১৯৭১ সালের মার্চ বাঙালির জাতীয় ইতিহাসে এক অগ্নিগর্ভ সময়। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেল জনতার আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিক তখনই ২০ মার্চ দিনটি হয়ে ওঠে এক গভীর তাৎপর্যময় মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত। এদিনের ঘটনাপ্রবাহে যেমন ছিল আলোচনার আশাবাদ, তেমনি অন্তরালে গড়ে উঠছিল এক ভয়াবহ সামরিক পরিকল্পনা।
সকালে ঢাকার রমনা প্রেসিডেন্ট ভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মধ্যে চতুর্থ দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর ছয়জন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্তভাবে জানান যে আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। তবে তাঁর সংযত বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল পরিস্থিতির জটিলতা এবং অনিশ্চয়তার গভীরতা।
পরদিন সংবাদপত্রগুলোতে আলোচনার অগ্রগতির আশাবাদী চিত্র তুলে ধরা হলেও বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছিল। একই সময়ে ঢাকার সেনানিবাসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার সামরিক উপদেষ্টাদের নিয়ে এক জরুরি বৈঠকে বসেন। সেখানে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করা হয় এবং আলোচনার ব্যর্থতার সম্ভাবনা সামনে রেখে কুখ্যাত ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর অনুমোদন দেওয়া হয়। ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম গণহত্যাগুলোর একটির নীলনকশা এভাবেই আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।
এদিকে রাজপথে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য। অসহযোগ আন্দোলনের উনিশতম দিনে ঢাকার জনজীবন ছিল মিছিলমুখর। মুক্তিকামী মানুষের ঢল নামে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। শপথ গ্রহণ শেষে মিছিলগুলো ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে সমবেত হয়। সেখানে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করেন যে মুক্তিপাগল সাড়ে সাত কোটি বাঙালির চূড়ান্ত বিজয় কেউ রুখতে পারবে না। তাঁর ভাষণে ছিল অদম্য আত্মবিশ্বাস, যা আন্দোলনরত জনতাকে নতুন করে উদ্দীপ্ত করে।
একই সঙ্গে তিনি জনগণের প্রতি শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে প্রতিফলিত হয় এক সুসংগঠিত জাতির নেতৃত্ব, যারা স্বাধীনতার লক্ষ্যে অবিচল এবং প্রস্তুত যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে।
সেদিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সাবেক নৌসেনাদের এক সমাবেশে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সংহতি জানানো হয় এবং একটি সম্মিলিত মুক্তিবাহিনী গঠনের আহ্বান তোলা হয়। ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গণবাহিনীর শোভাযাত্রাও ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা প্রতীকী অস্ত্র হাতে ভবিষ্যৎ সংগ্রামের প্রস্তুতির বার্তা দেয়।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। মিরপুর, চট্টগ্রাম, পার্বতীপুর ও সৈয়দপুরে বাঙালিদের সঙ্গে বিহারি ও পাকিস্তানি বাহিনীর সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হয়। একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নিয়মিতভাবে সৈন্য ও যুদ্ধসামগ্রী পূর্ব পাকিস্তানে আনা হচ্ছিল, যা আসন্ন বিপর্যয়ের পূর্বাভাস বহন করছিল।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছিল নানা হিসাবনিকাশ। জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রকাশ্যে কিছু প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলেন। ফলে আলোচনার পথ ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে ২০ মার্চ ছিল এক দ্বিমুখী বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে আলোচনার মঞ্চে আপাত অগ্রগতির ইঙ্গিত, অন্যদিকে অদৃশ্য প্রেক্ষাপটে নির্মিত হচ্ছিল দমন-পীড়নের ভয়াল পরিকল্পনা। বাঙালি তখনও সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি যে অচিরেই তাদের ওপর নেমে আসবে এক ভয়ংকর সামরিক অভিযান।
এই দিনের ঘটনাবলি স্পষ্ট করে দেয় যে স্বাধীনতার সংগ্রাম তখন আর কেবল রাজনৈতিক দরকষাকষির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তা অনিবার্যভাবে রূপ নিচ্ছিল এক সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধে, যেখানে একটি জাতির অস্তিত্ব, মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে চলেছিল।#




