গবেষক: ড. বরুণ কুমার মণ্ডল
প্রতিষ্ঠান: পি.পি.কে. কলেজ, বুন্ডু, রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশনা: সময়ের শব্দ
ISSN: 2704-1387
প্রকাশের তারিখ: ০২ অক্টোবর ২০২৬
সারসংক্ষেপ:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘরে-বাইরে উপন্যাসটি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত হলেও এর তাৎপর্য কেবল রাজনৈতিক ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। উপন্যাসটিতে স্বদেশী আন্দোলনের অর্থনৈতিক অভিঘাত, গ্রামীণ সমাজের সংকট এবং নিম্নবর্গের মানুষের প্রান্তিক অবস্থান গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। দেশীয় উৎপাদনের কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে না তুলে বিদেশি পণ্য বর্জনের যে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল, তার সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হয়েছিল দরিদ্র কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারিগর ও গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষকে।
নিখিলেশ চরিত্রের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ গঠনমূলক অর্থনীতি, মানবিক মূল্যবোধ ও টেকসই উন্নয়নের ভাবনা তুলে ধরেছেন। এর বিপরীতে সন্দীপের আগ্রাসী জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক জবরদস্তি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক মানসিকতা প্রান্তিক মানুষের জীবন ও জীবিকাকে আরও বিপন্ন করে তোলে। পঞ্চুর মতো চরিত্রের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক আধিপত্য কীভাবে গ্রামীণ সমাজে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে তীব্র করে তুলেছিল, উপন্যাসটি তারও তাৎপর্যপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। এই আলোচনার মধ্য দিয়ে ঘরে-বাইরে এমন এক আর্থ-সামাজিক ও মানবিক দলিল হিসেবে প্রতিভাত হয়, যেখানে জাতীয় মুক্তির সঙ্গে সামাজিক ন্যায়, অর্থনৈতিক অধিকার ও প্রান্তিক মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
মূলশব্দ: স্বদেশী আন্দোলন, নিম্নবর্গ, গ্রামীণ অর্থনীতি, অর্থনৈতিক বয়কট, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আগ্রাসী জাতীয়তাবাদ, আর্থ-সামাজিক বৈষম্য, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ
।।১।।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কেবল একটি বিশিষ্ট উপন্যাস নয়, এটি সমকালীন রাজনৈতিক উত্তেজনা, উগ্র জাতীয়তাবাদের উন্মাদনা এবং তার বিপরীতে মানবতাবাদী ও বাস্তবনিষ্ঠ আর্থ-সামাজিক উপলব্ধির এক অনন্য দলিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের প্রত্যক্ষ পটভূমিতে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ এই উপন্যাস রচনার তাগিদ অনুভব করেছিলেন। উপন্যাসটি নিছক কোনো কাল্পনিক প্রণয়কাহিনী কিংবা অন্তঃপুরের টানাপোড়েনের আখ্যান নয়; এর অন্তঃসলিলা ধারায় প্রবাহিত হয়েছে এক গভীর ঐতিহাসিক ও সামাজিক সংকট। রচনার মূলে রয়েছে স্বদেশী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে রবীন্দ্রনাথের নিজের অভিজ্ঞতা, তাঁর মোহভঙ্গ এবং গ্রামীণ ভারতবর্ষের আসল চেহারা প্রত্যক্ষ করার গভীর অন্তর্দৃষ্টি। সেই বিশেষ কালপর্বে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবর্গের আবেগনির্ভর রাজনীতি কীভাবে সাধারণ মেহনতী মানুষ, দরিদ্র প্রজা এবং প্রান্তিক অন্ত্যজদের অস্তিত্বকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ সেই নির্মম বাস্তবতাকে সাহিত্যের সত্যে রূপ দিতে চেয়েছিলেন।
ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে জাতীয়তাবাদের যে ধারণা বাংলায় গড়ে উঠেছিল, রবীন্দ্রনাথ প্রথমে তার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সূচনালগ্নে ‘রাখীবন্ধন’ উৎসব প্রবর্তন করেন, স্বদেশী গানের সুরে আপামর বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করেন এবং রাজপথে নেমে দেশপ্রেমের জোয়ারে সামিল হন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তিনি উপলব্ধি করেন যে, এই আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বিপজ্জনক অন্ধগলির দিকে ধাবিত হচ্ছে। যে স্বদেশচেতনার উন্মাদনায় বিলিতি পণ্য বর্জনের ডাক দেওয়া হয়েছিল, তার পেছনে কোনো টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল না। দেশীয় কুটির শিল্প বা পণ্যোৎপাদনের বাস্তব কাঠামো তৈরি না করে রাতারাতি সস্তা বিলিতি কাপড় ও পণ্য পুড়িয়ে ফেলার উন্মত্ততা তৈরি হয়েছিল। এই অর্থনৈতিক সংকটের আঘাত গিয়ে পড়েছিল সমাজের একেবারে নিচুতলার দরিদ্র কৃষক, দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর। এই নির্মম সত্য রবীন্দ্রনাথকে ব্যথিত করেছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তথাকথিত উচ্চবর্গের দেশপ্রেমিকরা ত্যাগের যে বড়াই করছে, সেই ত্যাগের বোঝা মূলত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের ওপর, যাদের ঘরে একবেলা পেট ভরে ভাত জোটে না। এই আত্মঘাতী উগ্র জাতীয়তাবাদের মুখোশ উন্মোচন এবং দেশপ্রেমের নামে প্রান্তিক মানুষের প্রতি অবিচারের স্বরূপ তুলে ধরাই হয়ে উঠেছিল ‘ঘরে-বাইরে’ রচনার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও নৈতিক কারণ।
উপন্যাসটির মূল চরিত্র নিখিলেশ রবীন্দ্রনাথের আত্মচেতনারই এক পরিণত প্রতিবিম্ব। নিখিলেশ একজন জমিদার হওয়া সত্ত্বেও গতানুগতিক শোষক নয়, বরং মানবকল্যাণকামী ও প্রগতিশীল চিন্তাবিদ। নিখিলেশ যখন স্বদেশী আন্দোলনের নামে জোরজবরদস্তির বিরোধিতা করে, তখন তা আসলে রবীন্দ্রনাথেরই নিজস্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন। নিখিলেশ স্বদেশপ্রেমবিরোধী নয়; সে বহু আগে থেকেই দেশীয় প্রযুক্তিতে চিনি তৈরি, তাঁত শিল্পের প্রসার কিংবা গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে অন্ধ উত্তেজনার বিরুদ্ধে। সে জানে, সস্তা বিদেশি কাপড় পুড়িয়ে দিলে কলকাতার বাবুদের হয়তো সাময়িক দেশপ্রেমের গৌরববোধ হতে পারে, কিন্তু গ্রামের যে মুসলমান তাঁতি বা দরিদ্র চাষা সস্তায় কাপড় কিনে শরীর ঢাকত, তার পেটে লাথি পড়ে। নিখিলেশের কণ্ঠে উচ্চারিত এই বাস্তবতাবোধ আসলে সেই সময়ের রবীন্দ্র-দর্শনেরই মূল কথা। রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন, স্বদেশী আন্দোলনের নায়কেরা গ্রামীণ সমাজকে অন্তর থেকে ভালোবাসেননি, তারা প্রলেতারিয়েত ও প্রান্তিক মানুষকে নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন মাত্র।
উপন্যাসে সন্দীপ চরিত্রটির মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ সমকালীন চটুল, বাগাড়ম্বরপূর্ণ এবং নীতিহীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক তৈরি করেছেন। সন্দীপ দেশপ্রেমের নামে যুক্তি ও বিবেককে অবজ্ঞা করে, ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনিকে অন্ধ মন্ত্রের মতো ব্যবহার করে এবং অন্যায় ও নিষ্ঠুরতাকে ‘প্রকৃতির আইন’ বলে মহিমান্বিত করে। সন্দীপের এই আগ্রাসী উগ্রতা সমাজের সাধারণ মানুষের ওপর যে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে, তা গ্রামীণ অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। সন্দীপেরা বিলিতি পণ্য বর্জন করতে গিয়ে জোর করে হাটে-বাজারে ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের পণ্য বাজেয়াপ্ত করে, পুড়িয়ে দেয়, কিন্তু তাদের বিকল্প কোনো আয়ের সন্ধান দেয় না। রবীন্দ্রনাথ দেখাতে চেয়েছেন, যে দেশপ্রেম মানুষের প্রতি সংবেদনশীল নয়, যে রাজনীতি দুর্বলকে পিষে ফেলে নিজের আস্ফালন ঘোষণা করে, তা শেষ পর্যন্ত সর্বনাশা ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়। সন্দীপের এই নির্লজ্জ ভোগবাদ ও ক্ষমতার লোভ তথাকথিত আদর্শবাদের ছদ্মবেশে দেশের অন্দরমহলে এবং বহির্জগতে কীভাবে আগুন লাগিয়ে দেয়, তা নিখুঁতভাবে চিত্রিত করার তাগিদেই রবীন্দ্রনাথ কলম ধরেছিলেন।
‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসের অন্যতম মর্মান্তিক এবং বাস্তবনিষ্ঠ মাত্রাটি হলো পঞ্চু চরিত্রের উপস্থিতি। পঞ্চু নিছক একটি পার্শ্বচরিত্র নয়, সে ঔপনিবেশিক এবং সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার নির্মম শিকার, শোষিত প্রান্তিক মানুষের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। পঞ্চু দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে বাতাসার দোকানে কাজ করে, শাঁখা তৈরি করে, একবেলা একমুঠো চাল আর জল খেয়ে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করে। অথচ তার মতো দুর্বল মানুষের ওপর দেশপ্রেমের চাপিয়ে দেওয়া অনুশাসন নেমে আসে অভিশাপের মতো। সে যখন হরিশ কুণ্ডুর মতো ক্ষমতাবান জমিদারের আদেশে বা স্বদেশী বাবুদের হুমকিতে সস্তায় বিলিতি কাপড় বিক্রি করতে পারে না, তখন তার উপবাসের দিন ঘনিয়ে আসে। রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত দরদের সঙ্গে দেখিয়েছেন যে, দেশের শতকরা আশি ভাগ মানুষ পঞ্চুদের মতো নিঃস্ব। তাদের পেটের ভাত কেড়ে নিয়ে তাদেরই ওপর ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়ার জবরদস্তি চালানো দেশপ্রেম নয়, চরম ভণ্ডামি ও পাপ। রবীন্দ্রনাথ পঞ্চু চরিত্রের মাধ্যমে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক রোমান্টিকতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, গ্রামীণ বাস্তবতার গভীরে না ঢুকলে, মেহনতী মানুষের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যকে দূর না করলে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত দেশবাসীর মুক্তি আনতে পারে না।
একই সঙ্গে উপন্যাসে নিখিলেশের জমিদারির মুসলমান প্রজাদের অসন্তোষ এবং প্রান্তিকতার সংকটকে অত্যন্ত দূরদৃষ্টির সাথে তুলে ধরা হয়েছে। তৎকালীন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক দুর্বলতা ছিল হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের ফাটল। হিন্দু উচ্চবর্ণ ও ভদ্রলোক শ্রেণির নেতৃত্ব আন্দোলনকে এমন এক ধর্মীয় ও পৌরাণিক প্রতীকতায় ভরিয়ে তুলেছিল, যা সাধারণ গ্রামীণ মুসলমান সমাজ স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। তার ওপর যখন নিখিলেশের প্রতিবেশী উগ্র স্বদেশী জমিদাররা প্রজাদের হাটে গরু কেনাবেচা বা ব্যবসায়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করল, তখন সেই অর্থনৈতিক নিপীড়ন শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপ নিল। রবীন্দ্রনাথ এই উপন্যাসের মাধ্যমে এক কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে, অর্থনীতিকে উপেক্ষা করে কেবল সাম্প্রদায়িক আধিপত্য দিয়ে স্বাদেশিকতা প্রতিষ্ঠা করতে গেলে জাতীয় ঐক্যের মূল ভিত্তিটাই ধ্বংস হয়ে যায়। উপন্যাসের পরিণতিতে যে দাঙ্গার আগুন জ্বলে ওঠে, যাতে অমূল্য মারা যায় এবং নিখিলেশ রক্তাক্ত হয়ে ঘরে ফেরে, তা নিছক উপন্যাসের ট্র্যাজেডি নয়, তা ছিল অখণ্ড বাংলার রক্তাক্ত ভবিষ্যতের এক অভ্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী।
রবীন্দ্রনাথের এই উপন্যাস রচনার পেছনে ছিল এক গভীর ব্যক্তিগত বেদনাবোধ ও একাকিত্ব। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গে যখন সারা বাংলা আত্মহারা, তখন রবীন্দ্রনাথের এই সংযত ও আত্মসমালোচনামূলক অবস্থানকে সমকালের বহু চিন্তাবিদ ও তরুণ সমাজ ‘দেশদ্রোহিতা’ বা দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তিনি নিজ দলের মানুষের কাছেও ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু কবি তাঁর সত্য থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্যের দায়িত্ব কেবল স্রোতে গা ভাসানো নয়, বরং ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে সত্যের আলোকবর্তিকা তুলে ধরা। তিনি দেখেছিলেন, ঘরে-ঘরে কীভাবে বিষাক্ত রাজনীতির হাওয়া ঢুকে পড়ছে, ব্যক্তিমানুষের শুভবুদ্ধিকে হরণ করছে এবং নারীর স্বাভাবিক মূল্যবোধ ও মাতৃত্বের আসনকে অন্ধ মোহের দ্বারা কলুষিত করছে। বিমলার গৃহকোণ থেকে বহির্জগতের উন্মাদনায় ঝাঁপিয়ে পড়া এবং পরবর্তীতে মোহভঙ্গের মধ্য দিয়ে যে চরম মানসিক যন্ত্রণা ও প্রায়শ্চিত্ত, তা প্রকারান্তরে সেই সময়ের সমগ্র বাঙালি শিক্ষিত সমাজের আত্মপ্রবঞ্চনা ও অধঃপতনেরই রূপক।
রবীন্দ্রনাথ ‘ঘরে-বাইরে’ রচনার মাধ্যমে সমসাময়িক রাজনৈতিক মহলে এক গভীর দার্শনিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন: দেশ বড়ো, না ধর্ম ও সত্য বড়ো? নিখিলেশের মুখ দিয়ে তিনি বলিয়েছিলেন যে, দেশকে ঈশ্বর বানিয়ে যখন মানুষ অন্য সব নৈতিকতাকে অস্বীকার করে, তখন সে দেশেরই সর্বনাশ ডেকে আনে। এই সর্বজনীন মানবতাবাদী সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা এবং রাজনীতির নামে নিম্নবর্গের মানুষকে বলি দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোই ছিল তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য। তিনি গ্রামীণ অর্থনীতিকে কোনো কৃত্রিম স্লোগান দিয়ে নয়, বরং স্বাবলম্বিতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পুনর্গঠন করতে চেয়েছিলেন, যা তিনি পরবর্তীতে তাঁর শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনের পল্লী পুনর্গঠন প্রকল্পে বাস্তবে রূপ দিতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। ‘ঘরে-বাইরে’ সেই কর্মযজ্ঞেরই তাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক পূর্বাভাস।
অতএব, ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসটি কেবল একটি বিশেষ কালের রাজনৈতিক ভাষ্য নয়, বরং তা চিরায়ত আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার এক গভীর দার্শনিক বিশ্লেষণ। রবীন্দ্রনাথ এই উপন্যাসটি রচনা করেছিলেন জাতিকে এক চরম আত্মবিনাশী বিভ্রম থেকে রক্ষা করার আকুল তাগিদে। তিনি স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, প্রান্তিক মানুষের কান্নাকে উপেক্ষা করে, গ্রামীণ অর্থনীতিকে পঙ্গু করে এবং নিম্নবর্গকে শোষণের জাঁতাকলে পিষে কোনো স্বদেশী আন্দোলন সফল হতে পারে না। সত্য, সংযম এবং প্রান্তিক মানুষের প্রতি প্রকৃত মমত্ববোধ ছাড়া দেশপ্রেম শেষ পর্যন্ত এক অন্ধ সর্বনাশা রক্তপাতের খেলায় পরিণত হয়। স্বদেশী অর্থনীতির অন্তঃসারশূন্যতা, গ্রামীণ জীবনের জটিল স্তরবিন্যাস এবং নিম্নবর্গের চিরন্তন বঞ্চনার নিখুঁত ও নিরপেক্ষ চিত্রায়ণের জন্যই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কালজয়ী উপন্যাসটি রচনা করার ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন।
।।২।।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসটি বিশ শতকের সূচনালগ্নে রচিত বাংলা সাহিত্যের এমন একটি অনন্য সৃষ্টি, যেখানে তৎকালীন ঔপনিবেশিক রাজনীতির উত্তাপ, স্বদেশী আন্দোলনের উগ্র আবেগ এবং গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক কাঠামোর নির্মম টানাপোড়েন এক গভীর সমাজতাত্ত্বিক ও মানবতাবাদী রূপ লাভ করেছে। সাধারণত এই উপন্যাসটিকে ব্যক্তিমনের অন্তর্দ্বন্দ্ব, প্রেমের রূপান্তর কিংবা অন্তঃপুরের সীমানা পেরিয়ে বহির্জগতে নারীর আত্মপ্রকাশের সংকট হিসেবে পাঠ করা হলেও, এর গভীরে প্রোথিত রয়েছে স্বদেশী অর্থনীতির অন্তঃসারশূন্যতা, গ্রামীণ জীবনের স্তরবিন্যাস এবং নিম্নবর্গের দলিত-প্রান্তিক মানুষের চিরন্তন বঞ্চনার আখ্যান। ঔপনিবেশিক শাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবর্গীয় সমাজ যখন আত্মপরিচয়ের উন্মাদনায় ‘স্বদেশী’র ধ্বজা তুলে ধরেছিল, তখন গ্রামীণ জনপদে তার অভিঘাত কতটা করুণ, রক্তক্ষয়ী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী হয়ে উঠেছিল, উপন্যাসটিতে সেই সমাজবাস্তবতা অত্যন্ত নিপুণভাবে উদ্ঘাটিত হয়েছে।
উপন্যাসের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল প্রেক্ষাপট। এই আন্দোলনের মূল অর্থনৈতিক কর্মসূচি ছিল বিলাতি পণ্য বর্জন এবং স্বদেশী পণ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করা। কিন্তু এই বয়কটের তাত্ত্বিক ভিত্তির সঙ্গে গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থার কোনো বাস্তবানুগ সংগতি ছিল না। নিখিলেশ চরিত্রটির মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ এই ভাববিলাসী আন্দোলনের গোড়ার ত্রুটিটিকে চিহ্নিত করেছেন। নিখিলেশ নিজে একজন জমিদার হয়েও উৎপাদনমুখী অর্থনীতির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিল আন্দোলনের বহু পূর্ব থেকেই। সে জানত যে, কোনো কার্যকর বিকল্প শিল্পকাঠামো না গড়ে তুলে নিছক অন্ধ উত্তেজনায় পণ্য পোড়ানোর রাজনীতি কখনো দেশের প্রকৃত কল্যাণ সাধন করতে পারে না। বিমলা যখন তার বিলাতি পোশাক পুড়িয়ে ফেলার উন্মত্ত আবেগে মেতে ওঠে, তখন নিখিলেশ তাকে থামিয়ে দিয়ে গঠনমূলক কাজের গভীর তাৎপর্য বুঝিয়ে বলে,
“গড়ে তোলবার কাজে তোমার সমস্ত শক্তি দাও- অনাবশ্যক ভেঙে ফেলবার উত্তেজনায়
তার সিকি পয়সা বাজে খরচ করতে নেই।” ১
নিখিলেশের এই বক্তব্য তৎকালীন স্বদেশী অর্থনীতির প্রধান দ্বন্দ্বটিকে স্পর্শ করে। দেশীয় পণ্যের উৎপাদন ক্ষমতা যখন অপ্রতুল, দেশীয় কাপড়ের দাম যখন চড়া এবং তার জোগান যখন অনিশ্চিত, তখন কেবলমাত্র বিলাতি বস্ত্র ও লবণ পোড়ানোর প্রতীকী আস্ফালন কোনো স্থায়ী অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে পারে না।
তৎকালীন গ্রামীণ বাংলায় যে কৃষক, তাঁতি, ক্ষুদ্র ফেরিওয়ালা ও দিনমজুরদের বসবাস ছিল, তাদের কাছে অর্থনীতি কোনো তাত্ত্বিক আদর্শ ছিল না, ছিল প্রতিদিনের বাঁচার লড়াই। এই বৃহত্তর জনসমাজকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা স্বদেশী নেতাদের ছিল না। আন্দোলনকারীরা ভাবত, ভাবাবেগের জোরে এবং আত্মত্যাগের নৈতিক দোহাই দিয়ে যেকোনো অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটানো সম্ভব। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল যে, ত্যাগের বড়াই কেবল সেই শ্রেণিকক্ষেই সাজে যাদের উদ্বৃত্ত সম্পদ রয়েছে; যার ঘরে একবেলার অন্ন নেই, তার কাছে সস্তা কাপড় বর্জন করা মানে সপরিবারে উলঙ্গ থাকা বা অনাহারে দিন কাটানো। নিখিলেশ এই সত্যটি জানত বলেই সে কোনো জাদুমন্ত্র বা মোহের আশ্রয় নিতে চায়নি। সে প্রত্যক্ষ করেছিল যে, দেশের বাস্তব সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন ধৈর্যশীল বিজ্ঞানসম্মত সাধনা, অন্ধ দেশপূজা নয়। অন্ধ উন্মাদনার বিপদ সম্পর্কে নিখিলেশ স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারণ করেছে,
“দেশকে আমি সেবা করতে রাজি আছি, কিন্তু বন্দনা করব যাঁকে তিনি ওর চেয়ে
অনেক উপরে। দেশকে যদি বন্দনা করি তবে দেশের সর্বনাশ করা হবে।” ২
নিখিলেশের এই দূরদর্শী চেতনা মূলত সমকালীন অর্থনৈতিক বাস্তবতাহীন স্বাদেশিকতার প্রতি এক কঠোর তাত্ত্বিক সতর্কতা।
উপন্যাসে সন্দীপ চরিত্রের আবির্ভাব গ্রামীণ সমাজে এক চরম আধিপত্যকামী ও বলপ্রয়োগকারী রাজনৈতিক শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটায়। সন্দীপের রাজনীতিতে কোনো মানবিক দায়বদ্ধতা নেই, নেই উৎপাদনমূলক অর্থনীতির প্রতি কোনো শ্রদ্ধা। তার নীতি হলো দখলদারি ও জবরদস্তির নীতি। সে বিশ্বাস করে, দুর্বলকে পীড়ন করে এবং ভয় দেখিয়ে নিজের ইচ্ছাকে চাপিয়ে দেওয়াই বীরত্ব। সন্দীপের এই ভোগবাদী ও নির্দয় মানসিকতা নিছক ব্যক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং এটি সেই সময়ের একদল ক্ষমতালোভী ও নৈতিকতাহীন ভদ্রলোক রাজনীতিকের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। সন্দীপরা গ্রামের সাধারণ মেহনতী মানুষকে ভালোবাসেনি, তাদের ব্যবহার করতে চেয়েছে নিজেদের রাজনৈতিক সাফল্যের সোপান হিসেবে। নিখিলেশ যখন ন্যায়নীতি ও মানবিক মূল্যবোধের প্রসঙ্গ তুলে সন্দীপের এই দৌরাত্ম্যের প্রতিবাদ করে, তখন তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব কেবল দুটি ব্যক্তির মতাদর্শে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা পরিণত হয় সর্বজনীন মানবতাবোধের সঙ্গে আগ্রাসী উগ্র জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক লড়াইয়ে। সন্দীপ যখন ন্যায়-অন্যায়কে বিসর্জন দিয়ে দেশকে দেবতার আসনে বসিয়ে সমস্ত পাপকে বৈধ করতে চায়, তখন নিখিলেশ তার অন্তরের গভীরতম সত্য থেকে জবাব দেয়,
“আমিও দেবতা না, আমি মানুষ; আমি সেইজন্যেই বলছি, আমার যা-কিছু মন্দ কিছুতেই
সে আমি আমার দেশকে দেব না, দেব না, দেব না।” ৩
স্বদেশী আন্দোলনের এই জোরজবরদস্তির শিকার হয়ে সবচেয়ে বেশি নিষ্পেষিত হতে হয়েছিল গ্রামীণ অর্থনীতির নিম্নবর্গীয় মানুষকে। বাবুরা যখন মিটিং ডেকে বিলাতি পণ্য নিষিদ্ধ করার ফতোয়া জারি করত, তখন গ্রামের ছোট ছোট বাজারে তার নির্মম প্রতিক্রিয়া শুরু হতো। নিখিলেশের জমিদারির অন্তর্গত সুখনায় বা অন্যান্য হাটে সস্তা বিলাতি কাপড়ের বিকল্প হিসেবে যে মোটা দেশি কাপড় বাজারে আসত, তার দাম সাধারণ কৃষকদের সাধ্যের বাইরে ছিল। ফলে গরিব মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠত। আন্দোলনের পরিচালকরা এই অর্থনৈতিক বৈষম্যকে দূর করার কোনো চেষ্টা করেনি, বরং তারা প্রহরার ব্যবস্থা করে গরিব ব্যবসায়ীদের পণ্য জোর করে কেড়ে নিয়ে পুড়িয়ে দিত। দেশপ্রেমের নামে এই যে আধিপত্যবাদী সন্ত্রাস, তা ছিল আসলে এক ধরনের সামাজিক উৎপীড়ন। নিখিলেশ এই কৃত্রিম উন্মাদনা ও হিপনোটিজমের অন্তঃসারশূন্যতা উন্মোচন করে তার আত্মকথায় বলেছে,
“দেশকে সাদাভাবে সত্যভাবে দেশ বলেই জেনে, মানুষকে মানুষ বলেই শ্রদ্ধা করে, যারা
তার সেবা করতে উৎসাহ পায় না- চিৎকার করে মা বলে, দেবী বলে, মন্ত্র পড়ে যাদের
কেবলই সম্মোহনের দরকার হয়- তাদের সেই ভালোবাসা দেশের প্রতি তেমন নয় যেমন
নেশার প্রতি।” ৪
এই নেশাগ্রস্ত রাজনীতির পেছনের চালিকাশক্তি ছিল এক শ্রেণির সুবিধাভোগী মধ্যবিত্তের কায়েমি স্বার্থ ও দস্যুবৃত্তি। সন্দীপের কণ্ঠে এই লুটেরা দর্শনের স্পষ্ট স্বীকৃতি পাওয়া যায়। সন্দীপ কোনো রাখঢাক না রেখেই ঘোষণা করে যে, অধিকারের চেয়ে লোভ এবং চাওয়ার জোরই প্রকৃতির আসল সত্য। তার আত্মকথার এক জায়গায় সে অত্যন্ত উদ্ধতভাবে ব্যক্ত করে,
“দেশে আপনা-আপনিই জন্মেছি বলেই দেশ আমার নয়- দেশকে যেদিন লুট করে নিয়ে
জোর করে আমার করতে পারব সেইদিনই দেশ আমার হবে।” ৫
এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিণতিতে স্বদেশী আন্দোলন তার মহৎ উদ্দেশ্য হারিয়ে পরিণত হয়েছিল প্রান্তিক মানুষের ওপর এক পীড়নযন্ত্রে। সন্দীপরা যখন জমিদারির ক্ষমতা ও বিত্তবান তরুণদের প্রভাব খাটিয়ে গ্রামের নিরীহ প্রজা ও ব্যবসায়ীদের ভয় দেখাত, তখন গ্রামীণ সমাজে বিদ্যমান চিরাচরিত সামাজিক সাম্য ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিতটি ভেঙে চুরমার হয়ে যেত। প্রান্তিক মানুষ কোনোদিনই এই ভদ্রলোকদের আন্দোলনের অংশীদার হতে পারেনি, তারা কেবল এর বলি হয়েছিল।
উপন্যাসে গ্রামীণ সমাজের এই চরম প্রান্তিকতা ও অবক্ষয়ের সবচেয়ে বাস্তব ও মর্মস্পর্শী রূপ ফুটে উঠেছে পঞ্চু চরিত্রের মাধ্যমে। পঞ্চু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ঔপনিবেশিক ও সামন্ততান্ত্রিক শোষণের শিকার এক প্রতিনিধি চরিত্র। সে কোনো আদর্শের প্রতীক নয়, সে ক্ষুধিত, শীর্ণ ও অসহায় গ্রাম্য ভারতবর্ষের জীবন্ত কঙ্কাল। পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য সে দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করে। কখনো বিলের জল ভেঙে নমঃশূদ্রদের বাড়ি গিয়ে সামান্য ধান সংগ্রহ করে, কখনো বাতাসার দোকানে কাজ করে, কখনো বা গভীর রাত পর্যন্ত শাঁখা তৈরি করে। তার আহারের সংস্থানটুকুও নিশ্চিত নয়; জল খেয়ে পেট ভরিয়ে কাঁচকলা খেয়ে তাকে বছরের চার মাস আধপেটা থাকতে হয়। এই পঞ্চুকে যখন নিখিলেশ কোনো আর্থিক সাহায্য দিয়ে রক্ষা করতে চেয়েছিল, তখন প্রাজ্ঞ শিক্ষক চন্দ্রনাথবাবু তাকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন, তা সমগ্র দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার ওপর এক রূঢ় আলোকসম্পাত করে। চন্দ্রনাথবাবু নিখিলেশকে বলেছিলেন,
“তোমার দানের দ্বারা মানুষকে তুমি নষ্ট করতে পার, দুঃখ নষ্ট করতে পার না। আমাদের
বাংলাদেশে পঞ্চু তো একলা নয়। সমস্ত দেশের স্তনে আজ দুধ শুকিয়ে এসেছে। সেই
মাতার দুধ তুমি তো অমন করে টাকা দিয়ে বাইরে থেকে জোগাতে পারবে না।” ৬
এই উক্তিটি পরিষ্কার করে দেয় যে, গ্রামীণ অর্থনীতির দারিদ্র্য কোনো ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়, এটি একটি কাঠামোগত ব্যাধি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে শাসন ও শোষণ চলেছে, তাতে পল্লীবাংলার মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। স্বদেশী নেতারা সেই গভীর ক্ষতের কোনো প্রতিষেধক তৈরি করতে পারেননি। বরং তারা পঞ্চুর মতো মানুষকেও রেহাই দেয়নি। পঞ্চু যখন শেষ সম্বল বিক্রি করে হাটে একটু সস্তা কাপড় এনে নিজের পরিবারের অন্ন সংস্থান করতে চেয়েছিল, তখন স্বদেশী বাবুরা তার কাপড় কেড়ে নিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল। তার ওপর উগ্র স্বদেশী জমিদার হরিশ কুণ্ডু পঞ্চুকে জরিমানা করে এবং ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার ষড়যন্ত্র করে। অর্থাৎ দেশপ্রেমের আন্দোলন নিচুতলার মানুষের কাছে মুক্তি না এনে নিয়ে এসেছিল নতুন এক দুঃস্বপ্ন। যে জমিদারের বিরুদ্ধে আন্দোলন হওয়ার কথা ছিল, সেই সামন্তপ্রভুরাই স্বদেশীর ছদ্মবেশে গরিব প্রজাদের ওপর নিজেদের পুরনো শোষণকে দ্বিগুণ মাত্রায় চাপিয়ে দিতে শুরু করেছিল।
রবীন্দ্রনাথ নিখিলেশ চরিত্রের উপলব্ধির মাধ্যমে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তথাকথিত বাবুদের ভদ্রলোকী দেশপ্রেমের বলয়ে গ্রামীণ নিম্নবর্গের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব ছিল না। নিখিলেশ বুঝতে পেরেছিল, ওপরতলা থেকে আদেশ চাপিয়ে দিলে বা কিছু উচ্চাঙ্গের স্লোগান দিলে দেশ এক হয়ে যায় না। যাদেরকে সারা জীবন নীচ, অস্পৃশ্য ও অবহেলিত করে রাখা হয়েছে, তাদের দুঃখ-কষ্টকে দূর না করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখা কেবল এক আত্মপ্রবঞ্চনা মাত্র। অন্ত্যজ সমাজের প্রতি এই মমত্ববোধ ও ঐতিহাসিক সত্যকে উপলব্ধি করে নিখিলেশ অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে তার অন্তরে অনুভব করেছে,
“আমার ভারতবর্ষ কেবল ভদ্রলোকেরই ভারতবর্ষ নয়। আমি স্পষ্টই জানি, আমার
নীচের লোক যত নাবছে ভারতবর্ষই নাবছে, তারা যত মরছে ভারতবর্ষই মরছে।” ৭
এই উপলব্ধিই ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসের মূল অর্থনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক সুর। রবীন্দ্রনাথের এই কথাটি তৎকালীন কংগ্রেসি রাজনীতির সীমাবদ্ধতা এবং ভদ্রলোক শ্রেণির স্বজাত্যবোধের অন্ধতাকে সরাসরি চিহ্নিত করে।
উপন্যাসের আর্থ-সামাজিক দ্বন্দ্বের আরেকটি মারাত্মক দিক ছিল গ্রামীণ হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যকার বিভাজন। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা ছিল মূলত কৃষক, খেটে খাওয়া মানুষ বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সিংহভাগই ছিল হিন্দু। যখন স্বদেশী আন্দোলনের নেতারা ‘বন্দে মাতরম্’ মন্ত্র এবং হিন্দু ধর্মীয় প্রতীকের আধিক্য ঘটিয়ে আন্দোলন চালাতে শুরু করল, তখন সাধারণ মুসলিম সমাজ স্বাভাবিকভাবেই তার থেকে নিজেদের মানসিকভাবে দূরে সরিয়ে নিল। তার ওপর যখন অর্থনৈতিকভাবে সস্তা বিলিতি পণ্যের ওপর জোরপূর্বক নিষেধাজ্ঞা জারি হলো, তখন মুসলিম কৃষকেরা এটিকে দেখল তাদের জীবিকার ওপর হিন্দু ভদ্রলোকদের আঘাত হিসেবে। মীরজানের মতো সাধারণ মাঝির জীবিকার নৌকা যখন স্বদেশী দলের নির্দেশে ডুবিয়ে দেওয়া হলো, তখন সেই ক্ষোভ আর কেবলমাত্র রাজনৈতিক প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকল না, তা রূপ নিল এক সর্বনাশা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে।
সন্দীপরা যে আগুন জ্বালিয়েছিল, তা নিয়ন্ত্রণের কোনো ক্ষমতা তাদের ছিল না। তারা অন্দরমহলে বিমলার অহংকারকে উসকে দিয়ে যেমন পরিবারের শান্তিকে ছারখার করেছিল, তেমনই বাইরে গ্রামীণ সমাজের শতাব্দীপ্রাচীন সহাবস্থানকে ভেঙে খানখান করে দিয়েছিল। যে মুহূর্তে দাঙ্গার আগুন জ্বলে উঠল, তখন সন্দীপের সমস্ত বাগাড়ম্বর ও বীরত্ব খসে পড়ল; সে নিজের প্রাণ বাঁচাতে গোপনে পালিয়ে গেল। আর যে নিখিলেশ চিরদিন এই উগ্রতার বিরোধিতা করেছিল, প্রান্তিক মানুষকে বুকে টেনে নিতে চেয়েছিল, তাকেই সেই রক্তপাতের আগুনে আত্মাহুতি দিতে হলো। অমূল্যের অপমৃত্যু এবং নিখিলেশের রক্তাক্ত পরিণতি দিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রমাণ করলেন যে, মাটির বাস্তবতাকে অস্বীকার করে গড়ে তোলা কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন দেশকে স্বাধীনতা দিতে পারে না, কেবল দেয় দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ক্ষত।
উপন্যাসের এই সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক সংকটের সারমর্ম নিহিত রয়েছে রবীন্দ্রনাথের সেই দার্শনিক উপলব্ধিতে, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে প্রস্তুতিহীন ও ভিত্তিহীন আন্দোলন সবসময় জাতিকে চরম পরাজয়ের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বাহ্যিক শোরগোল ও সাময়িক উত্তেজনায় ভেসে যাওয়াকে রবীন্দ্রনাথ কখনোই জাতীয় মুক্তির লক্ষণ হিসেবে দেখেননি। নিখিলেশ যখন সন্দীপের সাথে রাজনৈতিক তর্কবিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল, তখন সে অত্যন্ত গভীর অন্তর্দৃষ্টির সাথে জাতির এই অভ্যন্তরীণ অক্ষমতার স্বরূপটি স্পষ্ট করে তুলে ধরেছিল,
“সৌভাগ্য হঠাৎ এসে আমাদের দরজার কাছে হাঁক দিয়ে যায় কেবল দেখাবার জন্যে
যে তাকে গ্রহণ করবার শক্তি আমাদের নেই, তাকে ঘরের মধ্যে নিমন্ত্রণ করে বসাবার
কোনো আয়োজন আমরা করি নি।” ৮
পরিশেষে বলা যায়, ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসটি কেবল একটি বিশেষ রাজনৈতিক অধ্যায়ের দলিল নয়, বরং তা ঔপনিবেশিক আধুনিকতা, স্বাদেশিক অর্থনীতির সংকট এবং প্রান্তিক নিম্নবর্গের বঞ্চনার এক চিরকালীন বিশ্লেষণ। রবীন্দ্রনাথ এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, যে জাতীয়তাবাদ মানুষের জীবনের বাস্তব দাবিকে উপেক্ষা করে, যে অর্থনীতি গ্রামীণ মেহনতী মানুষের পেটে অন্ন জোগাতে ব্যর্থ হয় এবং যে রাজনীতি নিম্নবর্গকে ক্ষমতার বলিদান হিসেবে দেখে, তা শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী রূপ ধারণ করতে বাধ্য। নিখিলেশের আত্মত্যাগ এবং বিমলার মর্মন্তুদ মোহভঙ্গের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ সমকালীন সমাজকে যে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিলেন, তা আজও উন্নয়ন ও জাতীয়তাবাদের বিতর্কে সমান প্রাসঙ্গিক ও গভীর এক দিশারি।
তথ্যসূত্র:
১. ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ, ঘরে-বাইরে, প্রথম প্রকাশ ১৯১৬, বিশ্বভারতী, কলকাতা-১৭, পৃ-১৯-২০।
২. তদেব, পৃ-২১।
৩. তদেব, পৃ-৩০।
৪. তদেব, পৃ-৩৫-৩৬।
৫. তদেব, পৃ-৪০।
৬. তদেব, পৃ-৯১।
৭. তদেব।
৮. তদেব, পৃ-৯৫।
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি:
১. চৌধুরী, ভূদেব। বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (চতুর্থ খণ্ড: কথাসাহিত্য)। কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ১৯৯১।
২. দাশগুপ্ত, অমলেন্দু। রবীন্দ্র-উপন্যাসের সমাজতাত্ত্বিক বিচার। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৯৮।
৩. ভট্টাচার্য, ক্ষেত্রপ্রসাদ। স্বদেশী আন্দোলন ও বাংলা সাহিত্য। কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ১৯৮৮।
৪. মুখোপাধ্যায়, প্রভাতকুমার। রবীন্দ্রজীবনী (দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড)। কলকাতা: বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, ১৯৬১।
৫. সরকার, সুমিত। দ্য স্বদেশী মুভমেন্ট ইন বেঙ্গল: ১৯০৩-১৯০৮। নয়াদিল্লি: পিপল্স পাবলিশিং হাউস, ১৯৭৩।
সহায়ক পত্রিকা
১. ইতিহাস অনুসন্ধান। কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ ইতিহাস সংসদ। ISSN: 2278-8573।
২. চতুরঙ্গ। কলকাতা: সাধনা প্রকাশনী।
৩. বিশ্বভারতী পত্রিকা। শান্তিনিকেতন/কলকাতা: বিশ্বভারতী পাবলিকেশন বিভাগ। ISSN: 2348-4977।
৪. সাহিত্য পরিষৎ-পত্রিকা। কলকাতা: বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ। ISSN: 2456-7884।




