১৪ মে ১৯৭১: বাড়িয়া, নড়িয়া ও তাহেরপুর গণহত্যা

১৯৭১ সালের ১৪ মে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক ভয়াবহ ও রক্তাক্ত দিন। ২৫ মার্চের কালরাতের পর পাকিস্তানি সামরিক জান্তা পূর্ববাংলাকে দমন করার জন্য যে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিল, মে মাসে এসে তার নির্মমতা আরও বিস্তৃত হয়। ১৪ মে সেই ধারাবাহিকতারই এক নির্মম অধ্যায়। গাজীপুরের বাড়িয়া, মৌলভীবাজারের নড়িয়া এবং রাজশাহীর তাহেরপুরে গণহত্যা মুক্তিযুদ্ধের নৃশংসতার অন্যতম নির্মম উদাহরণ।

বাড়িয়া গণহত্যা:
গাজীপুরের জয়দেবপুরের বাড়িয়া গ্রামটি ছিল প্রধানত হিন্দু অধ্যুষিত এবং ভাওয়াল সেনানিবাসের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। এই অবস্থানই গ্রামটিকে পাকিস্তানি বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। ১৪ মে দুপুরে স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা কয়েকটি জিপ ও সামরিক ট্রাক নিয়ে বাড়িয়া গ্রাম চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। এরপর তারা গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। মানুষ প্রাণ বাঁচাতে যে যেদিকে পারে ছুটতে থাকে। কেউ মাঠে, কেউ বিলে, কেউ বাড়ির আড়ালে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু হানাদারদের গুলির সামনে এসব ছিল অর্থহীন। যারা পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে, তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়। একই সঙ্গে বাড়িঘর লুট করা হয় এবং গানপাউডার ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা এই হত্যাযজ্ঞে বাড়িয়া ও পার্শ্ববর্তী কামারিয়া গ্রামের প্রায় ২০০ মানুষ শহীদ হন। সন্ধ্যায় প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে পাকিস্তানি সেনারা গ্রাম ত্যাগ করে।

নড়িয়া গণহত্যা:
একই দিনে সিলেটের মৌলভীবাজারের কাগবালা ইউনিয়নের নড়িয়া গ্রামও পাকিস্তানি বর্বরতার শিকার হয়। সেসময়ে মৌলভীবাজার শান্তি কমিটির সভাপতি এ এন এম ইউসুফ-এর সহায়তায় পাকিস্তানি সৈন্যরা গ্রামে প্রবেশ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। হানাদারদের আগমনের খবর পেয়ে অনেকে পাশের ফরছা বিল ও নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিলেও শতাধিক নারী, পুরুষ ও বৃদ্ধকে আটক করা হয়। পুরুষদের আলাদা করে একটি লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর নারীদের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ। এসময় রাজাকার ও আলবদরের সদস্যরা ১৯টি বাড়িতে গান পাউডার ছিটিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। এই গণহত্যার পর জীবিত গ্রামবাসীদের হুমকি দেওয়া হয়, কেউ যেন নিহতদের লাশ সৎকার না করে। এরপর নড়িয়া জনমানবশূন্য একটি নিস্তব্ধ গ্রামে পরিণত হয়।

তাহেরপুর গণহত্যা:
১৯৭১ সালের ১৪ মে, সেদিনও ছিল হাটবার। সকাল থেকেই তাহেরপুর হাটে ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসেছিল কেনাবেচার কাজে। কিন্তু দুপুর গড়াতেই নেমে আসে ভয়াবহতা। বেলা প্রায় ১টা ৩০ মিনিটে মুসলিম লীগ নেতা ও পুঠিয়ার চেয়ারম্যান আউব আলীর প্ররোচনায় পাকিস্তানি বাহিনী হাটটি ঘিরে ফেলে। মুহূর্তেই চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ হাটুরেরা কী ঘটছে বুঝে ওঠার আগেই পাকিস্তানি সেনারা ২০ জন হাটুরে ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীকে আটক করে।
আটক ব্যক্তিদের হাটের পাশের ভাবনপুর তেলিপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁদের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে এবং নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করার পর মরদেহগুলো মাটিচাপা দেওয়া হয়।

এই গণহত্যায় শহীদদের মধ্যে যাঁদের নাম জানা গেছে, তাঁরা হলেন— মানিক (তাহেরপুর মাস্টার পাড়া), গৌড় চন্দ্র (পিতা: পরেশচন্দ্র, ভাবনপুর ১নং ওয়ার্ড), সেকেন্দার আলী (পিতা: খন্দকার গিয়াসউদ্দিন, তাহেরপুর), তুলসী দাস (তাহেরপুর), শম্ভু পাল (কামারখালি), পুড়িয়া দাম (দুর্গাপুর), মজিবুর রহমান (পিতা: উজির মোল্লা, ভাবনপুর), সেকেন্দার খন্দকার (পিতা: গিয়াস খন্দকার, তাহেরপুর), আনছার আলী সর্দার (পিতা: কাচু সর্দার, ধনিয়াপড়া), শিবু সাহা (তাহেরপুর), মো. চয়েন শাহ্ (পিতা: বাহার শাহ্, মথুরাপুর; স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক) এবং মজিবুর শাহ্ (পিতা: চয়েন শাহ্, মথুরাপুর)।

গণহত্যার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। স্থানীয় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আয়েনউদ্দিন, সদস্য হাজি মুনির উদ্দীন এবং ভাবনপুর গ্রামের স্বর্ণকার আব্দুল জলিলের নেতৃত্বে রতনপুর বালিকা বিদ্যালয়ে একটি রাজাকার ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই এই ক্যাম্পটি এলাকায় নির্যাতন ও হত্যার অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়।

এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করার লক্ষ্যে একসময় ১৫ জন গেরিলাযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে এফএফ আবদুল ছালাম, ইউনুস আলী (বুলবুল), রণজিৎ কুমার দাশ ও বৃন্দাবন ক্যাম্পটি ঘেরাও করেন। কিন্তু সেই অভিযান সফল হয়নি।

পরবর্তীতে ৭ নম্বর সেক্টরের শেখপাড়া সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন আব্দুর রশীদের নির্দেশে ৩ আগস্ট ইপিআর হাবিলদার শফিকুর রহমান তাহেরপুরে পাকিস্তানি সেনাদের ওপর আক্রমণ চালান। কিন্তু এই অভিযানও ব্যর্থ হয়। তখন স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা তাহেরপুর স্কুলে ঘাঁটি স্থাপন করে এবং সেখান থেকেই কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে। এই ঘাঁটিটি মুক্তিযোদ্ধাদের চলাচল ও সংগঠনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এ কারণে ৪ আগস্ট কমান্ডার শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল পুনরায় ক্যাম্প আক্রমণ করে। আকস্মিক এই হামলায় পাকিস্তানি সেনারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। এতে ৮ জন পাকসেনা নিহত এবং ২ জন আহত হয়। অভিযান শেষে মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদে নিজেদের ঘাঁটিতে ফিরে যান।

কিন্তু সেদিনের অভিযান সেখানেই শেষ হয়নি। বিশ্রামের মধ্যেই খবর আসে, পাকিস্তানি সেনাদের একটি টহল দল তাহেরপুর হয়ে নদীপথে অগ্রসর হচ্ছে। রাত তখন সাড়ে ১০টা। হাবিলদার শফিকুর রহমান দ্রুত তাঁর দল নিয়ে নদীর পাড়ে অবস্থান নেন। খুব কাছ থেকে পাকিস্তানি সেনাদের নৌকা লক্ষ্য করে একের পর এক গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। পাশাপাশি চলে রাইফেল ও এলএমজি থেকে টানা গুলিবর্ষণ। এই অভিযানে ১৮ জন পাকসেনা এবং ৩ জন মাঝি নিহত হয়।

আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তাহেরপুর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ চলতেই থাকে। অবশেষে ১০ ডিসেম্বর হাবিলদার শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে প্রায় ২০০ মুক্তিযোদ্ধা তাহেরপুর এলাকা শত্রুমুক্ত করতে সক্ষম হন।

তাহেরপুর মুক্ত করার এই যুদ্ধে শহীদ হন আবেদ আলী মৃধা (পিতা: সমরেশ আলী মৃধা, তাহেরপুর), আবুল কাশেম (পিতা: গোপাল উদ্দীন, বাঙ্গালপাড়া), ময়েজ উদ্দীন (পিতা: সদর উদ্দীন, দাউদপুর), ওয়াজেদ আলী (পিতা: গ্রামেজমং, রামপুর), দীনবন্ধু প্রামাণিক (পিতা: দশরথ চন্দ্র প্রামাণিক, বড়বাতিয়া), সুনীল কুমার (পিতা: জগবন্ধু, তাহেরপুর) প্রমুখ।

এই গণহত্যার ভেতরে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য গ্রামের নীরব কান্না, হাটের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষ, পুড়ে যাওয়া বাড়িঘর এবং হঠাৎ থেমে যাওয়া জীবনের গল্প। বাড়িয়া, নড়িয়া ও তাহেরপুর সেই ইতিহাসেরই তিনটি রক্তাক্ত নাম, যেখানে একটি দিনের মধ্যেই স্বাভাবিক জীবন চিরকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল নির্মম সহিংসতায়। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সংঘটিত এই নিষ্ঠুর ঘটনাগুলোর স্মৃতি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে লুকিয়ে থাকা সাধারণ মানুষের নিঃশব্দ আত্মত্যাগের কথাই বলে।#

তথ্যসূত্র:
১। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র – সপ্তম, অষ্টম, নবম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড।
২। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ২, ৩, ৫ ও ৭ নম্বর সেক্টর।
৩। সংগ্রামের নোটবুক

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on print
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!