কাজী নজরুল ইসলামের শাক্তচেতনা ও কালীসাধনা

কাজী নজরুল ইসলাম গীতিকার, বিদ্রোহ, মানবতা ও সাম্যবাদী চেতনার কবি হিসেবেই অধিক পরিচিত। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিসত্তার আরেকটি গভীর ও রহস্যময় দিক দীর্ঘদিন আড়ালেই থেকে গিয়েছে— সেটি হল তাঁর শাক্তভাবনা ও কালীসাধনা। ব্যক্তিজীবনের দুঃখ, পুত্রশোক, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান এবং শ্যামাসঙ্গীত রচনার মধ্য দিয়ে নজরুল একসময় বিদ্রোহী কবি থেকে সাধক কবিতে রূপান্তরিত হয়েছিলেন।

কাজী নজরুল ইসলামের জীবনেতিহাস থেকে জানা যায় যে, ‘দারিদ্র’ কবিতাটি লেখবার মাস চারেক পরে, ১৯২৭ সালের এপ্রিল মাসে তাঁর প্রথম পুত্র বুলবুলের জন্ম হয়েছিল। এরপরে তিনি কৃষ্ণনগরে আর বেশিদিন থাকেন নি। খুব সম্ভবতঃ সাংসারিক প্রয়োজনের চাপে পড়েই এসময়ে তাঁকে কলকাতায় চলে আসতে হয়েছিল। কিন্তু আগে থেকে কিছু ঠিক ছিল না বলে এসময়ে তিনি প্রথমে সপরিবারে নলিনীকান্ত সরকারের বাসাতেই উঠেছিলেন। তারপরে কিছুদিন এখানে ওখানে বাস করে শেষপর্যন্ত একসময়ে তাঁর ধূমকেতুর ম্যানেজার এবং মূলতঃ তাঁর অনুরাগী শান্তিপদ সিংহের প্রচেষ্টায় তিনি পানবাগান লেনে একটা বাসা পেয়েছিলেন। পরবর্তীসময়ে এ বাড়িতেই তাঁর দ্বিতীয় পুত্র ‘সানি’, অর্থাৎ সব্যসাচীর জন্ম হয়েছিল। অন্যদিকে, পানবাগানের বাড়িতে স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করবার পর থেকেই সুরলোকে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল, এবং তাঁর দেওয়া সুরের জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করেছিল। সেসময়ে বিভিন্ন গানের মজলিসে, সভা-সমিতির অনুষ্ঠানে অনেকেই নজরুলের রচিত গানগুলি, এবং তাঁরই সুর-বন্দেজে গাইতেন, অথচ তিনি গ্রামোফোন কোম্পানির তরফ থেকে কোনো গান রেকর্ড করবার অনুরোধ পর্যন্ত পেতেন না। শোনা যায় যে, শেষে এবিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্নের গুঞ্জন ওঠবার ফলে একসময়ে বৃটিশ গ্রামোফোন কোম্পানির টনক নড়েছিল। আসলে এসময়ে নজরুল যেহেতু রাজনীতি করতেন, সেহেতু ইংরেজ রেকর্ড কোম্পানি তাঁকে এড়িয়ে চলত। যাই হোক, শেষপর্যন্ত বেনিয়া বুদ্ধির তাড়নায় গ্রামোফোন কোম্পানি নজরুলকে এবিষয়ে চিঠি দেওয়ার জন্য তাঁর ঠিকানা জোগাড় করতে গিয়ে টের পেয়েছিল যে, তাঁদের অজ্ঞাতসারেই এর আগেই নজরুলের গান গ্রামাফোনে রেকর্ড হয়ে গিয়েছিল। আসলে তখন আসল রচয়িতার নাম গোপন করে হরেন্দ্র ঘোষ নজরুলের লেখা ছ’টি কবিতার কিছু কিছু অংশ বেছে নিয়ে সুর দিয়ে গ্রামাফোন কোম্পানি থেকে রেকর্ড করিয়ে নিয়েছিলেন। তবে এ ঘটনা জানবার পরে কোম্পানি প্রাথমিক ধাক্কা সামলে উঠে গান রচয়িতার প্রাপ্য রয়‍্যাল্টির টাকা পাঠিয়ে দিয়ে ভদ্রতা দেখিয়েছিল। আর এভাবেই গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে কবির প্রথম যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছিল। তারপরে তাঁর রচিত গান রেকর্ড করবার জন্য কোম্পানি তাঁর কাছে যথাবিধি অনুমতি চেয়েছিল, এবং এরপর থেকেই তাঁর লেখা, সুর-দেওয়া এবং স্বকণ্ঠে গাওয়া গানের অজস্র রেকর্ড গ্রামোফোন কোম্পানির কাছে আদরের সামগ্রী হয়ে উঠেছিল।

নজরুলের জীবনীকারদের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায় যে, সেই ছোটবেলা থেকেই নজরুলের গানের দিকে ঝোঁক ছিল। তখন শিয়ারসোলের স্কুলের শিক্ষক সতীশ কাঞ্জিলাল তাঁর ছাত্রের এ দিকে একটা প্রবণতা লক্ষ্য করে নিজের বাড়িতে তাঁকে নিয়ে গিয়ে তাঁকে গানের তালিমও দিয়েছিলেন। এই সতীশ কাঞ্জিলাল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চা করতেন। এরপরে নজরুল যখন পল্টনে কর্মরত ছিলেন, তখন নিজের সহকর্মীদের কাছ থেকে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের তালিম পেয়েছিলেন। আর গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর থেকে তিনি ওস্তাদ জমীরুদ্দীন খাঁ সাহেবের কাছে নিয়মিত তালিম নিতে শুরু করেছিলেন। এককথায় বলা যেতে পারে যে, এসময় থেকেই নজরুল সুরের সাগরে গা ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। এখনো পর্যন্ত তাঁর রচিত যেসব গানের উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, সবমিলিয়ে সেগুলোর সংখ্যা তিন হাজারের থেকে কিছু বেশিই হবে বলে মনে হয়। যাই হোক, জমীরুদ্দীন খাঁর মৃত্যুর পরে গ্রামাফোন কোম্পানি কবিকে তাঁর শূন্য আসনে—‘ট্রেনার’ ও ‘হেড কম্পোজার’ পদে বসিয়েছিল।

কিন্তু ইতিমধ্যে ১৯৩০ সালে নজরুল পুত্রশোক পেয়েছিলেন, এ বছরের বৈশাখ মাসে তাঁর নয়নমণি বুলবুলের মৃত্যু হয়েছিল। কথিত রয়েছে যে, নজরুলের এই শিশুপুত্রটি খুব অল্প বয়সেই জমীরুদ্দীন খাঁ সাহেব এবং নজরুলের সঙ্গীতচর্চার মধ্যে থেকে নির্ভুল সুরে গান গাইতে শিখে ফেলেছিল। ফলে তাঁর অকালমৃত্যু তখন নজরুলের পরিবারের উপরে গভীর বিষাদের ছায়া বিস্তার করেছিল। আর খুব সম্ভবতঃ বুলবুলের মৃত্যুই নজরুলের আধ্যাত্মিক দিকে ঝুঁকে পড়বার কারণ ছিল। কারণ, এর আগে তাঁর বন্ধুদের অনেকেই দেখেছিলেন যে, শোক থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য তিনি হাসির গান লিখতে গিয়ে একা একা বসে কেঁদেছিলেন। কিন্তু, বুলবুলের মৃত্যুর পরে তাঁকে পুনরায় দেখতে চাওয়ার আকাঙ্খাই তাঁকে আধ্যাত্মিক দিকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। অতঃপর এ আশায় তিনি নলিনীকান্ত সরকারকে সঙ্গে নিয়ে লালগোলা স্কুলের তৎকালীন হেডমাস্টার বরদাচরণ মজুমদারের কাছে পৌঁছেছিলেন। সেযুগে সিদ্ধযোগী বলে বরদাচরণের খ্যাতি থাকলেও তিনি সংসারত্যাগী কোন সন্ন্যাসী ছিলেন না; বরং, শ্যামাচরণ লাহিড়ীর মতোই একজন গৃহী যোগী ছিলেন। শোনা যায় যে, বরদাচরণ নজরুলের এ কামনা চরিতার্থ করেছিলেন; আর নজরুল তাঁর নিজের চোখের সামনে প্রিয় বুলবুলকে দেখতে পেয়েছিলেন। এরপর নজরুল স্বাভাবিকভাবেই বরদাচরণের সঙ্গে প্রায়শঃই দেখা করেছিলেন। বরদাচরণ শ্মশানে গিয়ে কালীসাধনা করতেন; তবে তিনি বরাবরই আত্মপ্রচার বিমুখ ছিলেন এবং সাধনক্ষেত্রে অন্য কাউকে টানা তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ ছিল। বরং তিনি অনধিকারীকে দূরে সরিয়ে রাখতেন। কিন্তু নজরুলকে তিনি যে গ্রহণ করেছিলেন, একথা অস্বীকার করবার কোন উপায় নেই। তবে নজরুল তাঁর কাছ থেকে কি শিক্ষা নিয়েছিলেন, এবিষয়ে কিছু জানা যায় না। শুধু এটুকু বলা যেতে পারে যে, নজরুল যে অধ্যাত্মশক্তি সম্বন্ধে কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলেন, এবং এর প্রভাব তাঁর বাস্তব জীবনকেও অনেকটা আচ্ছন্ন করেছিল—এর পিছনে নিশ্চিতভাবেই বরদাচরণের প্রভাব কাজ করেছিল।

এরপরে হঠাৎই ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে একটা অনুষ্ঠান করতে গিয়ে নজরুল প্রথম টের পেয়েছিলেন তাঁর জিহ্বা আর কাজ করছে না; এবং কথা বলতে গিয়ে গলা আটকে আসছে। বস্তুতঃ, এর অনেক আগে থেকেই তিনি নিজের অসুস্থতার কথা বুঝতে পেরেছিলেন, তবে তেমনভাবে গ্রাহ্য করেননি। কিন্তু সেদিন তাঁর পক্ষে আর রেডিওর প্রোগ্রাম করা সম্ভব হয়নি, ফলে নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে—কবি অসুস্থ। এরপরে নৃপেন্দ্রকৃষ্ণই একটা ট্যাক্সি করে তাঁকে নিয়ে বাড়িতে পৌঁছেছিলেন। এ ঘটনার সময়ে নজরুল দৈনিক ‘নবযুগ’ বলে একটা পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। অতঃপর লুম্বিনী পার্কের হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা হওয়ার পরে তাঁকে মধুপুরে বায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্রামের জন্য পাঠানো হয়েছিল।

আসলে অন্যের কাছে প্রকাশ পাওয়ার অনেক আগেই নজরুলের অসুখটা তাঁর দেহে আত্মবিস্তার লাভ করে ফেলেছিল। ফলে পরে যখন তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়েছিল, তখন তা উপশমের বাইরে চলে গিয়েছিল। নজরুলের সময়ে এদেশে শিল্পী ও সাহিত্যিকশ্রেণীর মানুষদের ভাগ্যে যশ-খ্যাতি যতোই জুটুক না কেন, আর্থিক ক্ষেত্রে তাঁদের মধ্যে শতকরা নব্বইজনের বেশি যে উপেক্ষিতই থাকতেন, একথা অস্বীকার করবার কোন উপায় নেই; আর নজরুলও এর কোন ব্যতিক্রম ছিলেন না। তাঁর প্রথম বই ‘ব্যথার দান’–এর স্বত্ব তিনি মাত্র দু’শো (?) টাকায় বিক্রি করেছিলেন বলে জানা যায়। হয়ত তখনকার দিনে দু’শো টাকার মূল্য অনেকটাই বেশি ছিল; কিন্তু, তিনি ‘কপিরাইট’ বিক্রি না করলে তাঁর অতিবড় বন্ধুও তখন এ গ্রন্থটি প্রকাশের জন্য হাতে নিতেন বলে মনে হয় না। এরপরে তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থের কপিরাইট বিক্রির ঘটনাও ওই একই বছরে, অর্থাৎ—১৯২১ সালেই ঘটেছিল। এবারে তিনি তাঁর ‘রিক্তের বেদন’ এবং আরও দুটি বইয়ের স্বত্ব সবমিলিয়ে মাত্র চারশো টাকায় বিক্রি করে দিয়েছিলেন। তবে তাঁর ‘অগ্নিবীণা’ এবং ‘যুগবাণী’ নামক বই দুটির কপিরাইট অবশ্য প্রথমদিকে বিক্রি করা হয় নি। কিন্তু, তখন যাঁরা নজরুলের লেখার অনুরাগী ছিলেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ গ্রন্থ প্রকাশকের সমস্ত ব্যয় বহন করলেও, সরকারি ঝামেলার ভয়ে প্রকাশক হিসেবে নিজেদের নাম ছাপাতে পর্যন্ত রাজি হননি। আর একারণেই তখন আর্য পাবলিশিং হাউস থেকে নজরুলের ‘যুগবাণী’ এবং ‘অগ্নিবীণা’—প্রকাশক হিসেবে নজরুলের নামাঙ্কিত হয়েই ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে পরবর্তীকালে অবশ্য ডি-এম লাইব্রেরি নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’র কপিরাইট কিনে নিয়েছিল; আর তাঁরাই এরপরে নজরুলের অধিকাংশ বইগুলি প্রকাশ করেছিল। প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি ছাড়া নজরুলের পরিবারের জীবনযাত্রা প্রধানতঃ তাঁর লেখার রয়‍্যালটির উপরেই নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু এসবের মধ্যে আবার তাঁর ‘বিষের বাঁশী’ এবং ‘ভাঙার গান’ সরকার থেকে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। তবে এই বাজেয়াপ্ত বইগুলিই তখন অনেকে গোপনে কিনেছিলেন, এবং এই বই বিক্রির টাকাই নজরুলের পরিবারকে আর্থিক দুর্দিনে বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছিল। কেন না, তিনি কোনো চাকরিতেই স্থিরভাবে বেশিদিন টিকে থাকতে পারেননি।

আজও নজরুলকে নিয়ে অনেকের মনে একটা ধারণা রয়েছে যে, একসময়ে নজরুলের আয় ছিল প্রচুর হলেও ব্যয়ের ক্ষেত্রে তাঁর হাত এতটাই দরাজ ছিল যে, টাকা যেমন এসেছিল তেমনি হাওয়ার আগে উড়ে গিয়েছিল। নজরুলের জীবনেতিহাস পড়লে একথা অস্বীকার করা চলে না। বস্তুতঃ, তাঁকে নিয়ে অতীতে যাঁরা স্মৃতিচারণ করেছিলেন, তাঁদের প্রায় প্রত্যেকেই জানিয়েছিলেন যে, বন্ধু-বান্ধবদের খাওয়াতে অথবা তাঁদের নিয়ে বেড়ানোর পিছনে তিনি কম খরচ করেননি। সেসময়ে তিনি হিসেব করে চললে তাঁকে হয়ত তাঁর স্ত্রী প্রমীলার অসুখের সময়ে এইচ-এম-ভির সমস্ত গানের রয়্যাল্টি বন্ধক রেখে চার হাজার টাকা ধারও করতে হত না। তাছাড়া এভাবে চললে নজরুল ও তাঁর পরিবার তখন এমনি আরও অনেক অসুবিধের হাত থেকে হয়ত নিষ্কৃতি পেয়ে যেতেন। কিন্তু এত হিসাব করে চললে নজরুল হয়ত কখনোই কবি নজরুল হতে পারতেন না।
যাই হোক, নজরুল কেন কালীসাধক ছিলেন, এবারে সেদিকে নজর দেওয়া যাক।

পুত্র বুলবুলের মৃত্যুর শোকে উন্মাদপ্রায় নজরুল বলেছিলেন—
“আমার কাননের বুলবুলি—উড়ে গেছে। যে দেশে গেছ তুমি সে কি বুলবুলিস্তান ইরানের চেয়েও সুন্দর?”

আর তারপরেই তাঁর মন হাজারো প্রশ্নে তোলপাড় করে উঠেছিল—
“মৃত্যু কেন? মৃত্যু তো অকাল মৃত্যু কেন? চারদিকে এতো উৎসব উজ্জ্বল জীবন সমারোহ, তার মাঝে কেন এই অকাল-নির্বাপণ? এই শীতল সমাপ্তি? এই প্রাণোচ্ছল সদানন্দ শিশু কি মরবে বলে এসেছিল? কিন্তু তাঁর চোখে-মুখে দেহে-মনে তার তো কোনো সঙ্কেত, কোনো আভাস ছিলো না। প্রদীপটি স্থির শিখায় জ্বলতে-না জ্বলতে কে তাতে নিশ্বাস ফেললো? কে সমস্ত কিছু নিবিয়ে দিলে এক ফুঁয়ে? কে সে? কোথায় সে? তাঁর দেখা পেলে একবার জিজ্ঞেস করতাম। কোন পথে গেলে তাঁর দেখা পাওয়া যায়? আমাকে সে পথের সন্ধান কে বলে দেবে?”
এরপরে—
“সহসা একদিন তাঁকে দেখলাম।”

‘পথহারার পথ’ নামের বইটির ভূমিকায় নজরুল লিখেছিলেন—
“নিমতিতা গ্রামে বিবাহ সভায় সকলে বর দেখছে, আমার ক্ষুধাতুর আঁখি দেখছে আমার প্রলয়-সুন্দর সাবথিকে। সেই বিবাহ সভায় আমার বধূরূপিণী আত্মা তাঁর চির জীবনের সাথীকে বরণ করে নিলো। অতঃপুরে মুহুর্মুহুঃ শঙ্খধ্বনি হুলুধ্বনি হচ্ছে। শ্বেতচন্দনের শুচি সুরভি ভেসে আসছে, নহবতে সানাই বাজছে—এমনি শুভক্ষণে আনন্দবাসরে আমার সে ধ্যানের দেবতাকে পেলাম, তিনি এই গ্রন্থ-গীতার উদগাতা শ্রীশ্রীবরদারণ মজুমদার মহাশয়। আজ তিনি বহু সাধকের পথ প্রদর্শক। সাধন-পথের প্রতিটি পথিক আজ তাঁকে চেনে। কিন্তু যেদিন আমি তাঁকে দেখি, তখনও তিনি বিশিষ্ট কয়েকজন ছাড়া অনেকের কাছেই ছিলেন অপ্রকাশ। সেদিন থেকে আমার বহির্মুখী চিত্র অন্তরে কার যেন অভাব বোধ করতে লাগলো। তখন ভারতে রাজনীতির ভীষণ ঝড় উঠেছে – অসহযোগ আন্দোলনকে বাংলার প্রলয়ঙ্কর রুদ্রের চেলারা ভ্রূকুটিভঙ্গে ভয় দেখাচ্ছে, আমি ধূমকেতুরূপে সেই রুদ্র ভৈরবদের মশাল জ্বেলে চলেছি। … কিছুদিন পরে যখন আমি আমার পথ খুঁজছি, তখন আমার প্রিয়তম পুত্রটি সেই পথের ইঙ্গিত দেখিয়ে আমার হাত পিছলে মৃত্যুর সাগরে হারিয়ে গেল। মৃত্যু এই প্রথম আমার কাছে ধর্মরাজরূপে দেখা দিলেন। সেই মৃত্যুর পশ্চাতে আমার অন্তরাত্মা নিশিদিন ফিরতে লাগলো। ধর্মরাজ আমার হাত ধরে তাঁরই কাছে নিয়ে গেলেন, যাঁকে নিমতিতা গ্রামে বিবাহ সভায় দেখেছিলাম। ধ্যানে বসে আবিষ্টের মতো তাঁকে বাইশবার প্রদক্ষিণ করলাম। ধর্মরাজ আমার পুত্রকে—বুলবুলকে—শেষবার দেখিয়ে হেসে চলে গেলেন।”

এই ‘পথ হারার পথ’ গ্রন্থটি ‘শ্রীবরদাচরণ মজুমদারের’ লেখা। ‘পথহারার পথ’ কথাটির অন্তর্নিহিত অর্থ হল ‘যোগসাধনার পথ’। কালক্রমে নজরুল এ পথের পর্যটক হয়েছিলেন। ‘বিদ্রোহী কবি’ তাই শুধু একজন যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি যোগীও ছিলেন। তিনি একইসঙ্গে যোগ ও যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি ছিলেন যুদ্ধযোগী, যোগীযোদ্ধা। ঠিকমত দেখতে শ্রীঅরবিন্দ ও নেতাজি সুভাষচন্দ্রও একই কাজ ছিলেন। নজরুলও তাঁদের অনুগামী হয়েছিলেন। আর অরবিন্দের মতোই নজরুলও আবার কবি ছিলেন।

নজরুল একসময়ে লিখেছিলেন—
“আমি আমার আনন্দ-রস-ঘন স্বরূপকে দেখেছি। কি দেখেছি, কি পেয়েছি আজও তা বলবার আদেশ পাইনি। হয়তো আজ তা গুছিয়ে বলতেও পারবো না, তবু কেবলই মনে হচ্ছে, আমি ধন্য হলাম, আমি বেঁচে গেলাম। আমি অসত্য হতে সত্যে এলাম, তিমির হতে জ্যোতিতে এলাম, মৃত্যু হতে অমৃতে এলাম।”

এরপরে এক ব্ল্যাক-আউটের রাতে নিবিড় অন্ধকারে একা একা হেঁটে গিয়ে তিনি দক্ষিণেশ্বরে যেমন ধ্যানে বসেছিলেন, তেমনি আবার বিরজাসুন্দরীর অন্তিম শয্যার পাশে বসে ভক্ত হরিদাসের মত নামকীর্তনও করেছিলেন। সেদিন তাঁর মুখ থেকে নামকীর্তন শুনে গৌরার্পিতচিত্ত বিরজাসুন্দরী বলেছিলেন—
“অদ্যাপিও সংকীর্তন করে গোরা রায়। কোনো কোনো ভাগ্যবানে দেখিবারে পায়।”
বাস্তবেই বিরজাসুন্দরী সেই ভাগ্যবতী ছিলেন।
আসলে বরদাচরণের সাক্ষাৎ পাওয়ার পরে নজরুল আর সঙ্গীতের স্তব্ধতা থাকেন নি, তিনি স্তব্ধতার সঙ্গীত হয়ে উঠেছিলেন।

কাজী নজরুল ইসলাম মায়ের দামাল ছেলে ছিলেন। নিজের অফুরন্ত প্রাণপ্রাচুর্য নিয়ে বাংলা মায়ের কোলে আবির্ভূত হয়ে তিনি এটাই প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, তিনি যথার্থই শাক্ত, মায়ের শক্তিতে শক্তিমান এক সন্তান ৷ তাঁর সেই উদ্দাম প্রাণের, অপরিমিত সৃজনী শক্তির পরিচয় তাঁর রচিত নানা গানে আজও ছড়িয়ে রয়েছে, যেগুলোর ভঙ্গীও বহু বিচিত্র—কখনো গজলের চটল আবেশের ছোঁয়ায় মাতাল, কখনো দেশপ্রেমের উদ্দীপনায় বিভোর, কখনো নানা রাগ-রাগিণীর তন্ময়তায় আনন্দ-বিহ্বল। বাংলা এখন তাঁকে এক অদ্বিতীয় সুরকার ও গীতিকার হিসাবে এবং একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক কবিরূপে চেনে,—যাঁকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও একদিন অভিনন্দিত করে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু নজরুলের আসল পরিচয়টি আজও মানুষের অগোচরেই রয়ে গিয়েছে, তাঁর ব্যক্তিসত্তার মর্ম-কেন্দ্রটি মানুষের কাছে আজও উদ্ঘাটিত হয়নি। নিজের শেষ জীবনে যিনি স্তব্ধ ও মূক হয়ে গিয়েছিলেন, একটা সময়ে তাঁর সেই মহামৌনের অতলে ডুব দিলে শুধু মাতৃনামের ঝঙ্কার শুনতে পাওয়া যেত।

কাজী নজরুল ইসলাম স্বভাবে ও স্বরূপে মাতৃসাধক বা পরম শাক্ত ছিলেন। নিজের প্রথম জীবনে দেশমাতৃকারূপে এই জননীই তাঁর ধ্যান, জ্ঞান ও আরাধনার বিষয় ছিলেন, এবং জীবনের শেষের দিকে বিশ্বমাতৃকা বা জগজ্জননীরূপে তিনিই তাঁর আরাধ্যা হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর অন্তর্জীবনের সেই পরিণতির খবর হয়ত অনেকেই এখন রাখেন না, গীতিসুরকার বা কবি গায়ক নজরুলের অন্তরালে সাধক নজরুলের অস্তিত্বের কথা আজও অনেকেই হয়ত জানেন না। তিনি শক্তিতত্ত্ব বা মাতৃস্বরূপের নব ভাষ্যকার ছিলেন। হিন্দুশাস্ত্রে তাঁর হিন্দুশাস্ত্রে গভীর অনুপ্রবেশ দেখে আজও চমকে উঠতে হয়। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘দেবীস্তুতি’তে এই নিখিলের আরাধ্যা মহাশক্তিকে নানাভাবে বন্দনা করেছিলেন। মূলে যিনি আদ্যাশক্তি পরমা কুমারী, তাঁর মুখ্য তিনটি বিভূতি বা বিভাব—মহাকালী, মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতী। মহাকালীরূপে মধুকৈটভ নাশের জন্য বিষ্ণুকে উদ্বোধিত করতে তাঁর প্রথম আবির্ভাব ঘটেছিল। কাজী নজরুল সেই মধু ও কৈটভকে অধৈর্য ও অবিশ্বাস রূপে চিনেছিলেন। তাঁর এ ব্যাখ্যা যেমন অভিনব, তেমনি আকর্ষণীয়। তেমনি মহিষাসুরকে তিনি ক্রোধের প্রতীকরূপে দেখেছিলেন, মহালক্ষ্মী যাঁর বিনাশ সাধন করেছিলেন এবং জগতে শান্তিসুষমা ও সুখসমৃদ্ধি এনে দিয়েছিলেন। আর শেষে কাম ও লোভরূপী শুম্ভ-নিশুম্ভকে সরস্বতী তাঁর জ্ঞানের প্রোজ্জ্বল খড়্গ দিয়ে বধ করেছিলেন। তখন—‘মা যে আমার কেবল জ্যোতি’, এবং—
“সেই পরম শুভ্র জ্যোতির্ধারায়
নিখিল বিশ্ব যায় ডুবে যায়।” —এ পরম অনুভবে কবি আত্মহারা হয়েছিলেন।

শ্রীশ্রীচণ্ডীতে মায়ের এই তিন মূল বিভাবের বিস্তৃত পরিচয় দেওয়া হয়েছে, মধুকৈটভাদি দৈত্য বা অসুরের নানা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাও প্রাচীন কালে প্রচলিত ছিল এবং আধুনিকযুগেও ‘সাধন-সমর’ প্রভৃতি গ্রন্থে দেখতে পাওয়া যায়। বাংলার মহা দুর্দিনে কবির সেই অভিনব শাক্তপদাবলী এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে এনেছিল।

ইতিহাস বলে যে, খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে হালিশহর কুমারহট্ট পল্লীর সাধক রামপ্রসাদ সেন সর্বপ্রথম শ্যামাসঙ্গীত রচনা করেছিলেন। তিনি তাঁর রচিত গানগুলিকে নিরাসক্ত চিত্তে মূলতঃ সহজ-সরল ভাব ও অনুভূতির বিনিময়ে তাঁর আরাধ্য দেবীকে পরিবেশন করতেন। এ গানের মূল কথা হল, বাৎসল্য ও স্নেহার্ত ভাব—যা কবিহৃদয়কে মানবিক রসে সহজেই সিক্ত করে তোলে। এরমধ্যে পরোক্ষভাবে লুকিয়ে থাকে বেদনা মিশ্রিত মর্মস্পর্শী এক ব্যাকুলতাবোধ। সর্বোপরি রামপ্রসাদের শ্যামাসঙ্গীত বাংলার পল্লীজীবনের স্নেহ-প্ৰেম মমতাপূর্ণ গার্হস্থ্য জীবনের জীবন্ত আলেখ্য হিসেবে আজও বিবেচ্য। সমকালীন ভারতচন্দ্রের বাক্‌চাতুর্যমণ্ডিত নাগরিকসুলভ রচনার পাশাপাশি সেই শান্ত-স্নিগ্ধ রসসমৃদ্ধ রামপ্রসাদী গান সাধারণ মানুষের কাছে এই সারল্যের গুণেই অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। রামপ্রসাদের পরবর্তীকালে যাঁরা শ্যামাসঙ্গীত রচনা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে কমলাকান্ত ভট্টাচার্য, ঈশ্বর গুপ্ত, গিরিশ ঘোষ, নবীন সেন, দাশরথি রায়, শ্রীধর কথক, রাম বসু প্রমুখ ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। অবশ্য তাঁদের রচনায় উমার প্রভাবই অধিক ছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে প্রধানতঃ নজরুলের রচনাতেই শ্যামাসঙ্গীতের সার্থক রূপায়ণ লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন কারণে নজরুল রচিত শ্যামাসঙ্গীতকে বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলা চলে।
প্রথমতঃ, ইতিপূর্বে কোনো মুসলিম কবির রচনায় এমন সার্থক শ্যামাসঙ্গীত অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
দ্বিতীয়তঃ, কবির সমসাময়িক কবিদের মধ্যে একমাত্র নজরুলই এত অধিক সংখ্যক সাৰ্থক শ্যামাসঙ্গীত রচনা করবার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন।

অতীতে হেমচন্দ্র সোমের সহায়তায় আবদুল আজীজ আল-আমান নজরুলের ইতস্ততঃ ছড়িয়ে থাকা শ্যামাসঙ্গীতগুলিকে সংকলিত করে ১৯৬৮ সালে ‘রাঙাজবা’ নামে সেগুলোকে নজরুল রচনাসম্ভারের অন্তর্ভুক্ত করে প্রকাশ করেছিলেন। এতে নজরুলের মোট ১০১টি রচনা সংকলিত করা হয়েছিল। ‘রাঙাজবা’ কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ রচনায় নজরুলের ভক্তহৃদয়ের আর্তি মূর্ত হয়ে উঠেছে বলে দেখা যায়। ফলে সারল্যের প্রসাদগুণে সেগুলি আজও বাংলা গানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, একটাসময়ে কবিকে গ্রামোফোন কোম্পানিতে থাকাকালীন অবস্থায় বিভিন্ন কারণে বিচিত্র চাহিদানুযায়ী গান লিখতে হয়েছিল। সেগুলো আজও সংখ্যার দিক থেকে যেমন বিরাট, তেমনি বৈচিত্র্যপূর্ণও বটে। ফলে একইসময়ে তিনি যুগপৎ ইসলামী গান ও শ্যামাসঙ্গীত রচনা করেছিলেন। বস্তুতঃ, কবির অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার পরিচয় তাঁর সেই ধরণের রচনায় সুপরিস্ফুট হয়ে ওঠে। যদিও অতীতের কেউ কেউ এধরণের রচনাগুলির পিছনে শুধুমাত্র কবির ব্যক্তিগত জীবনের অভাবপ্রসূত কারণ আবিষ্কার করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন; যেমন—‘সত্যই কি নজরুল শ্যামা সাধক’, কামাল হোসেন, যুগান্তর, ৭ই নভেম্বর, ১৯৭০ সাল। অন্যদিকে অতীতের কোনো কোনো সমালোচক আবার এধরণের কবিতাগুলির মাধ্যমে শুধুমাত্র কবির সাধক সত্তাটির গুণকীর্তন করতেই উৎসাহী হয়েছিলেন; যেমন—‘শ্যামাসাধক নজরুল’, বিভূতিভূষণ রায়, যুগান্তর, ২৯শে অক্টোবর, ১৯৭০ সাল। কিন্তু বাস্তবে, নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে গেলে দেখা যায় যে, নজরুলের বিচিত্র প্রয়াসী মনই এ ধরণের বিচিত্রধর্মী রচনায় কবিকে উৎসাহী করে তুলেছিল। ব্যক্তিগত জীবনে একা কবি যেমন তীব্র অভাবের মুখোমুখী হয়েছিলেন, তেমনি ধর্মের প্রতি কৈশোরের স্বভাবজাত আসক্তিই পরবর্তীকালে কবিকে অকস্মাৎ প্রভাবিত করেছিল। কবির ব্যক্তিগত জীবনে সাধক বরদাচরণ মজুমদারের প্রভাবকে কোনোমতেই অস্বীকার করা যায় না। অতীতের লালগোলা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক বরদাচরণ মজুমদারের সঙ্গে তাঁর পত্র-বিনিময় ও বরদাচরণের লেখা গ্রন্থে নজরুল লিখিত ভূমিকাটি দেখলেও একথার পরিষ্কার প্রমাণ পাওয়া যায়। যাই হোক, কবির শ্যামাসঙ্গীত রচনার পেছনে কেবলমাত্র চাহিদা ছাড়াও তাঁর সেই সাধক সত্তার আংশিক প্রভাবও তাই অনস্বীকার্য। অন্যদিকে কবির ইসলামী গান রচনার মূলে মূলতঃ কবির মুসলিম গণমানসের প্রতি প্রীতি ও আকর্ষণ কাজ করেছিল। কেবলমাত্র কোনো বিশেষ গায়কের জন্য অথবা একমাত্র ধর্মীয় উন্মাদনার বশে তিনি কখনোই কোন ইসলামী গান লেখেননি।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, শান্ত সুফী ও বাউল প্রধান গ্রাম চুরুলিয়ায় কবির জন্ম হয়েছিল। কৈশোরের প্রারম্ভে উদার সুফী ও বাউল মতবাদের সঙ্গে কবির ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটেছিল। পবর্তীকালে খুল্লতাত কবি বজলে করীমের সাহায্যে নজরুল দুই কবি-মহাজনেব সংস্পর্শে এসেছিলেন। ভাবপ্রবণ কবি নজরুল কৈশোরকালে পলাতক অবস্থায চণ্ডীদাসের জন্মভূমি নান্নুর ও কেন্দুবিল্বে গিয়েছিলেন, এবং জনৈক অঘোরপন্থী সাধকের সঙ্গে পরিচয়ের ফলে তাঁর উৎসাহে তারাপীঠ ও বক্রেশ্বর ভ্রমণও সমাপ্ত করেছিলেন। গ্রাম্য লেটোর দলে থাকাকালীন অবস্থায় মাত্র দশ বছর বয়সে রচিত তাঁর একটি অপ্রকাশিত গানে কবির, ভক্তিরসের প্রথম পরিচয় পাওয়া যায়। সেই গানটি ছিল—
“নিষ্প্রভ এই শশী॥
তব বদন শশী॥
বেরোল না হাসি॥ শশী মুখে॥
পূরব আকাশ রবি প্রায় সমাগত॥
কোকিলা ঝঙ্কারে কুহ অবিরত॥
তব মুখের আভা
যেন বিদ্যুৎ প্রভা॥
পরিণত লোভা॥
ক্ষীণালোকে॥
গুণ গুণ সুরে অলি বসিছে
কমলে॥

বিভু গানে মত্ত বিহঙ্গম দলে॥
তাহে আজ রবে॥
জীবন সংশয় হবে॥
বুঝি রইতে হবে॥ জন্ম দুখে॥
নজরুল এসলাম বলে॥
প্রিয়ার চরণ ধরে॥
দিবা যামিনী মান ভাঙ্গাও পাঁচ
বার করে॥
মালা তিরিশ ফুলে
পরাও হে তার গলে॥”

কবির ভক্তিরসের কথা স্মরণে রেখেই একদা তাঁর ক্ষেত্রে তারাক্ষ্যাপা ও নজরুল ইসলাম (নজর-আল-ইসলাম; অর্থাৎ—আল্লাহর প্রতি অর্ঘ্য), এবং নজর আলী ইত্যাদি নামকরণ করা হয়েছিল। কবির বিচিত্রধর্মী রচনায় তাই ভক্তিরসের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়।

লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, ১৯৪০ সালের পরে যে সব ভক্তিরসাশ্রিত গান কবি রচনা করেছিলেন, সেগুলোর মধ্যে শ্যামাসঙ্গীতের পরিমাণই উল্লেখযোগ্য। প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র বুলবুলের মৃত্যুর আঘাত কবিকে তখন অশান্ত ও বিভ্রান্ত করে তুলেছিল। ফলে সাধক বরদাচরণের উৎসাহে মৃত বুলবুলকে পুনরায় দেখার চেষ্টা ও শ্যামাসঙ্গীত রচনার অতাধিক আগ্রহ সেই সময়েই তাঁর মধ্যে যথেষ্ট সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। তাই কবির অধিকাংশ শ্যামাসঙ্গীতের মধ্যে তাঁর সেই উৎকণ্ঠা, মুক্তিপ্রয়াস ও ভক্তিরসাশ্রিত প্রাবল্যের পরিচয় পাওয়া যায়। এসময়ে কবি লিখেছিলেন—
“ধ্যান করি কিসে হে গুরু,
তুমি যোগ শিখাইতে এলে –
কানন পথে শ্যাম যে প্ৰেম বাণী
মধুকর করে,
(হে গুরু) কি যোগ আমি শিখিব তা ফেলে
তুমি যোগ শিখাইতে এলে।”

আর এ জাতীয় আর্তি কবির রচিত শ্যামাসঙ্গীতে প্রায়শঃই পাওয়া যায়। এমনকি কবি এই ব্যাকুলতার বশেই রচনা করেছিলেন—
“আর লুকাবি কোথা মা-কালী
(আমার) বিশ্বভুবন আঁধার করে
তোর রূপে মা সব ভোলালি॥”

এছাড়া কবির কোনো কোনো রচনা তাঁর কালী সাধনার সময়ে রচিত হয়েছিল। যেমন—‘শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে দেখব আমি’, অথবা ‘(আমার) কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন’ ইত্যাদি। একদা নজরুল কালী সাধনা ও শ্যামাসঙ্গীত রচনায় কি গভীরভাবে মেতে উঠেছিলেন—একথার প্রমাণ তাঁর নিজের লেখনীতেই পাওয়া যায়; যা নিম্নরূপ—
“আমার সেই আনন্দময় শক্তি যদি আবার সমাধিস্থা না হন, আমায় পরম শূন্যে নিযে গিয়ে চিরকালের জন্য লয় না করেন—তাহলে এই পৃথিবীতে যে প্রেমের—যে সাম্যের—যে আনন্দের গান গেয়ে যাব—সে গান পৃথিবী বহুকাল শোনেনি। আমার বাঁশী বিরহ যমুনার তীরে ফেলে চলে যাব। শুষ্ক যমুনার বালুচর থেকে সেই বেণু কুড়িয়ে যদি অন্য কেউ বাজাতে পারেন, আমার ফেলে যাওয়া বাঁশী ধন্য হবে। … যাঁর ইচ্ছায় আজ দেহের মাঝে দেহাতীতের নিত্যমধুর রূপদর্শন করেছি—তিনি যদি আমার সর্ব অস্তিত্ব গ্রহণ করে আমার প্রেমময়ী শক্তিকে ফিরিয়ে দেন, সেই শক্তির চোখে আবার যদি অশ্রুর বন্যা বই, তাঁর অঙ্গে যদি আবার অমৃত রসধারা প্রবাহিত হয, আবার যদি তাঁর চরণে বাসনৃত্যের ছন্দ জাগে—তাহলে আমি এই বিদ্বেষ জর্জরিত কুৎসিৎ সাম্প্রদায়িকতা ভেদজ্ঞান কলুষিত, অসুন্দর অসুর নিপীড়িত পৃথিবীকে সুন্দর করে যাব, এই তৃষিত পৃথিবী বহুকাল যে প্রেম, যে অমৃত, যে আনন্দ, রসধারা থেকে ৰঞ্চিত—সেই আনন্দ, সেই প্রেম সে আবার পাবে। আমি হব উপলক্ষ্য মাত্র। সেই সাম্য, অভেদ শান্তি, আনন্দ আসবে আমার নিত্য পরম সুন্দর পরম প্রেমময়ের কাছ থেকে।” (বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সভায় নজরুল ইসলাম প্রদত্ত ভাষণের অংশ, ১৯৪১ সাল) সুতরাং, এ থেকে কবিব সাধক সত্তার রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কালীর কাছে কবি তাঁর অন্তরের অন্তিম প্রার্থনা ব্যক্ত করতে গিয়ে লিখেছিলেন—
“মাগো আবার যদি তোমার মায়ায়,
রূপ নিতে হয় নূতন কায়ায়
তোমার প্রকাশ রুদ্ধ যেথায়।
সেথায় যেন না হয় গতি।”

এ থেকেই কবির শাক্ত পূজা সম্পর্কীয় একটা ধারণা পাঠক-পাঠিকার মনে জন্ম নেয়। অবশ্য এই প্রসঙ্গে শক্তিসাধনা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করবার প্রয়োজন রয়েছে।

লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, ভারতীয় তান্ত্রিকতার ইতিহাসে কালীতন্ত্রের একটা বিশিষ্ট স্থান রয়েছে। কালীতন্ত্রের আকারও সংক্ষিপ্ত। কিন্তু পূজার ইংগিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গূঢ়ার্থব্যঞ্জক। মহাকালীর তত্ত্ব ও উপাসনা প্রণালী বর্ণনাই এ তন্ত্রের মূল লক্ষ্য। এই তন্ত্রেই বহুবিখ্যাত দক্ষিণাকালীর ‘কালিকা দক্ষিণাং দিব্যাং মুণ্ডমালা বিভূষিতাম’ ধ্যানটির বর্ণনা করা হয়েছে। কালীর এই ধ্যানমগ্না মূর্তিই বাংলায় বহুখ্যাত ও সর্বজনপ্রিয় কালীমূর্তি। এই দেবী মুণ্ডমালা-বিভূষিতা। নজরুল শাক্তভাবের যে গান রচনা করেছিলেন সেটাও এই ভাবকে কেন্দ্র করেই কল্পিত হয়েছিল।

শাক্ত সাধনা সম্পর্কে জনমানসে কিছু ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকের ধারণা যে কালীসাধনা বুঝি ভোগারতি বা ব্যভিচারের সাধনা। কিন্তু শাক্ত সাধনা হল জৈবিক সত্তাকে উন্মীলিত করার সাধনা। সংসার ত্যাগ করবার প্রবণতাকে তাতে নির্দেশ বলে গ্রহণ করবার কোনো কারণ নেই। বরং সংসারে থেকে ভোগ পঙ্কে পঙ্কজ প্রস্ফুটিত করবার কথাই এই সাধনায় বলা হয়েছে। বস্তুতঃ, এই তত্ত্বানুযায়ী যে কোনো মানুষ শক্তির সাধনায় অগ্রসর হতে পারেন এবং পরম কৌলের মর্যাদালাভ করতে পারেন। এতে জাতবিচারের কোনো বালাই নেই। প্রকৃতপক্ষে এটি সমন্বয়সাধনের সাধনা। সকল আচারের মিলনস্থল বলে এতে কোনো ভেদবুদ্ধি বা সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নও অনুপস্থিত। এই তত্ত্বে সংকীর্ণতারও কোনো স্থান নেই। নজরুল এই তত্ত্ব থকেই তাঁর অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন।

শাক্ত গানের প্রধান বিশেষত্ব হলো দিব্যভাব। এই ভাব শক্তি উপাসনার চরম ভাব ও সকল দিক থেকেই পরিণতিতে তা শ্রেষ্ঠ। শাক্ত সঙ্গীতের প্রধান ভাগ হল দুটি—(১) লীলাসঙ্গীত (আগমনী ও বিজয়া), এবং (২) সাধন-সঙ্গীত (মনোদীক্ষা ভক্তের আকুতি)। এ দুই ভাগকে অবলম্বন করে সেটির শাখাপ্রশাখা প্রসারিত হয়েছে। নজরুলের রচনায় এই ভাবগুলির সংমিশ্রণ ঘটেছিল। এছাড়া নজরুলের শ্যামাসঙ্গীত রচনার মূলে ছিল তাঁর অন্তঃস্থিত সমন্বয় সাধনের প্রবৃত্তি। এ প্রবৃত্তির বশেই একইসঙ্গে তিনি শাক্ত সঙ্গীত ও ইসলামী সঙ্গীত রচনায় উৎসাহী হয়েছিলেন। একদিকে শাক্ত সঙ্গীতের অন্তঃস্থিত আবেগ, অপরদিকে ইসলামী সঙ্গীতের প্রেরণা—এ দুইয়ের আকর্ষণকে তিনি অস্বীকার করতে পারেননি। বস্তুতঃ, নজরুলের এই জাতীয় রচনায় পরমেশ্বরীর উপাসনাও যোগ্যরূপ সম্পর্কে, অর্থাৎ—স্থূল. সূক্ষ্ম ও পর, এ তিনটির যথাযথ ভাব-রসাশ্রিত বর্ণনাই প্রাধান্য পেয়েছে।

নজরুলের শ্যামাবিষয়ক রচনার মধ্যে মোটামুটি চারটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়—
(১) জগজ্জননীর রূপ পর্যায়ে বর্ণনাপ্রধান রচনা,
(২) মায়ের লীলা মাহাত্ম্য প্রধান রচনা,
(৩) ভক্তের আকুতি ও সমর্পণ বাসনা, এবং
(৪) দেবীর ধর্মীয় দর্শন এবং আধ্যাত্মিক কল্পনা বা আরাধনা।

এগুলির উদাহরণ নিম্নরূপ—
(১) রূপবিষয়ক—
“(তোর ) কালো রূপে মাগো অখিল বিশ্ব নিমগন
আধার নিশীথ সে যেন তোর কালো রূপের ধ্যান
(তোর) গহন কালোয় গাহন করে পুড়ায় ধরার প্রাণ॥”

(২) লীলামাহাত্ম্য—
“মাগো আজো বেঁচে আছি তোরি প্রসাদ পেয়ে
তোর দয়ায় মা অন্নপূর্ণা তোরই অন্ন খেয়ে॥
কবে কখন খেলার ছলে
ডেকে ছিলাম শ্যামা বলে
সেই পুণ্যে ধন্য আমি
আজ তোর নাম গেয়ে॥”

(৩) আকুতি—
“আমার হৃদয় অধিক রাঙা মাগো
রাঙা জবার চেয়ে।
আমি সেই জবাতে ভবানী তোর
চরণ দিলাম ছেয়ে।
মোর বেদনার বেদীর পরে
বিগ্রহ তোর রাখব ধরে
পাষাণ-দেউলে সাজে না তোর
আদরিণী মেয়ে॥”

(৪) আধ্যাত্মিকতা—
“সপ্তস্বর্গ সপ্ত পাতাল স্তব্ধ হয়ে উঠল নেয়ে
সাত্বিকী মোর জগন্মাতার জ্যোতিসুধার প্রসাদ পেয়ে
নৃত্যময়ী শব্দময়ী কালী
এল শান্ত কল্যাণ-দীপ জ্বালি
দেখরে পরমাত্মার সব
জননী সে জ্যোতিৰ্ম্মতী।”

এভাবে এই ধরণের রচনায় কবির সমর্পিত হৃদয়ের ব্যাকুলতাটি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছিল। বস্তুতঃ, পরবর্তীকালে কবির আধ্যাত্মিকতার প্রতি আকর্ষণজাত কল্পনার রূপায়ণ এই জাতীয় কবিতার মধ্যে দিয়েই ঘটেছিল। সাধক শিল্পীর আর্তিই এই কবিতাগুলির প্রাণস্বরূপ।

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!