মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি বিজয়ের পেছনে ছড়িয়ে আছে বহু গ্রামের কান্না, স্বজন হারানোর বেদনা আর গণহত্যার ভয়াবহ স্মৃতি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞে বাংলাদেশের নানা জনপদ পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরীতে। সেইসব গণহত্যার মধ্যে সিরাজগঞ্জের বাগবাটি গণহত্যা বিশেষভাবে ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক একটি অধ্যায়।
বর্তমান সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত বাগবাটি ইউনিয়ন। শান্ত, সবুজে ঘেরা ১৯৭১ সালে শুরুতে এই জনপদ অনেক মানুষের কাছে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে সিরাজগঞ্জ দখল করার পর শহর ও আশপাশের এলাকা থেকে শত শত বাঙালি হিন্দু পরিবার জীবন বাঁচাতে এসে আশ্রয় নেয় বাগবাটি, হরিণগোপাল, পিপুলবেরিয়া, ধলদব ও উত্তর আলোকদিয়া গ্রামে। বগুড়া, শেরপুর, চান্দাইকোনা, রায়গঞ্জ, তাড়াশসহ বিভিন্ন এলাকা থেকেও নারী, শিশু ও ব্যবসায়ীরা এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, দূরের এই গ্রামগুলো হয়তো যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে তাদের রক্ষা করবে। কিন্তু সেই আশ্রয়ই পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে।
গণহত্যার আগের দিন স্থানীয় রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যরা ঘোড়াছড়া স্কুলে একটি গোপন বৈঠক করে। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বাগবাটি, হরিণগোপাল ও অলোকদিয়া গ্রামের মানুষদের “নির্মূল” করা হবে। স্থানীয় দোসররা পাকিস্তানি বাহিনীকে জানিয়ে দেয় কোথায় হিন্দু পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছে এবং কোন গ্রামগুলোকে টার্গেট করতে হবে।
১৯৭১ সালের ২৭ মে ভোর হওয়ার আগেই শুরু হয় সেই নারকীয় অভিযান। পাকিস্তানি সেনারা স্থানীয় রাজাকার, আলবদর ও শান্তি কমিটির সদস্যদের নিয়ে কয়েকটি গাড়িতে করে সিরাজগঞ্জ শহর থেকে বাগবাটির দিকে রওনা হয়। তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা তরিকুল ইসলাম ওরফে লেবু মিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে ভোরের আগেই ঘিরে ফেলা হয় বাগবাটি, হরিণগোপাল ও উত্তর আলোকদিয়া গ্রাম।
ভোরবেলা শোনা যায় গুলির শব্দ। ঘুমন্ত মানুষ আতঙ্কে দৌড়াতে শুরু করে। কেউ বাঁশঝাড়ে, কেউ পুকুরপাড়ে, কেউ পাশের গ্রামে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে। কিন্তু অনেকেই সেই সুযোগ পাননি। প্রত্যক্ষদর্শী রতন চন্দ্র শীল পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, মিলিটারির গাড়ি বাজারে ঢুকতেই তিনি বাড়ির পাশের বাঁশঝাড়ের একটি গর্তে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে তিনি দেখেন রাজাকারদের চলাফেরা, শোনেন মানুষের আর্তনাদ আর গুলির শব্দ। পাকিস্তানি সেনারা বাড়ি বাড়ি ঢুকে পুরুষদের ধরে এনে রাস্তার ওপর দাঁড় করিয়ে গুলি করতে থাকে।
মুক্তিযোদ্ধাদের না পেয়ে হানাদাররা সাধারণ গ্রামবাসীকেই টার্গেট করে। অনেককে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়। বিভিন্ন সূত্রে নিহতের সংখ্যা ভিন্ন হলেও অধিকাংশ বর্ণনায় ১৭৫ থেকে ২০০-এর বেশি মানুষের হত্যার কথা উঠে এসেছে। নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন নিরীহ বাঙালি হিন্দু।
আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী সঙ্গীত শিক্ষক সন্তোষ শিকদার জানান, প্রথমে বাগবাটি ইউনিয়ন পরিষদ অফিসের দিক থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসে। এরপর শুরু হয় লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নারী নির্যাতন। ভোর ৫টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত চলে হত্যাযজ্ঞ। পাকিস্তানি সেনারা চলে যাওয়ার পর তিনি নিজে প্রায় ৩০টি লাশ গুনেছিলেন। বাগবাটি গ্রামের ক্ষুদু বাবু দারোগার কুয়ায় তিনি নিজ হাতে ১১টি লাশ ফেলেছিলেন। তার ভাষায়, “তিনটি গ্রামের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য লাশ পুঁতে রাখা হয়েছিল। আজও মাটি খুঁড়লে হাড়গোড় পাওয়া যাবে।”
তিনি আরও জানান, জ্ঞানেন্দ্র দেব নামের এক ব্যক্তি সাহসিকতার সঙ্গে দুই পাকিস্তানি সেনাকে জাপটে ধরেছিলেন। পরে অন্য সেনারা এসে তাঁকে হত্যা করে। এই হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি নারীদের ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। স্থানীয় দোসরদের সহযোগিতায় বহু বাড়িঘর লুট করা হয় এবং অন্তত ২০টি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পুরো এলাকা মুহূর্তেই পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে।
হরিনা গ্রামের চণ্ডী শীলের বর্ণনায় উঠে আসে সেই দিনের ভয়াবহতা। পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামে ঢুকেছে শুনে তিনি পাশের গ্রামে পালিয়ে যান। পালানোর সময় তাঁকে লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়া হয়। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান, কিন্তু তাঁর বাবা ও ভাইদের হত্যা করা হয়। তাঁদের লাশ পর্যন্ত তিনি খুঁজে পাননি।
বাগবাটির বৃদ্ধা বাসনা রানীর স্মৃতিতেও সেই দিনের বিভীষিকা আজও জীবন্ত। তিনি জানান, রাজাকারদের দেখিয়ে দেওয়া অনুযায়ী পাকিস্তানি সেনারা তার স্বামী জ্ঞানেন্দ্রনাথকে ধরে নিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। ছয় সন্তান নিয়ে এরপর তাকে চরম কষ্টে জীবন পার করতে হয়েছে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও তার আক্ষেপ, স্বামীর হত্যার বিচার হয়নি, এমনকি তার কবরটিও হারিয়ে গেছে।
গণহত্যার পর নিহতদের অনেককে তড়িঘড়ি করে গণকবরে দাফন করা হয়। কোথাও কূপে ফেলে রাখা হয় মরদেহ, কোথাও মাটিচাপা দেওয়া হয়। বাগবাটি ও ধলদবের পুরোনো জমিদারবাড়ির নির্জন কূপেও বহু লাশ ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
১৯৯৯ সালে সরকার এই এলাকাকে বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করে। তখন বাগবাটি বধ্যভূমি চিহ্নিতকরণ উদ্যোগের অংশ হিসেবে শহীদদের একটি তালিকাও প্রস্তুত করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার ভিত্তিতে ৩৭ জন শহীদের নাম নথিভুক্ত করা হয়। এই তালিকায় রয়েছেন—ভানু দত্ত, ছানু দত্ত, কালীপদ দত্ত, জ্ঞানেন্দ্রনাথ দত্ত, দুলাল চন্দ্র, কানাই লাল, নালু রাহা, অলক কুমার পোদ্দার, বিমলেন্দু রায়, হেমন্ত চন্দ্র রায়, শমনাথ রায়, হরিমঙ্গল হালদার, রতন চক্রবর্তী, সদা সরকার, নরেন্দ্রনাথ ভাম্বলী, যোগেশ চন্দ্র শলি, পুষ্প হালদার, ফণীভূষণ কাওয়ালী, চেংগু পাল, মন্টু পাল, হারান পাল, শুটা পাল, যুধিষ্ঠীর পাল, হুন্ডি খা, মাংগন আলী খা, যতীন্দ্রনাথ দত্ত, তারা কর্মকার, সন্তু সাহা, গেদা হালদারসহ আরও অনেকে।
শহীদদের স্মৃতিকে ধরে রাখতে বাগবাটি ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। তবে বাস্তবতা হলো, এই গণহত্যার মূল বধ্যভূমি আজও অবহেলিত। কোথাও সেটি গোচারণভূমি, কোথাও আবার গড়ে উঠেছে বসতি। ইতিহাসের চিহ্নগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
আজও বাগবাটির মাটি সেই রক্তের স্মৃতি বহন করে। স্বাধীনতার এত বছর পরও বাগবাটির গণকবরগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ হয়নি। শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকাও এখনো প্রণয়ন করা হয়নি। অথচ এই মানুষগুলোর আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।#




