২৪ মে ১৯৭১: কুমিল্লার মুরাদনগরে বাখরাবাদ গণহত্যা

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল হয়ে উঠেছিল ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সাক্ষী। তেমনই এক নির্মম ও হৃদয়বিদারক অধ্যায় কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের উত্তর ও দক্ষিণ বাখরাবাদ গ্রামে সংঘটিত হয় ২৪ মে ১৯৭১, যা ইতিহাসে “বাখরাবাদ গণহত্যা” নামে পরিচিত।

সেদিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী স্থানীয় সহযোগী রাজাকার ও আলবদরদের সহায়তায় এই দুই গ্রামে এক সুপরিকল্পিত অভিযান চালায়। ভোর থেকে শুরু হওয়া এই আক্রমণ চলে দুপুর পর্যন্ত। হঠাৎ আক্রমণে গ্রামের সাধারণ মানুষ, যাদের অধিকাংশই ছিলেন কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী, তারা কোনো প্রতিরোধের সুযোগ না পেয়ে চরম সহিংসতার শিকার হন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, পাকবাহিনী গ্রামে প্রবেশ করে নির্বিচারে গুলি চালায়। পাশাপাশি বেয়নেট দিয়ে নৃশংসভাবে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রামের একাধিক বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই একটি শান্ত ও নিরীহ গ্রাম পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে, যেখানে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল মৃতদেহ এবং কান্নার আর্তনাদ।

বিভিন্ন গবেষণা ও দলিল অনুযায়ী, ওইদিন প্রায় দেড় শতাধিক নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে নারী, পুরুষ ও বৃদ্ধসহ সব বয়সের মানুষই ছিলেন। ঘটনার পর বহু মরদেহ গ্রামের বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকে। পরে বেঁচে থাকা গ্রামবাসীরা গভীর শোক ও আতঙ্কের মধ্যে শহীদদের গণকবর দিয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন।

ঘটনার আরও একটি ভয়াবহ দিক ছিল পরবর্তী সময়ে সংঘটিত নির্যাতন। কিছু যুবককে ধরে পার্শ্ববর্তী দেবিদ্বার ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের মধ্যে কয়েকজনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। এ ঘটনার মধ্যেও কিছু ব্যক্তি ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গেলেও তাদের জীবনের অভিজ্ঞতা ছিল চরম আতঙ্ক ও বেদনার।

বাখরাবাদ গণহত্যা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের বহু মানবতাবিরোধী ঘটনার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাদায়ক অধ্যায় এবং সমগ্র জাতির ইতিহাসে এক গভীর শোকাবহ স্মৃতি হিসেবে চিহ্নিত। আজও স্থানীয় জনগণের স্মৃতিতে এই দিনটি গভীর বেদনার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই গণহত্যার স্মৃতি বহন করে চলছে পরবর্তী প্রজন্ম।

তথ্যসূত্র:
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৬ষ্ঠ খণ্ড

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on print
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!