একটি রাস্তা। রাস্তার দু’ধারে সারি সারি বটগাছ। বিশাল ডালপালা ছড়িয়ে আছে আকাশের দিকে। কোথাও ঝুলে পড়েছে শিকড়। কোথাও পাখির বাসা। দুপুরের তীব্র রোদে পথিকেরা এসে দাঁড়াচ্ছেন গাছের ছায়ায়। বাতাসে পাতার মর্মর শব্দ। চারপাশে সবুজের শান্তি।
কর্ণাটকের হুলিকাল থেকে কুদুরের পথে আজ এমনই এক দৃশ্য দেখা যায়। কিন্তু একদিন এই পথ এমন ছিল না। তখন রোদ ছিল প্রখর। মাটি ছিল রুক্ষ। আজকের মতো আকাশছোঁয়া বটগাছের সারি ছিল না। ছিল কিছু ঝোপঝাড়, ছোট গাছ আর কাঁটালতা। সেই পথের পাশে একদিন দাঁড়িয়েছিলেন এক সাধারণ গ্রামীণ নারী।
তাঁর নাম, সালুমারাদা থিম্মাক্কা।
তখন তাঁর কাছে ছিল না বড় কোনও অর্থ, ছিল না আধুনিক যন্ত্রপাতি, ছিল না কোনও বড় প্রতিষ্ঠানের সাহায্য। ছিল শুধু দুটি হাত, মাটির প্রতি ভালোবাসা আর একটি অদ্ভুত স্বপ্ন।
সেই স্বপ্ন ছিল, গাছ লাগাবেন। থিম্মাক্কার নিজের কোনও সন্তান ছিল না। সন্তান না থাকার কষ্টের সঙ্গে তাঁকে শুনতে হয়েছে মানুষের নানা কথা। কিন্তু তিনি সেই কষ্টকে নিজের জীবনের শেষ পরিচয় হতে দেননি। স্বামী চিক্কাইয়াহকে পাশে নিয়ে তিনি অন্য এক পথ বেছে নিলেন।
তাঁরা গাছ লাগাতে শুরু করলেন। আর সেই গাছগুলিই ধীরে ধীরে হয়ে উঠল তাঁদের সন্তান। নিজের হাতে মাটি খুঁড়ে চারা পুঁততেন থিম্মাক্কা। জল দিতেন। রোদের তাপে মাটি শুকিয়ে গেলে দূর থেকে জল বয়ে আনতেন। গরু-ছাগলের হাত থেকে চারাগুলিকে বাঁচাতে বেড়া দিতেন। একটি চারা একটু মাথা তুললেই তাঁর মুখে ফুটে উঠত আনন্দ।
একটি শিশু যেমন প্রথম হাঁটতে শেখে, থিম্মাক্কার চারাগুলিও তেমনই ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। প্রথমে ছিল হাতে গোনা কয়েকটি। তারপর আরও কয়েকটি। তারপর আরও। সংখ্যাটা বাড়তে থাকল বছরের পর বছর। গণিতের ভাষায় একে বলা যায় একটি ক্রমবর্ধমান ধারা। কিন্তু থিম্মাক্কার কাছে সেটি কোনও সংখ্যার খেলা ছিল না। প্রতিটি নতুন সংখ্যা ছিল একটি নতুন প্রাণ, একটি নতুন স্বপ্ন। একটি চারার পাশে আরেকটি। তার পাশে আরও একটি। ছোট ছোট সেই সংযোজন একদিন মিলে গেল এক বিশাল সবুজ ছবিতে। আজ হুলিকাল থেকে কুদুরের পথে দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছগুলির দিকে তাকালে সেই ছবিটিই চোখে পড়ে।
ভাবলে আশ্চর্য হতে হয় যে, একটি ছোট্ট চারা কত বড় হতে পারে!
একদিন যে চারাটিকে দুই হাতে ধরে মাটিতে পুঁততে হয়, বহু বছর পরে সেই গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে কত মানুষ। তার ডালে পাখি বাসা বাঁধতে পারে। তার শিকড় মাটিকে আঁকড়ে ধরতে পারে। তার পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে মাটিতে নকশা আঁকতে পারে।
একটি ছোট কাজের এত বড় ফল! ছোট্ট কাজ এইভাবে মহৎ হয়ে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে! বিস্ময় জাগাতে পারে! এই কারণেই থিম্মাক্কার গল্প শুধু গাছ লাগানোর গল্প নয়। এটি ছোট কাজের নিঃসীম শক্তির গল্প। পৃথিবীর কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠার গল্প।
আমরা অনেক সময় ভাবি, “আমি একা কী করতে পারি?”
থিম্মাক্কা সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন তাঁর জীবন দিয়ে।
তিনি একদিনে পৃথিবী বদলে দিতে চাননি। তিনি শুধু একটি চারা লাগিয়েছিলেন। একদিন একদিন করে বহুদিন, বহু ঋতু ধরে অজস্র চারা। অগণিত গাছ তিনি লাগিয়েছেন। ছোট ছোট প্রচেষ্টা সমবেত হয়ে পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। বছরের পর বছর সেই ছোট ছোট কাজই একদিন পৃথিবীর কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ তাঁর কাজের প্রতি উৎসাহী ও মনোযোগী হয়ে উঠেছে।
১৯৯১ সালে স্বামী চিক্কাইয়াহ চলে গেলেন। জীবনের দীর্ঘ পথের সঙ্গীকে হারিয়ে থেমে যাওয়ার মতো যথেষ্ট কারণ ছিল। কিন্তু থিম্মাক্কা থামলেন না। কারণ তাঁর সন্তানরা তখনও বেঁচে ছিল। তাঁর সন্তানরা ছিল গাছেরা। তিনি গাছ লাগিয়ে গেলেন। গাছের যত্ন নিয়ে গেলেন। অন্য মানুষকেও গাছ লাগাতে উৎসাহিত করলেন। তাঁর হাতে রোপিত গাছের সংখ্যা ক্রমে এত বেড়ে গেল যে একসময় তাঁর বৃক্ষসাধনার কথা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে গেল বিশ্বের নানা প্রান্তে।
তাঁর কাজের স্বীকৃতিও এল একের পর এক। BBC-এর ‘100 Women’ তালিকায় তাঁর নাম স্থান পেল। ২০১৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করল। কিন্তু থিম্মাক্কার সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনও পুরস্কার নয়। তিনি একজন মা। সাধারণ মা নন, ব্যতিক্রমী একজন মা। মায়ের কোলে তাঁর সন্তানরা বড় হয়ে ওঠেনি। তারা বড় হয়েছে মাটির বুকে। রোদ, বৃষ্টি, ধুলো আর বাতাসের মধ্যে। আর সেই সন্তানরাই আজ অসংখ্য মানুষ ও প্রাণীর আশ্রয়।
২০২৫ সালের ১৪ নভেম্বর, ১১৪ বছর বয়সে থিম্মাক্কার জীবনাবসান হয়। কিন্তু কিছু মানুষের মৃত্যু তাদের কাজকে শেষ করতে পারে না। থিম্মাক্কার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তিনি নেই। কিন্তু তাঁর গাছেরা আছে। হুলিকাল থেকে কুদুরের পথে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলি আজও আকাশের দিকে মাথা তুলে আছে। পথিকেরা তাদের ছায়ায় দাঁড়ান। পাখিরা ডালে বসে। বাতাসে পাতারা দোলে।
আর হয়তো কোনও কিশোর সেই ছায়ায় দাঁড়িয়ে একদিন ভাববে,
একটি ছোট্ট চারা যদি এত বড় হতে পারে, তাহলে একটি ছোট্ট স্বপ্ন কেন বড় হতে পারবে না? একটি মানুষ যদি নিজের হাতে মাটি খুঁড়ে পৃথিবীর জন্য এতটা সবুজ রেখে যেতে পারেন, তাহলে আমরাও কি পারি না?
হয়তো পারি।
হয়তো পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় কিছু দিয়ে শুরু করতে হয় না। কখনও কখনও শুরুটা হতে পারে খুব ছোট, একটি গাছ দিয়ে, একটি ভালো কাজ দিয়ে, একটি সাহসী সিদ্ধান্ত দিয়ে।
আজ যে চারাটি তোমার হাতে ছোট্ট, কাল সেটিই হয়তো কাউকে ছায়া দেবে। আজ যে স্বপ্নটি তোমার কাছে ছোট মনে হচ্ছে, কাল সেটিই হয়তো তোমার পরিচয় হয়ে উঠবে।
থিম্মাক্কার জীবন তাই আমাদের একটি সহজ কথা মনে করিয়ে দেয়, বড় কাজের শুরু অনেক সময় খুব ছোট হয়। একটি বীজ থেকে যেমন জন্ম নেয় বিশাল বৃক্ষ, তেমনই একটি ছোট্ট ভালো কাজ থেকেও জন্ম নিতে পারে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ। মায়ের কোলে নয়, মাটির বুকে জন্মেছিল তাঁর সন্তানরা। আজ সেই সন্তানরাই পৃথিবীকে ছায়া দেয়। আর তাদের ছায়ার নিচে হয়তো নতুন কোনও স্বপ্নের জন্ম হয়।#




