রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সর্বজাতীয় ভাবনা

“সকল দেশের সাহিত্য মানুষকে তৈরী করেছে। সাহিত্যের ভিতর দিয়ে আশা, আকাঙ্খা আদর্শ রসের দ্বারা পুষ্ট হবে। — তার আয়োজন হয়েছে, ভূমিকা হয়েছে। এর মধ্যে যেন বিকৃতি না-আসে। সমস্ত পৃথিবী কলুষিত হয়েছে, সমস্ত পৃথিবীর হাওয়াতে লেগেছে পাপ, তা সে যুদ্ধের জন্য বা যে-জন্যই হোক। সে কত বড় আঘাত তা জানি না। … এই যুদ্ধের সঙ্গে যে চিত্ত-বিকৃতি হয়েছে, তাতে সমস্ত বিশ্বের সাহিত্যকে ভূমিতলে নামাবার চেষ্টা হয়েছে – যাকে তারা মনে করে বাস্তবতা। যা কীটের বাস্তবতা, পশুর বাস্তবতা মানুষের বাস্তবতাও কি তাই? সেই দূর দেশ থেকে আমাদের মধ্যে সংক্রমিত হতে চলেছে।” ( আনন্দবাজার, ২৩ শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৩৭)।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের চন্দননগরের সম্মেলনে (২১ শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৭, রবিবার) ‘সাহিত্যের বাস্তবতা বিষয়ক বক্তব্য দেন। তারই অংশবিশেষ উদ্ধৃতি করেছি। কবিগুরু যুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর যুগে সাহিত্যের নির্মলতা ও সৌন্দর্য্যকে গুরুত্ব দেন।

কবিগুরু সাহিত্য সংস্কৃতি শিল্পের সকল শাখায় যেমন অভাবনীয় সৃষ্টি করেছেন, ঠিক তেমনি ভারতবর্ষের সংকট অনুধাবন করে তার নিষ্কৃতি লাভের উপায় খুঁজেছেন। তাঁর কর্ম সাধনার মধ্যে তার ব্যাপকতা বিস্ময়করভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ভারতের সংকটের সাথে বিশ্বের সংকটসমূহের প্রভাব প্রতিপত্তি আছে, সেই সব তিনি তুলে ধরেছেন। সাধনার ব্যাপকতায় তিনি ‘সর্বজাতীয় রাষ্ট্র’ ভাবনার উন্মেষ ঘটিয়েছেন। ভারতে সেই সময়ে ধর্মীয় হানাহানির বিরূদ্ধে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ় ছিলো।
“ধর্মের নামে যে ভ্রাতৃবিরোধ উপস্থিত হইয়াছে নাস্তিকতাও সমাজের এত অনিষ্ট করিতে পারে নাই। সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের তাহাদের দুর্ব্যবহারের কথা স্মরণ করাইয়া দিলেই আপনাদের শাস্ত্র হইতে তাহারা প্রেম ও শান্তির বুলি আওড়াইতে থাকে। ইহা যে তাহাদের মনের পক্ষে অধিকতর ক্ষতিকর তাহারা তাহা বুঝে না। ধর্মের এই গ্লানি কোন ধর্মবিশেষের বস্তু নহে, কম বেশি সকল ধর্মেই ইহা বিদ্যমান। ধর্মের ইতিহাসে অধর্মের কার্যাবলী ভাতৃ-শোণিতের অক্ষরে লিখিত রহিয়াছে।”

কবিগুরু অনুভব করেছেন ধর্মীয় সহিংসতা থেকে যে ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। আজ-অবধি ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অন্ধতা থেকে বিশ্বের মানুষ নিষ্কৃতি লাভ করতে পারে নাই। “ধর্ম যখন নিজের মত অন্যের উপর চাপাইতে চেষ্টা করে তখন উহা পীড়াদায়ক ও সাম্রাজ্যবাদের রূপান্তর হইয়া পড়ে। এই কারণে ধর্মবিষয়েও কঠোর ফ্যাসিজমের রূপ আমরা দেখিতে পাই। ব্যক্তিগত ধর্ম অন্যের উপর প্রভুত্ব করিবে এই ভাবই সাম্প্রদায়িকতার জন্মদাতা।” (কেশরী- ৪ঠা মার্চ, ১৯৩৭)। কবিগুরু রামকৃষ্ণ শতবার্ষিকী উৎসবে উপলক্ষে বিশ্বধর্ম সম্মেলনের (ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট, তৃতীয় দিবস, ৩রা মার্চ, ১৯৩৭) সভাপতিত্ব করেন। তাঁর উপস্থাপিত ভাষণ ইংরেজিতে লিখিত ছিলো, যা সেই বছরে Modern Review -April 1937 সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ভাষণের মর্মার্থের কিছু অংশ তুলে ধরেছি।

কবিগুরু ১৯৩০ সালে রাশিয়ার সফর করে। তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের শিক্ষা, কৃষি, সমবায় সহ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা। কবির ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রাশিয়ার চিঠি’ গ্রন্থে পাওয়া যায়। কবি বিশ্বের সাম্য, সম্প্রীতি ও শান্তির জন্য, স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় বলেন- ‘সর্বজাতীয় রাষ্ট্রিক সমবায় জাতির প্রকৃত স্বার্থসাধন সম্ভব’। বিশ্বের সংকট উত্তরণের জন্য তিনি যেসব বিশ্লেষণ ও ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত করেছেন, তা কালকে অতিক্রম করেছে। কবির উপলব্ধি, “য়ুরোপীয় সভ্যতা প্রথম থেকেই নগর সংহত হবার পথ খুঁজছে। নগরে মানুষের সুযোগ হয় বড়ো, সম্বন্ধ হয় খাটো। নগর অতিবৃহৎ, মানুষ সেখানে বিক্ষিপ্ত, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য একান্ত, প্রতিযোগিতায় মথন প্রবল। ঐশ্বর্য সেখানে ধনী-নির্ধনের বিভাগকে বাড়িয়ে তোলে এবং চ্যারিটির দ্বারা যেটুকু যোগসাধন হয় তাতে সান্ত্বনা নেই, সম্মান নেই। সেখানে যারা ধনের অধিকারীএবং যারা ধনের বাহন, তাদের মধ্যে আর্থিক যোগ আছে, সামাজিক সম্বন্ধ বিকৃত অথবা বিচ্ছিন্ন।” সামাজিক চিত্র যেটি গুরুদেব উপস্থাপন করছেন, তা কোন একটা দেশের জন্য নয়। প্রত্যেক দেশের সংকট নৈরাশা প্রতিনিয়ত সামাজিক জীবনে যে নিদারুণ ভয়াবহ জীবন সংকট সৃষ্টি করছে, তা উঠে আসে। ”এমন অবস্থায় যন্ত্রযুগ এল, লাভের অঙ্ক বেড়ে চলল অসম্ভব পরিমাণে। এই লাভের মহামারি সমস্ত পৃথিবীতে যখন ছড়াতে লাগল তখন যারা দূরবাসী অনাত্মীয়, যারা নির্ধন, তাদের আর উপায় রইলো না— চীনকে খেতে হল আফিম, ভারতকে উজাড় করতে হল তার নিজস্ব; আফ্রিকা চিরদিন পীড়িত, তার পীড়া বেড়ে চলল।” ( রাশিয়ার চিঠি) কবির ভাবনা যে কত স্বচ্ছ ও সুদূরপ্রসারী তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কবির বিশ্বভূমিতে আগমন ও অবস্থান একটি মহাকালকে নির্দেশ করে। ইতিহাসে দেখা যায়, যুগ যুগ ধরে বঙ্গশ্চ অঞ্চলে আধিপত্যবাদ চরম শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিল। তার সঠিক অনুধাবন ও উপলব্ধি পরিপূর্ণভাবে করেছিলেন রাজা রামমোহন রায়। বেদের অনুবাদের মাধ্যমে জাতি বর্ণভেদের বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন করে তিনি বাঙালির বঙ্গসমাজের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। কবিগুরু তাইতো বলেন, ”আমরা সমস্ত বঙ্গবাসী তাঁহার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী, তাঁহার নির্মিত ভবনে বাস করিতেছি।” কবিগুরুর পিতামহ থেকে বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রামমোহনের ব্রাহ্মসমাজের ভাবনায় জীবন অতিবাহিত করেছেন। কবিগুরুও একই পথের পথিক হলেন। মহাপুরুষদের যে পথ, সেই পথের পথিক হলেন তিনি। ফলে তাঁর ভাবনা ও কর্মের মধ্যে মহর্ষির প্রভাব নানাভাবে লক্ষ্য করা যায়। অনায়াসে বলতে পারেন,
‘অহঙ্কার চূর্ণ করো, প্রেমে মন পূর্ণ করো,
হৃদয় মন হরণ করি রাখো তব সাথ হে।’

কবিগুরু তপোবনের সাধনায় বিশ্বকে বাঙালির বিশ্বভাবনায় শান্তির পথ অন্বেষণ করেছেন। অনায়াসে কবি বলেছেন— ”হে অনন্ত বিশ্বসংসারের পরম এক পরমাত্মন, তুমি আমার সমস্ত চিত্তকে গ্রহণ করো তুমি সমস্ত জগতের সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও পূর্ণ করিয়া স্তব্ধ হইয়া রহিয়াছ, তোমার সেই পূর্ণতা আমার দেহে-মনে, অন্তরে-বাহিরে, জ্ঞানে-কর্মে ভাবে যেন প্রত্যক্ষ করতে পারি। আমি আপনাকে সর্বতোভাবে তোমার দ্বারা আবৃত রাখিয়া নীরবে নিরভিমানে তোমার কর্ম করিতে চাই।” এই অনুভব কবির।

বিশ্বের দেশে দেশে হানাহানি রক্তপাত, মানবিক বিপর্যয়ের সংবাদ দেখে কবি বিমর্ষ হয়ে যেতেন। ”সেখানে বিজ্ঞান আছে, বাহুবল আছে, অর্থবল আছে, বুদ্ধিবল আছে, কিন্তু তার দ্বারা মানুষ রক্ষা পায় না। স্বাজাত্যর শিখরের উপর চড়ে বিশ্বগ্রাসী লোভ যখন মনুষ্যত্বকে খর্ব করতে স্পর্ধা করে, রাষ্ট্রনীতিতে নিষ্ঠুরতা ও ছলনার সীমা থাকে না, পরস্পরের প্রতি ঈর্ষা এবং সংশয় যখন নিদারুণ হিংস্রতায় শান দিতে বসে, তখন মানবের ধর্ম আঘাত পায় এবং মানবের ধর্মই মানুষকে ফিরে আঘাত করে।” (মানুষের ধর্ম)

বিশ্বের দিকে দৃষ্টিনিবদ্ধ করলে দেখা যায়, একইরকম নৃশংসতা, মানবিকতার উপর চরম আঘাত বর্তমান অবধি অব্যাহত আছে। কবি বিভিন্ন সম্মিলনের অভিভাষণের মাধ্যমে বিশ্বমানবমনের ঐক্য গড়ে তোলার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। কবি তাঁর ‘মানবসত্য’ প্রবন্ধে বলেন, ”আমাদের জন্মভূমি তিনটি, তিনটিই একত্র জড়িত। প্রথম পৃথিবী। মানুষের বাসস্থান সর্বত্র।” …মানুষের দ্বিতীয় বাসস্থান স্মৃতিলোক। অতীতকাল থেকে পূর্বপুরুষদের কাহিনী নিয়ে কালের নীড় সে তৈরী করেছে। …স্মৃতিলোকে সকল মানুষের মিলন। বিশ্বমানবের বাসস্থান- এক দিকে পৃথিবী আর একদিকে সমস্ত মানুষের স্মৃতিলোক। …আর তৃতীয় বাসস্থান আত্মিকলোক। সেটাকে বলা যেতে পারে সর্বমানবচিত্তের মহাদেশ। অন্তরে অন্তরে সকল মানুষের যোগের ক্ষেত্র এই চিত্তলোক।’ কবিগুরুর ভাবনার ভিতর দিয়ে মহামানবের চিরায়ত বাণী প্রবাহিত হয়েছে। তাইতো কবি অনুভব করেছেন ‘সর্বজনীন জনশিক্ষায়’। জনগণের ঐক্য মিলনে, সত্য প্রেমে শান্তির পথ দেখিয়েছেন। কবি সকলপ্রকার নৃশংসতার বিরূদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন— ‘পৃথিবীতে প্রচণ্ডের মধ্যে, সংঘাতের মধ্যে, শান্তির যে অভ্যুদয় দেখি আদিযুগে, তাই দেখি মানুষের ইতিহাসেও। উদ্দাম নিষ্ঠুরতা আজ ভীষণাকার মৃত্যুকে জাগিয়ে তুলছে সমুদ্রের তীরে তীরে; দৈত্যরা জেগে উঠছে মানুষের সমাজে, মানুষের প্রাণ যেন তাদের খেলার জিনিস। মানুষের ইতিহাসে এই দানবিকতাই কি শেষ কথা? মানুষের মধ্যে এই-যে অসুর এই কি সত্য?’ মানবিক বিপর্যয়ের দিনেও কবি অনুভব করেছেন মহাপুরুষের, যিনি শান্তির বাণী নিয়ে কঠিন পরিস্থিতি অতিক্রম করতে পারেন। কবি সত্যের পথে থেকেছেন, অন্যায়ের বিপক্ষে শক্তিশালীরূপে অবস্থান নিয়েছেন। কবিগুরুর ভাবনা শান্তির এবং মহাকালের মহানুভবতার পরিচয় বহন করে। তিনি দার্শনিক প্রজ্ঞায় সর্বমানবকে সত্য জ্ঞানে অনন্তরূপে মিলনবন্ধনে আবদ্ধ করতে চেয়েছেন।

কবি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবিক বিপর্যয়, ভয়াবহ হিংস্রতা প্রত্যক্ষ করছেন। সেই বিপর্যয়ের মধ্যে কবি আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন। “আমাদের দেশে আমাদের পল্লীতে পল্লীতে ধন-উৎপাদন ও পরিচালনার কাজে সমবায় নীতির জয় হোক, এই কামনা করি।” কবি পল্লীর মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের উপায় বলেছেন, “আমাদের দেশের গ্রামগুলি বেঁচে উঠুক…। বর্তমান যুগের বিদ্যা ও বুদ্ধির ভূমিকা বিশ্বব্যাপী, যদিও তার হৃদয়ের অনুবেদনা সম্পূর্ণ সে পরিমাণে ব্যাপক হয়নি। গ্রামের মধ্যে সেই প্রাণ আনতে হবে যে প্রাণের উপাদান তুচ্ছ ও সংকীর্ণ নয়, যার দ্বারা মানব প্রকৃতিকে কোন দিকে খর্ব ও তিমিরাবৃত না রাখা হয়।” ( রাশিয়ার চিঠি)

কবি পল্লী উন্নয়নে যে পথের নির্দেশনা দিয়েছেন, তা দেশের পল্লী সমবায় ভাবনায় নতুন উদ্ভাবন বলে মনে করা যায়। “সমবায় প্রণালীতে ঋণ দিয়ে নয়, একত্র কর্ম করিয়ে পল্লীবাসীর চিত্তকে ঐক্যপ্রবণ করে তুলে তবে আমরা পল্লীকে বাঁচাতে পারব।” কবির ভাবনা যুগের আলো বহন করছে। রাষ্ট্রের মধ্যে গ্রামীন ব্যাংকসহ যারা ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, তা দরিদ্র জনজীবনে মৌলিক কোন পরিবর্তন সূচিত করেনি। বরং বিদ্যমান সংকট ও শোষণ প্রক্রিয়াকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তুলেছে।

কবি রাষ্ট্রের উন্নয়নে পথ দেখিয়েছেন, নৃশংসতার বিরূদ্ধে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৩১ সালে হিজলীর জেলে হত্যাকান্ডের বিরূদ্ধে লক্ষাধিক সমাবেশে বক্তব্য প্রদান করেন। ১৯৩৩ সালে আন্দামানে জেল হত্যার প্রতিবাদ করে ভারতের জনগণের মুক্তি ও ঐক্য কামনা করেছেন।একইভাবে বিশ্বের উদ্ভূত সংকট থেকে উত্তরণে পথের সন্ধান দিয়েছেন। ১৯৩৭ সালে ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধে, ১৯৩২ সালে জাপানের চীন আক্রমণে তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রতিবাদ করেন। ১৯৩৫ সালে কবিগুরু “বিশ্বশান্তি কংগ্রেসের’ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। ১৯৩৫ সালে ইতালির বর্বরতার বিরদ্ধে দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ১৯৩৬ সালে All India Civil Liberties Union-এর অনারারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যক্তিস্বাধীনতা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে কবি প্রত্যক্ষভাবে প্রত্যকটিতে অংশগ্রহণ করেছেন। কবির বিরল ভূমিকার জন্য বিখ্যাত লেখক রোমাঁ রলাঁ ১৯৩৭ সালে ৫ই ডিসেম্বর কবিগুরুকে অভিনন্দন জানিয়ে পত্র লিখেছিলেন।
” In the Bulletin of the ‘ Indian Civil Liberties Union’, which I receive from time to time, I read your name always in the frontline of the sacred struggle for the defence of liberty and for Justice…. I would wish them to have a powerful politics guide like Jaures and s great poet like Victor Hugo— or like yourself. They deseve it. ( Rolland & Tagore).

কবিগুরু এভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল বিষয়ে প্রগতিশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। একই সাথে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উগ্র ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদের বিরূদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। সকল বর্বরতা থেকে মানব সভ্যতাকে রক্ষার জন্য কবির আহবান ও ভূমিকা ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

বৃটিশ সরকারের অন্যায্যতা বিরূদ্ধে, স্বদেশী আন্দোলনের পক্ষে কবি ” বাংলার মাটি বাংলার জল”, ‘সার্থক জনম আমার’, ‘ও আমার দেশের মাটি’ ইত্যাদি সংগীত রচনা করেছেন। প্রথম মহাযুদ্ধ উত্তর কবি ভারতবর্ষকে বিশ্বের মিলনক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

“আমার বাণীর পথরোধ করবে এমন সাধ্য কারো নেই। সমস্ত পৃথিবীকে আমি আমার দেশ বলে বরণ করে নিয়েছি। …পৃথিবী থেকে যাবার আগে সমস্ত পৃথিবীর সঙ্গে আমার আপন সম্বন্ধ অনুভব ও স্বীকার করে যেতে পারলুম এইটেতে আমি আমার জীবন সার্থক বলে জানচি। আমাদের বাংলাদেশের কোণে একটা বিশ্বপৃথিবীর হাওয়া উঠেচে এইটে আমাদের সকলের অনুভব করা উচিত।”

কবিগুরু যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন। সেই চিঠিতে আরও পাই—
“বাংলাদেশের চিত্ত সর্বকালের সর্বদেশে প্রসারিত হোক, বাংলাদেশের বাণী সর্বজাতির বাণী হোক। … আমাদের সত্যকার সাধনা কি! …আমরা সর্বদেশের বৈরাগী হব— আমরা মানববিধাতার রাজপথে মহামানবের গান গেয়ে বেড়াব। …মহাবিশ্বের পথকেই আমরা দেশ বলে গ্রহণ করব।” (চিঠিপত্র, দ্বিতীয় খণ্ড)।

বিশ্ব মানব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কোন দেশের সীমায় তিনি আবদ্ধ নন। তাঁর চিন্তা-ভাবনা ও কর্মের প্রয়োগ হলে সকল দেশের জনজীবনে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। তাইতে কবি বলেন, “যেদিন মানুষ স্পষ্ট করে বুঝবে যে, সর্বজাতীয় রাষ্ট্রিক সমবায়েই জাতির প্রকৃত স্বার্থসাধন সম্ভব, কেননা পরস্পর নির্ভরতাই মানুষের ধর্ম, সেইদিনই রাষ্ট্রনীতিও বৃহৎভাবে মানুষের সত্য সাধনায় ক্ষেত্র হবে।” ‘রবীন্দ্র রচনাবলী, ২৪ খণ্ড।’

জাতি বিষয়ক ভাবনায় কবিগুরু ‘নেশন কী?’
এই শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেখানে, তিনি বলছেন, ‘নেশন একটি সজীব সত্তা, একটি মানস পদার্থ। দুইটি জিনিস এই পদার্থের অন্তঃপ্রকৃতি গঠিত করিয়াছে। তাহার মধ্যে একটি অতীতে অবস্থিত, আর-একটি বর্তমানে। একটি হইতেছে সর্বসাধারণের প্রাচীন স্মৃতিসম্পদ, আর-একটি পরস্পর সম্মতি, একত্রে বাস করিবার ইচ্ছা — যে অখণ্ড উত্তরাধিকার হস্তগত হইয়াছে তাহাকে উপযুক্তভাবে রক্ষা করিবার ইচ্ছা। মানুষ উপস্থিতমত নিজেকে হাতে হাতে তৈরি করে না। নেশনও সেইরূপ সুদীর্ঘ অতীত কালের প্রয়াস, ত্যাগস্বীকার এবং নিষ্ঠা হইতে অভিব্যক্ত হইতে থাকে। আমরা অনেকটা পরিমাণে আমাদের পূর্বপুরুষের দ্বারা পূর্বেই গঠিত হইয়া আছি। অতীতের বীর্য, মহত্ত্ব, কীর্তি, ইহার উপরে ন্যাশনাল ভাবের মূলপত্তন। অতীত কালে সর্বসাধারণের এক গৌরব এবং বর্তমান কালের সর্বসাধারণের এক ইচ্ছা, পূর্বে একত্রের বড় কাজ করা এবং পুনরায় একত্রে সেইরূপ কাজ করিবার সংকল্প— ইহাই জনসম্প্রদায় গঠনের ঐকান্তিক মূল।”

এই জনসম্প্রদায় গঠনের জন্য রেনাঁর মতামত এই প্রবন্ধে তুলে ধরেছেন।
রেনাঁ বলিতেছেন, ”আমরা রাষ্ট্রতন্ত্র হইতে রাজার অধিকার ও ধর্মের আধিপত্য নির্বাসিত করিয়াছি, এখন বাকি কি রহিল? মানুষ, মানুষের ইচ্ছা, মানুষের প্রয়োজন,-সকল। অনেকে বলবেন ইচ্ছা জিনিসটা পরিবর্তনশীল, অনেক সময় তাহা অনিয়ন্ত্রিত অশিক্ষিত — তাহার হস্তে নেশনের ন্যাশনালিটির মতো প্রাচীন মহৎসম্পদ রক্ষার ভার দিলে, ক্রমে যে সমস্ত বিশ্লিষ্ট হইয়া নষ্ট হইয়া যাইবে।”

…Rene′ Descartes একজন ফরাসী দার্শনিক ছিলেন। তাঁর বক্তব্যকে কবিগুরু গুরুত্ব দিয়েছেন। ‘রেনাঁ বলেন— ”মানুষ জাতির, ভাষার, ধর্মমতের বা নদীপর্বতের দাস নহে। অনেকগুলি সংযতমনা ও ভাবোত্তপ্ত হৃদয় মনুষ্যের মহাসংঘ যে একটি সচেতন চারিত্র সৃজন করপ তাহাই নশন। সাধারণের মঙ্গলের জন্য ব্যক্তিবিশেষের ত্যাগ -স্বীকারের দ্বারা এই চারিত্র চিত্র যতক্ষণ নিজের বল সপ্রমাণ করে ততক্ষণ তাহাকে সাঁচ্চা বলিয়া জানা যায় এবং ততক্ষণ তাহার টিকিয়া থাকিবার সম্পূর্ণ অধিকার আছে।”

রেনাঁর আরেকটি উদ্ধৃতি ‘ভারতবর্ষীয় সমাজ’ প্রবন্ধ থেকে নেয়া হলো। রেনাঁ দেখাইয়াছেন, ”নেশনের মূল লক্ষণ কী, তাহা বাহির করা শক্ত। জাতির ঐক্য, ভাষার ঐক্য, ধর্মের ঐক্য, দেশের ভূসংস্থান, এসকলের উপরে ন্যাশনালত্বের একান্ত নির্ভর নহে।”

জাতি বিষয়ক মতামত দিতে গিয়ে কবিগুরু বলেছেন— ”প্রত্যেক জাতিই বিশ্বমানবের অঙ্গ। বিশ্বমানবকে দান করিবার, সহায়তা করিবার সামগ্রী কী উদ্ভাবন করিতেছে, ইহারই সদুত্তর দিয়া প্রত্যেক জাতি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যখন হইতে সেই উদ্ভাবনের প্রাণশক্তি কোনো জাতি হারায়, তখন হইতেই সেই বিরাট মানবের কলেবরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত অঙ্গের ন্যায় সে কেবল ভারস্বরূপে বিরাজ করে।” (স্বদেশী সমাজ)

কবিগুরুর বিশ্বচেতনার দ্যুতি বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক অনুপ্রাণিত করেছিলো। তিনি প্রতিনিয়ত ভাবনার জড়তাকে মুক্ত করে আলোর পথে নিয়ে যায়, মানবের মহান পরিশুদ্ধ আত্মার সংযোগ সৃষ্টি করে। মানবের সাথে মানবের শান্তি স্থাপনে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্ববাসীকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। সামন্তীয় অভিজাত পরিবারের শৈশব কৈশোরের বলয়, যৌবনের প্রারম্ভে পুঁজিবাদী সমাজের ইউরোপ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া আগ্রহ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বিশ্ব মানব ভাবনার দার্শনিক কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শৈশব থেকে অন্তিম প্রয়াণের পূর্ব পর্যন্ত সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে দেশ কালের সীমা অতিক্রম করে তিনি মহামানবে পরিণত হয়েছেন। তাঁর সৃষ্টিকর্মের বৈশিষ্ট্য সত্যানুভূতির পথে, সেই পথে ফরাসী দার্শনিক বার্গসঁ-এর গতিশীলতা – change, change, constant change is life, অপূর্ব সম্মিলন সৃষ্টি করে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বানুভূতি ও মর্ত্যপ্রেম মিলেমিশে মহৎ আত্মোপলব্ধির ‘জীবনদেবতা’ রবীন্দ্র-দর্শন, তাঁর দার্শনিক উপলব্ধি, বৃহৎ মানববিশ্বের নির্মল আত্মপ্রকাশ ঘটায়। “আজি অমারাত্রির দুর্গতোরণ যত/ ধূলিতলে হয়ে গেল ভগ্ন/ উদয়শিখরে জাগে মাভৈঃ মাভৈঃ রব / নবজীবনের আশ্বাসে। ‘জয় জয় জয় রে মানব-অভু্যদয়’/ মন্দ্রি উঠিল আকাশে’ (সভ্যতার সংকট)। রবীন্দ্র -দর্শন, তাঁর শিল্পের সকল শাখায় নিজস্ব রূপে বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বলরূপে বিদ্যমান। তিনি কবি, ঔপন্যাসিক, নট নাট্যকর, সংগীতস্রষ্টা, চিত্রকর, ছোটগল্পকার, দার্শনিক, কণ্ঠশিল্পী অর্থাৎ শিল্পের সকল শাখায় তাঁর অবস্থান শক্তিশালী এবং বিশ্বে, এ যাবতকাল পর্যন্ত তাঁর মতো বহুমাত্রিক অনবদ্য দার্শনিক শিল্পদ্রষ্টার অস্তিত্ব বিরল। বাঙালির জাতিসত্তার সার্বজনীন রূপটি তাঁর মাধ্যমে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত ও সমাদৃত হয়েছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধুমাত্র কবি নন, তিনি অনন্তকালের জীবনবোধের দ্বারা আন্তর্জাতিক ঐক্যবোধ সৃষ্টি করেছেন।

কবির উপলব্ধি প্রকৃতির ক্ষেত্রেও পাওয়া যায়। বিশ্বের যুদ্ধ মানুষকে ধ্বংস করে, তেমনি প্রকৃতিও ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। বনভূমি, অরণ্য সম্পদ ধ্বংসের মাধ্যমে বিশ্বের বিপদজনক পরিস্থিতি হতে পারে। সেই বিষয়ে কবিগুরু শ্রীনিকেতনে বৃক্ষরোপণ ও হলকর্ষণ উৎসবে ‘অরণ্য দেবতা’ শীর্ষক একটি লিখিত ভাষণ দেন।
” … অরণ্য— সে পৃথিবীকে রক্ষা করেছে ধ্বংসের হাত থেকে, তার ফলমূল খেয়ে মানুষ বেঁচেছে। সেই অরণ্য নষ্ট হওয়ায় এখন বিপদ আসন্ন।’
”এ সমস্যা আজ শুধু এখানে নয়, মানুষের সর্বগ্রাসী লোভের হাত থেকে অরণ্যসম্পদকে রক্ষা করা সর্বত্রই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকাতে বড় বড় বন ধ্বংস করা হয়েছে ; তার ফলে এখন বালু উড়িয়ে আসছে ঝড়, কৃষিক্ষেত্রকে নষ্ট করছে, চাপা দিচ্ছে। … লুব্ধ মানুষ অরণ্যকে ধ্বংস করে নিজেরই ক্ষতিকে ডেকে এনেছে।” (পল্লীপ্রকৃতি)

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সকল ভাবনার মধ্যে বিশ্ববোধ প্রবলরূপে বিদ্যমান। তাঁর লেখার মধ্যে পৃথিবীর মানুষের প্রতি অপরিসীম মমত্ববোধ ও ভালোবাসা স্থান পেয়েছে। অত্যাচারিত, নিগৃহীত, নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের পক্ষে কবি অবস্থান নিয়েছেন। স্বদেশে- বিদেশে সকল প্রকার অত্যাচারী, উৎপীড়কদের অন্যায়, শোষণ, লুণ্ঠন, আগ্রাসনের বিরূদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের পক্ষে দৃঢ়চেতা-দীপ্তিমান থেকেছেন। কবিগুরু বিংশ শতাব্দীর মানবিকতার সংগঠক, সংগ্রামী সত্তার মহামানব।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!