চেতনার ভাঙন ও শিল্পের গর্জনে কবির আত্মরূপান্তর

কবিতা নিছক আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাস কিংবা ভাষার আলংকারিক খেলা নয়; তা মূলত এক নিরন্তর আত্মদহন, আত্মখনন এবং অস্তিত্বের রূপান্তরের ইতিহাস। কোনো কবি যখন প্রথম লিখতে শুরু করেন, তখন তার কণ্ঠে থাকে পূর্বসূরিদের উত্তরাধিকার, তরুণ বয়সের উচ্ছল ভাবাবেগ এবং প্রথাবদ্ধ ছন্দ-রীতির বশ্যতা। কিন্তু সেই কবিই যখন আত্মসচেতনতায় পৌঁছে ‘পরিণত কবি’ হয়ে ওঠেন, তখন তার ভেতরের শিল্পীসত্তা এক নির্মম বিচারকের আসনে বসে। সেখানে প্রীতি বা মমত্ববোধের জায়গা নেই; সেখানে কবি নিজেই নিজের সবচেয়ে কড়া সমালোচক। নিজেরই নির্মিত প্রাচীন প্রাসাদকে তিনি অবলীলায় ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন নতুন দিগন্তের সন্ধানে। ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার যথার্থই উচ্চারণ করেছিলেন:

“Le vrai poète est celui qui trouve son propre enfer et sait en sortir.”

অর্থাৎ প্রকৃত কবি তিনিই, যিনি নিজের নরক নিজে আবিষ্কার করেন এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ জানেন।

কবিতা কেবল আপাত কথার পিঠে কথা সাজানো কোনো আলাপচারিতা নয়; তা মানবচেতনার গভীরে লুকিয়ে থাকা দর্শনের গর্জন এবং একই সঙ্গে রূপবন্ধের বা শিল্পের গর্জন। এই গর্জনের জন্ম হয় যখন প্রতিষ্ঠিত ব্যাকরণ, নিরাপদ ছন্দ এবং আত্মতুষ্টির চর্বিতচর্বণকে কবি নির্মমভাবে অস্বীকার করেন। একজন কবির মানসজগতে এই চেতনার ভাঙন কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এক সুনির্দিষ্ট জৈবিক ও দার্শনিক রূপান্তর। দেশি ও বিদেশি কবিতার ইতিহাস এবং সাহিত্যতাত্ত্বিক বিবর্তন পর্যবেক্ষণ করলে একজন পরিণত কবির চেতনার ভাঙনের প্রধান স্তরগুলিকে চিহ্নিত করা সম্ভব।

মুগ্ধতা থেকে বিদ্রোহের স্তর

কবির যাত্রাপথের প্রথম স্তরে থাকে সমকাল ও পূর্বসূরিদের প্রতি অন্ধ মুগ্ধতা। কিন্তু পরিণতি আসার প্রথম লক্ষণই হলো সেই মুগ্ধতার বৃত্ত ভেঙে ফেলা। কবি উপলব্ধি করেন, তিনি আসলে নিজের ভাষায় কথা বলছেন না, অন্যের প্রতিধ্বনি হয়ে বেঁচে আছেন। এই স্তরে এসে কবি নিজের পুরনো লেখাকে বাতিল করেন এবং পূর্বতন কাব্যভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

বিশ্বকবিতার ইতিহাসে এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস (W. B. Yeats)। প্রথম জীবনে কেল্টিক লোকগাথা, প্রাক-রাফায়েলাইট নান্দনিকতা আর রোমান্টিক কল্পনাবিলাসে নিমগ্ন ইয়েটস যখন পরিণত হলেন, তখন তিনি নিজেই নিজের সেই পুরনো মায়াজাল ছিঁড়ে ফেললেন। ১৯১৪ সালে প্রকাশিত ‘A Coat’ কবিতায় তিনি অকপটে লিখেছিলেন:

“I made my song a coat
Covered with embroideries
Out of old mythologies
From heel to throat;
But the fools caught it,
Wore it in the world’s eyes
As though they’d wrought it.
Song, let them take it,
For there’s more enterprise
In walking naked.”

ইয়েটস উপলব্ধি করলেন, কবিতার শরীরে কৃত্রিম কারুকার্যখচিত পোশাক চাপানোর চেয়ে নগ্ন সত্যের মুখোমুখি হওয়া অনেক বেশি সাহসের। এই নগ্নতাই কবিতার আধুনিকতা।

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং এই ভাঙনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ‘সন্ধ্যাসংগীত’ ও ‘প্রভাতসংগীত’-এর পর যে রূপান্তর শুরু হয়েছিল, তা শেষ বয়সে এসে চরম রূপ নেয়। জীবনের প্রান্তে পৌঁছে তিনি যখন ‘বলাকা’, ‘পুনশ্চ’ বা ‘রোগশয্যায়’-এর পর্বে প্রবেশ করলেন, তখন তার নিজেরই আদি রোমান্টিক সুষমাকে তিনি আঘাত করলেন। ‘পুনশ্চ’-র সূচনাতেই তিনি গদ্যছন্দকে বরণ করে কবিতার সনাতন ব্যাকরণ গুঁড়িয়ে দিলেন। তিনি লিখলেন:

“অনেক দিন থেকেই আমার মনে এই ইচ্ছাটা ছিল যে, কাব্যের ভাষাটিকে যতদূর সম্ভব স্বচ্ছ ও সোজাসুজি ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে হবে… কাব্যলক্ষ্মীকে যে-অলঙ্কারের ভার দিয়ে রাখা হয়েছে, তাকে নামিয়ে দিলে তার সহজাত সৌন্দর্যের মহিমা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।”

নিজের রচিত রাজকীয় ছন্দসৌধকে কবি নিজেই ভেঙে ফেললেন আরও এক মহত্তর স্বচ্ছতার তাগিদে।

আত্মবিরোধের বিনির্মাণে ‘আমি’-র খণ্ডীকরণ

পরিণত কবির ভাবজগতের দ্বিতীয় স্তরটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকটের। এখানে কবি আবিষ্কার করেন যে তার সত্তা অখণ্ড নয়, বরং বহুধা বিভক্ত। তার চিন্তা, অনুভূতি ও শব্দচয়নের মধ্যে ক্রমাগত দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। যে কবি নিজেকে সম্পূর্ণ জেনে ফেলেছেন বলে ভাবেন, তার সৃজনশীলতা সেখানেই থেমে যায়। ভাঙনের এই স্তরে কবি নিজের তৈরি ভাবাদর্শকেই আক্রমণ করেন।

ফরাসি প্রতীকবাদী কবি আর্তুর র‍্যাঁবো (Arthur Rimbaud) মাত্র সতেরো বছর বয়সে পল দেমেনিকে লেখা তার বিখ্যাত চিঠিতে (Lettres du Voyant) লিখেছিলেন:

“Car JE est un autre.” (কারণ ‘আমি’ হলো অন্য কেউ।)

র‍্যাঁবো স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, কবিকে হতে হবে দ্রষ্টা (voyant)—আর তার জন্য প্রয়োজন সমস্ত ইন্দ্রিয়বোধের সচেতন ও সুশৃঙ্খল বিশৃঙ্খলাসাধন (un long, immense et raisonné dérèglement de tous les sens)। তিনি অনুভব করেছিলেন, যে কবিতার জন্ম প্রচলিত নিয়ম মেনে হয়, তা কবির প্রকৃত অস্তিত্বকে প্রকাশ করে না। তিনি শেষ পর্যন্ত প্রচলিত কাব্যচর্চা ত্যাগ করে নীরবতার চরম রূপ বেছে নিয়েছিলেন, যা আত্মসমালোচনার চরমতম এবং তীব্রতম প্রকাশ।

একইভাবে টি. এস. এলিয়ট (T. S. Eliot) তার যুগান্তকারী প্রবন্ধ ‘Tradition and the Individual Talent’ (১৯১৯)-এ ব্যক্তিসত্তার এই বিলোপসাধন ও ভাঙনকে কবিতার মূল শর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন:

“Poetry is not a turning loose of emotion, but an escape from emotion; it is not the expression of personality, but an escape from personality.”

বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ দাশ এই আত্মখনন ও ভাঙনের সবচেয়ে নিবিড় রূপকার। ‘ঝরা পালক’-এর নজরুল ও মোহিতলালীয় প্রভাবযুক্ত চপল ও চড়া সুরকে তিনি ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’-তে এসে নিষ্ঠুরভাবে বর্জন করলেন। তিনি নির্মাণ করলেন সম্পূর্ণ নতুন এক বিষাদ ও বিপন্নতার ভূগোল। তার চেতনার ভাঙন প্রতিফলিত হলো সেই অমোঘ আত্মসংকটে:

“সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি;
কবি—কারণ তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার একটা নিজস্ব সহৃদয় সমন্বয় রয়েছে… কিন্তু সেই কল্পনা এবং সেই অভিজ্ঞতা তাদের জীবনে শান্তি আনে না, এক গভীর অসন্তোষ ও আলোড়নের সৃষ্টি করে।”

পরবর্তীকালে ‘আট বছর আগের একদিন’ বা ‘অদ্ভুত আঁধার এক’-এ পৌঁছে জীবনানন্দ ব্যক্তিমানুষের নিশ্চিন্ততাকে সম্পূর্ণ চূর্ণবিচূর্ণ করে দেখালেন এক অন্ধকারের দর্শন।

শিল্পের গর্জন ও ব্যাকরণ ভাঙার সাহস

কবিতা যখন কেবল বাক্যালাপ না হয়ে দর্শনের গর্জন এবং শিল্পের গর্জন হয়ে ওঠে, তখন তার জন্য নতুন রূপবন্ধ বা ফর্মের প্রয়োজন হয়। প্রচলিত ব্যাকরণ, অলংকারশাস্ত্র ও বৃত্তীয় ছন্দের খোলস সেই গর্জনকে ধারণ করতে পারে না। ফলে কবিকে হতে হয় ব্যাকরণ-ভাঙা কারিগর।

আমেরিকান কবি এজরা পাউন্ড (Ezra Pound) আধুনিকতাবাদের ডাক দিয়েছিলেন একটি সংক্ষিপ্ত ঘোষণায়:

“Make it new!” (নতুন করে গড়ে তোলো!)

ইমাজিজম বা চিত্রকল্পবাদের ইশতেহারে পাউন্ড নির্দেশ দিয়েছিলেন:

বস্তুর প্রত্যক্ষ ও নির্মম প্রকাশ (Direct treatment of the ‘thing’)।

এমন কোনো শব্দ ব্যবহার না করা যা প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখে না।

সুর বা মিউজিক্যাল ফ্রেজের ছন্দ অনুসরণ করা, মেট্রোনোমের মতো বাঁধাধরা ছন্দের দাসত্ব না করা।

পাউন্ড কবিতাকে ভাবালুতার মেদ ঝরিয়ে পাথরের মতো কঠিন ও স্পষ্ট এক শিল্পে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। সেখানে অলংকারের বাহুল্য ছিল আত্মপ্রবঞ্চনার সমান। স্টেফান মালার্মে (Stéphane Mallarmé) শব্দকে শুধু অর্থ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে না দেখে তাকে স্থানিক ও দৃশ্যমান শিল্পের মর্যাদা দিতে গিয়ে পৃষ্ঠার ওপর শব্দের বিন্যাস নিয়ে বিপ্লব ঘটালেন (Un Coup de Dés Jamais N’Abolira Le Hasard)। কবিতার চেনা ব্যাকরণ সেখানে দৃশ্যশিল্পের গর্জনে রূপ নিল।

বাংলা সাহিত্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় এই ব্যাকরণ ভাঙার এক উত্তাল রূপকার। প্রথাগত ছন্দের নিখুঁত জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তিনি ভাষাকে টেনে নিয়ে গেলেন এক স্বেচ্ছাচারী, মাতাল অথচ গভীর দার্শনিক সৌন্দর্যে। ‘যেতে পারি, কিন্তু কেন যাবো’ বা ‘ধর্মে আছো জিরাফেও আছো’-তে তিনি বাক্যগঠনের স্বাভাবিক ব্যাকরণকে ওলটপালট করে দিলেন:

“অনন্ত কুয়ার মুখে বসে আছি—
বুকের ভিতর দিয়ে চলে গেছে দেওদার বন।”

কিংবা শঙ্খ ঘোষ, যিনি আত্মদমন ও আত্মপরীক্ষার মধ্য দিয়ে কবিতাকে পৌঁছে দেন এক অতলান্ত সংযমে। তিনি যখন লেখেন:

“বলব না আর কোনো কথাই মানবজন্মের অপরাধে—
আড়ালে গিয়ে এবার তবে নিজের মুখে মারো চড়।”

তখন তা নিছক কবিতা থাকে না, তা হয়ে ওঠে কবির নিজেরই বিরুদ্ধে নিজের নৈতিক ও নান্দনিক চাবুক।

শূন্যতার মুখোমুখি অস্তিত্বের গভীর সংকট

পরিণত কবির ভাঙনের চূড়ান্ত স্তর হলো শূন্যতার দর্শন। এই স্তরে এসে কবি ভাষা ও অভিব্যক্তির চূড়ান্ত সীমাবদ্ধতাকে উপলব্ধি করেন। যে শব্দ দিয়ে তিনি জীবনভর শিল্প গড়েছেন, সেই শব্দকেই একসময় নিঃস্ব ও অক্ষম মনে হতে থাকে। হাইডেগারের অস্তিত্ববাদী দর্শন কিংবা কামুর ‘অ্যাবসার্ডিটি’-র মতো কবি অনুভব করেন, জগতের মূল সত্যটি আসলে নৈঃশব্দ্যে নিহিত।

জার্মান কবি রাইনার মারিয়া রিলকে (Rainer Maria Rilke) তার ‘Duino Elegies’ (প্রথম এলিজি)-তে কবিতার সেই আদিম ও বিধ্বংসী শক্তির মুখোমুখি হয়ে ঘোষণা করেছিলেন:

“Denn das Schöne ist nichts
als des Schrecklichen Anfang, den wir noch grade ertragen,
und wir bewundern es so, weil es gelassen verschmäht,
uns zu zerstören.”

অর্থাৎ সৌন্দর্য তো অন্য কিছু নয়, তা হলো সেই ভয়াবহতার শুরু যা আমরা কোনোমতে সহ্য করে আছি; আর আমরা তার বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি কারণ সে শান্তভাবে আমাদের ধ্বংস না করে এড়িয়ে যায়।

কবিতা তখন আর কোনো মোলায়েম সুখপাঠ্য রচনা নয়; তা এক পরম ধ্বংসকারী সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো।

বাংলা কবিতায় সমর সেনের কাব্যজীবন এই স্তরের এক অনন্য উদাহরণ। আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম তীক্ষ্ণ ও ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বর হওয়া সত্ত্বেও সমর সেন তার তরুণ বয়সের সেই দীপ্ত কাব্যচর্চাকে খুব দ্রুত থামিয়ে দেন। নিজের কাব্যভাষার পুনরাবৃত্তিকে প্রশ্রয় না দিয়ে তিনি কলম নামিয়ে রেখেছিলেন। এই স্তব্ধতাও এক গভীর আত্মসমালোচনার পরিণাম—যেখানে কবি মনে করেন, যদি নতুন দর্শনের উন্মোচন না ঘটে, তবে পুরনো কথার পুনরাবৃত্তি করা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছু নয়।

চেতনার ভাঙনের স্তরবিন্যাস এরকমই

একজন কবির চেতনার এই অভ্যন্তরীণ ভাঙন এবং পুনর্নির্মাণকে তাত্ত্বিক কাঠামোয় এভাবে বিন্যস্ত করা যায়:

চেতনার স্তর মানসিক ও দার্শনিক দ্বন্দ্ব কাব্যিক প্রকাশ ও ব্যাকরণ ভাঙার ধরন উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত
১. মুগ্ধতা-ভঙ্গ ও বর্জন পূর্বসূরিদের অনুকরণের মোহমুক্তি; আত্মতুষ্টি ত্যাগ চটুল ছন্দ ও মেকি অলংকারের বিলোপ; নগ্ন সত্যের সন্ধান ডব্লিউ. বি. ইয়েটস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (শেষ পর্ব)
২. সত্তার দ্বিখণ্ডীকরণ কবির ‘আমি’ ও দ্রষ্টার সংঘাত; ব্যক্তিস্বার্থের বিনাশ ভাষার বিচ্যুতি ও সচেতন বিশৃঙ্খলা; নির্লিপ্ত পর্যবেক্ষণ আর্তুর র‍্যাঁবো, জীবনানন্দ দাশ, টি. এস. এলিয়ট
৩. রূপবন্ধের বিদ্রোহ ভাব ও দর্শনের তুলনায় প্রচলিত ছন্দের অপ্রতুলতা মুক্তছন্দ, গদ্যকবিতা, দৃশ্যমান বিন্যাস, চিত্রকল্পের কাঠিন্য এজরা পাউন্ড, স্টেফান মালার্মে, শক্তি চট্টোপাধ্যায়
৪. শূন্যতা ও নৈঃশব্দ্য ভাষার অক্ষমতার উপলব্ধি; অস্তিত্বের মৌলিক সংকট সংযম, তীব্র নীরবতা, বাক্যসংকোচন বা স্বেচ্ছাকৃত স্তব্ধতা রাইনার মারিয়া রিলকে, সমর সেন, শঙ্খ ঘোষ

নতুন দিগন্তের উন্মোচন

পরিণত কবি জানেন, ধ্বংস ছাড়া সৃষ্টির কোনো পথ নেই। গাছ যেমন পুরনো শুকনো পাতা ঝরিয়ে ফেলে নতুন কচি কিশলয়ের জন্ম দেয়, তেমনি একজন কবিকেও প্রতিনিয়ত নিজের ভিতরকার ‘পূর্বতন কবি’-টিকে হত্যা করতে হয়। আত্মতুষ্ট লেখক কেবল নিজের অতীত খ্যাতির স্মৃতি রোমন্থন করেন, কিন্তু একজন চিরনবীন কবি সর্বদা এক অস্থির ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়ে হাঁটেন।

কবিতা যখন দর্শনের গর্জন হয়ে ওঠে, তখন তা মানবচেতনার গভীরতম অন্ধকার কোণে আলো ফেলে; আর যখন তা শিল্পের গর্জন হয়, তখন তা ভাষার সংকীর্ণ প্রাচীর ভেঙে অনন্তের দিকে প্রসারিত হয়। নিজের রচিত ব্যাকরণকে চূর্ণ করে, নিজের জনপ্রিয় ভাবমূর্তিকে বিসর্জন দিয়ে এবং নিজের অতীত সৃষ্টিকে কঠোর বিচারকের দৃষ্টিতে বাতিল করেই কেবল একজন কবি পৌঁছাতে পারেন সেই চিরন্তন উত্তরণে—যেখানে কবিতার প্রতিটি পঙ্‌ক্তি হয়ে ওঠে অস্তিত্বের এক নতুন জন্মমুহূর্ত।#

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on print
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!