গ্রামের ছোট্ট বাজারটায় প্রতিদিন সকাল হলেই হাট বসে। কেউ নিয়ে আসে শাকসবজি, কেউ ফল, কেউ চাল-ডাল। এক কোণে মাটির ওপর পাটি পেতে বসেন রমার মা। সামনে সাজানো থাকে টাটকা মাছ।
স্বামী অনেক বছর আগেই চলে গেছেন। অসুখ হয়েছিল। টাকার অভাবে ভালো চিকিৎসা করাতে পারেননি। একদিন চুপচাপ চোখ বুজেছিলেন তিনি।
তারপর থেকেই সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়েছিল রমার মায়ের কাঁধে।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে মাছ কিনতে যেতেন। সেই মাছ নিয়ে বসতেন হাটে। কোনো দিন সব মাছ বিক্রি হয়ে যেত। কোনো দিন কিছু মাছ পড়ে থাকত। বিক্রি না হওয়া মাছ বাড়িতে নিয়ে যেতে হতো।
মা তখন ভাবতেন, “আজ যদি সব মাছ বিক্রি হতো!”
মাছ তো আর রেখে দেওয়া যায় না। নিজেরা খেলে পেট ভরে ঠিকই, কিন্তু পরের দিনের মাছ কেনার টাকা কমে যায়। সেই টাকাই তাদের পুঁজি। তবু মা কোনো দিন ছেলেমেয়েদের বুঝতে দিতেন না সংসারের হিসাবটা কত কঠিন।
রমার দাদা অর্ণব পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। ছোটবেলা থেকেই বই ছিল তার প্রিয় সঙ্গী। স্কুলের শিক্ষকরা বলতেন, “অর্ণব অনেক দূর যাবে।”
অর্ণবেরও একটা স্বপ্ন ছিল। সে ডাক্তার হবে।
একদিন মাকে বলেছিল, “মা, আমি ডাক্তার হব।”
মা হেসে বলেছিলেন, “হবি বাবা। খুব বড় ডাক্তার হবি।”
“বাবা তো চিকিৎসা না পেয়ে চলে গেলেন। আমি বড় হয়ে গরিব মানুষের চিকিৎসা করব। কেউ যেন টাকার অভাবে চিকিৎসা না পেয়ে মারা না যায়।”
মা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলেননি। আঁচলে শুধু চোখের কোণটা মুছে নিয়েছিলেন।
তারপর শুরু হয়েছিল মায়ের আরেক লড়াই।
ছেলের স্কুলের ফি, বই, খাতা, পরীক্ষার খরচ। তারপর কলেজ। সামনে আরও বড় পথ।
মা আরও বেশি পরিশ্রম করতে লাগলেন। ভোরে মাছ কিনতেন। সারাদিন হাটে বসতেন। রোদে পুড়তেন, বৃষ্টিতে ভিজতেন। নিজের জন্য নতুন শাড়ি কেনার কথা ভাবতেন না।
এক জোড়া জুতো ছিল তাঁর। একদিন সেটাও ছিঁড়ে গেল। কয়েকবার সেলাই করেছিলেন। একসময় আর সেলাই করারও উপায় রইল না। পরদিন ভোরে তিনি খালি পায়েই মাছ কিনতে বেরিয়ে গেলেন।
তারপর কত বছর যে সেই খালি পায়ে হাটে গেছেন, কেউ হিসাব রাখেনি।
পুরোনো কাপড় ছিঁড়ে গেলে সেলাই করে আবার পরেছেন। কোনো কোনো রাতে ঘরে খাবার কম পড়লে নিজের ভাগের খাবারটুকু ছেলেমেয়েদের থালায় তুলে দিয়েছেন।
অর্ণব সব বুঝত। তাই সে আরও মন দিয়ে পড়ত।
ডাক্তারি পড়ার পথটা সহজ ছিল না। খরচ অনেক। মায়ের একার পক্ষে সেই খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু অর্ণব হাল ছাড়েনি। ভালো ফলের সুবাদে একসময় সে একটি বৃত্তি পেল। সেই বৃত্তির টাকা তার পড়াশোনার বড় ভরসা হয়ে দাঁড়াল। পাড়ার কেউ পরীক্ষার খরচে সাহায্য করলেন, কোনো শিক্ষক বইয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন। সামান্য সামান্য সহযোগিতা মিলে পথটা একটু সহজ হলো।
তারপর একদিন অর্ণব ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেল।
খবরটা শুনে মা অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারেননি। শুধু ছেলের মাথায় হাত রেখেছিলেন।
বছরের পর বছর কেটে গেল। অর্ণব ডাক্তারি পাশ করল।
গ্রামের মানুষ আনন্দে মেতে উঠল। স্কুলের শিক্ষকরা এলেন। বাজারের পরিচিত মানুষ এলেন। অর্ণবকে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন হলো। মঞ্চে ফুলের মালা, হাতে পুরস্কার।
অর্ণবকে যখন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াতে বলা হলো, সবাই ভাবছিল সে হয়তো নিজের সাফল্যের কথা বলবে।
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মঞ্চের এক পাশে বসে থাকা মায়ের দিকে তাকাল।
পুরোনো শাড়ি পরে বসে আছেন মা। পায়ে কোনো জুতো নেই।
অর্ণবের গলা কেঁপে উঠল।
“আজ যে পুরস্কারটা আমি পেয়েছি, এটা আমার নয়।”
চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
অর্ণব আবার মায়ের দিকে তাকাল।
“এটা আমার মায়ের।”
মা মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
“আমার বাবা চিকিৎসা না পেয়ে মারা গিয়েছিলেন। তারপর মা মাছ বিক্রি করে আমাদের বড় করেছেন। কত দিন রোদে পুড়েছেন, বৃষ্টিতে ভিজেছেন। নিজের জন্য কিছু কেনেননি। কত বছর খালি পায়ে হাটে গেছেন, তার হিসাব আমি জানি না।”
অর্ণব একটু থামল।
“আমার পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, শুধু সেই চেষ্টা করে গেছেন। আমি ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম, কারণ আমার বাবা চিকিৎসা পাননি। আমি চাই, টাকার অভাবে যেন আর কোনো মানুষকে চিকিৎসা না পেয়ে চলে যেতে না হয়।”
সামনে বসে থাকা অনেকের চোখে তখন জল।
অর্ণব আর কিছু বলতে পারল না। শুধু বলল, “এই পুরস্কার আমার মায়ের। আমার মায়ের মতো সব মায়ের।”
তারপর মঞ্চ থেকে নেমে সোজা মায়ের কাছে গেল।
মায়ের পায়ের কাছে বসে পড়ল।
যে পায়ে কত বছর জুতো ছিল না, সেই পায়ের ওপর মাথা রেখে বলল, “মা, আজ আমি ডাক্তার হয়েছি। তুমি না থাকলে আমি কিছুই হতে পারতাম না।”
মা ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।
কিছু বললেন না।
চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।
সেদিন সেই ছোট্ট গ্রামের মানুষ বুঝেছিল, সব পুরস্কার হাতে তুলে দেওয়া যায় না। কিছু পুরস্কার মায়ের পায়ের কাছেই রেখে দিতে হয়।
মঞ্চের এক কোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল রমা।
তার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা সামনে। পড়াশোনায় সেও ভালো। দাদা তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলোর একজন। অর্ণব ডাক্তার হওয়ার পর থেকে রমার নিজের স্বপ্নটাও যেন একটু একটু করে বড় হয়েছে।
একদিন সে দাদাকে বলেছিল, “দাদা, আমিও তোমার মতো ডাক্তার হতে চাই।”
অর্ণব হেসেছিল।
“আমার মতো কেন? তুই তোর নিজের মতো হবি। শুধু স্বপ্নটা বড় রাখিস।”
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে রমা আবার পড়ার টেবিলে বসেছিল।
কঠিন একটা অঙ্কে অনেকক্ষণ আটকে রইল। একবার বই বন্ধ করে দিতে ইচ্ছে হলো। তারপর তার চোখের সামনে ভেসে উঠল মঞ্চের সেই দৃশ্য।
দাদা মায়ের খালি পায়ের ওপর মাথা রেখে বসে আছে।
রমা আবার বই খুলল।
পাশের ঘরে মা তখন ঘুমিয়ে পড়েছেন।
রমার পড়ার টেবিলের আলোটা অনেক রাত পর্যন্ত জ্বলছিল।




