও দামেরখণ্ডের গণহত্যা ছিল পরিকল্পিতভাবে নিরীহ মানুষকে নিশ্চিহ্ন করার এক ভয়ংকর অপচেষ্টা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকাররা যে নিষ্ঠুরতা চালিয়েছিল, তা মানবতার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।




