পথে হলো দেখা

আজ বিকেলটা আর পাঁচটা বিকেলের মতো নয়, বারবার ঝালমুড়ি আনমোনা হয়ে পড়ছে—
পিকলু, রিঙ্কু দাদা, পিকাই সবাই রয়েছে তবু যেন খেলতে ইচ্ছে করছে না ঝালমুড়ির, দুপুর থেকে ঘন মেঘ করে এসেছে এখানে আজ ঢালবে বোধহয়!
আর পাহাড় মানেই তো যখন-তখন বৃষ্টি!
যাইহোক গড়াম-গুড়ুম করে মেঘ ডাকছে, ঝালমুড়ি বলে উঠলো রিঙ্কু দাদা চল ফিরে যাই বৃষ্টি আসবে!
ঝালমুড়ি সবার পেছনে লাইন করে বাকিরা আগে আগে হাটছে যদিও হাতিদের এটাই নিয়ম জঙ্গলে তারা লাইন দিয়েই বড় থেকে ছোটো ক্রমে হাঁটে। কিছুটা যাওয়ার পর ঝালমুড়ি সামনে তাকিয়ে দেখে কেউ নেই সেখানে ঘন অন্ধকার, পাহাড়েতে ঝুপ করেই তো রাত নামে!
‘রিঙ্কু দাদা…, পিকলু কোথায় তোরা? আমার ভয় করছে!’ঝালমুড়ি একটানা ডেকে গেল! কারো কোনো সাড়া নেই।
ঝালমুড়ির বুকের ভেতর ধরফর করতে আরম্ভ করলো; এবার কি হবে?
সে তো কাউকে সত্যিটা বলতেই পারেনি তাহলে—
বাড়ি ফিরতে তাকে হবেই।
কিন্তু…
তন্য তন্য করে জঙ্গলের রাস্তা চোষে ফেললো তবু সে নিজের বাড়ি খুঁজে পেলো না।
ক্লান্তিতে ঝালমুড়ির শরীর এবার ভেঙে পড়ছে তখন যন্ত্রনায় ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ, অবশেষে একটি পরিত্যাক্ত মন্দিরের চাতালে গিয়ে বসলো, একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে সে ভাবতে লাগলো—
যেভাবে হোক রাতটা কাটিয়ে দিতে পারলেই,
সকাল থেকে আবার নতুন করে বাড়ির রাস্তাটা খোঁজার কাজ শুরু করবে।
এমন সময় একটা ভারি গলায় কে যেন বলে উঠল—
‘কি ব্যাপার ভায়া! আমার আস্তানায় তুমি কি করছো’?
হকচকিয়ে তাকিয়ে ঝালমুড়ি দেখে আরেকটা হাতি, গায়ের রং ময়লা পোষাকটাও ধুলো মাখা, একটু রুগ্ন গোছের, দেখে যেন মনে হচ্ছে—
কয়েকদিন ঠিক মতো খেতে পায়নি, সে অর্থে দেখতে গেলে ঝালমুড়ি বাবা মায়ের একটিমাত্র সন্তান বেশ আদরে বড় হয়েছে, যার ফলে ও যে ধনী পরিবারের সন্তান সেটা ওর চকচকে গড়ন দেখে বেশ বোঝাই যায়। তো হাতিটি আরেকটু গলা খেঁকিয়ে জিজ্ঞেস করে উঠল—
‘কি ব্যাপার এখানে কেন?দেখে তো বড়লোক ঘরের হাতি বলেই মনে হচ্ছে,তো আমার মতো গরীবের কুটিরে কেন ভাই!’
উত্তর দেওয়ার আগেই ঝালমুড়ির চোখ ভিজে এলো, ঝাপসা হয়ে গেল দৃষ্টি, অবস্থা বেগোতিক দেখে উল্টো দিকের হাতিটি, একটু নরম করে বললো-‘হ্যালো আমি টুকলু,আর তোমার নাম?’
একটু ধাতস্থ হয়ে উত্তর দিল—
আমি ঝালমুড়ি।
টুকলু: এখানে এলে কি করে? তোমার বাড়ি কোথায়?
ঝালমুড়ি: আমি হারিয়ে গেছি, বিকেলে খেলতে গেছিলাম, সেখান থেকে ফেরার পথেই—
হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললো সে। টুকলো তাড়াতাড়ি করে এক গামলা জল এগিয়ে দিল তার দিকে।
সে, শোঁ শোঁ শব্দ করে সমস্ত জলটা এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেললো ভেতরটা যেন আকাঠ মরুভূমি হয়ে ছিল, একটু ভালো লাগলো ঝালমুড়ির।
টুকলু: আমি ফেরার পথে কিছু ফল নিয়ে এসেছি ডিনারের জন্য, তুমি খাবে তো? রাত হয়ে গেছে তুমি তো কিচ্ছু খাওনি, চলো খেয়ে নিই, কাল সকালে আমি নিজে গিয়ে তোমাকে বাড়ি দিয়ে আসবো তুমি কিচ্ছু ভেবো না, কষ্ট ও পেও না।
ঝালমুড়ির গলার কাছে যে কথাটা দলা পাকাচ্ছে সেটা কি সে টুকলু কে বলবে?কথাটা সে তার বাবা-মাকেও জানাতে পারেনি, আদেও পারবে কি না জানে না, তবে কি একজন অপরিচিত হাতিকে সেটা বলবে? বিশ্বাসই বা কাকে করবে সে? পাঁচ বছর ধরে যাদের বন্ধু বলে জানতো মাঝ-জঙ্গলে ঝড় বৃষ্টির ভয়ে তারাই ওকে একা ফেলে চলে গেল, আর এই একজন টুকলু যে নিজের খাবার থেকে তাকে খাবার অফার করছে, জল এনে দিয়েছে, এতো অভাবেও তাকে এতটা কেয়ার করছে…

এইসব আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখ লেগে গেছে বুঝতেই পারেনি ঝালমুড়ি, চোখ যখন খুললো তখন চারিদিকে ফটফট করছে আলো, কিন্তু পাশে টুকলু নেই, গেল কোথায়? সাময়িক ভাবে একটু ঘাবড়ে গেল ঝালমুড়ি!
তারপর, দেখলো দুধ পাওরুটি নিয়ে একগাল হাসি মুখে টুকলু মাথা দুলিয়ে আসছে, হঠাৎ এই দৃশ্যটি দেখে ঝালমুড়ির বুকের ভেতরটায় একটা শান্ত স্রোত বয়ে গেল, যেন কোনো বহু জন্মের চেনা এক অনুভূতি!
টুকলু বলে উঠলো—
বলো অ্যাড্রেসটা তোমাকে বাড়ি দিয়ে আস্তে হবে তো? ঝালমুড়ি আবেগ ঘন চোখে টুকলুর দিকে তাকিয়ে সততার সঙ্গে বলে দিল, আমার তো মনে নেই, বলেই সে হু হু করে কেঁদে ফেললো!
টুকলু মনে মনে ভাবলো—
উফ্ কি ছিছকাদুনে ছেলেরে বাবা!
ঝালমুড়ি: জানো দীর্ঘ অনেক দিন ধরে আমি কিছু কিছু করে পুরনো ঘটনা ভুলে যাচ্ছি।
টুকলু: একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো ঝালমুড়ির দিকে, তারপর বললো আচ্ছা ঠিক আছে তোমার বাবার নামটাই বলো, আমি এই তল্লাটে মোটামুটি সব হাতিদেরই কম-বেশি চিনি, একটা সময় সার্কাস দেখাতামতো, অনেক হোমড়া-চোমড়া হাতির সাথে ওঠা-বসা ছিল, এখনো আছে, তুমি বললে লোক লাগাবো কনো অসুবিধা নেই।
ঝালমুড়ি: এখনো সার্কাসে কাজ করো?
টুকলু: না ম্যাজিক দেখাই, পয়সা কম তবে শান্তি আছে। যাহোক তোমার বাবার নাম বলো?
ঝালমুড়ি: হ্যাঁ আমার বাবার নাম—
নামটা মনেই করতেপারছে না সে, মাথা ঝাঁকিয়ে শুঁড় নাচিয়ে ও কিছু মনে পড়ছে না, মাথার দুপাশ যেন ফেটে বেড়িয়ে যাবে, চোখ গুলো জবা ফুলের মতো লাল হয়ে উঠছে।
এই অবস্থা দেখে—
টুকলু তাড়াতাড়ি করে ঝালমুড়িকে শান্ত করার ব্যবস্থা করে, সে বুঝতে পারে এখন ব্রেনে চাপ পড়লে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই সে বাড়ি সংক্রান্ত কোনো কথাই আর ঝালমুড়ির সামনে তোলে না।
কিন্তু টুকলুর ভেতর ভেতর খুব কষ্ট হয় ঝালমুড়ির জন্য— ছেলেটা সারাদিন মন মরা হয়ে থাকে, বাড়ি থেকে বেড়োয় না, গল্প করে না, শুধু টুকলুর সাথেই যা এক চিলতে কথা বলে।
এরকমই একদিন বিকেলে বাড়ি ফিরে টুকলু দেখে ঝালমুড়ি কিছুতেই নিজের নাম মনে করতে পারছে না।তখন টুকলুর মনে হয়—
না, বিষয়টা তো সিরিয়াস হয়ে উঠছে—
তখন সে সাইকায়ট্রিস্ট ডক্টর লাড্ডুর কাছে যায়, তিনি আবার টুকলুর বাবার ছোটোবেলার বন্ধু , বাবা মারা যাওয়ার পর কোনোদিন আর আসেনি টুকলু চেম্বারে।
সমস্ত কথা টুকলুর মুখে শুনে—
ডক্টর ঝালমুড়িকে নিয়ে আসতে বলে।
পরের দিন তাকে নিয়ে হাজির হয় টুকলু, স্ক্যান করে দেখা যায় ঝালমুড়ির মাথার পেছনে একটা আঘাত লেগেছিল, তার ফল স্বরূপই
এই মেমরি লসের প্রবলেম। তিনি ওষুধ-পত্র সব দিয়ে ঝালমুড়িকে বাইরে ওয়েট করতে বলেন, আর ইতিমধ্যে টুকলুকে আলাদা করে ডেকে নেন আর বলেন— ঝালমুড়ির প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে। টুকলু ও জিজ্ঞাসা করলো—
‘ডাক্তার আংকেল ওর পুরনো স্মৃতি ফিরে আসবে তো?’
ডক্টর বললেন— ওষুধগুলো ঠিক করে দাও ধীরে ধীরে মনে পড়বে, তারাহুরো করবে না।
‘ওকে আংকেল’এই বলে টুকলু ঝালমুড়িকে নিয়ে বেড়িয়ে গেল।
এ যেন এক নতুন চ্যালেঞ্জ টুকলুর কাছে—
ঝালমুড়িকে সুস্থ করে বাড়ি ফেরাতেই হবে, টুকলুর বাবা-মা কেউ আর নেই, কিন্তু বাবা-মায়ের থেকে দূরে থাকার কষ্ট সে প্রতি পলে অনুভব করে, তাই সে কখনোই চায়না ঝালমুড়ি আর বেশিদিন সেই কষ্ট পাক। এমনিও ঝালমুড়ি কয়েক বছরের ছোটো টুকলুর থেকে, আর ধনী পরিবারের সন্তান বলেই হয়তো একটু আদুরে গোছের।কষ্ট পেয়ে যায় খুব তাড়াতাড়ি।
সে যেমনি হোক টুকলুর বন্ধু তো বটে।
দিন রাত এক করে ঝালমুড়িকে মানসিক ভাবে শারিরীক ভাবে যত্ন করতে শুরু করল সে। ওষুধ দেওয়া খাওয়ার খাওয়ানো আবার তার সাথে সাথে স্পেশাল সেশান্।বিকেল হলেই ঝালমুড়ি কে শুঁড় ধরে ঘুরতে নিয়ে যেত টুকলু, তার তো জঙ্গল প্রায় নখ দর্পনে। যদি কোনোদিন ঝালমুড়ির মনে পড়ে যায় তার বাড়ির পথ। এই জন্যই এই প্রচেষ্টা।

এভাবেই কেটে গেল প্রায় পাঁচ মাস!
কিন্তু রুটিন এদিক ওদিক হতো না তার, তো এমনি একদিন বিকেল বেলা ঝালমুড়ি ও টুকলু বেড়িয়েছে, কিন্তু আশ্চর্য সেদিন টুকলু নয় ঝালমুড়ি টুকলুকে শুঁড় ধরে নিয়ে যেতে লাগলো জঙ্গলের ভেতর—
যেন সেই রাস্তা, ঘাট, বাঁক তার মুখস্থ
কিছুটা যাওয়ার পর টুকলু দেখতে পায়, এক মস্ত প্যালেস, ঝিলমুড়ি শুঁড় তুলে বলে— ‘দেখো আমার বাড়ি।’
টুকলুর কথাটা শুনেই খুব অদ্ভুত অনুভূতি হয়, সে বুঝতেই পারে না যে হাসবে নাকি কাঁদবে, ঝালমুড়ি দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাড়ির দিকে, আর টুকলুর পাগুলো গেঁথে যাচ্ছে মাটিতে, এগোতে পারছে না সে, কিন্তু এমন কেন হচ্ছে? সে তো এটাই চেয়েছিল তাহলে আজ কেন?
ঝালমুড়ির বাবা-মা বেড়িয়ে এসে জড়িয়ে ধরেছে তাকে, দুচোখে জল, টুকলু একটু দূরে দাঁড়িয়ে অমোঘ দৃষ্টিতে ওদের দেখছে!
এমন সময়—
ঝালমুড়ির বাবা এগিয়ে এল টুকলুর দিকে—
একি তুমি আবার কে? আমাদের বাড়ির সামনে কি করছো?’
টুকলু: আসলে আমি…
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মাথা ঘুড়িয়ে ঝালমুড়িকে, তার বাবা জিজ্ঞেস করে—
‘ওই ছেলে-হাতিটা কে? তুই চিনিস?’
ঝালমুড়ি অনেক্ষন তাকিয়ে রইল টুকলুর দিকে…
তারপর বাবার দিকে ঘুরে বললো—
নাতো..
টুকলু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো!
ঝালমুড়িরকে নিয়ে ওরা ঢুকে গেল ভেতরে।
মাথা নীচু করে টুকলু ফিরে এলো,
আসার পথে ফ্ল্যাশব্যাকে তার মনে পড়ছিল ডক্টর আংকেলের একটিই কথা—
‘টুকলু পুরনো স্মৃতি ফিরে এলে ওর কিন্তু নতুন তাজা স্মৃতিগুলো মুছে যাবে, হয়তো তোমার বন্ধুটি আর তোমাকেও চিনতে পারবে না। তুমি সেইতে পারবে তো?’
টুকলু সেদিন বলেছিল—
পারবো ডক্টর আংকেল…..

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!