আলোচনার শুরুতেই জানিয়ে রাখা যাক যে, প্রাচীনকাল থেকে আধুনিকযুগ পর্যন্ত ভারত-ভূখণ্ডে নৃত্যকলার কোন ধারাবাহিক ইতিহাস পাওয়া সম্ভব না হলেও এর উপাদান ভারতের প্রায় সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে বলেই দেখতে পাওয়া যায়। আর পাথরের গায়ে খোদিত শিলালিপি, তাম্রফলক, পাণ্ডুলিপি, মন্দিরের গায়ে খোদিত মূর্তি, লিপি ও বাদ্যযন্ত্রগুলি নিশ্চল নীরব ভাষায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই সাক্ষ্য বহন করে আসছে বলেই লক্ষ্য করা যায়।
ঐতিহাসিকেরা ভারতের ইতিহাস রচনার কাল থেকে আধুনিকযুগ পর্যন্ত সময়কে কয়েকটি যুগে ভাগ করেছেন বলে দেখা যায়। এরমধ্যে প্রথম যুগটি হচ্ছে প্রাক-ঐতিহাসিকযুগ। প্রস্তরযুগ, ধাতুযুগ, সিন্ধুনদের সভ্যতা প্রভৃতিকে এ যুগের অন্তর্গত করা যেতে পারে। কিন্তু এ সময়কালের অনেকটাই অন্ধকারে আবৃত; আর এসময়ের কোন বিস্তৃত ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় না। সুতরাং, এযুগের ভারত-ভূখণ্ডের নৃত্যের ইতিহাস সম্বন্ধে কিছুই জানতে পারা যায় না। তবে ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেন যে, প্রস্তরযুগে মানুষের আদিম উল্লাসের প্রকাশ ছিল নৃত্য। তবে সে নৃত্য কোন শাস্ত্রীয় নৃত্য ছিল না, এবং তাতে কোন তাল লয়ের সূক্ষ্ম অনুভূতিও ছিল না। এতে শুধু ছন্দে ছন্দে প্রাণের উল্লাস ও মনের বৃত্তিগুলিকে প্রকাশের অদম্য ইচ্ছা ছিল। একইসাথে এসময়ে কোন গান ছিল না, কোন ভাষা ছিল না,—শুধু মানুষের অভিব্যক্তি ছিল। তখন এভাবেই প্রকৃতির কোলে প্রকৃতির খেয়ালখুশির শিকার ভাষাহীন ও অসহায় মানুষ নিজের মনোবৃত্তিকে নৃত্যের ভিতর দিয়ে প্রকাশ করতেন। আর এটাই ছিল নৃত্যের আদিম অবস্থা। এটাকেই লোকনৃত্য এবং শাস্ত্রীয় নৃত্যের বীজ বলা যেতে পারে; এবং এর উপরে ভিত্তি করে বলা যেতে পারে যে, নৃত্যই হচ্ছে মানুষের স্বভাবজাত বৃত্তির আঙ্গিক প্রকাশ। এখানে বলাই বাহুল্য যে, আদিম অসভ্য যুগ থেকে মানুষের ক্রমবিবর্তনের সঙ্গে তাঁর প্রকাশভঙ্গিরও পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু ভারতবাসীরা যে চিরকালই নৃত্যকলাকে বিশেষভাবে ভালবসেছেন এবং প্রাধান্য দিয়েছেন, একথা সহজেই অনুমেয়। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, অতীতে সিন্ধুনদের উপত্যকায় মহেঞ্জদড়ো ও হরপ্পায় যেসব ভগ্নস্তূপ পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলির মধ্যে থেকে একটি নর্তক ও নর্তকীর মূর্তিও উদ্ধার করা হয়েছিল। এছাড়া সাতটি ছিদ্রযুক্ত বাঁশি, তন্ত্রীযুক্ত বীণা ও বিভিন্ন চামড়ার বাদ্যযন্ত্রও এখানে পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু সেযুগের সঙ্গীতের বিষয়ে এর থেকে বেশি কোন তথ্য ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তবে এযুগের মতোই সেযুগেও নৃত্যের সঙ্গে বাদ্যযন্ত্র বাজাবার প্রচলন যে ছিল, একথা সহজেই অনুমেয়। ঐতিহাসিকেরা বলেন যে, এযুগের অধিবাসীরাও নাগরিক জীবন অতিবাহিত করতেন, এবং তাঁরা সঙ্গীতপ্রিয় ছিলেন।
এঁদের অধিকাংশই শঙ্কর ও কালীর উপাসক, অর্থাৎ—মূর্তি পূজার উপাসক ছিলেন। শুধু তাই নয়, সমকালে উত্তর-পশ্চিম ভারতে বহু প্রাচীন নাগজাতির যেসব মানুষেরা বাস করতেন, তাঁরা বৃক্ষ ও শিবের পূজা করতেন। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, মহেঞ্জোদড়ো থেকে আবিষ্কৃত একটি শীলমোহরে বৃক্ষকে আবেষ্টন করে থাকা নাগদম্পতির উৎকীর্ণ মূর্তিও দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া সেযুগে সর্প ও জীবজন্তু পূজার প্রচলন ছিল বলেও ইতিহাস থেকে জানা যায়।
সুদূর অতীত থেকেই ভারতের আদিবাসী সাঁওতাল, কোল, ভীল ও মুণ্ডাদের প্রস্তরযুগের মানুষের বংশধর বলে মনে করা হয়ে থাকে। যদিও পৃথিবীর বিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরবর্তীসময়ে তাঁদের আকৃতি ও প্রকৃতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু তবুও, আজও অনেক বিষয়েই প্রাচীনযুগের মানুষের সাথে তাঁদের সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। গবেষষকদের মতে, এঁদের নৃত্যকে মনোবৃত্তির স্বতঃস্ফূর্ত আঙ্গিক বহিঃপ্রকাশ বলা চলে। কিন্তু দ্রাবিড়যুগের নৃত্যকলা সম্পর্কে কোন অনুমানই করা চলে না। তবে একথা অনুমান করা অবশ্য কঠিন নয় যে, এযুগের মত সেযুগেও নৃত্যের সঙ্গে সঙ্গীত সহযোগিতা করত; এবং পায়ে মল জাতীয় কোন গহনা তখনও নৃত্যের তালরক্ষা করত। এছাড়া নৃত্যের সাহায্যে তখনও যে দেবদেবীর পূজা করা হত, একথার ঐতিহাসিক প্রমাণ শঙ্কর এবং অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তিগুলির নৃত্যভঙ্গিমা থেকেই পাওয়া যায়। তাছাড়া আজও দ্রাবিড়দের এধরণের সঙ্গীত, শিল্পকলা ও চিত্রকলার প্রতি আসক্তি দেখে একথাই মনে হয় যে, অতীতেও তাঁরা শিক্ষায় উন্নত ও সভ্য শিল্পী ছিলেন। এমনকি অতীতের পাশ্চাত্য গবেষকরাও একথা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, সাধারণতঃ গ্রীষ্মপ্রধান দেশের অধিবাসীরা উদ্দীপ্ত, ভাবপ্রবণ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন হলেও তাঁরা বরাবরই বর্ণ ও সৌন্দর্যের উপাসক ছিলেন। অবশ্য তাঁদের একথা যে শুধু প্রাচীন ভারতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, তা নয়; বরং, প্রাচীন ভারতের সমসাময়িক মেসোপটেমিয়া ও সুমের সভ্যতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলেও দেখতে পাওয়া যায়। কারণ, প্রাচীনকালে পৃথিবীর এসব দেশেও যে নৃত্যের ব্যাপক প্রচলন ছিল, একথার প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায়। এছাড়া ইতিহাস একথাও বলে যে, প্রাচীনযুগে যে দেশে সভ্যতা উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে উঠতে পেরেছিল, সে দেশেই শিল্পকলার চর্চ্চা এবং সঙ্গীতপ্রিয়তাও প্রবল হয়ে উঠেছিল; এবং এসব জায়গার অধিবাসিরাও উন্নত নাগরিক জীবন অতিবাহিত করেছিলেন
প্রস্তরযুগের পরবর্তীসময়কার ভারতকে ইতিহাসে বৈদিকযুগ বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। ঐতিহাসিকদের মতে, খৃষ্টপূর্ব ৩০০০ বছর আগে আর্যরা ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে পাঞ্জাবের কাছাকাছি অবস্থিত দ্রাবিড় সভ্যতাকে ধ্বংস ও দ্রাবিড় জাতিকে বিতাড়িত করে সেখানে নিজেদের বসতি স্থাপন করেছিলেন। সেসময়ে আর্য ও অনার্যদের মধ্যে যে প্রবল যুদ্ধ হয়েছিল, সেই যুদ্ধের ইতিহাস বিভিন্ন রূপে বিভিন্ন প্রাচীন কাব্য, মহাকাব্য, পুরাণ প্রভৃতিতে পাওয়া যায়। এমনকি এযুগে প্রথম যে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিল, সেটারও বিষয়বস্তুও দেবাসুরের যুদ্ধই ছিল বলেই লক্ষ্য করা যায়। এখানে বলাই বাহুল্য যে, তখন দেবতা ও দানবরাই যথাক্রমে আর্য ও অনার্য বলে অভিহিত হয়েছিলেন। তবে পরবর্তীযুগে অবশ্য আর্য ও অনার্য সভ্যতা পরস্পরের সাথে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে, এর উভয়ের মধ্যে কোন প্রভেদ করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। অতীতে শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘দেবায়তন ও ভারত সভ্যতা’ নামক গ্রন্থের ২৩নং পৃষ্ঠায় এ ঘটনার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন—
“বৈদিক যুগের শেষভাগে সূত্রের যুগে ভারতে মূর্তি পূজার সূত্রপাত হয়। অনার্য প্রভাবিত ব্রাহ্মণ্য ভারতে তাহার বিকাশ এবং বিস্তার। ব্রাহ্মণ গ্রন্থে শিল্পের পর্যায়ে তক্ষণ ও ধাতুমূর্তি, কণ্ঠ ও যন্ত্র-সঙ্গীত এবং নৃত্যকেই বুঝাইত।”
গবেষকদের মতে, প্রাচীন ভারতে ব্রাহ্মণগ্রন্থপ্রণেতা মহর্ষি ঐতরেয়ের কল্যাণেই এদেশে আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির মিলনে চৌষট্টিকলার সৃষ্টি হয়েছিল। যাই হোক, এসময়েই আর্যরা বেদের সংস্কার করেছিলেন, আর পরবর্তীকালে এই বেদই ভারতবাসীর জীবনে সঞ্জীবনী সুধার কাজ করেছিল। অতীতে ‘সঙ্গীত ও সংস্কৃতি’ নামক গ্রন্থের একজায়গায় স্বামী প্রজ্ঞানানন্দ বলেছিলেন—
“ভারতীয় শিল্প ও মাধুর্য্যের বিকাশের পিছনে আছে সুপ্রাচীন বেদ ও উপনিষদের সাহিত্যের প্রেরণা।”
মোটকথা হল যে, বেদের দর্শনই প্রাচীনকালে ভাবতীয়দের কর্মে প্রেরণা দিয়েছিল, তাঁদের শান্তির বাণী শিখিয়েছিল, সৌন্দর্যের উপাসক করেছিল, এবং শিল্প ও সঙ্গীতের জ্ঞান দিয়েছিল। আর বৈদিকযুগের সঙ্গীতই পরবর্তীযুগের সঙ্গীতকে প্রেরণা দিয়েছিল। এসময়ে সামবেদ থেকে সামগানের সৃষ্টি হয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, ‘সাম’ শব্দের অর্থই হল গান। সুতরাং, প্রাচীন ভারতের সঙ্গীত নিয়ে আলোচনা করতে হলে বেদের বিষয়েও কিছু সাধারণ জ্ঞান থাকা উচিত। বেদ চারটি ভাগে বিভক্ত—ঋক, যজুঃ, সাম ও অথর্ব। এই প্রত্যেক বেদের আবার তিনটি করে অংশ রয়েছে; যথা—(১) মন্ত্র অথবা সংহিতা, (২) ব্রাহ্মণ, (৩) আরণ্যক ও উপনিষদ। এগুলির মধ্যে সংহিতাতে দেবতাদের স্তুতি করে মন্ত্র, অর্থাৎ—বৈদিক ঋকের সঙ্কলন পাওয়া যায়। অন্যদিকে ব্রাহ্মণে বৈদিক কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়, আরণ্যকে দার্শনিক তথ্যের ব্যাখ্যা লক্ষ্য করা যায়, আর উপনিষদে আত্মজ্ঞানের কথা বলা হয়েছিল বলে দেখা যায়। ঐতিহাসিকদের মতে, প্রাচীনকালে বেদের এসব শাখাগুলিকে শিক্ষা করবার জন্য যে ব্যাকরণের সৃষ্টি করা হয়েছিল, সেটাকে তখন ‘প্রাতিশাখ্য’ বলা হত। প্রাচীন ভারতে রচিত উপনিষদগুলির মধ্যে ছন্দোগ্য উপনিষদে গান, বাদ্য ও নৃত্যের উল্লেখ পাওয়া যায়; আর প্রাতিশাখ্যে তাল, লয়, মাত্রা ও ছন্দ প্রভৃতির উল্লেখ লক্ষ্য করা যায়। ঐতিহাসিকেরা বলেন যে, সেযুগে চারটি বেদ থেকে সারাংশ গ্রহণ করেই ভারতীয় সঙ্গীতের সৃষ্টি হয়েছিল। অন্যদিকে সঙ্গীতের উৎপত্তি সম্বন্ধে ভরতমুনি তাঁর নাট্যশাস্ত্রে জানিয়েছিলেন যে, সত্যযুগ অতীত হওয়ার পরে ত্রেতাযুগের শুরুর দিকে জনগণ অধর্ম অচরণের ফলে দুঃখ পাচ্ছেন দেখে ইন্দ্র প্রমুখ দেবতারা তখন পিতামহ ব্রহ্মাকে প্রধানতঃ শূদ্র ও নারীদের শিক্ষার জন্য একটি পঞ্চম বেদ সৃষ্টি করতে অনুবোধ করেছিলেন। কারণ, শূদ্র ও নারীদের তখন বেদ অধ্যয়ন করবার কোন অধিকার ছিল না। এরপরে তাঁদের এই অনুরোধ অনুসারে ব্রহ্মা ঋগ্বেদ থেকে পাঠ্য, সামবেদ থেকে গান, যজুর্বেদ থেকে অভিনয়, এবং অথর্ববেদ থেকে রস গ্রহণ করে নাট্যবেদ সৃষ্টি করেছিলেন। এটাই তখন পঞ্চম বেদ বলে অভিহিত হয়েছিল; এবং এতে সবার সমান অধিকারকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সুখভোগে অভ্যস্ত দেবতারা নাট্যবেদের গ্রহণ, ধারণ ও জ্ঞান প্রয়োগে অযোগ্য বলে বিবেচিত হওয়ায় ইন্দ্র তখন এবিষয়ে ঋষিদের উপযুক্ততার কথা উল্লেখ করেছিলেন। আর তাই তাঁর অনুরোধে ব্রহ্মা তখন ভরতমুনিকে নাট্যবেদের প্রথম উপদেশ প্রদান করেছিলেন। এরপরে ভরতমুনি ব্রহ্মার আদেশে তাঁর শত পুত্রকে এর শিক্ষা দিয়েছিলেন; এবং আত্রেয় প্রমুখ ঋষিদের কর্তৃক জিজ্ঞাসিত হয়ে ভরত পূর্বোক্ত কাহিনীটি তাঁদের কাছে বিবৃত করেছিলেন। এই ভরতমুনি একাধারে দেবতাদের মঞ্চাধ্যক্ষ, নাট্যকার, ত্রৈযত্রিক ও সূত্রকার ছিলেন। ভরতই তাঁর শিষ্যদের মাধ্যমে এই নৃত্য মর্ত্যে প্রচার করেছিলেন।
অন্যদিকে প্রাচীন ভারতের প্রখ্যাত নাট্যতাত্ত্বিক ও ঋষি নন্দিকেশ্বর তাঁর ‘অভিনয় দর্পণ’ নামক গ্রন্থে জানিয়েছিলেন যে, পুরাকালে চতুর্মুখ ব্রহ্মা ভরতকেই প্রথম নাট্যবেদ প্রদান করেছিলেন। আর তারপরে ভরত গন্ধর্ব ও অপ্সরাদের নিয়ে শম্ভুর সম্মুখে নাট্য, নৃত্ত ও নৃত্যের প্রয়োগ করেছিলেন। অতঃপর অনন্তর হর স্বপ্রযুক্ত হয়ে উদ্ধত প্রয়োগ স্মরণ করে স্বগণের অগ্রণী তণ্ডুকে দিয়ে ভরতকে এর শিক্ষা দিয়েছিলেন, এবং একইসাথে প্রীতিবশতঃ পার্বতীকে দিয়ে তাঁকে লাস্যের উপদেশ প্রদান করিয়েছিলেন। তণ্ডুর কাছ থেকে তাণ্ডবের জ্ঞান লাভ করবার পরে মুনিরা মর্ত্যে এর প্রচার চালিয়েছিলেন। অন্যদিকে বাণরাজ দুহিতা উষা পার্বতীর কাছ থেকে লাস্য শিক্ষা করে দ্বারকার গোপীদেরকে, গোপীরা সৌরাষ্ট্র দেশের নারীদের, এবং সেসব নারীরা অন্যান্য দেশের নারীদের এই শিক্ষা দিয়েছিলেন। সুতরাং, এসব কাহিনীর মধ্যে এটাই দেখা যায় যে, নাট্যশাস্ত্রের মূল উপাদান হল বেদ।
এছাড়া বৈদিকযুগে যে নৃত্য-গীতের বিশেষ প্রচলন ছিল, একথার প্রত্যক্ষ প্রমাণও কিন্তু ইতিহাসে পাওয়া যায়। বৈদিক সাহিত্য থেকে জানা যায় যে, তখন যজ্ঞের সময়ে উদ্গাত্রীরা পরস্পরের সংলগ্ন হয়ে যজ্ঞবেদী পরিক্রমণ করতেন; এবং অনেক সময়ে পুরনারীরাও তখন এই পরিক্রমণে যোগদান করতেন। অতীতে স্বামী প্রজ্ঞানন্দ এটাকেই সমবেত নৃত্যের প্রথম সূত্রপাত বলেছিলেন।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, বৈদিকযুগে মুনি-ঋষিরা যখন যজ্ঞমণ্ডপ নির্মাণ করে হোম করতেন তখন গগনস্পর্শী অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত হয়ে উঠত। সেসময়ে উদাত্ত কণ্ঠে সুরের লহরী তুলে তাঁরা দেবতার স্তুতি করতেন। এসময়ে কখনও পাঠ্যে, তো কখনও সঙ্গীতে, তো কখনও আবার স্বর্গীয় রসধারায় প্লাবিত হয়ে তাঁরা বেদ গান করতেন। প্রাচীন ব্রাহ্মণ সাহিত্যগুলিতে জানানো হয়েছিল যে, সামগরা যখন গান করতেন, পুরনারীরা তখন করতালি দিয়ে নৃত্য করতেন; আর সামগদের গানের সঙ্গে নর্তকরাও বাঁশের লাঠির মত কিছু উপরে তুলে ধরে নৃত্য করতেন। তাছাড়া এই যজ্ঞাদি উৎসবের পরে তখন ‘অবভূথস্নান’ নামের একটি উৎসব হত; আর এই উৎসবে রাজা ও রানীর সঙ্গে পুরুষ ও নারী উভয়েই নৃত্য-গীত-বাদ্যের সঙ্গে স্নান করতে যেতেন। প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, কঠোপনিষদের যম ও নচিকেতা সংবাদেও নৃত্য ও গীতের উল্লেখ পাওয়া যায়।
যাই হোক, দ্রাবিড়যুগে মানুষেরা নাগরিক জীবন অতিবাহিত করলেও বৈদিকযুগের বেশিরভাগ মানুষ গ্রাম্যজীবনেই অভ্যস্ত ছিলেন, এবং এসময়ে সমস্ত সঙ্গীত ও নৃত্যের মধ্যে একটি স্বতঃস্ফূর্ত ভাব দেখা দিয়েছিল। এর কারণ ছিল যে, আর্যরা প্রাকৃতিক আশ্চর্য লীলাশক্তিকে অনুভব করতে পেরেছিলেন। বস্তুতঃ আর্যরাই প্রথম প্রাকৃতিক মহাশক্তির অমিত তেজ নিজেদের গভীর অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বশক্তি ও সব দেবদেবী সেই পরমপিতা পরমব্রহ্ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছেন বলে ঘোষণা করেছিলেন। একইসাথে তখন তাঁরা একথাও প্রচার করেছিলেন যে, সৌরমণ্ডলের প্রধান প্রধান দেবতা—সূর্য, বৃষ্টি, বজ্র ও ইন্দ্র প্রভৃতি আসলে পরমব্রহ্মেরই বিকাশ। আর একারণেই তাঁরা তখন অগ্নিদেবকে পরিক্রমা করে অথবা করতালি দিয়ে অথবা বাঁশের লাঠি ধরণের কিছু উপরে তুলে ধরে নৃত্যের প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু এসব শুধুই তথ্য; কারণ, প্রাগৈতিহাসিক ও বৈদিকযুগের ভারতে আদতে কি ধরণের নৃত্য প্রচলিত ছিল, এর কোন পাথুরে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে প্রাচীন সাহিত্যের বর্ণনা থেকে একথা অবশ্যই বুঝতে পারা যায় যে, তখন সঙ্গীতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই বিভিন্ন ধরণের নৃত্য অনুষ্ঠিত হত।
এরপরে এসেছিল মহাকাব্যের যুগ—যার সঠিক সময় নিরূপণ করা আজও কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে এই বৈদিকোত্তর যুগে রচিত রামায়ণ, মহাভারত, হরিবংশ, পুরাণ প্রভৃতিতে নৃত্য, গীত ও বাদ্যের বিশেষভাবে উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, বর্তমানে ব্যবহৃত ‘কুশী লব’ শব্দটি রামায়ণে বর্ণিত রামচন্দ্রের যমজ পুত্র—কুশ ও লবের নাম থেকে এসেছে বলেই মনে করা হয়ে থাকে। কারণ, এই কুশ ও লবই মহাকবি বাল্মীকির অমর কাব্য রামায়ণকে সঙ্গীত, আবৃত্তি ও অভিনয়ের সাহায্যে অযোধ্যার রাজসভায় রামচন্দ্রের সম্মুখে নিবেদন করেছিলেন, এবং এই অমৃতধারা সেখানে উপস্থিত প্রত্যেক শ্রোতারই হৃদয়কে যে দ্রবীভূত করেছিল—স্বয়ং বাল্মীকি একথা জানিয়েছিলেন। তবে অন্যদিকে শ্রীল রূপ গোস্বামী তাঁর ‘বিদগ্ধমাধব’ নাটকে ‘কুশীলবের’ অর্থ নট অথবা চারণ করেছিলেন বলে দেখতে পাওয়া যায়।
অনুরূপভাবে মহাভারতেও নৃত্যের বহু উল্লেখ পাওয়া যায়, এমনকি ভরতের নাট্যশাস্ত্রে ও হরিবংশে আসারিত নৃত্যের যে বিবরণ রয়েছে, মহাভারত মহাকাব্যেও এর উল্লেখ লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া এতে ‘হল্লীসক’, ‘ছালিক্য’ প্রভৃতি নৃত্যের কথাও রয়েছে, দেবরাজ ইন্দ্রের নৃত্যসভার সুন্দর বর্ণনা রয়েছে, এবং সেই নৃত্যসভায় অপ্সর-অপ্সরা, কিন্নর-কিন্নরীরা কি ধরণের নৃত্য প্রদর্শন করতেন—একথাও জানানো হয়েছে। তাছাড়া মহাভারতে বৃহন্নলা কর্তৃক রাজকন্যা উত্তরাকে নৃত্য শিক্ষা দেওয়ার বর্ণনাও পাওয়া যায়। কিন্তু এসব সত্ত্বেও রামায়ণ ও মহাভারতের যুগের ভারতে নৃত্যের স্বরূপ যে কিধরণের ছিল—এবিষয়ে সুস্পষ্ট কোন তথ্য ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তবে এগুলিতে প্রদত্ত তথ্য থেকে একথা অবশ্যই বুঝতে পারা যায় যে, তখনও নৃত্যের ব্যাপক প্রচলন ছিল; এবং সেযুগে নৃত্য যে সর্বশ্রেণী কর্তৃক সমাদৃত হত—একথার প্রমাণও এতে পাওয়া যায়।
কিন্তু একইসাথে বৈদিক ও মহাকাব্যের যুগ থেকেই এদেশে সামাজিক ও ধর্ম সংক্রান্ত পরিবর্তন শুরু হয়েছিল বলেও লক্ষ্য করা যায়। ঐতিহাসিকদের মতে, মূলতঃ এসময় থেকেই বৈদিক সনাতন ধর্ম হিন্দুধর্মে পরিণত হতে আরম্ভ করেছিল; এবং এদেশে আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির মিলন ঘটতেও শুরু হয়েছিল। অতীতে এপ্রসঙ্গে শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘দেবায়তন ও ভারত সভ্যতা’ নামক গ্রন্থে জানিয়েছিলেন যে, এসময় থেকেই হিন্দুধর্মে যক্ষ, যক্ষী, মনসা প্রভৃতির উদ্ভব ঘটেছিল। আর ধর্মক্ষেত্রে উভয় জাতির মিলনের ফলে হিন্দু জাতি ও সভ্যতার উন্মেষ, এবং অন্যদিকে আর্য ও অনার্য সংস্কৃতি ও শিল্পের মিলনের ফলে হিন্দু স্থাপত্য শিল্পের উন্মেষ ঘটেছিল। এখানে বলাই বাহুল্য যে, এসব স্থাপত্য শিল্পকেই এখন এদেশে নৃত্যের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে অমূল্য সম্পদ বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। ঐতিহাসিকদের মতে, সিন্ধু দ্রাবিড় সভ্যতার সঙ্গে অসুর, অর্থাৎ—অষ্ট্রিক ও বৈদিক সভ্যতার মিশ্রণের ফলেই রামায়ণ, মহাভারত ও উপনিষদের সৃষ্টি, এবং যজ্ঞ ও পূজার প্রচলন হয়েছিল।
মহাকাব্যের যুগের সাহিত্যিক বিবরণগুলি পর্যবেক্ষণ করলে বুঝতে পারা যায় যে, সেযুগে জাতিপ্রথা পূর্ণমাত্রায় বর্তমান ছিল। এসময়ে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—এই চারভাগে মানবসমাজ বিভাজিত হয়েছিল। তবে এ যুগে নারীর স্বাধীনতা ছিল, এবং কোন পর্দাপ্রথাও তেমনভাবে ছিল না। কিন্তু অন্যদিকে মহাকাব্যের যুগে পৌঁছে বৈদিকযুগের দেবতাদের প্রাধান্য অবশ্য কমে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, এসময়ে বৈদিকযুগের প্রাকৃতিক দেবতাদের পরিবর্তে বিভিন্ন দেবদেবীরা প্রাধান্য পেয়েছিলেন। একইসাথে বৈদিকযুগে একেশ্বরবাদের পরিবর্তে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শঙ্কর প্রমুখ দেবতাদের প্রাধান্যও বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাছাড়া এসময়ে সমগ্র ভারতবর্ষ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এযুগেই কাশী, কোশল, মগধ, বিদেহ প্রভৃতি রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল। অন্যদিকে সমকালে পূর্বদিকের অঙ্গ, বঙ্গ, পুণ্ড্র প্রভৃতি রাজ্যগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল। এসব জায়গার নামগুলি পরবর্তীযুগের নাট্যশাস্ত্রে পাওয়া যায়। তাছাড়া পূর্বোক্ত দেবতারা তখন সঙ্গীতেও বিশেষ বিশেষ স্থান অধিকার করেছিলেন; আর এঁদের মধ্যে শঙ্কর সঙ্গীতশাস্ত্রে নৃত্যের জনক বলে পূজিত হয়েছিলেন। প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, এখনকার মত তখনও পূর্ব-বঙ্গে আর্য, অনার্য ও বৈদিক দেবতাদের নৃত্য শুরু করবার আগে পুষ্পাঞ্জলি ও নমস্কার করবার বিধি প্রচলিত ছিল।
মহাকাব্যের যুগের পরে ভারতের ইতিহাসে এক যুগসন্ধিক্ষণ উপস্থিত হয়েছিল। ইতিহাস বলে যে, এসময়ে চীন, ভারতবর্ষ, ইরান, গ্রিস—সর্বত্রই ধর্ম এবং সমাজ আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল; এবং এই মহাসন্ধিক্ষণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সমাজ-সংস্কারক, ধর্মসংস্কারক, দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের আবির্ভাব ঘটেছিল। ফলে এযুগে ধর্মসংস্কার, দর্শন প্রভৃতির সঙ্গে সঙ্গীতও একটি বিশেষ রূপ পরিগ্রহ করেছিল। আর যদিও এসময় থেকেই এক ধর্মের সাথে অন্য ধর্মের প্রতিযোগিতার শুরু হয়েছিল, কিন্তু তবুও সঙ্গীত সব ধর্মেই প্রিয় ছিল। একথার উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, হিন্দু ও বৌদ্ধধর্ম—উভয় ধর্মেই তখন সঙ্গীতের একটা বিশিষ্ট জায়গা ছিল। তবে এরপরেই অবশ্য হিন্দুধর্মে ব্রাহ্মণদের প্রতাপ ও যাগযজ্ঞ, পশুবলি ইত্যাদি বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সঙ্গীত যেন সমাজ থেকে একেবারে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। আরো ভালো করে বললে, ব্রাহ্মণরাই তখন সঙ্গীতকে অপাংক্তেয় করে তুলেছিলেন; আর এই কলাটি শুধুমাত্র শূদ্র প্রভৃতি জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে গিয়েছিল। কারণ, এসময়ে ব্রাহ্মণরা সবধরণের কোমল বৃত্তিকে দমন করে শুধুমাত্র শুষ্ক আচার বিচার নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। অন্যদিকে সুকুমার বৃত্তি ও সৌন্দর্যবোধ বরাবরই ললিতকলার উৎস বলে পরিগণিত হয়ে এসেছে। ফলে এযুগে যখনই একটি বিশেষ শ্রেণীর ভিতরে এর অভাব দেখা দিয়েছিল, তখনই সে জায়গা থেকে সঙ্গীতের দেবী নির্বাসিতা হয়েছিলেন। আর এযুগেই মনু তাঁর মনুসংহিতায় স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন যে, এসব ব্রাহ্মণদের জন্য নয়। অতঃপর এই কঠোর ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিরুদ্ধে বৌদ্ধধর্ম বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল; এবং ক্রমে ব্রাহ্মণ্যধর্মের হিংসা ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে বৌদ্ধধর্ম প্রবল প্রতিদ্বন্দিতায় অবতীর্ন হয়ে এদেশে ধর্মের ও শাসনের ক্ষেত্রে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছিল। এরফলে সমাজে একটি প্রবল আলোড়নের সৃষ্টি হলেও সঙ্গীতের প্রতিপত্তি আগের মতোই অপ্রতিহত থেকে গিয়েছিল, এবং এমনকি উত্তরোত্তর বৃদ্ধিও পেয়েছিল।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, বৌদ্ধ জাতকেও সঙ্গীতের উল্লেখ পাওয়া যায়। এধরণের গ্রন্থগুলিতে বুদ্ধদেবের পূর্বজন্মের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল, আর একইসাথে এগুলি তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, কৃষ্টি প্রভৃতির উপরেও আলোকপাত করেছিল। এই জাতক গ্রন্থগুলির মধ্যে নৃত্যজাতকে বলা হয়েছিল যে, নৃত্যের ছন্দ-পতন হওয়ার জন্যই ময়ূর হংসরাজ-কন্যার স্বামী হতে পারেন নি। এছাড়া মৎস্যজাতক, গুপ্তিলজাতক, ভেরীবাদক জাতক ইত্যাদিতেও নৃত্যগীত, বাদ্য ও অভিনয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া জাতক থেকে একথার প্রমাণও পাওয়া যায় যে, সেযুগে নৃত্য ও গীতের প্রতিযোগিতা ছিল। আর কিন্নর, কিন্নরী, অপ্সর, অপ্সরা, নট-নটী, দেবদাসী প্রমুখের নৃত্য, গীত ও বাদ্য-পটীয়সীদের কথাও তৎকালীন সাহিত্যে বিশেষভাবে জায়গা করে নিয়েছিল। এছাড়া বৌদ্ধযুগের ইতিহাস থেকেই আম্রপালি প্রভৃতি নটীদের কথাও জানতে পারা যায়, যাঁরা তখন সামাজিক পীড়নে নটী-জীবন গ্রহণে বাধ্য হলেও শেষপর্যন্ত বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে নটী-জীবন পরিত্যাগ করে বৌদ্ধধর্মকেই নিজেদের শেষ আশ্রয় রূপে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে থেরিগাথা অথবা থেরগাথাতেও নৃত্যগীতের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে জাতকেই অবশ্য নটীদের জীবন নিয়ে বহু কাহিনীর উল্লেখ লক্ষ্য যায়। এছাড়া অবদান শতকে নটী শ্রীমতী, বোধিস্বত্বাবদান কল্পলতায় নটী বাসবদত্তা, মহাবস্তবদানে সুন্দরী প্রধানা শ্যামার উল্লেখ লক্ষ্যণীয়। ঐতিহাসিকদের মতে, এসময়ে সঙ্গীত একটি বিশেষ শ্রেণীর মধ্যেই প্রচলিত ছিল, এবং তাঁরাই তখন নট-নটী আখ্যা লাভ করেছিলেন।
অন্যদিকে পাণিনির ব্যাকরণে সঙ্গীতকার শিলালি ও কৃশাশ্বের নাম পাওয়া যায়। সেযুগে এঁরাও নটশ্রেণীভুক্ত ছিলেন, আর সঙ্গীতই এঁদের পেশা ছিল। কিন্তু প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, পাণিনির সময় নির্ধারণ নিয়ে পণ্ডিতমহলে আজও মতবিরোধ রয়েছে। যেমন—অতীতে পণ্ডিত সমশ্রেয়ী খৃষ্টের জন্মের ২৩০ বছর আগে পাণিনির সময় নির্ধারণ করলেও, জার্মাণ পণ্ডিত ব্যুহলার আবার কথাসরিতের উপরে ভিত্তি করে পাণিনিকে খৃষ্টের ৪০০ বছর আগের ব্যক্তি বলে উল্লেখ করেছিলেন। যাই হোক, পাণিনির ভাষ্যকার পতঞ্জলিও তাঁর মহাভাষ্যে ‘কংসবধ’ ও ‘বালিবধ’ নামের যে দুটি নাটকের কথা উল্লেখ করেছিলেন, সেগুলিতেও নৃত্য ও গীতের উল্লেখ পাওয়া যায়। সুতরাং, এসব তথ্যের ভিত্তিতে একথা নিশ্চিন্তেই বলা যেতে পারে যে, সেযুগে নৃত্য, গীত, বাদ্য ও অভিনয়ের বহুল প্রচার না থাকলে সঙ্গীত তদানীন্তনকালের সাহিত্যে ও ব্যাকরণে কখনোই জায়গা করে নিতে পারত না। প্রসঙ্গতঃ জানিয়ে রাখা যাক যে, ঐতিহাসিকেরা খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতককে পতঞ্জলির উদ্ভবকাল, এবং খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতককে বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তিকাল বলে অনুমান করে থাকেন।
ইতিহাস বলে যে, এসময়ে উত্তর ভারত অনেকগুলি ছোট রাজ্যে বিভক্ত ছিল যেগুলিকে তখন ‘মহাজনপদ বলা হত। এইগুলি ছিল—কাম্বোজ, গান্ধার, পাঞ্চাল, কুরু, সুরসেন, মৎস্য, কোশল, কাশী, মগধ, অঙ্গ, বৎস, চেদি, অবন্তি, অস্মক, বজ্জী ও মল্ল। এগুলির মধ্যে কয়েকটি মহাজনপদ আজও ইতিহাসের পৃষ্ঠায় উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। যেমন—এগুলির মধ্যে গান্ধার দেশ তখন সঙ্গীতের জন্যই বিশেষ প্রসিদ্ধ ছিল। এছাড়া নাট্যশাস্ত্রেও দেশাচারের হিসেবে চার ধরণের অভিনয়ের ধারা বর্ণনা করা হয়েছিল বলে একথা অনুমান করা যেতে পারে যে, অতীত থেকেই এসব রাজ্যে সঙ্গীতের প্রচলন ছিল,—যেটাকে ভরত তাঁর গ্রন্থে দেশীয় সঙ্গীত বলে অভিহিত করেছিলেন। আর ভরতের মতে, এই চারটি ধারা ছিল—দাক্ষিণাত্য, আবন্ত, ঔদ্ধ্রমাগধী ও পাঞ্চাল-মধ্যম। এগুলির মধ্যে দাক্ষিণাত্য, কোশল, কলিঙ্গ, দ্রাবিড় এবং মহারাষ্ট্র, অর্থাৎ—মধ্যপ্রদেশ, অর্থাৎ—ভারতের দক্ষিণপূর্ব এবং দক্ষিণ পশ্চিম অংশের মানুষেরা তখন প্রথম ধারাটি (style); অবন্তী, বিদিশা, সৌরাষ্ট্র মালয়া, সিন্ধু, অর্থাৎ—মধ্য ও পূর্বাংশের অধিবাসিরা দ্বিতীয় ধারাটি; অঙ্গ, বঙ্গ, বৎস, মগধ, পুণ্ড্র, নেপাল, অস্তগিরি, বাহিরগিরি, মল্লবর্ষ, ব্রহ্মহত্র, প্রাগজ্যোতিষপুর, বিদেহ ও তাম্রলিপ্তের অধিবাসিরা তৃতীয় ধারাটি; এবং পাঞ্চাল, সুরসেন, কাশ্মীর, হস্তিনাপুর, বহলিক, মদ্র অঞ্চলের মানুষেরা চতুর্থ ধারাটি অনুসরণ করতেন। তবে এগুলি ছাড়াও নাটকে তখন আরও পাঁচ ধরণের অন্ত্যজ-জাতির ভাষা ব্যবহৃত হত; যথা—সবরী, আভরী, চাণ্ডালী, শকারী এবং দ্রাবিড়ী। সুতরাং, ভারতের নাট্যশাস্ত্রের তথ্যের ভিত্তিতে বলা যেতে পারে যে, সেযুগের ভারত খণ্ড খণ্ড রাজ্যে বিভক্ত ও আত্মকলহে লিপ্ত থাকলেও প্রত্যেক রাজ্যই সঙ্গীতের সমাদর করত।
কিন্তু এগুলির মধ্যে মগধ রাজ্যই তখন একাজে বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল, এবং এর প্রথম শাসক ছিলেন হরিয়াঙ্ক বংশের বিম্বিসার। আর এরপরে এখানেই চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য যে রাজবংশের সূচনা করেছিলেন, ইতিহাসে সেটা মৌর্যবংশ বলে পরিচিত। ঐতিহাসিকদের মতে, মৌর্যরা ৩২০ খৃষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৮৫ খৃষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন; এবং এই বংশের অধিকাংশ শাসকই বৌদ্ধধর্মালম্বী ছিলেন। একারণেই এযুগে বহু থের-থেরীদের গাথা প্রভৃতি রচিত হয়েছিল, এবং সেগুলিতে নৃত্য গীতের প্রচুর উপাদান লক্ষ্য করা যায়। এই মৌর্যবংশেরই শ্রেষ্ঠ শাসক অশোক বৌদ্ধধর্ম প্রচার করবার জন্য দেশবিদেশে ধর্মপ্রচারক প্রেরণ করেছিলেন, যারফলে ভারতের সঙ্গে অন্যান্য দেশের সাংস্কৃতিক বিনিময় তখন সম্ভব হয়েছিল। আর বৌদ্ধ-শ্রমণ, ভিক্ষু ও শ্রেষ্ঠীদের সাহায্যেই এই বিনিময় সেযুগে ব্যাপকতা লাভ করেছিল।
মৌর্যবংশের পতন ঘটবার পরে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে যেসব ছোট ছোট রাজ্য স্থাপিত হয়েছিল, সেগুলির মধ্যে উত্তর ভারতের শুঙ্গবংশ ও কান্ববংশ, এবং দাক্ষিণাত্যের সাতবাহন বংশ, চেদি বংশ প্রভৃতি ইতিহাসে বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। এঁদের মধ্যে মৌর্যদের পতন ঘটবার পরে শুঙ্গরা রাজত্ব করেছিলেন, এবং তাঁদের রাজত্বকালেও সঙ্গীতচর্চা অব্যাহত ছিল। অতঃপর শুঙ্গবংশের পতন ঘটিয়ে কান্ববংশের উদ্ভব হয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, শুঙ্গবংশীয় রাজারাই ২নং সাঁচিস্তুপের নির্মাণ কার্য শুরু করেছিলেন, এবং কান্ববংশীয় শাসকদের সময়ে বারহুত নির্মিত হয়েছিল। অন্যদিকে প্রায় সমকালে দক্ষিণের সাতবাহন বংশ ভারতীয় সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, মৌর্যবংশের পতন ঘটবার পরে দাক্ষিণাত্যে এই বংশের উদ্ভব হয়েছিল।
আর ঠিক এসময় থেকেই উত্তর ভারতে বিদেশিদের আক্রমণ শুরু হয়েছিল। এঁদের মধ্যে য়ুনীয়নরা সর্বপ্রথম ভারত আক্রমণ করেছিলেন, এবং তাঁদের পরে শকরা ভারতে প্রবেশ করে রাজত্ব করেছিলেন। আর শকদের পরে পার্থিয়ানরা এদেশে নিজেদের রাজত্ব স্থাপন করেছিলেন। অতঃপর চীনের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত থেকে ইউচীরা ভারতে প্রবেশ করে ভারতে নিজেদের রাজত্ব স্থাপন করেছিলেন, এবং এঁরাই ভারতের ইতিহাসে কুষাণবংশীয় বলে পরিচিত। এই কুষাণবংশের শ্রেষ্ঠ শাসক কণিষ্ক সঙ্গীতপ্রিয় একজন ব্যক্তি ছিলেন; আর তাঁর সময়েই অশ্বঘোষ, নাগার্জুন প্রমুখ প্রথম শ্রেণীর নাট্যকাররা বর্তমান ছিলেন। এসব তথ্য থেকে স্পষ্টভাবেই বুঝতে পারা যায় যে, সভ্যতার প্রথমযুগে এদেশের জনসাধারণ ও অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে নৃত্য বিশেষ প্রিয় ছিল।
এরপরে ভারতের ইতিহাসে গুপ্তযুগের সূচনা ঘটেছিল, এবং ৩২০ খৃষ্টাব্দ থেকে ৪৬৭ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত গুপ্তযুগের উল্লেখযোগ্য ইতিহাস পাওয়া যায়। এসময়ের মধ্যে গুপ্তযুগের প্রথমার্ধ ঐশ্বর্য, শিল্প ও সংস্কৃতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছিল; এবং এসময়ে সঙ্গীতের যে বিশেষ প্রসার ঘটেছিল—একথা সমকালীন মুদ্রা, ভাস্কর্য্য ও সাহিত্য থেকে জানা যায়। এসময়কার শাসকদের মধ্যে সমুদ্রগুপ্তের সময়কার সমাজে নারী ও পুরুষরা স্বাধীনভাবে নৃত্য ও গীতের চর্চা করবার অধিকারী ছিলেন; এবং সমুদ্রগুপ্তের পুত্র দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সময়কার সমাজেও সঙ্গীত বিশেষভাবে আদৃত হয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, ফা-হিয়ানের ভ্রমণ বৃত্তান্ত থেকে গুপ্তযুগের শিল্প ও সংস্কৃতির ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে ইতিহাস একথাও বলে যে, খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে ৭ম-৮ম শতাব্দী পর্যন্ত এদেশে বহু গুণী ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাছাড়া এসময়েই পৃথিবী বিখ্যাত অজন্তা, ইলোরার গুহাগুলি নির্মিত হয়েছিল, যেগুলি থেকে তৎকালীন শিল্পকলার একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
তবে একইসাথে গুপ্ত রাজত্বের সময় থেকেই ভারতের উপরে হুণদের আক্রমণ শুরু হয়েছিল। আর এসব বৈদেশিক আক্রমণকে আজও ভারতের ইতিহাসের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে সমকালীন উত্তর ভারতীয় ও দক্ষিণ ভারতীয় নৃত্যের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখতে পাওয়া যায় যে, ভারতের দুই অঞ্চলের ভিতরে তখন থেকেই একটি ব্যবধান গড়ে উঠেছিল; আর এর প্রধান কারণ ছিল যে, উত্তর ভারতকে তখন বারংবার বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিহত করতে হয়েছিল।
এছাড়া এদেশের বিভিন্ন ধর্মের উত্থান পতনের সঙ্গেও ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলেও লক্ষ্য করা যায়; আর ঐতিহাসিক পটভূমিকাতেই এবিষয়ে আলোচনা করা সঙ্গত বলেই মনে হয়। যেমন—ঐতিহাসিকদের মতে, গুপ্তযুগের সময়েই ভারত-ভূখণ্ডে হিন্দুধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল বলে এযুগের নৃত্য, সঙ্গীত, স্থাপত্যকলা ও ভাস্কর্যে হিন্দুধর্মের বিশেষ প্রভাব পড়েছিল। এমনকি এযুগেই হিন্দুধর্ম কয়েকটি শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল বলে এসময় থেকেই শ্রেণীগত হিসেবে নর্তকী ও নৃত্যের ধারার মধ্যেও কিছু প্রভেদের সৃষ্টি হয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, এযুগে হিন্দুধর্ম মূলতঃ চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল; যথা—
(১) স্মার্ত—যাঁরা প্রাক-বৌদ্ধযুগের সাহিত্যকে তখন প্রমাণস্বরূপ গ্রহণ করেছিলেন;
(২) শাক্ত—এঁরা অনেক নাম, রূপ ও দেবতার পূজা করতেন; এঁদের সম্প্রদায়ে তখন পশুবলি তো বটেই, এমনকি নরবলিও প্রচলিত ছিল;
(৩) শৈব—এঁরা শিবের উপাসক ছিলেন; এবং
(৪) বৈষ্ণব—এঁরা বিষ্ণুর উপাসনা করতেন।
এখানে বলাই বাহুল্য যে, নৃত্যের উপরেও তখন এসব সম্প্রদায়ের প্রভাব বিশেষভাবে পড়েছিল।
এরপরে ভারতের ইতিহাসে থানেশ্বরের পুষ্যভূতি বংশের উত্থান লক্ষ্য করা যায়। আর পুষ্যভূতি বংশীয় শাসক হর্ষবর্ধনের সময়েও এদেশে নৃত্যগীতের মর্যাদা আগের মতোই অক্ষুণ্ণ ছিল। এমনকি এই সম্রাট নিজেও একজন নাট্যরসিক ছিলেন, এবং তাঁর লিখিত দুটি উল্লেখযোগ্য নাটক ছিল—‘রত্নাবলী’ ও ‘নাগানন্দ’। অনুরূপভাবে হর্ষবর্ধনের পিতা প্রভাকর বর্ধনও সংগীত ও ললিতকলার একান্ত অনুরাগী ছিলেন। এঁদের সময়ে থানেশ্বরের রাজপ্রাসাদে প্রমোদগৃহ, প্রেক্ষাগৃহ প্রভৃতির ব্যবস্থা ছিল; এবং নট, নটী, সঙ্গীতজ্ঞ প্রমুখ গুণিরা এখানকার রাজসভা অলঙ্কৃত করে থাকতেন।
অনেক ঐতিহাসিকের মতে হুণদের পরে গুর্জর ও প্রতিহাররা ভারত আক্রমণ করেছিলেন, এবং রাজপুতরা এঁদেরই বংশধর। এছাড়া কেউ কেউ বলেন যে, শকজাতি থেকেই রাজপুতগণের উদ্ভব হয়েছিল, আবার কারো কারো মতে রাজপুতরা সূর্যবংশীয় ও চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয় ছিলেন; এবং উত্তর ভারতে ১০২০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত এঁরা রাজত্ব করেছিলেন। যাই হোক, রাজপুতদের উদ্ভব নিয়ে ঐতিহাসিকমহলে বিতর্ক থাকলেও রাজপুতদের অতীত বাসস্থান রাজস্থানেই যে কথক নৃত্যের বহুল প্রচলন ছিল—এবিষয়ে অবশ্য কোন বিতর্ক নেই। আর ইতিহাস থেকে এ তথ্যও পাওয়া যায় যে, অতীতের রাজপুতানায় ভাট ও চারণরা নৃপতিদের প্রাচীন কীর্তি অভিনয়ের সঙ্গে গাইতেন।
এসবের সাথে ভারতীয় নৃত্যকলা সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞানলাভ করতে হলে, অথবা এর ইতিহাস জানিতে হলে প্রাচীন সঙ্গীতশাস্ত্র অথবা গুহাশিল্প, মন্দির ও চিত্রশিল্পগুলিও কম মূল্যবান নয়। আর সঙ্গীতশাস্ত্রগুলির মধ্যে নাট্যশাস্ত্র, অভিনয়দর্পণ, সঙ্গীত রত্নাকর, সঙ্গীত দামোদর, সঙ্গীত মকরন্দ ইত্যাদি তো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ঐতিহাসিকদের মতে, সম্রাট অশোকের রাজত্বকাল থেকেই এদেশে গুহাশিল্পের সূচনা হয়েছিল। বস্তুতঃ সম্রাট অশোকের সময়ে নির্মিত স্তম্ভ ও স্তূপগুলিকেই প্রাচীন ভারতীয় প্রস্তর-শিল্পের প্রথম ঐতিহাসিক নিদর্শন বলে গণ্য করা হয়ে থাকে, এবং এগুলিতে নৃত্যের যেসব দৃশ্য লক্ষ্য করা যায়, তা থেকে একথাই প্রমাণিত হয় যে, সেই প্রাচীন যুগেও এদেশে নৃত্যের বিশেষ সমাদর ছিল। যেমন—খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে নির্মিত ১নং সাঁচিস্তূপের উত্তর পশ্চিম স্তম্ভে নর্তকীর যে মূর্তিটি লক্ষ্য করা যায়, তাতে বাদ্যযন্ত্রের সমবেশও রীতিমত লক্ষ্যণীয়। আর এখানকার ব্র্যাকেট মূর্তিগুলির ভিতরে বনদেবীর যে মূর্তিটি রয়েছে, তাতে সঙ্গীতের মূর্ছনা ও নৃত্যের মাধুর্য সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়রয়েছে বলে দেখতে পাওয়া যায়। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, শুঙ্গ রাজত্ব থেকে আরম্ভ করে অন্ধ্র রাজত্ব পর্যন্ত এই স্তূপের নির্মাণ কার্য অব্যাহত ছিল। আর শুঙ্গ রাজত্বের অবসান ঘটবার পরে কান্ববংশের উদ্ভব ঘটলে বারহুত, ভোজ ও বুদ্ধগয়ার মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। এরমধ্যে খৃষ্টীয় প্রথম শতকে নির্মিত বারহুতের ভাস্কর্যে নর্তক ও নর্তকীদের সমবেত নৃত্যের একটি দৃশ্যের কথা এখানে উল্লেখ্য। এতে দেখা যায় যে, গৌতম যখন তপস্যার দ্বারা বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন দেবতারা গৌতমের বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির সম্ভাবনায় তাঁর কেশচূড়া একটি বেদির উপরে স্থাপন করে পূজা করেছিলেন, এবং এ উপলক্ষ্যে স্বর্গের দেবসভায় অপ্সরা এবং গন্ধর্বরা নৃত্যগীতের দ্বারা এই উৎসব পালন করেছিলেন। আলোচ্য ভাস্কর্যে এই দৃশ্যে নর্তকরা নৃত্য করছেন, এবং ৮ জন বাদ্যকর সঙ্গীত পরিবেশন করছেন বলে দেখতে পাওয়া যায়। এঁদের মধ্যে চারজন এই দৃশ্যে হার্প ধরণের কোন বাজনা বাজাচ্ছেন, একজন মৃদঙ্গ বাজাচ্ছেন, এবং একজন গান গাইছেন বলেও দেখা যায়। এমনকি এই ভাস্কর্যে এসব নর্তকীদের নামও খোদিত করা হয়েছিল; যথা—মিশ্রকেশী, সুভদ্রা, পদ্মাবতী ও অম্বুসা।
অন্যদিকে খৃষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে নির্মিত যে অমরাবতীকে অন্ধ্রবংশের স্মরণীয় কীর্তি বলে মনে করা হয়ে থাকে, তাতেও গৌতম বুদ্ধের জীবনবৃত্তান্ত খোদিত রয়েছে বলে দেখতে পাওয়া যায়, আর পরবর্তীকালের অন্ধ্ররাজত্বের সময়েই নির্মিত উড়িষ্যার খণ্ডগিরি, উদয়গিরি ও রানীগুহায় নর্তক, নর্তকীসহ বাদ্যকরের মূর্তি লক্ষ্য করা যায়।
এছাড়া ঐতিহাসিকদের মতে, কুষাণ রাজত্বের সময়ে উত্তর ভারতে গ্রিক, রোমান ও ভারতীয় শিল্পের সংমিশ্রণে গান্ধার শিল্প নামের একটি নতুন শিল্পধারার প্রবর্তন হয়েছিল। এই গান্ধার শিল্পকে গুপ্তশিল্পের পূর্ববর্তী ধারা বলা হয়ে থাকে। অনেকের মতে, ২০৬ খৃষ্টপূর্বাব্দে সিরিয়ার গ্রিকরাজ এ্যান্টিয়োকস পাঞ্জাব আক্রমণ করেছিলেন এবং ব্যাক্ট্রিয়ার (বহলিক, অর্থাৎ—হিন্দুকুশ ও অক্ষুনদীর মধ্যবর্তী ভূ-ভাগ) গ্রিকরা এখানে স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। অতঃপর এই গ্রিকরাই ক্রমশঃ পাঞ্জাব ও সিন্ধুদেশে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন, এবং এসব জায়গায় তাঁদের সংস্কৃতির বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন রেখে গিয়েছিলেন, যারফলে গান্ধার শিল্পের সৃষ্টি হয়েছিল। আর এই গান্ধার পদ্ধতিতেই ভারতীয় ও গ্রিক-শিল্পের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল। একারণেই মথুরা এবং অমরাবতীর শিল্প নিদর্শনের উপরে গান্ধার শিল্পের সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়; এবং গান্ধার অঞ্চলে এধরণের শিল্পের নিদর্শন সর্বাধিক পরিমাণে দেখতে পাওয়া যায়। এর কারণ হল যে, ইউচিরাই কুষাণ বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, এবং গান্ধার অঞ্চলেই তাঁদের রাজ্য ছিল। পুরুষপুর অথবা পেশোয়ার ছিল তাঁদের রাজধানী। আগেই বলা হয়েছে যে, এই কুষাণবংশের শ্রেষ্ঠ রাজা কণিষ্ক সঙ্গীতপ্রিয় একজন ব্যক্তি ছিলেন এবং তাঁর গান্ধার রাজ্যও সঙ্গীতের জন্য সুপ্রসিদ্ধ ছিল। তাঁর সময়ে অশ্বঘোষ, নাগার্জুন প্রমুখ প্রথম শ্রেণীর নাট্যকার ছিলেন।
আবার দক্ষিণে চালুক্য রাজাদের রাজত্বকালে গুহাশিল্পের বিশেষ উন্নতি ঘটেছিল বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, খৃষ্টপূর্ব ১ম থেকে খৃষ্টীয় ৭ম শতক পর্যন্ত অজন্তার নির্মাণকার্য চলেছিল। তবে কোন এক রাজার জীবনে এর সমাপ্তি সম্ভব হয়নি; বরং একের পর এক শাসক এর আরব্ধ কাজ শেষ করেছিলেন। যাই হোক, ৬৪২ খৃষ্টাব্দে অঙ্কিত অজন্তা গুহায় গন্ধর্ব ও অপ্সরাদের নৃত্য ও গীতের একটি চিত্র লক্ষ্য করা যায়, যেটার দৃশ্যাবলী মহাজন জাতক থেকে নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া গন্ধর্ব ও অপ্সরার দ্বৈত ও একক চিত্রাবলীও এই গুহায় পাওয়া যায়। তাছাড়া চালুক্যগণের রাজত্বকালেই (৫৫০-৭৫০ খৃষ্টাব্দ) অহীহোলের দুর্গামন্দির নির্মিত হয়েছিল; এই মন্দিরের স্তম্ভে অনেক নর্তক নর্তকীর মূর্তি খোদিত রয়েছে বলে দেখা যায়। আবার চালুক্য শাসকদের রাজত্বকালেই ৭০০ খৃষ্টাব্দে ইলোরা মন্দিরের নির্মাণকার্য আরম্ভ হয়েছিল, আর এরপরে খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে রাষ্ট্রকূট শাসকদের সময়েও এর নির্মাণ কার্য চলেছিল বলে জানা যায়। তাছাড়া এসময়েই এ্যালিফ্যান্টার মন্দিরও নির্মিত হয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, ইলোরা মন্দির কৈলাসনাথ, অর্থাৎ—নটরাজ শিবের উদ্দেশ্যে নিবেদিত ছিল। আজও এর দরজার গায়ে থাকা নটরাজ শিবের মূর্তি সহজেই দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু অন্যদিকে চিদাম্বরম মন্দিরের নটরাজ মূর্তির সঙ্গে এর যথেষ্ট পার্থক্যও দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া এখানে নৃত্যরত মূর্তির সঙ্গে দর্শকদের মূর্তিও লক্ষ্যণীয়। ঐতিহাসিকদের মতে, পল্লববংশীয় শাসকরা ৬০০ খৃষ্টাব্দ থেকে ৮৫০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন, এবং তাঁদের দ্বারা নির্মিত মামাল্লাপুরমের বিখ্যাত শিবের মন্দিরটিকে চারুকলার অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন বলা যেতে পারে। এখানে যে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়, সেটা হল যে, এসময়ে দক্ষিণের বিভিন্ন ছোট ছোট রাজ্যের মধ্যে পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ নানাভাবে বিদ্যমান থাকলেও চারু ও কারুকলার উপরে এঁদের সকলেরই যে গভীর আকর্ষণ ছিল, একথার প্রমাণ তাঁদের শিল্পকলার মধ্যে দিয়েই পাওয়া যায়। অনুরূপভাবে ভুবনেশ্বরের মন্দিরেও অনেক নৃত্যরত গন্ধর্ব ও অপ্সরাদের মূর্তি দেখা যায়, যেগুলো সেখানকার নৃপতিদের গভীর সঙ্গীতপ্রীতির ঐতিহাসিক পরিচয় দেয়।
ঐতিহাসিকদের মতে, ১০০০ খৃষ্টাব্দ হইতে ১৬০০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে সুলতানিযুগ বা মধ্যযুগের প্রথমভাগ বলে অভিহিত করা যেতে পারে। এরমধ্যে ১০০০ খৃষ্টাব্দে খাজুরাহে কন্দর্যদেবের মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এতে খোদিত নারীমূর্তিগুলির মধ্যে নৃত্যের একটি লীলায়িত ভঙ্গি দেখতে পাওয়া যায়। অনুরূপভাবে রাজস্থানের নৃত্যরত গণেশের মূর্তিটির কথাও এখানে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া গঙ্গবংশীয় শাসকদের কর্তৃক নির্মিত পুরীর মন্দির এবং সোমনাথ ও কোনার্ক মন্দিরের নাটমণ্ডপও এপ্রসঙ্গে উল্লেখ্য। বস্তুতঃ, ভারতের প্রত্যেক প্রাচীন মন্দিরেই একটি করে নাটমণ্ডপ লক্ষ্য করা যায়; আর এসব নাটমণ্ডপগুলি একথারই প্রমাণ দেয় যে, সেযুগে এদেশে সঙ্গীতের বিশেষ প্রচলন তো ছিলই, একইসাথে এটি তখন প্রত্যেক মন্দিরে অধিষ্ঠিত দেবদেবীর চিত্তবিনোদনের জন্যও অবশ্য পালনীয় একটি কর্তব্য ছিল। প্রাচীন ভারতের শাসকরা এসব মন্দির ও ভাস্কর্যের মধ্যে দিয়েই নিজেদের গৌরব, মহিমা, ঐশ্বর্য ও শিল্পপ্রীতিকে প্রকাশ করেছিলেন।
তাছাড়া এক্ষেত্রে এটাও লক্ষ্য করবার বিষয় যে, সমগ্র ভারতের প্রাচীন প্রস্তর মূর্তিগুলির মধ্যে একটি যোগসূত্রও বর্তমান রয়েছে। এমনকি উত্তর ভারতের মন্দিরগুলির গায়ে খোদিত অথবা স্তূপ ও স্তম্ভের মূর্তিগুলির সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের মূর্তিগুলির বিশেষ কোন পার্থক্যও দেখতে পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিকদের মতে, খৃষ্টীয় দ্বাদশ থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত চিদাম্বরমের নির্মাণ কাজ চলেছিল। পাণ্ড্যরাজারা এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। এই মন্দিরের গায়ে ১০৮টি নৃত্যের করণ খোদিত রয়েছে বলে লক্ষ্য করা যায়। আবার ১২৩২ খৃষ্টাব্দে নির্মিত মাউন্ট আবুর ‘নেমিনাথ’ মন্দিরের ছাদে খোদিত নারীমূর্তিগুলির ভিতরেও একইধরণের নৃত্যের করণ দেখা যায় যায়। এমনকি এরপরে ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত বিজয়নগরের বিঠল স্বামীর মন্দিরের পাথরের বেদির গায়েও অতীতের শিল্পধারার ঐতিহ্য রক্ষা করেই নৃত্যরতা বাদ্যরতা সুন্দরী নর্তকীদের নৃত্যের ভঙ্গি উৎকীর্ণ করা হয়েছিল বলেই দেখা যায়। তাছাড়া নিমিনাথের মন্দিরে ও চিদাম্বরম মন্দিরের গায়ে উৎকীর্ণ ১০৮টি করণের মধ্যেও তেমন কোন পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় না; এবং উভয় জায়গার মূর্তিগুলির অঙ্গহার, করণ, পদবিক্ষেপ, গতি ও হস্তভেদের মধ্যেও কোন বৈসাদৃশ্য দেখা যায় না। সুতরাং, এ থেকে একথা অনুমান করা কষ্টসাধ্য নয় যে, তখন সমগ্র ভারতে মার্গ নৃত্যের মধ্যেই একটি সমতা ছিল। আর এই সমতাই এখন ভারতের যে কোন প্রান্তের যে কোন মন্দিরের গায়ে অথবা গুহাশিল্পের নর্তক নর্তকীর নৃত্যভঙ্গির মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। তবে একইসাথে একথাও উল্লেখ্য যে, এসব মার্গ নৃত্যের ধারার (style) মধ্যে দেশভেদে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য অবশ্যই থাকতে পারে। অনেকের মতে, প্রাচীনকালে ভরতমুনি তাঁর গ্রন্থে অভিনয় সম্বন্ধে তৎকালীন ভারতের চার প্রান্তে প্রচলিত যে চারটি ধারার কথা উল্লেখ করেছিলেন, নৃত্য সম্বন্ধেও একে প্রয়োগ করা যেতে পারে। যাই হোক, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা প্রাচীন মন্দিরগুলির নর্তকীদের নৃত্যভঙ্গিমা ও এর ব্যাপকতা লক্ষ্য করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যেতে পারে যে, এসব মার্গনৃত্য তখন অভিজাত শ্রেণীর মধ্যেই ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল; কারণ, সেকালে ভারতীয় রাজারাই বংশপরম্পরায় সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন, এবং এই প্রবহমান সঙ্গীতের মধ্যে কোন পার্থক্য লক্ষ্য করা যেত না।
অনুরূপভাবে ভারতীয় নৃত্যের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে ভারতীয় সঙ্গীতশাস্ত্রগুলিকেও বিশেষ মূল্যবান বলে মনে করা হয়ে থাকে। এসব সঙ্গীতশাস্ত্রগুলিতেও প্রাচীন ভারতের নৃত্য, নাট্য, গীত ও বাদ্য সম্বন্ধে প্রচুর ঐতিহাসিক উপকরণ পাওয়া যায়। বস্তুতঃ, শুধু সঙ্গীতশাস্ত্রেই নয়, বরং প্রাচীন কাব্য নাটকেও এবিষয়ে প্রচুর উপাদান পাওয়া যায়। এগুলির মধ্যে ভরতের নাট্যশাস্ত্রকে নৃত্য, নাটক, সঙ্গীত প্রভৃতির মানদণ্ডরূপে গণ্য করা হয়ে থাকে। কিন্তু ভরতের নাট্যশাস্ত্রের রচনাকাল নিয়ে অতীত থেকেই ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। যেমন—কেউ কেউ বলেন যে, খৃষ্টপূর্ব যুগে ভরতের উদ্ভব হয়েছিল; তেমনি আবার কারো মতে, খৃষ্টীয় চতুর্থ থেকে পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত সময়কে ভরতের নাট্যশাস্ত্র রচনার কাল বলা চলে। তবে একথা সঠিক যে, ভরতের পরবর্তীকালে এই নাট্যশাস্ত্রে অনেক সংযোজনা হয়েছিল, এবং অনেকে অনুমান করেন যে, কোহলই এই সংযোজনার কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন। এই কোহল ভরতের পরবর্তী সঙ্গীত শাস্ত্রকার ছিলেন। সাধারণভাবে অনুমান করা হয়ে থাকে যে, খৃষ্টীয় দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় শতকে তাঁর আবির্ভাব ঘটেছিল। এছাড়া প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে কোহল রচিত ‘সঙ্গীতমেরু’ নামক একটি গ্রন্থের উল্লেখও পাওয়া যায়। কোহলের পরবর্তীকালে নাট্যশাস্ত্রকার দত্তিল তাঁহার ‘দত্তিলম’ নামক গ্রন্থে নৃত্য-গীতের আলোচনা করেছিলেন বলে জানা যায়।
এরপরে আলোচনা প্রসঙ্গে এখানে মহাকবি কালিদাসের রচিত দুটি অমর কাব্যের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এরমধ্যে ‘বিক্রমোবর্শী’ নাটকের চতুর্থ অঙ্কে নৃত্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। আর ‘রঘুরংশ’ নাটকে কালিদাস আঙ্গিক, বাচিক ও সাত্ত্বিক অভিনয়ের কথা বলেছিলেন বলে দেখতে পাওয়া যায়। তাছাড়া তাঁর মালবিকাগ্নিমিত্রমের নায়িকাও নৃত্যগীত পটীয়সী ছিলেন বলেই লক্ষ্য করা যায়।
অতঃপর এবিষয়ে যেসব প্রাচীন গ্রন্থগুলির কথা এখানে উল্লেখ্য, সেগুলির মধ্যে ডাঃ কৃষ্ণমাচারিয়ার মতানুসারে নারদ রচিত ‘সঙ্গীত মকরন্দ’ ১১০০ খৃষ্টাব্দে রচনা করা হয়েছিল। অন্যদিকে রামকৃষ্ণ ভেলাভের মতে শাঙ্গদেব রচিত ‘সঙ্গীত রত্নাকর’ নামক গ্রন্থটি ১২১০ খৃষ্টাব্দ হইতে ১২৪৭ খৃষ্টাব্দের মধ্যে রচিত হয়েছিল। আবার নন্দিকেশ্বরের ‘অভিনয় দর্পণ’ অথবা তাঁর অভ্যুদয়কালকে খৃষ্টীয় দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় থেকে পঞ্চম অথবা সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত ধরা হয়ে থাকে। এছাড়া শারদাতনয় রচিত ‘ভাবপ্রকাশন’, ধনঞ্জয় রচিত ‘দশরূপ’, এবং শুভঙ্কর রচিত ‘সঙ্গীত-দামোদর’ নামক গ্রন্থের কথাও এপ্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তবে এসবের মধ্যে সবথেকে প্রাচীন ও প্রামাণিক গ্রন্থ হিসেবে নাট্যশাস্ত্র ও অভিনয় দর্পণের নামই বিশেষভাবে উল্লেখ্য। প্রাচীনকালে ভারতীয় নৃত্যে ভরত ও নন্দিকেশ্বরের দুটি ধারা প্রচলিত ছিল। তবে অতীতের অনেকে অবশ্য ভরতের থেকে নন্দিকেশ্বরের অভিনয় দর্পণ গ্রন্থটিকেই বেশি প্রাচীন বলে উল্লেখ করেছিলেন। প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, নন্দিকেশ্বরের অভিনয় দর্পণে যেখানে বাহ্যিক প্রকাশ ও রীতিনীতির উপরে বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল, সেখানে ভরত কিন্তু রসানুভূতি অথবা রসসৃষ্টির উপরেই বেশি দৃষ্টি দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে প্রাচীন ভারতের প্রধান নাট্যশাস্ত্রকার হিসেবে এখানে কোহল ও মতঙ্গের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এমনকি অনেকে একথাও মনে করেন যে, নাট্যশাস্ত্রের শেষ অংশ আসলে কোহল কর্তৃক রচিত হয়েছিল; কারণ, ভরত নিজের কোহলের নাম বহুবার উল্লেখ করেছিলেন। এঁরা ছাড়া খৃষ্টীয় দ্বিতীয় থেকে সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত যেসব সঙ্গীত-গুণী সঙ্গীতের উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে তুম্বুরু, যাষ্টিক, নন্দিকেশ্বর, দুর্গাশক্তি প্রমুখের নাম ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখ্য। মতঙ্গ নিশ্চিতভাবেই এঁদের পরবর্তী গুণী ছিলেন, আর তাঁর ‘বৃহদ্দেশী’ নামক গ্রন্থে সঙ্গীত সম্বন্ধে বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। বস্তুতঃ ভরতের পরবর্তীকালে মতঙ্গই ভারতীয় সঙ্গীত জগতে একটি নব জাগরণ নিয়ে এসেছিলেন। এছাড়া ১২১০ খৃষ্টাব্দের গুণী শাঙ্গদেবের ‘সঙ্গীতরত্নাকর’ গ্রন্থেও নৃত্যের প্রচুর ঐতিহাসিক উপাদান লক্ষ্য করা যায়। তবে যদিও এই গ্রন্থটি মূলতঃ ভরতের নাট্যশাস্ত্রকে অনুসরণ করেই রচনা করা হয়েছিল, কিন্তু তবুও, এর ভিতরে তৎকালীনযুগের দেশীয় নৃত্যপদ্ধতির পরিচয় পাওয়া যায়।
ইতিমধ্যে ৭৫০ খৃষ্টাব্দ থেকে উত্তর ভারতে মুসলমান আক্রমণ শুরু হয়েছিল। তবে প্রথমদিকে মুসলমানরা ভারতে লুটপাট করবার উদ্দেশ্যেই আক্রমণ চালিয়েছিলেন, এসময়ে এখানে স্থায়ীভাবে রাজত্ব করবার কোন ইচ্ছাই তাঁদের ছিল না। এরফলে হিন্দুসংস্কৃতি তখন বিপদের সম্মুখীন হলেও বিপর্যস্ত হয়নি। অবশেষে ১২০৬ খৃষ্টাব্দ থেকে ভারতে স্থায়ীভাবে সুলতানিযুগের আরম্ভ হয়েছিল; আর সুলতানিযুগের ভারতে হিন্দু ও মুসলমান সংস্কৃতির যে মিলন শুরু হয়েছিল, সেটাই পরে মোঘলযুগে আকবরের রাজত্বে পৌঁছে চরম বিকাশ লাভ করেছিল। এসময়েই উত্তর ভারতে একটি নতুন সংস্কৃতির জন্ম হয়েছিল। অন্যদিকে সুলতানিযুগে দক্ষিণ ভারতকে বারবার মুসলমান আক্রমণ প্রতিহত করতে হলেও দক্ষিণ ভারত রক্ষা পেয়ে গিয়েছিল। কারণ, এযুগে হিন্দু সংস্কৃতি ও ধর্মের রক্ষক হিসেবে বিজয়নগরের নৃপতিরা অতুলনীয় অবদান রাখতে পেরেছিলেন। শুধু তাই নহে, এযুগে অনেকেই হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করবার জন্য দাক্ষিণাত্যেই আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু খৃষ্টীয় ১২০০ শতাব্দী থেকে ভারতের দুর্ভাগ্য ঘনিয়ে এসেছিল, আর সমগ্র ভারত তখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে আত্মকলহে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। এরফলে বহিঃশত্রুর আক্রমণে ভারত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল, এবং এখানকার শাসকরা তখন তাঁদের নিজেদের রাজ্য রক্ষা ও যুদ্ধ করিতে ব্যস্ত হয়ে পড়বার কারণে শিল্পকলার সমাদর কমতে শুরু করেছিল। এমনকি এসময়েই অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যেও এর প্রচলন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, এবং এই একটি পৃথক শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে এর স্বর্গীয় রূপটিও বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর মুসলমান শাসকদের জলসাঘরে নাচওয়ালীদের আগমন ঘটেছিল, এবং দাক্ষিণাত্যের দেবদাসীরা সেখানকার শাসকদের চিত্তবিনোদন করতে আরম্ভ করেছিলেন।
তারপরে সপ্তদশ শতাব্দীতে এদেশে ইংরেজদের আগমনে সঙ্গীতশিল্পের মান আরও নিম্নগামী হয়েছিল, এবং এমনকি বিলুপ্তির পথে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যে দেশের অণুতে নৃত্যের ছন্দের অনুরণন সেই অতীত থেকেই ছিল, সে দেশে নুপুরের ধ্বনি কখনোই স্তব্ধ হওয়া সম্ভব ছিল না। আর তাই রাজনৈতিক বিপ্লব, আত্মকলহ, বহিঃশত্রুর আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়েও ভারতবাসীরা কখনোই কলাদেবীর আরাধনা করতে ভুলে যাননি। একারণেই আজও দেখা যায় যে, ভারতীয় নৃত্য বিভিন্ন-ধারায় বিভিন্ন নাম নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে, এবং এটি উত্তর ভারতে ‘কথক’, পূর্বভারতে ‘মনিপুরী’, এবং দক্ষিণ ভারতে ‘ভরতনাট্যম’ ও ‘কথাকলি’ বলে পরিচিত হয়েছে। এসব বিভিন্ন নৃত্যের ইতিহাস বিশেষণ করলে এটাই দেখা যায় যে, অতীতে এসব নৃত্যশৈলী কিভাবে সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল, এবং এগুলির উপরে বৈদেশিক শক্তি তখন কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, ঐতিহাসিকদের মতে, আজও উত্তর ভারতে মুসলমান প্রভাব, দক্ষিণ ভারতে আর্য ও অনার্যের সংমিশ্রণ এবং পূর্বভারতে মোঙ্গল, চীন প্রভৃতি জাতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া বেলুচিস্থান, সীমান্তপ্রদেশ ও পশ্চিম পাঞ্জাবে এখন তুর্ক ইরানীয় জাতির বংশধরেরা বাস করেন। এমনকি অতীতের অনেকে একথাও অনুমান করেছিলেন যে, সুদূর অতীতের কোন একসময়ে দ্রাবিড় ও মোঙ্গল জাতির সংমিশ্রণেই নাকি বাংলা ও উড়িষ্যার অধিবাসিদের উদ্ভব ঘটেছিল; আর অন্যদিকে তরাই, নেপাল, আসাম ও ভুটানের অধিবাসিদের উদ্ভব মোঙ্গল জাতি থেকেই হয়েছিল। মোটকথা হল যে, ভারতের প্রত্যেক অঞ্চলই এক একটি জাতির বৈশিষ্ট্য নিয়ে অতীতে গড়ে উঠেছিল, এবং তাঁদের কৃষ্টির উপরে সেই সেই জাতিরই প্রভাব পড়েছিল।#




