নিউইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎকার
১২ আগস্ট ১৯২৭ আমেরিকার দ্য নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় পুরো দুই পৃষ্ঠা জুড়ে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সঙ্গীতজ্ঞ-গায়ক দিলীপকুমার রায়ের একটি কথোপকথন প্রকাশিত হয়। বিষয় ছিল পুরুষ, নারী, ভালোবাসা ও স্বাধীনতা। যদিও পত্রিকার পাতায় সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী হিসেবে ‘বিলিপ কামুর রয়” ভুলবশত ছাপা হয়েছে। দিলীপকুমার রায় (১৮৯৬-১৯৮০) এর পিতা গীতিকার, কবি ও সঙ্গীতশিল্পী দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। পূর্ণাঙ্গ কথোপকথনটি নিচে প্রকাশিত হল। ইংরেজি থেকে ভাষান্তর করেছেন তুহিন দাস।
সন্ধ্যেবেলায় শান্তিনিকেতনে তাঁর লেখার ঘরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আধুনিক সমাজে নারী ও তাদের অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন। এ মহান ভারতীয় কবি আমাকে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, এখানে তাঁর আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে, যখন অস্তগামী সূর্য পশ্চিম দিগন্তে তার শেষ রশ্মিগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছিল, তখন আমরা নারীদের নতুন উদয় নিয়ে আলোচনা করেছি।
আমি যা জিজ্ঞাসা করেছিলাম তা হল, সামাজিক অধিকার ও কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে সম্পূর্ণ সমতার বিষয়ে কবি আধুনিক নারীদের বিক্ষোভ সম্পর্কে কি ভাবেন।
”আমরা প্রায়শই ভুলে যাই যে নারী মূলত পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।” রবীন্দ্রনাথ বললেন, “নারী পুরুষের পরিপূরক। তাই এটা নারীদের জন্য কোনো মঙ্গলজনক হতে পারে না যদি সে জীবনের শোভা বর্ধন করে না এমন জিনিসের পিছনে ঝাঁকুনি দিয়ে কাজের জগতের ময়দানে বেরিয়ে আসে।”
”আপনি কি বলতে চাচ্ছেন যে নারীরা অবশ্যই পুরুষদের সাথে সমান অধিকার দাবি করবেন না?”
”না, আমি তা বলছি না,” বললেন কবি। “আমি বলতে চাচ্ছি, তারা যেন ভুলে না যায় যে তাদের জীবনে যে উদ্দেশ্য রয়েছে তা পুরুষের মতো একই রকম নয়। তারা নিশ্চিতভাবে আমাদের জীবনের যাত্রায় পুরুষদের সহযোগী, তবে তাদেরও মনে রাখতে হবে যে সহযোগিতা মানে অনুকরণ নয়।”
আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “পুরুষ এবং নারীদের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে, আপনি কি এ বিষয়ে যুক্তি দিচ্ছেন?”
“অবশ্যই আমি দেবো.” তিনি জবাব দিলেন, “যদি না থাকতো, তবে মহাবিশ্বের চিরন্তন খেলা কখনই শুরু হতো না। নারী যদি পুরুষের সঙ্গী হতেন তাদের জীবনে একই কাজ সম্পাদন করার জন্য, তবে জীবনে একঘেয়েমি ছাড়া আর কিছুই থাকত না; শুষ্ক দীর্ঘ প্রসারিত অবসাদ মানবজাতি কখনই সহ্য করতে পারে না। সৌভাগ্যবশত, নারী পুরুষের সঙ্গী নয়, বরং তাদের জীবনের যৌথ নৃত্যে প্রতিযোগী ও পরিপূরক। পুরুষের মানসিক জগতের অবচেতন অংশে নারীর অনুপ্রেরণার বীজ অবশ্যই রোপণ করতে হবে যাতে তার সৃজনশীল উদ্দীপনা উন্মুক্ত হতে পারে। আমি এক মুহুর্তের জন্যও নারীর ক্রিয়াকলাপকে শারীরিক সমতলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে জীবনে তার কার্যকারিতাকে ছোট করি না। মানসিক, উপলব্ধির, এবং আধ্যাত্মিক কার্যকলাপের প্রধান অনুপ্রেরণাকারী হিসাবে নারী পুরুষের জন্য অপরিহার্য। তারা নেপথ্যে কাজ করার কারণেই আমরা সচেতনভাবে তাদের অবদান উপলব্ধি করি না।“
আমার পরে রবীন্দ্রনাথের ‘কৃতজ্ঞ’ শিরোনামে একটি কবিতার কথা মনে পড়লো, যেখানে তিনি বলছেন,”তবুও আমি জানি যে আপনি আমাকে ভালবাসেন বলেই আমার কবিতা ও সঙ্গীতের ফসল আমার সারা জীবন দীপ্তিময় উচ্ছ্বাসে অন্তহীন আঙ্গিকে ও বেড়াহীন ভাবে ফুটেছে।”
“আপনি বলতে চাচ্ছেন, তাহলে, নারীদের পরিপূর্ণতার উপায় পুরুষদের থেকে আলাদা?”
”হ্যাঁ, আমি বলি”, রবীন্দ্রনাথ বললেন। “কারণ আমি বিশ্বাস করতে পারি না যে প্রকৃতি কখনোই চায় যে নারী পুরুষের মতো অভিন্ন ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তি করে একই মাড়ানো পথে পদার্পণ করুক।”
“তাদের নিজ নিজ চাহিদাও তো আলাদা হবে, তাই না?”
” অবশ্যই।”
”কোন্ উপায়ে?”
”পুরুষের প্রয়োজন দূরত্ব (স্পেস) ও স্বাধীনতা—মুক্তি—এক অর্থে তার সঙ্গী, নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্যের চেয়েও বেশি মৌলিক।”
আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম,”আপনি কি বলতে চান যে নারীর স্বাধীনতার প্রয়োজন নেই?”
“না, আমি তা বলছি না,” কবি বললেন, “শুনুন, আমি আরেকটু স্পষ্ট করে বলবো।“ তিনি থামলেন এবং তারপরে তার সুরেলা কণ্ঠে বলা চালিয়ে গেলেন:”যখন আমি বলেছিলাম যে পুরুষের স্বাধীনতার বেশি প্রয়োজন, আমি বলতে চাইনি যে নারীর স্বাধীনতার প্রয়োজন নেই। আমি কেবল বোঝাতে চেয়েছিলাম যে নারীর একাগ্রতা ও আবেগ পুরুষের চেয়ে বেশি প্রয়োজন। অন্য কথায়, যখন নারীত্ব প্রেম ও স্নেহের মাধ্যমে নিজেকে আরও পূর্ণ করে তোলে, আর পুরুষের পরিপূর্ণতার জন্য স্বাধীনতার বিস্তৃত পরিসরের প্রয়োজন। পুরুষ মূলত অসীম সমৃদ্ধির জন্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নারী অসীম সমৃদ্ধির মাধ্যমে উচ্চাকাঙ্ক্ষী নয়। শুধুমাত্র তার পদ্ধতি ভিন্ন—এই আরকি। সে তার পরিপূর্ণতার লক্ষ্যে কাজ করে, মুক্তির দিকে নয় যা হল দূরত্ব (স্পেস), বরং বন্ধনের মাধ্যমে, যা হল একাগ্রতা। প্রকৃতি কার্যত পুরুষকে কিছুটা উপেক্ষা করেছে, তার বেশিরভাগ মনোযোগ নারীদের দিয়েছে। ফলে প্রকৃতিকে আরও বেশি দায়মুক্তির সঙ্গে অস্বীকার করার সামর্থ্য পুরুষের রয়েছে এবং এইভাবে পুরুষ প্রকৃতিকে তার নিজের মুদ্রায় ফেরত দেয়। একটি উদাহরণস্বরূপ: যে অনুপ্রেরণা বুদ্ধকে অসীমের সন্ধানে তার স্ত্রী গোপাকে পরিত্যাগ করতে সক্ষম করেছিল তা কেবল একজন পুরুষের ক্ষেত্রেই সত্য হতে পারে। গোপা মূলত বুদ্ধকে শেষ পর্যন্ত ত্যাগ করতে অক্ষম ছিলেন।“
“কেন?”
কবি তার অবস্থানে ফিরে আসেন,”কারণ তিনি একজন নারী ছিলেন।”
”ক্ষমা করবেন”, আমি আপত্তি করলাম। “এমন নারী নেই যাদের—”
“—একাগ্রতার চেয়ে স্বাধীনতা বেশি প্রয়োজন?” রবীন্দ্রনাথ বাক্যটি শেষ করলেন। “অবশ্যই আছে। অন্য কথায়, এমন নারীদের খুঁজে পাওয়া যাবে যাদের প্রকৃতি নারীর চেয়ে পুরুষের মাটিতে বেশি গড়া—ঠিক তেমনি এমন পুরুষদেরও দেখা যায় যাদের স্বভাব মূলত পুরুষের চেয়ে বেশি নারীসুলভ। কিন্তু এই উভয় ধরনকে শ্রেণীর বাইরে আমার বলা উচিত কারণ তারা তাদের নিজ নিজ লিঙ্গের প্রতিনিধি নয়। তাই আমার মন্তব্য মিথ্যে নয় কারণ এই ধরনের মেয়েলি পুরুষ বা পুরুষালি নারীর অস্তিত্ব পাওয়া যায়।”
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি কি বলতে চাচ্ছেন, তাহলে, ভালোবাসা পুরুষের জন্য এতোটা অপরিহার্য নয় কারণ বুদ্ধ গোপাকে পরিত্যাগ করেছিলেন।”
“না, ঠিক তেমন নয়।” রবীন্দ্রনাথ বললেন। “আমি অবশ্যই বলতে পারি না যে ভালবাসা মানুষের কাছে গুরুত্বহীন। এইভাবে আমি বিশ্বাস করি না যে বুদ্ধ গোপাকে ভালোবাসতেন বা ভালোবাসতেন না এটা তার কাছে অমূলক ছিল। তার পূর্ণতার জন্য ভালোবাসার দরকার ছিল। এটাই তার জন্য সব কিছু না হলেও গোপার ভালোবাসা অবশ্যই ছিল, এটা তার জন্য একটি বড় রকমের সাহায্য ছিল। আমি এটা বলছি কারণ আমি মনে করি যে মানসিক উচ্ছ্বাস নারীকাঠামোর মেরুদণ্ড, যখন একজন পুরুষের ক্ষেত্রে এটি তার জীবনের যাত্রায় একটি দুর্দান্ত আলো মাত্র।
রবীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে এটি কি অল্প হলেও নারীর প্রতি অবমাননাকর নয়?
তিনি হাসিমুখে জবাব দিলেন,“কোনোভাবেই নয়। অথবা নারীর মর্যাদার প্রতি একটু অবমাননাকর মনে হলে তাহলে দায়িত্ব অবশ্যই প্রকৃতির, যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন। সত্যিই কিন্তু এর সারমর্ম এই ধরনের একটি দাবির মধ্যে কোনো অসম্মান নেই। এর সহজ অর্থ হল নারী পুরুষ থেকে আলাদা, এই যা। বাস্তবে, নারীকে ভিন্নভাবে গঠন করার কারণেই সৃষ্টি অনন্ত সময়ের মধ্যে বহুবিধ উপায়ে নিজেকে নতুন করে তৈরি করে। সে যদি নিছকই পুরুষের প্রতিরূপ হতেন, তাহলে সমস্ত স্পন্দন, সমস্ত অভিব্যক্তি, সমস্ত উচ্চারণ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেত। তাই শুধুমাত্র সৃষ্টিকে ক্রমাগত নিজেকে পুনর্নবীকরণ করার অনুমতি দেওয়া প্রকৃতি এটি এইভাবে ইচ্ছা করেছে যে, পুরুষ কেবল নারীর প্রতিধ্বনি বা পুরুষের নারী হবে না।“
“এটি আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে আপনি অন্য দিন আমাকে কি বলেছিলেন একজন বিবাহিত বিশেষ নারীর তার প্রেমিকের সঙ্গে সুউচ্চ সহবস্থানে ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েও পালিয়ে যাবার বিষয়ে। আপনি বলেছিলেন যে আপনার একজন বিজ্ঞ বন্ধু এতে আশ্চর্যের কিছু দেখেননি, কিন্তু সহজভাবে আপনি নিশ্চিত করেছেন যে সে নারীর অন্য কোনো উপায় ছিল না।”
”নারী যখন সত্যিই ভালোবাসে তখন সে তার পুরো প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। সে তার সত্তার প্রতিটি তন্তুর সঙ্গে ভালবাসাকে আঁকড়ে ধরে। সে কারণে সে আরও সহজে শেষ পর্যন্ত নিঃসংকোচে প্রেমের পথ অনুসরণ করতে তার বিদায়ের পথে সে সবকিছু ছেড়ে দিতে পারে।“
“আপনি কি মনে করেন না যে এমন ক্ষেত্রে একজন নারী এই পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুশোচনা করতে পারেন, বিশেষ করে যেখানে সমাজ উভয়ের প্রতিই নির্দয়?”
“যতক্ষণ না সামাজিক বর্বরতার সম্মুখীন হয়ে সে পুরুষটির জন্য তার ভালবাসা শীতল হয়।”
“আপনি কি মনে করেন যে এমন ক্ষেত্রে পুরুষটির ভালবাসা পরে ঠান্ডা হয়ে যেতে পারে?” আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
”আমি মনে করি যে যদি ভালবাসার জন্য তাকে তার সমস্ত গুরুতর কাজ ত্যাগ করতে হয় তবে এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় যে, যদি না তিনি একজন মেয়েলি পুরুষ, তিনি অবশেষে ধরে নেবেন যে ভালবাসা তাকে যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ দিতে পারছে না।”
আমি প্রশ্ন করলাম, “আপনি কি বোঝাতে চেয়েছেন?”

“সহজভাবে”, রবীন্দ্রনাথ বললেন, “যদি পুরুষটি একক স্থায়ী ভালবাসার জন্য তার সমস্ত বৈচিত্র্যময় দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রত্যাখ্যান করার জন্য কখনও অনুশোচনা না করে, তাহলে আমি মতামত দিতাম যে তার প্রকৃতি মূলত পুরুষের চেয়ে বেশি নারীসুলভ ছিল। আমি আরও সুনির্দিষ্ট হওয়ার চেষ্টা করব, কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি যে পুরুষ ও নারীর মৌলিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আমি সীমানা রেখা আঁকাতে আপনার কিছুটা হজম করতে অসুবিধা হচ্ছে।” তিনি থামলেন ও ধীরে ধীরে আবার শুরু করলেন: “আমি পুরুষকে মৌলিকভাবে একজন অন্বেষী হিসাবে দেখতে পারব না—অর্থাৎ সে একজন অসীমের অনুসন্ধানকারী উচ্চাকাঙক্ষী, একে পরিত্রাণ বলুন বা ঈশ্বর বা আপনার যা খুশি বলুন। তাই কোনো অভিজ্ঞতা, যতই মহৎ, তাকে সন্তুষ্ট করতে পারে না যদি তা পুরুষের গতিকে বেঁধে দেয়: যদি তা তার অজানায় নিমজ্জিত হতে বাধা দেয়। কিন্তু যদি এটি এই শর্ত পূরণ করে তাহলে ভালোবাসা একটি মহান অভিজ্ঞতা সত্যিই একটি খুব মহান আলোকসজ্জা হতে পারে। নারীর মুক্তি একটি ভিন্ন পথ ধরে রয়েছে। তাই একজন নারী তার জীবনসঙ্গীর থেকে ভিন্ন, একমাত্র ভালোবাসার মাধ্যমে সে নিজেকে পরিপূর্ণ করতে পারে। ফলস্বরূপ, যদি একজন পুরুষ দৃঢ়তার সাথে দাবি করে যে সেও তার সমগ্র সত্ত্বা দিয়ে ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারে, তাহলে সে অস্থিরতা অবশ্যই সাময়িক অন্ধত্ব বা খাঁটি সাহসিকতার কারণে হতে হবে। উভয় ক্ষেত্রেই, তার প্রকৃতি শেষ পর্যন্ত তার উপর প্রতিশোধ নিতে পারে না। পুরুষকে এমন একটি বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে যার প্রয়োজন সম্প্রসারণ, দূরত্ব, খোলামেলা হাওয়া, রস-বাতাস ও বৃষ্টির বিচিত্র সংমিশ্রণ—সব ধরনের জিনিস। তাই তার শিকড় ছিঁড়ে গেলে সে প্রচন্ড যন্ত্রণায় কাতরাতে পারে না। অন্যদিকে, নারী হল লতাপাতার মতো যে গাছটিকে আলিঙ্গন করার মাধ্যমে পরিপূর্ণতা খোঁজে এবং কেবল গাছের চারপাশে আঁকড়ে ধরেই বিকাশ লাভ করতে পারে। এই কারণেই অনেক মহান পুরুষ ভালোবাসার জন্য সবকিছু বিসর্জন দিয়ে তাদের জীবন ধোঁয়ায় শেষ করে দিয়েছেন, ঘোষণা করেছেন যে ভালোবাসাই যথেষ্ট। এটা দুর্ভাগ্যবশত পুরুষের ক্ষেত্রে সত্য নয় যে সে তার সমস্ত কাজ ও জীবনের লক্ষ্য পরিত্যাগ করতে ও শুধুমাত্র ভালোবাসায় সন্তুষ্ট থাকতে পারে—যদিও এটি নারীর ক্ষেত্রে সত্য হতে পারে।”
“তাহলে সে রকম ক্ষেত্রে একজন নারীর আচরণ কী হওয়া উচিত?”
”অপ্রচলিত ভালোবাসার নির্মম শাস্তির জন্য পুরুষটিকেই সবকিছু বিসর্জন দিতে হয় আপনি কি এমন ক্ষেত্রের কথা বলতে চাচ্ছেন?”
”হ্যাঁ।”
” আপনি জানেন যে আমি সারা বিশ্বের নারীদের জন্য কতটা গভীরভাবে অনুভব করি”, রবীন্দ্রনাথ বললেন। “তাই আমাকে আফসোসের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে যে এই ধরনের ক্ষেত্রে নারীটি, যদি সে সত্যিকারের ভালবাসে তবে কখনও সেই পুরুষের বিশাল ত্যাগ যে তার ভালবাসার জন্য সবকিছু ছুঁড়ে দেয় তা গ্রহণ করা করা উচিত নয়। আমি বলতে চাচ্ছি যে তাকে চিরকালের জন্য তার ভালবাসার ডানার নীচে আশ্রয় নিতে বলা উচিত নয়। এই সমস্ত ক্ষেত্রে তার এই সত্যটি হারানো উচিত নয় যে তার ভালোবাসার জন্য যে মূল্য তার প্রেমিককে দিতে বলতে হবে তা শেষ পর্যন্ত তার সামর্থ্যের চেয়ে বেশি, এটা প্রমাণিত। এবং কারণটি সুনির্দিষ্টভাবে হল তিনি একজন পুরুষ, নারী নন।”
“কিন্তু ধরুন যে একটি মূল্য যা পুরুষের জন্য খুব বেশি হতে পারে তা নারীর জন্য খুব বড় নাও হতে পারে, বস্তুগত কারণে এটি করুণ, আপনি কি এমন মনে করেন না?”
রবীন্দ্রনাথ জানতে চাইলেন, “কেন?”
”আপনি এখন যা বলেছেন তা এমন: নারী ভালোবাসার জন্য তার সবকিছু ছেড়ে দিতে পারে। কিন্তু, আমি জিজ্ঞাসা করি তা হল, পুরুষের কাছ থেকে পেতে হয় একটি অনিচ্ছাকৃত প্রতিদান যার গুরুত্ব তার কাছে গৌণ। আরও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে: একজন নারী যখন তার প্রেমিকের জন্য সবকিছু ছুঁড়ে ফেলে দেন, তখন এটি কি একটি ট্র্যাজেডি নয় যে তিনি কখনই পুরুষের কাছ থেকে অনুরূপ সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের আশা করতে পারেন না?”
“আমি তা মনে করি না”, রবীন্দ্রনাথ বললেন,”এখানে আপনার অবশ্যই ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, যদিও নারীর ভালোবাসা সম্পূর্ণরূপে আত্মবিস্মৃত ও মূলতঃ বেপরোয়া, তবুও সে নিজেকে এভাবে বিলিয়ে দেয় শুধু তার ভালোবাসার জন্য নয়। তিনি কেবল মাতৃত্বের মধ্যে তার সম্পূর্ণ পরিপূর্ণতা খুঁজে পান। ফলে সে পুরুষের কাছ থেকে যা পায় তাই তাকে সন্তুষ্ট করে। তার এটুকুই শুধু দরকার, যেহেতু সে মাতৃত্বে তার পুরুস্কার পায়।”
“কিন্তু ধরুন সে মাতৃত্ব চায় না।“
কবি বলেছিলেন, “এখানে একটি জিনিস থেকে কখনই দৃষ্টি হারানো উচিত নয় যে, পরাক্রমশালী শক্তি চক্রাকারে এই মহাবিশ্বের অবিরাম সৃষ্টি ও পুনরুৎপাদনের পালাক্রমের নিয়মিত কাজ প্রায়শই অদৃশ্যমানভাবে গুপ্তভাবে করে। এই শক্তিই আমাদের সত্যিকারের উদ্দেশ্য ও আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিনিধিত্ব করে যা আমাদের সচেতন পৃষ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসা দৃষ্টিগোচর উদ্দেশ্য নয়। এই লুকানো তাগিদটি এটি এখন পর্যন্ত এইভাবে নির্ধারণ করেছে, যে নারী মাতৃত্ব ছাড়া নিজেকে সম্পূর্ণরূপে পূর্ণ করতে পারবেন না। পুরুষ ভালোবাসায় নিজেকে পরিপূর্ণ করে, কারণ সে তার আত্ম-উপলব্ধির দিকে অগ্রসর হয় সে পথে যাতে ভালোবাসা আলো ফেলে, তিনি তার যাত্রায় ভালোবাসার এই উপহারের বীজের মাধ্যমে সৃষ্টি, আনন্দ ও বিশ্বাসে প্রস্ফুটিত হন; এক কথায়, রহস্যের কোষ যা তার দৃষ্টিকে ঢেকে রাখে তা জীবনের সমুদ্রের মধ্য দিয়ে তার যাত্রায় ভালোবাসার জাদুর কাঠির স্পর্শে উত্থিত হয়। আমরা কিছুই বুঝতে পারি না যতক্ষণ না এটি আমাদের সত্তার একটি অংশ হয়ে ওঠে, এবং আমরা কিছুই আত্তীকরণ করি না যতক্ষণ না আমরা এই ধরনের আত্তীকরণের জন্য মূল্য পরিশোধ করি। ভালোবাসার উপলব্ধি আত্তীকরণের জন্য এই মূল্য বেদনার আকারে থাকতে হবে—গভীর, কমনীয় ও স্থায়ী বেদনা। যদি আমরা এই মূল্যে অতৃপ্ত, তবে ভালোবাসা কেবলমাত্র অলঙ্কারশাস্ত্রে একটি শব্দের প্রতিকৃতি হিসেবে থেকে যায়। এটি নিজেই আমাদের সত্যিকারের সম্পদে রূপান্তরিত হয় না। আমরা কিছু নিতে পারতাম না যদি এটি আমাদেরকে সহজভাবে দেওয়া হয়। আমাদের অবশ্যই এটির যোগ্যতা অর্জন করতে হবে, এটি অর্জন করতে হবে ও এর জন্য আমাদের জীবনের রক্ত ঝরাতে প্রস্তুত থাকতে হবে। তারপরেই শুধুমাত্র সম্পূর্ণ আত্তীকরণ, গ্রহণ বাস্তব। ত্যাগই জগতের নিয়ম, এবং ত্যাগ ছাড়া কিছুই লাভ করা যায় না; না প্রভুত্ব, না স্বর্গীয় আবেগ, না সবকিছুর সর্বোচ্চ অধিকার।




