মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখেছিলেন—
“আমার জীবনকে আমি প্রদীপ করে জেলেছিলুম, তোমার,
আরতি করবো বলে।”
(নেবা দীপ, আমের বোল)
এবং এরপরে এই পংক্তিটির অণুরণন তাঁর মধ্যে সারা জীবন ধরে চলেছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। সারস্বত সাধনার মধ্যে তিনি তাঁর নিজের জীবনকে প্রদীপ করে তুলেছিলেন, এবং সেই প্রদীপের আলোতে তিনি তাঁর জীবনদেবতার বা পরমপ্রিয়ের আরতি করছিলেন। অতীতে অলডাস হাক্সলি বলেছিলেন যে, এই পৃথিবীতে কোন মানুষ তাঁর নিজস্ব দর্শন নিয়ে (Philosophy of life) বেঁচে থাকেন। (End and Means, Aldous Huxley, P- 252) শুধু শিল্পী, কবি বা দার্শনিক নন, সাধারণ মানুষকেও ঐ একই পদ্ধতিতে বেঁচে থাকতে হয়। তবে এই জীবনদর্শন কারো ক্ষেত্রে ব্যক্ত, তো কারো ক্ষেত্রে আবার অব্যক্ত। একজন শিল্পীর ক্ষেত্রে শিল্প-কলায়, একজন সাহিত্যিকের ক্ষেত্রে সাহিত্যকৃতিতে, এবং কোন সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে তাঁর নিজের কাজে এই অব্যক্ত জীবন-দর্শন ছাড়িয়ে থাকে বলে দেখতে পাওয়া যায়। বাংলার কল্লোলযুগের ত্রয়ী — অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও বুদ্ধদেব বসুও — অনুরূপভাবেই তাঁদের নিজের নিজের জীবন-দর্শনের চিহ্ন তাঁদের সাহিত্যকৃতির মধ্যে রেখে গিয়েছেন। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত যেমন রোম্যান্টিকতার ধারা বেয়ে ঈশ্বর-সাধনায় (পরমপুরুষ রামকৃষ্ণ ইত্যাদি) মগ্ন হয়েছিলেন, বৃদ্ধদেব বসু তেমনি অমৃতাভিলাষী হয়ে (বন্দীর বন্দনা) ভালবাসতে চেয়েছিলেন। তাঁদের এই রোম্যান্টিক রিয়েলিজম–এর পাশে প্রেমেন্দ্র মিত্রের সংশয়াচ্ছন্ন প্রশ্নমনস্ক-মন সীমা ও অসীমের টানাপোড়েনে নির্দিষ্ট কোন সীমারেখা টানতে পারেনি। একদিন চিকিৎসা কর্মকে যিনি তাঁর নিজের জীবনের পেশা হিসেবে বেছে নেবেন বলে ভেবেছিলেন, তাঁকেই আবার বিশ্বকোষের খাতায় অহরহ বিহার করতে দেখা গিয়েছিল; কখনো তিনি চড়ুই পাখির কলহ শুনেছিলেন, তো কখনও আবার সারা দুনিয়ার খোয়া ভেঙেছিলেন আর খাল কেটেছিলেন, পথ তৈরি করেছিলেন। তাঁর স্বপ্ন, বাসরে বিরহিণী বাতি মিথ্যেই সারারাত ধরে অপেক্ষা করেছিল, কারণ— তাঁর কাছে সময় ছিল না, তিনি সুদূরের আহ্বান শুনতে পেয়েছিলেন। সেই সঙ্গে নিজের জীবনের জন্য কবি তাঁর জীবন-দেবতাকে প্রণাম জানাতেও কুণ্ঠা বোধ করেননি। এই প্রসঙ্গে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তকে লেখা তাঁর একটি চিঠি থেকে অন্ততঃ সে কথাই প্রকাশ পায়। তাতে তিনি লিখেছিলেন —
“জীবন কেন পেয়েছিলাম তা যখন জানি না, জানি না কোন পুণ্যে, তখন হারাবার সময় কৈফিয়ৎ চাইবার অধিকার আছে ভাই? খোঁড়া হয়ে জন্মাইনি, বিকৃত হয়ে জন্মাইনি— মার কোল পেলাম, বন্ধুর বুক পেলাম, নারীর হৃদয় পেলাম, তা যতটুকু কালের জন্যেই হোক না— আকাশ দেখেছি, সাগরের সংগীত শুনেছি, আমার চোখের সামনে ঋতুর মিছিল গেছে বার বার, অন্ধকারে তারা ফুটেছে, ঝড় হেঁকে গেছে, বৃষ্টি পড়েছে, চিকুর খেলেছে— কত লীলা কত রহস্য, কত বিস্ময়! তবে জীবন-দেবতাকে কেন না প্রণাম করবো ভাই। কেন না বলবো ধন্য আমি— নমো নমো হে জীবন দেবতা।” (কল্লোলযুগ, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, ১৩৭২ বঙ্গাব্দ, পৃ- ২২)
মানবজন্মের জন্য যে কবি নিজের জীবন-দেবতাকে নমস্কার জানিয়েছিলেন, তিনি তাঁর জীবনের তরীকে এক ঘাটে না বেঁধে রেখে খেয়ালখুশি মত নানা ঘাটে বেঁধেছিলেন; কিন্তু— তাঁর প্রতিটি তরণীই শস্যসভারে পূর্ণ ছিল।
সীমা থেকে অসীমে এবং অসীম থেকে সীমায় আসা-যাওয়ার মধ্যেই কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র আপন স্বাতন্ত্র্যে প্রোজ্জ্বল ছিলেন। জীবনে কোন বিশেষ কর্মে তিনি যেমন নিজেকে নিযুক্ত রাখেননি (শিক্ষকতা, কৃষিশিক্ষা, টালি খোলার ম্যানেজারি, গবেষণায় সহায়তা, আকাশবাণীর প্রোগ্রাম প্রোডিউসার হিসেবে কাজ করা, চিত্র পরিচালনা, সাহিত্য রচনা), তেমনি সাহিত্যকর্মের মধ্যে শুধু কবিতা নয়, ছোটগল্প–উপন্যাস–শিশুসাহিত্য–প্রবন্ধ–নাটক–পত্রিকা সম্পাদনায় তাঁর যাযাবরি (বোহেমীয়) মনোভাব অটুট ছিল। যেন কোথাও তিনি শান্তি ও স্বস্তি পাচ্ছিলেন না, তাই কোন একটি বিষয়ে তাঁর স্থিতি ছিল না। তাঁর মনে সবসময় সংশয় ছিল। এর কারণ জানাতে গিয়ে তিনি তাঁর একটি পত্রে লিখেছিলেন —
“কিন্তু আসল কথা কি জানিস অচিন, ভালো লাগে না— সত্যি ভালো লাগে না। বন্ধুর প্রেমে আনন্দ নেই, নারীর মুখেও আনন্দ নেই, নিখিল বিশ্বে প্রাণের সমারোহ চলেছে তাতেও পাই না কোন আনন্দ।” (কল্লোলযুগ, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, ১৩৭২ বঙ্গাব্দ, পৃ- ১৯)
আর সেজন্যই তিনি আনন্দ রূপ ও অমৃতের অন্বেষণে নিজের সারাজীবন ধরে ব্যাপ্ত ছিলেন। সেজন্যেই প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর মনে জিজ্ঞাসা ছিল। এই কারণেই কবি একদা বলেছিলেন —
“কি সে চায়, এ ছবিতে?
একটি সবুজ ছিটে—
জীবনের দৃপ্ত বিদ্রোহের?
এক ফোঁটা সাদা রং
হাঁস নয়,
সব কিছু দিগন্ত ছড়ানো
দুঃসাহসী অক্লান্ত জিজ্ঞাসা?”
(ছবি, কখনো মেঘ)
এখানে জিজ্ঞাসাকেও কবি জিজ্ঞাসা চিহ্নে চিহ্নিত করেছিলেন।
তাই প্রশ্নের সোপান বেয়েই তিনি অভিযাত্রা করেছিলেন। নিজের একটি কবিতায় তিনি তাঁর নিজের বিরুদ্ধে নিজেই চক্রান্ত করে গতিময়তার প্রতি আস্থাজ্ঞাপন করেছিলেন। তিনি তাঁর ‘মৌসুমী’ উপন্যাসে বলেছিলেন যে, গতিই হল জীবন; এই কবিতার সেই গতি হল— আত্মশাসন এবং আত্মবিদ্রোহের দ্বন্দ্ববাদের শক্তিতে পূর্ণ। কবি বলেছিলেন —
“আমিই শাসন,
আমিই বিদ্রোহ।
শিরায় শোণিতে মজ্জায় অস্থিতে।
নিজের বিরুদ্ধে চক্রান্ত বেড়াচ্ছি বয়ে
এই চক্রান্তই আমার ইতিহাসকে ছোটায়।
এই চক্রান্তই লেপে দেয় তার ছোপ।
সে ছোপ মুছতে পারলে
পৌঁছোতাম বুঝি।
এ সৃষ্টির সব ধাঁধার পেছনে!
কে চায় সে ধাঁধার উত্তর?”
(চক্রান্ত, নদীর নিকটে)
প্রেমেন্দ্র মিত্রের দ্বৈত সত্তাই তাঁর জীবন-দর্শনের মূল ছিল। তাই তিনি বলেছিলেন —
“দ্বিজ হব তপস্যায়।
এই মোর গূঢ় অঙ্গীকার।
তোমাকেও তাই খুঁজি না’ক নগ্নবাসনায়।
তার পর তোমাকেও কখন ছাড়িয়ে দ্বিজ হই তপোবলে
অন্তহীন রহস্য সত্তায়।”
(দ্বিজ, হরিণ-চিতা-চিল)
একদিন যিনি নারীর দৈহিক প্রেমের মত্ততার মগ্ন ছিলেন, পরবর্তী সময়ে সেই তিনিই নিজের তপপ্রভাবে দেহাতীত-ইন্দ্রিয়াতীত এক পরম-অন্তহীন রহস্য সত্তায় লীন হতে চেয়েছিলেন। এভাবেই নিজের দ্বৈতসত্তার দ্বন্দের মধ্যেও তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন। ব্যস্ত পৃথিবীর বস্তুতান্ত্রিক ঐশ্বর্যের পাশে তিনি অন্তর্জগতের সন্ধান চালিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন—
“একপিঠে এ সত্তার সময় বাহিত
উদয়াস্ত ইতিহাস চলে,
অন্য পিঠে খুঁজে ফিরি নিজেকেই নিজের অতলে।”
(দুপিঠে, নদীর নিকটে)
তাঁর সত্তার এই রূপকে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তকে লেখা আরেকটি চিঠিতে পাওয়া যায়, যেখানে তিনি লিখেছিলেন —
“সত্যি নিজেকে আর চিনতে পারি না। মনে হয় প্রেমেন বন্ধু ছিল তাকে আমাদের মধ্যে খুঁজে পাই না। মনে হয় গাছের যে ডালপালা একদিন দু বাহু মেলে আকাশ আলোর জন্য তপস্যা করত যার লোভ ছিল আকাশের নক্ষত্র, সে ডালপালা আজ যে কে কেটে ছারখার করে দিয়েছে। শুধু অন্ধকার। মাটির জীবন্মৃত গাছের মূলগুলো হাতড়ে হাতড়ে অন্বেষণ করছে শুধু খাবার, মাটি আর কাদা, শুধু বেঁচে থাকা—, কেঁচোর মত বেঁচে থাকা। এ প্রেমেন তোদের বন্ধু ছিল না বোধহয়।” (কল্লোলযুগ, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, ১৩৭২ বঙ্গাব্দ, পৃ- ২০)
এই অন্ধকার থেকে আলোর মন্দিরে যাওয়ার জন্যই তিনি আজীবন কেঁদেছিলেন। কারণ—
“এ-এক জোনাকি-মন
জ্বলে আর নেভে,
অন্ধকার পার হ’বে ভেবে
ইতিউতি ধায়;”
(জোনাকিমন, সাগর থেকে ফেরা)
কিন্তু জানা-অজানা জগতে উত্তরণের জন্য তাঁর মন সদা সচেষ্ট ছিল। তাঁর সেই জোনাকি-মন চেয়েছিল— “জানা না-জানার চেয়ে চায় কোনো অন্য উত্তরণ!” (জোনাকিমন, সাগর থেকে ফেরা)
তিনি কোন কিছুকেই ধ্রুবসত্য নয় বলে মনে করেছিলেন এবং সেজন্যই তাঁর মধ্যে এই দোলাচলবৃত্তি দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। একদিন কলেজ স্ট্রীটের ফুটপাথে হাঁটতে হাঁটতে ‘Ingersoll’–এর লেখা একটা ছোঁড়া বই তাঁকে ঈশ্বর সম্বন্ধে সংশয়াচ্ছন্ন করে তুলেছিল— আর সেই সংশয়ই তাঁর জীবনের লক্ষ্যকে স্থির করে দিতে পারেনি। তাই তিনি নিজের ‘যিনি বিধাতা’ উপন্যাসে জানিয়েছিলেন—
“ধরে রেখো না, কিছুই ধ্রুব বলে ধরে রেখো না। নিজেকে কোথায় খুঁজছো? তোমার দেছে? তোমার মনে? সেখানে নেই। তাহলে কি আত্মায়? সেই খোঁজেও বেরিয়ে গিয়েছিল নির্মলা। মাথা মুড়িয়ে অলংকার থেকে অহংকার সব কিছু ত্যাগ করে। নিজেকে সে আত্মার মধ্যে খোঁজার কথা ভেবেছিল না। সন্ন্যাসিনী হয়ে ঘুরেছিল তীর্থে তীর্থে। বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিন্তু যা খাঁজছিল তা পেয়েছে কি? দেহে ও মনে প্রকৃতির দম দেওয়া পুতুল হওয়ায় নিয়তি অস্বীকার করেছে। আত্মার খোঁজ থেকেও ফিরবে। পুলকেশই নির্মলাকে ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু কোথায়?” (যিনি বিধাতা, শারদীয় যুগান্তর, ১৩৭৭ বঙ্গাব্দ, পৃ- ৩০৬)
এই সীমা ও অসীমের মধ্যে যাওয়া-আসার জন্যই কবি অবিরত বয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাই তিনি লিখেছিলেন —
“এ সৃষ্টির গূঢ় অর্থ স্রোতেই ভাসানো।
কোথায় ধরবে তাকে থেমে?
তীর নেই তট নেই।
বিধাতার নেমে দাঁড়াবার।
শুধু বওয়া।
অবিরত অনিয়ত হওয়া।”
(বহুতা, অথবা কিন্নর)
জীবন-দর্শনের মধ্যে নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করাও একটি অনুষঙ্গ। কিন্তু— এই গ্লানি জর্জর যন্ত্র-সভ্যতা পুষ্ট পৃথিবীর ছবি তিনি আর দেখতে চাননি। তাই তিনি বলেছিলেন —
“দুনিয়া পাল্টে নয়া জমানা আনতে হবে, টান দিয়ে ছিড়ে ফেলতে হবে ওপরের ঘেয়ো দুর্গন্ধ বদবো চামড়া।” (সেই যে শহর রাজোলি, ১৯৭২ সাল, পৃ- ৫৬)
আর ‘ময় দানবের দ্বীপ’ উপন্যাসে তিনি বলেছিলেন —
“পৃথিবী জয় করতে চাই, আবার নতুন করে গড়বার জন্য। দেখতে পাচ্ছেন না, পৃথিবীময় আজ কী বিশৃঙ্খলা অনাচার, অবিচার সেই জন্যেই আমরা একসঙ্গে সমস্ত পৃথিবী জয় করতে চাই। পুরোনো পোড়ো বাড়ি–যেমন ধূলিসাৎ করে নতুন করে তৈরী করে, তেমনি করে একেবারে নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করতে চাই— যেমন দেশ নয়, জাতি নয়, মানুষই সবচেয়ে বড়।” (ময়দানবের দ্বীপ, ১৯৬৫ সাল, পৃ- ১০)
কবি তাঁর ‘প্রথমা’ কাব্যে লিখেছিলেন —
“আমি যুগ থেকে যুগান্তরে দেশ থেকে দেশান্তরে
মনের সড়ক তৈরী করলাম।
আমার থামা তবু হবে না।
পথই আমার প্রাণ—আমার অসীম পথের পিপাসা!” (রাস্তা)
এবং এই পিপাসা নিয়েই তিনি সাহিত্যে মহাকাশ যাত্রা করেছিলেন —
“অসীম অমর জীবাণু!
নিখিলের বিস্ময়!
দূরতম নক্ষত্রের পথ আমি খুঁজি আজ!”
(রাস্তা, প্রথমা)
কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয় হল যে, এই পথের পিপাসা নিয়ে তিনি কোন বিশেষ লক্ষ্যে পৌঁছাবার সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। তাই তিনি একবার অচিন্ত্য সেনগুপ্তকে লিখেছিলেন —
“… মনে হত পথটা জানি চলাটাই শক্ত— এখন দেখছি চলার চেয়ে পথটা জানা কম কথা নয়। এই ধর জীবনের একটা Programme দিই! বিদ্যাজ্ঞান স্বাস্থ্য শক্তি সৌন্দর্য শিল্প সাধনা গেল প্রথম। দ্বিতীর ভালবাসা পাবার। ধর পেলুম কিংবা পেলুম না। তারপর আরো সাধনা পরিপূর্ণতার জন্যে। পরের উপকার, বিশ্ব মানবের জন্যে দরদ, পৃথিবী জোড়া দুঃখ দারিদ্র্য হাহাকারের প্রতিকার চেষ্টায় যথাসাধ্য নিজেকে লাগান। তৃতীয় সারাজীবন ধরেই ভুমার জন্য তপস্যা, সারাজীবন ধরে দুঃখকে অবহেলা করবার ব্যর্থতাকে তুচ্ছ করবার মৃত্যুকে উপহাস করবার শক্তি অর্জন।” (কল্লোলযুগ, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, ১৩৭২ বঙ্গাব্দ, পৃ: ১০১-১০২)
কিন্তু এক্ষেত্রেও তাঁর মধ্যে সংশয় ছিল। তাই ঐ একই চিঠির শেষে তিনি লিখেছিলেন —
“বেশ মন্দ কি! কিন্তু যত সহজ দেখাচ্ছে ব্যাপারটা, আসলে মোটেই এমনি সহজে মীমাংসা হয় না। কিযে ভুমা আর কি যে পরিপূর্ণতা, কি যে মানুষের উপকার আর কি যে শিল্প আর জ্ঞান তার কি মীমাংসা হল? … না, মাথা গুলিয়ে যায়। আসল কথা হচ্ছে এই যে, আফ্রিকার সবচেয়ে আদিম অসভ্য Bushman–এর একটা বিংশ শতাব্দীর সম্পূর্ণ এরোপ্লেন পেয়ে যে অবস্থা হয় আমাদের এই জীবনটা নিয়ে হয়েছে তাই। আমরা জানি না এটা কি এবং কেন? কোথায় কি তা তো জানিই না, এর সার্থকতা ও উদ্দেশ্য কি তাও জানি না।” (কল্লোলযুগ, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, ১৩৭২ বঙ্গাব্দ, পৃ- ১০২)
এই সীমা-অসীমের মিলন ও দ্বন্দ্বই প্রেমেন্দ্র মিত্রের জীবন দর্শনের ভিত্তি ভূমি ছিল। কবি প্রেমেন্দ্রের কৈশোরের একটি কবিতায় এই বৃত্তির বৈপরীত্য (contrast) দেখা দিলেও সারাজীবন ধরেই কবি তাঁর নিজের জীবন নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে গিয়েছিলেন।
“আলোয় তোমায় দেখেছিলুম অন্ধকারে তুমি
অবাধ হয়ে ধরা দিলে তোমায় পেলুম।”
(নেবা দ্বীপ, আমের বোল, ছয় দশকের কবিতা, পৃ- ৩)
আর এখানেই নিজের সমসাময়িক অন্যান্য কবিদের থেকে তিনি স্বতন্ত্র ছিলেন।#




