৪ জুন ১৯৭১: নাটোরে ছাতনী গণহত্যা

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অসংখ্য গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনা লিপিবদ্ধ রয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নৃশংসতার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হলো নাটোরের ছাতনী গণহত্যা। ১৯৭১ সালের ৪ জুন সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ড উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ও বর্বর গণহত্যা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। আজও এ ঘটনার স্মৃতি নাটোরবাসীর হৃদয়ে গভীর বেদনার জন্ম দেয়।

নাটোর শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ছাতনী ইউনিয়ন ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিকামী মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা এমসিএ শংকর গোবিন্দ চৌধুরীর বাড়ি এই ইউনিয়নে হওয়ায় এখানকার অনেক মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি এই সমর্থনকেই অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ছাতনী ইউনিয়নের নিরীহ জনগণের ওপর নির্মম প্রতিশোধ নেয়।

১৯৭১ সালের ৪ জুন গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং নাটোরের কয়েকশ সশস্ত্র বিহারী ছাতনী ইউনিয়ন ও আশপাশের নাড়িবাড়ি, শিবপুর, পণ্ডিতগ্রাম, বারোঘড়িয়া, ভাটপাড়া, আমহাটি, ভাবনি, হাড়িগাছা, রঘুনাথপুর এবং বনবেলঘরিয়া গ্রামের ঘুমন্ত মানুষদের ঘর থেকে ধরে নিয়ে আসে। শিশু, নারী, বৃদ্ধ— কেউই তাদের নিষ্ঠুরতা থেকে রেহাই পায়নি। আটক ব্যক্তিদের চোখ-মুখ বেঁধে ছাতনী স্লুইজ গেট এলাকায় জড়ো করা হয়।

এরপর শুরু হয় এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ। হাফেজ আব্দুর রহমানের নেতৃত্বে হানাদার বাহিনী প্রথমে বন্দিদের গুলি করে, পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুঁচিয়ে ও জবাই করে হত্যা করে। ইতিহাসের অন্যতম নির্মম এই হত্যাকাণ্ডে মোট ৪৬৭ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। হত্যার পরও তাদের বর্বরতা থেমে থাকেনি। নিহতদের পরিচয় গোপন করতে এবং মৃত্যুর নিশ্চয়তা নিশ্চিত করার জন্য মরদেহগুলোর মুখে এসিড ঢেলে বিকৃত করা হয়। পরে লাশগুলো ছাতনী স্লুইজ গেট সংলগ্ন এলাকা, পুকুর ও ডোবায় তড়িঘড়ি করে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় নাটোর ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর উত্তরাঞ্চলীয় সামরিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে নাটোরের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। তবে ছাতনী গণহত্যা ছিল এর মধ্যে সবচেয়ে নৃশংস, পরিকল্পিত এবং হৃদয়বিদারক ঘটনা। এই গণহত্যা শুধু একটি এলাকার মানুষের ওপর আক্রমণ ছিল না; এটি ছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর নির্মম প্রতিশোধ।

আজ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর ছাতনী গণহত্যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক শোকাবহ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের এই রক্তাক্ত ইতিহাসই আমাদের স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করতে শেখায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশপ্রেম ও মানবতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, অষ্টম, নবম, দ্বাদশ, ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ খণ্ড।

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!