১৯৮৭ সালে রাজস্থানের রূপ কানোয়ার সতী হয়েছিলেন। সরকারি হিসাবানুসারে সেটাই ছিল ভারতে শেষ কোন সতীদাহের ঘটনা। এর আগে, বিংশ শতাব্দীর ভারতে — ১৯১৩, ১৯৭৫, ১৯৭৮, ১৯৮০ ও ১৯৮১ — সালেও সতী হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। প্রথমেই দেখা যাক যে — সতী শব্দের অর্থ কি? আমাদের ভুললে চলবে না যে ভারতীয় ভাষাগুলির ক্ষেত্রে সতীর কোনও পুংলিঙ্গ প্রতিশব্দ নেই। অর্থাৎ, সম্পূর্ণভাবে এবং বিশেষভাবে শব্দটির নৈতিক তাৎপর্য শুধুমাত্র কোনও নারীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কি সেই তাৎপর্য? সদ্যবিধবা নারী তাঁর মৃত স্বামীর চিতায় আরোহণ করেন এবং নিজেকে উৎসর্গ করেন —
প্রথমতঃ পরলোকে তাঁর স্বামীর স্বচ্ছন্দ অবস্থানের জন্য;
দ্বিতীয়তঃ স্বর্গে চিরকাল স্বামী সঙ্গ সুখের আশায়।
আলোচ্য বিশেষ ঘটনার ক্ষেত্রে জানতে পারা যায় যে, রূপ কানোয়ারের স্বামী নিবীৰ্য ছিলেন, তাই স্বামীর মৃত্যুর কিছুদিন আগেই তিনি নিজেই তাঁর স্বামীকে অপর এক পুরুষের জন্য ত্যাগ করেছিলেন। তাই সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে, অনন্তকালের জন্য সেই স্বামীর সঙ্গলাভের আশায় তিনি কি সত্যই ব্যাকুল ছিল? হয়তো সেই সম্ভাবনা তাঁর কাছে ভয়াবহ হয়েই দেখা দিয়েছিল।
রূপ-এর আত্মোৎসর্গের বিভিন্ন ব্যাখ্যা, অন্ততঃ যুক্তি ও মানবতার বিচারে যে তথ্য তাৎপর্যপূর্ণ, সেটা হল যে – বহু শাস্ত্রীয়গ্রন্থ এবং সমাজের একটি বৃহৎ অংশের মিলিত সিদ্ধান্ত ছিল যে — ‘স্বামীর চিতায় আত্মহনন’ — করাই সদ্যবিধবার উচিত কাজ। এখানে মনে রাখতে হবে যে, তাঁর স্বামীর মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল। কোনও সচেতন আত্মহত্যার পিছনে যে বাড়তি যন্ত্রণা থাকে, সেই ধরণের দুর্ভোগ তাঁকে সহ্য করতে হয়নি। মৃত্যু যখন উপস্থিত হয়েছিল, তখন তাঁর সামনে অন্য কোনও বিকল্প ছিল না, কিন্তু তাঁর বিধবা স্ত্রীর ক্ষেত্রে কিন্তু ছিল। কিন্তু তবুও কোন অমানবিক পারিপার্শ্বিক ওই বিধবাকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল?
সম্ভবতঃ সহমরণ প্রথার শিকড় প্রাচীন সমাজের বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত। অথর্ববেদে মৃতের বধূ হওয়ার জন্য জীবিত নারীকে নীত হতে দেখা যায় অথবা নারী প্রাচীন প্ৰাথারই অনুগমন করছে বলে দেখা যায় (অথর্ববেদ ১৮:৩:১,৩)। এই প্ৰথা কত প্রাচীন? এটি কী প্ৰাগাৰ্য যুগের? সম্ভবতঃ তাই। কারণ — গ্রিক, রোমান, জার্মান অথবা কেন্টিক প্রাচীন সাহিত্যে অর্থাৎ অন্যান্য সমগোত্রীয় ইন্দো-ইউরোপীয় সাহিত্যে স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীকে দাহ করবার কোনও সাক্ষ্য পাওয়া যায় না। যেখানে অথবা যখনই এর সূচনা হয়ে থাকুক, ইতিহাসে প্রমাণ রয়েছে যে, আর্য ও প্রাগাৰ্যদের মিশ্র জনগোষ্ঠী অন্ততঃ আংশিকভাবে, সাময়িকভাবে হলেও অথবা আঞ্চলিকভাবে এই প্রথাকে গ্ৰহণ করে নিয়েছিল, যদিও কখনওই প্রথাটি বহুল প্রচলিত হতে পারেনি। মহাভারতে পাণ্ডুর মৃত্যুর পরেও কুন্তী বেঁচে ছিলেন। মাদ্রীর স্বেচ্ছায় মৃত্যু কোনও সহমরণের ঘটনা নয় বরং অপরাধবোধে আত্মোৎসর্গ ছিল। মনে হয় যে, ওই সময়ে সেই ধরণের সহমরণ কোন বিকল্প প্রথা ছিল। মহাভারতের মূল কাব্যে মাদ্রীর মৃত্যু এক্ষেত্রে একক ব্যতিক্রম মাত্র। উভয় মহাকাব্যেই অধিকাংশ বিধবা জীবিত থেকেছেন; স্বর্গে অনন্তকাল ধরে স্বামীসঙ্গে বাস করবার প্রলোভনে কেউ তাঁদের আত্মহননের ব্যাপারে প্রলুব্ধ করেনি। যখন ‘হর্ষচরিত’ রচিত হয়েছিল, সেই সময়ে উত্তর ভারতীয় সমাজ এক অনুদার সংরক্ষণশীল পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। তবুও যখন যশোবতী, তাঁর স্বামীর মৃত্যুর পরে চিতারোহণে উদ্যত হয়েছিলেন, কেউ তাঁকে সেবিষয়ে উৎসাহিত করেননি; বরং সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে যাঁদের কাছ থেকে তিনি বিদায় নিতে গিয়েছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁকে নিরস্ত করেছিলেন। এরও পূর্ববতী সাহিত্যে কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’ কাব্যে দেখা যায় যে, স্বামীর বিয়োগে কাতর রতি আত্মহত্যায় উদ্যত বলে কবি বর্ণনা করেছিলেন; এর খুব সম্ভাব্য কারণ এটাই ছিল যে — কবি নিজেও জানতেন বাস্তবে সেটা ঘটবে না। ‘রঘুবংশ’-এ একাধিক রাজার মৃত্যুর উল্লেখ থাকলেও স্বামীর সাথে সহমৃতা হওয়া একটিও বিধবার কথা বলা হয়নি। কিন্তু পরবর্তীযুগের সাহিত্যে বিশেষ করে ‘রাজতরঙ্গিনী’–র মত প্রাচীন মধ্যযুগের সাহিত্যে, স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যাওয়ার ঘটনা বহুবার উল্লেখিত হয়েছিল, এবং সেসব তৎকালীন সমাজের প্রশংসাও পেয়েছিল।
মহাভারতে দক্ষযজ্ঞের একাধিক বিবরণ রয়েছে, কিন্তু সেখানে শিব-নিন্দার কারণে দক্ষযজ্ঞ ধ্বংসের কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। ‘অতঃপর শিব ক্ৰোধে যজ্ঞ পণ্ড করেন’ — পরবর্তী পুরাণগুলিতে, যেমন — বায়ুপুরাণ (৩০:৪০-৪৫), স্কন্দ পুরাণ ও বামনপুরাণেও কাহিনীটির উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই পরিচিত কাহিনীর একটি বিশদ সংস্করণ অর্বাচীন, গৌণ শিবপুরাণে (১৭:২৫-২৯) পাওয়া যায়। সেখানে পতিব্ৰতা স্ত্রী সতী, তাঁর স্বামীর নিন্দা সহ্য করতে না পেরে স্বেচ্ছায় প্রাণত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু অগ্নিদগ্ধ হয়ে নয়। ওই কাহিনীতে সতী বিশেষণটি (প্রকৃতপক্ষে তাঁর নাম) একটি নতুন মাত্রা পেয়েছিল — যখন স্বামীর অপমান হয় তখন স্ত্রীর জীবন সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়ে, তাই তিনি স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বেছে নিয়েছিলেন। দক্ষের কন্যা হিমালয় দুহিতা পার্বতীরূপে পুনর্জন্ম নিয়েছিলেন, এবং শিবকেই আবার বিবাহ করেছিলেন। সতীর ভাবমূর্তিতে তখন থেকে নতুন একটি সংজ্ঞা যুক্ত হয়েছিল — স্বামীর সম্মান রক্ষা করবার জন্য তিনি স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন। একথা বলা নিষ্প্রয়োজন যে, সমস্ত প্রাচীন সাহিত্যের কোথাও কিন্তু স্ত্রীর সম্মান বা মর্যাদা রক্ষা করবার জন্য স্বামীর পক্ষে কোনও প্রকারের দুশ্চিন্তার অবকাশ রাখা হয়নি। কারণ খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়, অতীতে কখনই মানুষ হিসাবে সামাজিক সম্মান মেয়েদের প্রাপ্য ছিল না। তাই ধৃতরাষ্ট্রের সভায় কুরু বৃদ্ধদের মত প্ৰত্যেকেই বিনা প্ৰতিবাদে একজন নারীর নিগ্রহ এবং অপমান প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
ভারতের সতীদাহের ইতিহাসের সূত্রপাতে দেখা যায় যে, প্রাচীন ধর্মশাস্ত্র ও পুরাণগুলির চিন্তাধারায় এটিকে একটি পবিত্র কর্মের আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বাসস্থতির নিদান অনুসারে শুধুমাত্ৰ ব্রাহ্মণ-নারীর (অন্য কোনও বর্ণের নয়) নিজের স্বামীর চিতায় দগ্ধ হওয়ার অধিকার রয়েছে, এবং — “যদি সে জীবিত থাকে, তবে উত্তম বস্ত্র ও গহনা পরিত্যাগ করবে, এবং তপস্যার দ্বারা শরীরকে শুদ্ধ করবে” (২:৫৩)। এখানে একটি বিকল্প রয়েছে — বিধবা নারী তপস্বিনী হয়ে বেঁচে থাকতে পারতেন। পরাশরের ধর্মসূত্ৰতেও বিকল্প ব্যবস্থার স্বীকৃতি রয়েছে — যে নারী স্বামীর মৃত্যুর পরে তপস্যাচরণ করে থাকেন, তিনি তপস্বীদের মতোই স্বৰ্গলাভ করেন (৪:২৭)। কিন্তু এর একটু পরেই বলা হয়েছে — “মানুষের শরীরে সাড়ে তিন কোটি লোম থেকে, যে নারী মৃত্যুতেও তাঁর স্বামীকে অনুগমন করে, সে স্বামীর সঙ্গে ৩০ কোটি বৎসরই স্বৰ্গবাস করে” (৪:২৮)। এখানে অন্তর্নিহিত বক্তব্য এটাই যে, জীবিত থাকবার বিকল্প নিকৃষ্ট নারীর জন্যই প্রযোজ্য; সতী-নারী সহমরণের পথই বেছে নেন এবং স্বৰ্গে চিরকাল স্বামীসঙ্গ লাভ করেন। অতীতে সদ্যবিধবাকে তাঁর দুর্বল ও বিহ্বলতর মুহুর্তে এইসব কথা বলা হত। দক্ষ সংহিতাতে বলা হয়েছে — যে সতী নারী স্বামীর মৃত্যুর পর অগ্নিতে প্ৰবেশ করে সে স্বৰ্গে পূজা পায়; যেমন করে সাপুড়ে সাপকে তার গর্ত থেকে টেনে বার করে তেমনভাবে সতী তাঁর স্বামীকে নরক থেকে আকর্ষণ করে এবং তাঁর সঙ্গে সুখে থাকে। হরীত সংহিতায় বলা হয়েছে — “যে নারী স্বামীর চিতায় আত্মোৎসর্গ করে সে তাঁর, পিতৃকুল, স্বামীকুল উভয়কেই পবিত্র করে” (৫:১৬০)। যাজ্ঞবল্ক্য অবশ্য সহমরণকে অনুমোদন করেননি; সেখানে বলা হয়েছে — স্বামীহারা স্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন তাঁর পিতা-মাতা, শ্বশুর-শাশুড়ি, এমনকী ভাইরা ও মাতুল। অন্যথায় তাঁর নামে নিন্দা হবে (১:৮৬)। হরীত সংহিতা বলেছে — “কোনও বিধবা রমণী দিনে দুইবার মাত্ৰ আহার করবে এবং সুগন্ধি ফুল, অলংকার, রঙিন পোশাক ও কাজল পরিত্যাগ করবেন” (১১:২০৫-২১০)।
বিষ্ণুধর্মসূত্রর লেখকও জানিয়েছিলেন, বিধবা নারী আজীবন কঠোর সংযম অভ্যাস করবেন (২:৫:১৪)। যদিও তিনি তাঁর স্বামীর চিতায় মৃত্যুকেও সমর্থন করেছিলেন। মাদ্রী পাণ্ডুর চিতাতেই অনুমৃতা হয়েছিলেন, কিন্তু এই ঘটনা সহমরণের উদাহরণ নয়। পাণ্ডুর প্রতি অভিশাপের শর্ত অবমাননার জন্য প্ৰায়শ্চিত্তের চেষ্টামাত্র ছিল। মহাভারতের অর্বাচীন সংযোজিত অংশ — মৌষল পর্বে — কৃষ্ণের চারজন স্ত্রী — রুক্মিণী, রোহিণী, ভদ্রা এবং মদিরা — তাঁর সঙ্গে একই চিতায় সহমৃতা হয়েছিলেন। এমনকী বসুদেবের আটজন স্ত্রীও তাঁর মৃত্যুর পরে সহমরণে গিয়েছিলেন। খুব সম্ভবতঃ বৃষ্ণি ও সাত্বতদের মধ্যে এই প্রথা প্রচলিত ছিল। তখন কোনও কোনও নারী তাঁদের স্বামীর মৃত্যুর পরে অথবা শীঘ্রই অগ্নিপ্রবেশ করতেন, কারণ স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ তাঁদের কাছে অসহনীয় ছিল; যদিও কখনওই কোনও স্বামী কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ বা স্ত্রীর মৃত্যুর দুঃখে নিজে স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বরণ করে নেননি। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে স্ত্রীর মৃত্যুতে স্বামীর আত্মোৎসর্গের কথা কোথাও পাওয়া যায় না।
যাজ্ঞবল্ক্য স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রীর সহমরণের বিধান না দিলেও তাঁর ভাষ্যকারেরা নিজেদের মতের সমর্থনে যাজ্ঞবল্ক্যের বক্তব্যকে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর একটি বিধিকে উদ্ধৃত করে মিতাক্ষরাটীকা বলেছিল — কোনও অন্তঃস্বত্ত্বা বা সদ্যোজাত শিশুর জননী ভিন্ন অব্রাহ্মণ, চণ্ডাল সব নারীর জন্যই সহমরণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু যাজ্ঞবল্ক্য তাঁর নিজের শাস্ত্রে বলেছিলেন — বিধবা তাঁর পিতামাতা অথবা স্বামীর পিতামাতার পরিবারে অন্তর্ভুক্ত থাকবে সুতরাং সে জীবিতই থাকবে। কিন্তু যাজ্ঞবল্ক্য–এর মানবিকতাবোধ তাঁর টীকাকারেরা কল্পনা করেননি। বরং পরিবর্তনশীল সামাজিক বিধির স্রোত অনুযায়ী তাঁর শাস্ত্রীয় বিধানকে তাঁরা পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। এমনকী স্বভাবতঃ সংরক্ষণশীল মনুও কিন্তু বিধবার জন্য — ‘সংযত নিয়ন্ত্রিত জীবনের বিধান’ — দিয়েছিলেন, স্বামীর সঙ্গে সহমরণের বিধান তিনি দেননি। তিনি বলেছিলেন — ‘বিধবার ভক্ষ্য হবে শুধু ফলমূল এবং ফুল, সে শীর্ণ হবে, কোনও অসম্পর্কিত পুরুষকে, এমনকী নাম ধরেও সম্বোধন করবে না’ (৫:১৫৭)। এখানে ‘শীর্ণ’ হওয়ার যে বিধান — সেটার অন্তর্নিহিত অর্থ হল আয়ুক্ষয়; কিন্তু সদ্য বৈধব্যের পরেই মৃত্যুর সঙ্গে এটির পার্থক্য রয়েছে। ভাষ্যকার মেধাতিথি এই শ্লোকের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছিলেন — “পুরুষের পক্ষে যেমন, স্ত্রীলোকের পক্ষেও তেমন, আত্মহত্যা সমর্থন যোগ্য নয়।” যদিও অঙ্গিরস বলেছিলেন — স্বামীর চিতায় মৃত্যুই নারীর পক্ষে বাধ্যতামূলক, কিন্তু এক্ষেত্রে মৌলিক বিধিকেই (নিত্যবিধি — এক্ষেত্রে আত্মহনন উচিত নয়) অনুসরণ করতে হবে; যদি কোনও বিধবা ফললাভের তীব্র (অন্যায্য, উদগ্র) আশায় প্রলুব্ধ হয়ে আত্মহত্যা করে তবে শাস্ত্রানুসারে কাজ করা হবে না। বৌধায়ন ধর্মসূত্রে বলা হয়েছে — ‘বিধবা এক বছরের জন্য মধু, মাংস, মদ্য এবং লবণযুক্ত আহার্য ত্যাগ করবেন’ (২:২:৬৬-৬৪)। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, উক্ত গ্রন্থে কিন্তু অবিধবাদের জন্য মাংস ভোজন ও মদ্যপানের পরোক্ষ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
অতীতে সব শাস্ত্রকারই আত্মহত্যাকে সাধারণতঃ হীন অপরাধ বলেছিলেন। কিন্তু মিতাক্ষরা এবং অপরার্ক ভাষ্যে বলা হয়েছিল — সতীর ক্ষেত্রে, অর্থাৎ সহমরণের ক্ষেত্রে আত্মহত্যা কোনও ধরণের অপরাধ নয়। অপরার্ক তাঁর গ্রন্থে আপস্তম্বকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন — যে নারী মায়াবশে ভ্ৰান্ত হয়ে চিতা থেকে নেমে আসে সে প্রাজাপত্য প্ৰায়শ্চিত্তের মাধ্যমে নিজেকে শুদ্ধ করতে পারে। এখানে লক্ষ্য করা উচিত যে, সমস্ত পৃথিবীতেই আত্মহত্যাকে নিজের প্রতি একটি হিংসাত্মক অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। কিন্তু সব যুগেই এই সত্যিটি শুধু পুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, নারীর ক্ষেত্রে সতীর মত আত্মহত্যার ঘটনা কোনও পাপ বা অপরাধ তো নয়ই, — বরং পুণ্যকর্ম।
আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি বিশ্বজনীন এবং সমর্থনযোগ্য (বহু প্রচারিত উক্তি — “আত্মানং সততং রক্ষেৎ” — নিজেকে সর্বদা রক্ষা করবে)। কিন্তু যখন কোনও নারী চিতা থেকে নেমে এসে নিজেকে রক্ষা করতে যায়, তখন সেই কাজ পাপ হয়ে দাঁড়ায়! এক্ষেত্রে অঙ্গিরসকে উদ্ধৃত করে বলা যেতে পারে — ‘সতী নারীর চিতায় আত্মোৎসর্গের কোনও বিকল্প নেই।’
সতীর প্রতিশব্দ হল সাধ্বী এবং সতী শব্দের মত এরও কোনও পুংলিঙ্গ শব্দ নেই। সৎ — অর্থ ভাল। যদি কোনও নারী সারাজীবন পবিত্র এবং ভাল থেকে থাকে, তবুও মৃত স্বামীর জন্য আত্মহনে অস্বীকৃত হলেই সে হয়ে যায় মন্দ-অসতী, অসাধ্বী।
রঘুনন্দন স্মৃতিশাস্ত্রের নব্য মধ্যযুগীয় পণ্ডিত ছিলেন। তিনি অঙ্গিরসকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন — ‘সেই নারী যে চিতারোহণ করে’, এর অর্থ থেকে বোঝা যায় যে, তখন অন্যান্য যেসব নারী সতী হতে চাইতেন না, তাঁদের জন্য বিকল্প পথ খোলা ছিল। রঘুনন্দন অনুমোদন করেছিলেন যে, বিধবার পক্ষে শ্রেষ্ঠ পন্থা হল মৃত স্বামীর চিতায় আরোহণ করা, কিন্তু তিনিও যাঁরা স্বামীর মৃত্যুর পরে বেঁচে থাকতে চাইতেন — তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছিলেন। তাঁর মতে, যে সতী হয় সে-ই হল শ্রেষ্ঠ, কিন্তু অন্যরাও থাকতে পারেন; যাঁরা শ্রেষ্ঠ না হলেও বাঁচতে চান, সে জন্য তাঁদের পাপী বলে মনে করা উচিত নয়। বিষ্ণু ধর্মশাস্ত্রতেও এই দুটি বিকল্পকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে —- স্বামীর মৃত্যুর পরে (নারী) হয় সংযত তপস্বিনীর জীবনযাপন করবে অথবা স্বামীর চিতায় আরোহণ করবে। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, প্রথম বিকল্পটি বেঁচে থাকাকেই সমর্থন করে।
কি সেই সংযম? যৌন জীবন থেকে বিরতি, তাম্বুল প্রভৃতি পরিত্যাগ ইত্যাদি। ‘ইত্যাদি’ শব্দটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে টীকাকার — সীসা প্রভৃতি ধাতুর পাত্রে আহার এবং প্রসাধন দ্রব্যাদি বর্জনের কথা বলেছিলেন। এই প্রসাধন দ্রব্যাদি কি? রঘুনন্দন বলেছিলেন, ‘এই অভ্যঞ্জন একটি চিকিৎসা শাস্ত্রের ব্যবহারিক প্রয়োগ, এর অর্থ হল সেই পরিমাণ কেশ-তৈল যা মাথা থেকে দুই কাঁধ এবং বাহু পর্যন্ত লিপ্ত হতে পারে আর অল্প পরিমাণকে বলা হয় মাষ্টি।’ অনেক অর্বাচীন শাস্ত্রগ্রন্থে বিধবার জন্য দিনে একবার আহার করবার বিধান দিয়েছে, এবং তাঁকে পালঙ্কে শয়ন করবার অনুমতিও দেওয়া হয়নি — অন্যথায় তাঁর স্বামী পরলোকে দুৰ্গতি ভোগ করবেন। স্কন্দপুরাণ বলেছে — বিধবা যদি কবরী রচনা করে তাহলে স্বামীর পক্ষে সেটা পাপ হয়ে দাঁড়ায়। এরকম উদাহরণ আরও দেওয়া যায়; কিন্তু শাস্ত্রীয় এই সব বিধিনিষেধের অন্তর্নিহিত চিন্তা খুবই স্পষ্ট। বিধবাদের ন্যূনতম মানবিক সুখ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করাই এই সব হীনবুদ্ধি শাস্ত্রীয় গ্রন্থগুলির উদ্দেশ্য ছিল। এই প্রসঙ্গে স্মরণীয় যে, কোন বিগতদার ব্যক্তির জন্য শোকপালনের শাস্ত্রীয় সীমা মাত্র একদিন, এরপরে তিনি শুধু পুনর্বিবাহ করতেই পারে না, তাঁর জন্য পুনর্বিবাহ করবার বিধানই শাস্ত্রে দেওয়া হয়েছে।
হারীত সাধ্বী নারীর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন — ‘স্বামী যখন দুঃখ পায় তখন সে দুঃখ পায়; স্বামীর সুখ ভোগে সে সুখ পায়, স্বামী গৃহ ছেড়ে গেলে তাঁকে দেখে মনে হয় ভেঙে পড়েছে এবং সে ব্যাকুল হয় এবং স্বামীর মৃত্যুতে প্রাণ ত্যাগ করে।’ এই প্রকার নারীই পতিব্ৰতা। হারীতের গ্রন্থটিকে অর্বাচীন বৈদিক সাহিত্য বলা হয়। মহাভারতে বলা হয়েছে যে, যথাযথ সময়ে (অর্থাৎ স্বামীর মৃত্যুর পরে) যদি নারীরা তাঁদের (মৃত্যুতেও) অনুসরণ করেন, এমনকি অনুরাগ, ক্রোধ ভয় অথবা ভ্রান্তির বশে, তবুও সেই সব নারীরা পবিত্র হয়ে ওঠেন (মতান্তরে এইসব প্রবৃত্তি থেকেই নারীরা সহমরণের মাধ্যমে পবিত্র হয়ে ওঠেন)। ব্ৰহ্মপুরাণ বলেছে — যদি স্বামীর প্রবাসে মৃত্যু হয়ে থাকে, তবে স্ত্রীর কর্তব্য হল স্বামীর পাদুকা বুকে ধরে অগ্নিপ্রবেশ করা। ইতিহাস থেকে লক্ষ্য করা যায় যে, পরবর্তীযুগের সমস্ত শাস্ত্রগুলি ক্ৰমান্বয়ে এমন এক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে গিয়েছিল, যেখানে বিধবা নারীর বেঁচে থাকবার অধিকারও শেষপর্যন্ত হারিয়ে গিয়েছিল।
ঋগ্বেদের একটি অর্বাচীন অংশের উদ্ধৃতি দিয়ে রঘুনন্দন জানিয়েছিলেন, নারীর আত্মহত্যা করা উচিত নয়। বিভিন্ন মত আলোচনা করে তিনি বলেছিলেন — ব্রাহ্মণ-বিধবা শুধুমাত্র স্বামীর চিতায়, পৃথক কোনও চিতায় নয়, মৃত্যুকে বেছে নিতে পারেন। এইভাবে তিনি ব্ৰাহ্মণ বিধবার জীবনের সম্ভাবনাকে আংশিকভাবে হলেও সম্ভাব্য করেছিলেন। ব্যাস ধর্মশাস্ত্র বলেছে — ‘যদি স্বামী এমন দূরত্বে মারা যায় যে, পথ এক দিনের, তবে যতক্ষণ না স্ত্রী সহমরণের জন্য উপস্থিত হচ্ছে ততক্ষণ দাহ করা উচিত নয় এবং যে অগ্নিকর্তা সে উভয়েরই পারলৌকিক ক্রিয়া করবে।’ ভারতের মত উষ্ণ দেশে মৃতদেহের একদিন অপেক্ষা করবার ফলাফল সহজেই অনুমান করা যায়, কিন্তু তা সত্ত্বেও এই বিধিনিষেধ কেন? এর ফলে বিধবার জীবিত থাকবার আশা ক্ষীণতর হয়। বিভিন্ন শাস্ত্রগ্রন্থের মূল প্রতিপাদ্য সংক্ষেপে একথাই বলে যে — হয় তাঁকে স্বামীর সঙ্গেই দাহ করা উচিত অথবা তাঁর জীবৎকালকে জীবিতমৃত্যু করে তোলা উচিত।
ব্ৰহ্মপুরাণ বলেছে — যে নারী স্বামীর বংশরক্ষার জন্য স্বামীর চিতায় আরোহণ করতে উদ্যত, তাঁর জন্য উপস্থিত সকলে তাঁকে চিতারোহণে সাহায্য করবেন; এই আবৃত্তি করে এই সব পবিত্র সুসজ্জিত নারীরা পতিব্রতা; তাঁরা স্বামীর দেহের সঙ্গে সঙ্গে চিতায় প্রবেশ করুন; এই কথা শুনে পতিব্ৰতা বিশ্বস্তা স্ত্রী পিতৃমেধ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে স্বৰ্গলাভ করবেন। রঘুনন্দন তাঁর ভাষ্যে বলেছিলেন, চিতায় আরোহন করা হল পিতৃমেধ অনুষ্ঠান। একথা বলবার কোন প্রয়োজন নেই যে, স্বর্গের এই পথ শুধু বিধবার জন্য খোলা রয়েছে, বিপত্নীকের জন্য নয়।
বিষ্ণু ধর্মশাস্ত্রে প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে, এভাবে আত্মহননের কাজ নারীর পক্ষে পাপজনক কিনা? পরিশেষে তর্ক বিতর্কের পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, যেহেতু নারী তাঁর স্বামীর চিতারোহণ করছে সেহেতু এই মৃত্যু আত্মহত্যা নয়। স্বামী এমনই এক পূত পবিত্র বস্তু যার ফলে তাঁর চিতায় আত্মহত্যাও আর আত্মহত্যা থাকে না, সেটা পুণ্যকর্ম হয়ে দাঁড়ায়! সংক্ষেপে, বিধবার মৃত্যুই ভাল, সুতরাং বিভিন্ন কথায় সহমরণকে পুণ্যকর্ম বলে ঘোষণা করে অতীতে তাঁকে উৎসাহ দেওয়া হত। এরপরে রঘুনন্দন অনুত্তেজিত ও সুচিন্তিতভাবে সতীর অন্ত্যেষ্টি ও শ্ৰাদ্ধক্রিয়া সম্পর্কে নিজের মতামত দিয়েছিলেন।
বাসস্মৃতি বলছে — চিতায় বিধবা নারী তাঁর স্বামীর মৃতদেহ আলিঙ্গন করবেন; অথবা তাঁকে নিজের মস্তকামুণ্ডন করতে হবে (২:৫৫)। অন্যান্য শাস্ত্ৰেও এই ধরণের নির্দেশ পাওয়া যায়। যে যুক্তিতে বিধবা নারীকে প্রসাধন, সুগন্ধি, ফুল, ইত্যাদি ব্যবহার করা থেকে বিরত করা হয়েছে, সেই একই যুক্তিতে বিধবা নারীর মস্তক মুণ্ডনকে উচিত বলে মনে করা হয়েছে, অর্থাৎ যাতে তাঁর চেহারায় নারী সুলভ কোন আকর্ষণ না থাকে, এবং তিনি অন্য কোনও পুরুষকে প্রলুব্ধ করতে না পারেন। কিন্তু এতকিছু সাবধানতামূলক বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও নারীর প্রতি পুরুষের প্রলোভন কখনো বাধা পায়নি এবং যুগে যুগে পুরুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য বিধবারাই সহজলভ্য শিকার হয়ে উঠেছিলেন। তাই এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে, স্কন্দপুরাণ বলেছে — সমস্ত রকম অশুভ দ্রব্যের মধ্যে বিধবা হল অশুভতম (৩:৭:৫০-৫১)। ষষ্ঠ শতকে বরাহমিহির, তাঁর বৃহৎসংহিতায় বলেছিলেন, অহো নারীর প্রেম কি সুদৃঢ়, তাঁরা স্বামীর দেহ ক্ৰোড়ে নিয়ে অগ্নিতে প্ৰবেশ করে (৭৪:২৩)।
নারদ স্মৃতিতে সাত ধরণের নারীর কথা বলা হয়েছে —
(১) যাঁর পূর্বে একজনের সঙ্গে বিবাহ হয়েছে;
(২) কুমারী;
(৩) যে বিধবাকে তাঁর শ্বশুরকুল তাঁর স্বামীর বংশে অন্য কাউকে সমর্পণ করেছে;
(৪) নিঃসন্তানা বিধবা;
(৫) যে বিধবা তাঁর দেবরকে বিবাহ করতে অস্বীকার করে এবং নিজের পছন্দ মতো কাউকে বিবাহ করে;
(৬) যে বিধবা যাঁকে কিনে আনা হয়েছিল অথবা যে বিদেশি এবং নিজে ইচ্ছা মতো যে অন্য কাউকে বিবাহ করে; এবং
(৭) যে বিধবাকে তাঁর গুরুজনেরা কোনও অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির হাতে দান করেন।
উপরোক্ত নারীদের মধ্যে শেষের চার শ্রেণীকে বলা হয় বহির্মুখী বা স্বেচ্ছাচারিণী অর্থাৎ বারাঙ্গনা; যদিও শেষোক্ত জন তাঁর গুরুজনদেরই আজ্ঞা পালন করেন। শাস্ত্রগ্রন্থ এই সাতজনকে পুনর্ভু অথবা অন্যপূর্ব বলেছে, অর্থাৎ যে নারীর পূর্বে অন্য পুরুষ ছিল। যাজ্ঞবল্ক্য ধর্মশাস্ত্ৰ বলেছে — পুনর্ভু দুই প্রকার — কুমারী এবং অ-কুমারী। মনু (৯:১৭৬), বিষ্ণু ধর্মসূত্র (১৫:৮, ৯), বশিষ্ঠ ধর্মসূত্র (১৭:১৮) – পুনর্ভুর কথা বলেছে। গ্রন্থগুলিতে সতীদাহের বিকল্পের অবকাশ রয়েছে।
বিধবার জীবিত থাকবার সামাজিক অধিকার বিষয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল ঋগ্বেদের অর্বাচীন অংশের একটিমাত্ৰ মন্ত্রের বিষয়ে বিভিন্ন ভাষ্য থেকে। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, ঋগ্বেদের সেই অংশটি দেশজ অধিবাসীদের সঙ্গে বহিরাগত জনগণের সংমিশ্রণ এবং উভয়ের সাংস্কৃতিক একীভবনের পরবর্তীকালে রচিত হয়েছিল। সেই মন্ত্রে কোনও সদ্যবিধবাকে সম্বোধন করা হয়েছিল, যিনি চিতায় তাঁর স্বামীর মৃতদেহের পাশে আত্মহনন করবার সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে শুয়ে ছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্যে বলা হয়েছিল — “ওঠ, হে নারী, যে শুয়ে আছে মৃতকে আলিঙ্গন করে, তুমি জীবিতের রাজ্যে এসো, যে পুরুষ তোমার হাত ধরে আছে তাঁর স্ত্রীর অধিকার স্বীকার কর” (১০:১৮:৮)। কে তাঁর হাত ধরে জীবিতের রাজ্যে নিয়ে যেতে চায়? আশ্বিলায়ন গৃহ্যসূত্র বলেছে — সেই পুরুষ হলেন তাঁর দেবর, মৃত স্বামীর শিষ্য অথবা পুরাতন ভৃত্য (৪:২:১৮)। এখানে বহু বিষয়ে প্রশ্ন তোলা যায় — তাহলে কি ওই বিধবা সতীর ভূমিকাটি অভিনয় করছিলেন? অতঃপর দেবর অথবা অন্য কেউ তাঁকে চিতা থেকে হাত ধরে তুলে এনেছিলেন (সম্ভবতঃ দেবর শব্দটির উৎপত্তি দ্বি — দুই বর — এভাবে)। এমনকি এখনও উড়িষ্যা এবং অন্যান্য রাজ্যের কোনও কোনও জায়গায় কনিষ্ঠ দেবরের সঙ্গে বিধবা ভ্ৰাতৃবধুর পুনর্বিবাহ প্রথা চালু রয়েছে। তৃতীয়তঃ, সহমরণে বাধা দেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে বংশ রক্ষার কাজ অব্যাহত রাখা — প্রজনন। ভাবী জননীর অকাল মৃত্যুকে প্রতিহত করা হয়েছে, কারণ নারীর প্রসবিনী শক্তি এবং সন্তানলাভ করাও সেকালের সমাজের প্রয়োজন ছিল। কোষগ্রন্থ শব্দকল্পদ্রুমতে বলা হয়েছে — দিদিষু শব্দের অর্থ পুনর্ভু; সেজন্যই তাঁকে পুনর্বিবাহের প্রেরণা দেওয়া হয়েছে। মনে হয় স্বামীর চিতায় বিধবার আত্মহুতি দেওয়ার প্রথা কোনও প্রাগার্য প্রথা, সম্ভবতঃ সিন্ধু সভ্যতায় এই প্রথার প্রচলন ছিল, ইন্দো ইওরোপীয় সভ্যতায় এর কোনও সমর্থন পাওয়া যায় না। সুতরাং এই প্রথা অনুসরণে উদ্যত কোনও নারীকে (আর্য পুরুষদের অনার্য স্ত্রীরা নিজেদের প্রথা পালনে উদ্যোগী হতেই পারেন) অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী আৰ্য প্রথা মানতে বাধ্য করা হতেই পারে; সেই ঘটনাই আলোচ্য ঋগ্বেদের মন্ত্রে বর্ণনা করা হয়েছিল। বিধবা নারীর পুনর্বিবাহের কিছু কিছু ঘটনা প্রাচীন গ্রিক, ল্যাটিন ও জার্মান সাহিত্যে দেখা যায়।
ঋগ্বেদ পরবর্তী ভারতীয় সাহিত্যে ক্ৰমান্বয়ে বিধবাকে অশুচি ও অশুভরূপে দেখানো হয়েছে, তাঁর বেঁচে থাকবার অধিকার বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। তারপর বিভিন্ন উদ্দেশ্যমূলক পরিস্থিতির চাপে ওই ঋগ্বেদীয় মন্ত্রটির অর্থকে, সমাজপতিদের অনুকুলে পরিবর্তিত করে নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী শাস্ত্ৰ স্বাগবিধান বলেছে, কেবলমাত্র নিঃসন্তান বিধবাকেই জীবিতের রাজ্যে ফিরিয়ে আনা চলে (৩:৮:৪)। অর্থাৎ মৃতের পারলৌকিক কাজ করবার জন্য একজন যথাযথ অধিকারী চাই। কোনও কোনও শাস্ত্ৰে দেখা যায় যে, দেবরের সঙ্গে বিধবার বিবাহ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু ঋগ্বেদের আরেকটি মন্ত্রের অর্থ বিষয়ে কোনও সংশয় থাকে না। সেখানে অশ্বিনদ্বয়কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে — অন্য কে তোমাদের (সূক্ত দ্বারা) স্তুতি করেছে, যেমন করে কোনও বিধবা শয্যায় তাঁর দেবরকে সস্তুষ্ট করে (১০:৪০:২)। অতএব, ঋগ্বেদের যুগে বিধবারা বেঁচে থাকতেন এবং দেবরকে বিবাহও করতেন। এই প্রথা সে যুগে অবশ্যই বহুপ্রচলিত ছিল, অন্যথায় এটিকে উপমা হিসাবে ব্যবহার করা হত না। অথর্ববেদে এমন এক নারীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি একাধিক বিবাহ করেছিলেন (৯:৫:২৭)। এমনকি একজন নারীর দশজন স্বামী গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে (৫:১৭:১৯)। এখানে অন্ততঃ দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বিধবার পুনর্বিবাহ যে প্রচলিত ছিল, সেটার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অথর্ববেদে অবশ্য দু’বার সহমরণেরও উল্লেখ রয়েছে। এই ভাবে এই প্রথার উদ্ভব ও প্রয়োগ যে প্ৰাগাৰ্যদের মধ্যে ছিল না — সেকথা বোঝা যায়। হয়ত এটি সিন্ধু সভ্যতার প্রথার একটি স্মৃতিচিহ্ন। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ–এ প্রার্থনা করা হয়েছে, আমি যেন ইন্দ্রাণীর মতো অবিধবা হই (৩:৭:৫:৫১)। এখানেও স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবার বেঁচে থাকবার পরোক্ষ ইঙ্গিত পাওয়া যায়, কারণ বৈধব্যের দুঃখ যন্ত্রণার ভোগ সতীর কাছে অজানা।
রামায়ণ ও মহাভারতের মূল অংশে কোনও সতীদাহের ঘটনা নেই; মাদ্রী অনুতাপে আত্মহনন করেছিলেন। কারণ তিনি পাণ্ডুর কামনার বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন। আর্য বসতিগুলির চারপাশের সমাজে এই প্রাগার্য প্রথার প্রচলন ছিল, সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই আর্যদের উপরেও এই প্রথার সক্রিয় প্রভাব পড়েছিল। কিন্তু রামায়ণে দশরথের তিন স্ত্রী; তারা ও মন্দোদরী; ইন্দ্ৰজিৎ অথবা কুম্ভকর্ণের স্ত্রীরা কেউই স্বামীর সঙ্গে চিতায় আরোহণ করেননি। মহাভারতেও — সত্যবতী, কুন্তী, অম্বিকা, অম্বালিকা এবং দুঃশলা — তাঁদের স্বামীর মৃত্যুর পরেও বেঁচেছিলেন।
খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতক পর্যন্ত সময়ে উত্তর ভারতে বিদেশি অভিযানের মিছিল চলেছিল। এর ফলে সেখানকার সামাজিক পরিমণ্ডলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল। ভগবদগীতা প্রথম থেকে দ্বিতীয় শতকে রচিত হয়েছিল। উক্ত গ্রন্থে কৃষ্ণ অৰ্জ্জুনকে যুদ্ধের কুফল সম্পর্কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন — এতে বংশক্রম বিনষ্ট হয় এবং এর ফলে পরম্পরাগত ধর্মক্ষয় পায়। এইরূপ ঘটনা ঘটলে সমস্ত পরিবার অপবিত্র হয়, অভিজাত কুলনারীরাও দুষ্ট ব্যবহার করেন এবং বর্ণসংকর ঘটে থাকে (১:৩৯:৪০)। এইসব দুষ্টা কুলনারীদের মধ্যে যুদ্ধ-বিধবাদের দেখা যেতে পারে কারণ অৰ্জ্জুন এখানে যুদ্ধ ও তার ফলাফল বিষয়েই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। অন্যভাবে বলতে গেলে, যদি স্বামীর মৃত্যুর পরেও বিধবা জীবিত থাকেন, তিনি অন্য স্বামীকে বরণ করতে পারেন এবং তারই ফলে সর্বাধিক ভয়াবহ বিপদ — বৰ্ণসংকর — ঘটে যাবে। তখন পরিবার এবং তার ধ্বংসকারী — উভয়েরই গতি হবে নরকে, পিতৃপুরুষের সংকর সঠিকভাবে হবে না এবং তাঁরা নরকে পতিত হবেন (১:৪২)। একথা সহজবোধ্য এবং এজন্যই সতীপ্রথা উজ্জীবিত হয়, অংশতঃ এভাবে ব্যাপক সামাজিক অবক্ষয় রোধ করবার জন্য।
গুপ্তযুগে মনুর নির্ধারিত নীতিই প্রচলিত ছিল (তুলনীয় রঘুনন্দন ১:১৭)। যদিও মনু বিধবার জন্য স্বামীর চিতায় মৃত্যুর কোন বিধান দেননি, তবুও তিনি বিধবাদের কঠোর সংযমবিধি পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই যুগে পুরাণগুলি রচিত হতে শুরু করেছিল এবং সেগুলির মাধ্যমে নারী ও শূদ্রের প্রতি অবদমনের একটি ক্রমবর্ধমান চিত্র পাওয়া যায়। সম্প্রদায়গত পুরোহিতরা কয়েক শতক ধরে পুরাণ রচনা করে আসছিলেন; তাঁদের ধর্ম ও দর্শনগত মতবাদ ভিন্ন ছিল, কিন্তু নারী ও শূদ্রের প্রতি নিপীড়ন করতে তাঁরা প্রকৃতপক্ষে একমত ছিলেন।
বেদ-পরবর্তী যুগ থেকে পৌরাণিক যুগ পর্যন্ত কুড়িজন শাস্ত্রকার তাঁদের গ্রন্থ রচনা করেছিলেন: বহু বিষয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদও দেখা যায়। কেউ কেউ বিধান দিয়েছেন স্বামীর সঙ্গে বা তারপরে সতীদাহ করতে, কেউ বলেছেন শুধু ব্রাহ্মণ বিধবারাই এভাবে মারা যেতে পারেন; অন্যরা শুধু কঠোর নিয়ম পালন করবেন। কেউ কেউ বলেছেন, যে সব বিধবা এই ভাবে মৃত্যুবরণ করেন তাঁরা পিতৃকুল ও পতিকুল উভয়েরই পূর্বপুরুষদের মুক্তি দেন। অন্যরা বলেছেন, সাপুড়ে যেমন গর্ত থেকে সাপকে টেনে বার করে তেমন করেই একজন সহমৃতা সতী তাঁর স্বামীকে নরক থেকে উদ্ধার করেন। এভাবে বিষয়টি অনুমান করা হয় যে, যে স্বামী কোনও গুরুতর অপরাধ করে নরক ভোগ করছে, তাঁকে উদ্ধার করার একমাত্র উপায় হল স্ত্রীর আত্মহত্যা! যে স্বামী তাঁর নিজের পাপের জন্য নরকবাসের যোগ্য, সে উদ্ধার পেতে পারে একটি নিরপরাধিনী মেয়ের মৃত্যুতে — এই বিধানের অন্তর্নিহিত অবিচারে কোনও সংশয় নেই; ঠিক যেমন যে নারী পাপ করছে তাঁকে বাঁচাবার জন্যও কোনও দুশ্চিন্তা দেখা যায় না। সারা জীবন নীরবে স্বামীর সেবা করে যাওয়া আর তাঁর মৃত্যুতে আত্মহত্যা করা, — নারীর জন্য এই বিধান দেওয়া হয়েছে। কোনও কোনও শাস্ত্র আর একটু অগ্রসর হয়েছে; সে স্বৰ্গে তাঁর স্বামীর সঙ্গে বাস করবে ত্ৰিশ কোটি বছর কিংবা তাঁর শরীরে যত লোম আছে তত বছর, যখন স্ত্রীর মৃত্যু হয় স্বামীর আগে, তখন কিন্তু স্বামীর জন্য এমন কোনও নিষ্ঠুর বিধান নেই যাতে সে চিরদিন তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে বাস করবে। প্রচলিত প্ৰবাদ হল — ‘ভাগ্যবানের বউ মরে, অভাগার গরু’। শাস্ত্ৰ বিধান দেয় স্ত্রীর মৃত্যুতে স্বামীর শোক পালন এবং অশৌচ মাত্র একদিনের। তারপরে তাঁর পুনরায় বিবাহ করাই উচিত।
(ছবি — An Indian woman being led towards her husband’s funeral pyre to be burned alive (1811), London.)#




