তৈমুর খানের ছয়টি কবিতা

শূন্যে চেয়ে থাকি

বিকেল শীতের খড় শুকিয়ে নিতে থাকে
রোদের ওড়না মেলে দাঁড়িয়ে থাকে গাছ
শালিক পাখির ঠোঁটে নরম ইশারা
ঘুরেফিরে কার ছায়া আসে?

মুঠো খুলি
স্মৃতির স্পর্শগুলি শিহরন ছড়ায়
বালিপথ জুড়ে সময়ের পদচিহ্ন আঁকা

শেষ নিশানায় জলপাখি
ডুব মারে
কী মাছ? কী মাছ ওর ঠোঁটে?

সাম্রাজ্যের কারুকাজগুলি জলের ওপরে দুলে ওঠে
তীরে কার ছায়ার আড়ালে শূন্যে চেয়ে থাকি
উন্মুখ দিগন্তের পারে?

জন্মান্তর

জাগরণ স্থির হয়ে আছে
তবু রোজ পুনর্জাগরণ চাই
প্রতিটি সকাল কি একই হতে পারে?
প্রতিটি রাস্তা কি গন্তব্যে যায়?

কার কথা শুনব তবে?
অনেক কথার ভিড়ে অনেক সমুদ্রের পর
একটি ছোট্ট নদীর কাছে এসেছি আজ
আমার তৃষ্ণার কথা বলে যাব তাকে

দুই পাশে দাউদাউ আগুন সমাজ
যা পায় পোড়ায় শুধু উড়িয়ে দেয় ছাই
জন্মান্তর তবু ফিরে আসে
দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোজ এখানে দাঁড়ায়…

মূর্খজীবন

পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে হাওয়া
আর কোথাও যাবে নাকো যাওয়া
ভুল ঠিকানায় জীবন বারোমাস
মরচে ধরে, জন্ম নেয় ঘাস

দূর পাহাড়ে মেঘ নামে, মেঘের পরি নামে
চিঠি আসে রামধনু আর সবুজ পাতার খামে
বুকের আগুন জ্বলে, ওড়ে পোড়া ছাই
একটি জীবন মূর্খ হয় ভণ্ড তপস্যায়

সাইকেল

গল্প নয়, জীবন প্রতিদিন সাইকেলে বাড়ি ফিরছে
বহুদূর রাস্তা, রাস্তার বাঁক
রাস্তায় দুর্বিপাক
পাশ কাটিয়ে জীবন ফিরছে বাড়ি

ঢংঢং ঘণ্টা বাজিয়ে দিচ্ছে সময়
সময়ের সরোবরে কত পদ্মরাগ
তুলে নিয়ে চলে যাচ্ছে চিকন পিঠ
চশমা পরা মোটর সাইকেল যুবক

আমি শুধু দূর কোলাহল, ব্যস্ত ক্রিংক্রিং
ধূলি-ধূসর মাথায় ফিরছি বাড়ি

কোথায় হাত-মুখ ধোয়ার জল?
মুখ দেখার আয়না?
জীবনে জীবন যোগের সেতু?

দুইচোখ করুণ সরোবর
এখানেই সাঁতার কাটো
যুদ্ধক্ষেত্রের ঘোড়া এখন এই ভাঙাচোরা সাইকেল!

যাত্রা

পার্থিব যাবে অপার্থিবের বাড়ি
আমরা বৈরাগ্য চাইব যদি না ফেরে হলদে শাড়ি
ক্ষতচিহ্ন ঢেকে
চাঁদ উঠবে
মৌসুমিকে কেউ ভোলেনি
মৌসুমী যদিও ঋতু নয়, কিংশুক ফুলের মতো নারী

ডেটল ভেজাচ্ছে তুলো
আমরা তার গন্ধগুলো ভাগ করছি
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসছে মৃত্যুগুলো

ছুটি হল
এই মুহূর্তে ছুটি হল
নিরালোকে ছুটে যাচ্ছে নিপুণ হাওয়া গাড়ি

আমরা সবাই দুর্গাদাস

সমস্ত জাহাজগুলি থেকে ধর্ম নেমে আসে
প্রতিটি ধর্মের গায়ে স্বর্গের পালক

ধুলোর সংসার পেতে
মা-মাসিরা খই-মুড়ি ভাজে
বিকেলের রাঙা চোখ, নোনতা বিশ্বাস
কোন্ ক্রোধে এমন তাকায়?

রূপকথার কত বাড়ি ঘর
কৌতূহল যাওয়া-আসা করে
আমাদের উন্মুখ কারিগর
দু-একটা ধর্মাশ্রয় বানিয়ে দেয়

তবু নীল ভয় হামাগুড়ি দিয়ে নামে রোজ
তার হাতে-পায়ে কী অসম্ভব জোর
জোড়াতালি-মারা এজীবন ঠুনকো
বিষাদ-চোর চেয়ে চেয়ে দ্যাখে

কারুবালা, এসো এসো
মা হও, বউ হও, রক্ষা করো
আমরা সবাই দুর্গাদাস
আমাদের সংসারে ঢোকে সন্ত্রাস!

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on print
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!