খৃষ্টীয় ঊনিশ শতকের সূচনায় ইউরোপীয় আধুনিকতা ও প্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী সমাজব্যবস্থার এক সন্ধিক্ষণে ভারতের আধুনিক ভাবধারার পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায়ের (১৭৭২–১৮৩৩) আবির্ভাব ঘটেছিল। তিনি শুধুমাত্র একজন সমাজসংস্কারক বা ধর্মীয় চিন্তাবিদ ছিলেন না; তিনি এক দূরদর্শী জাতীয় ও সামাজিক রূপকারও ছিলেন। তিনি খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ ও ঊনিশ শতকের সূচনালগ্নে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাহীন, সামাজিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং শিক্ষাগত দিক থেকে স্থবির বাংলাকে গভীর মমতায় পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, এবং এ জীর্ণ সামাজিক ভিত্তিকে পুনর্গঠন করবার তাগিদ অনুভব করেছিলেন।
রামমোহন রায়ের দৃষ্টিতে বাংলা এক অপার সম্ভাবনাময় ভূখণ্ড ছিল, যা তৎকালীন সময়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন ও মধ্যযুগীয় সামাজিক ব্যাধিতে জর্জরিত হয়ে উঠেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, যুক্তিবাদী শিক্ষা, ধর্মনীতি ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়েই বাংলাকে প্রাচ্যের এক অগ্রগামী চিন্তার কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। এযুগে দাঁড়িয়ে তিনিই প্রথম ব্যক্তি ছিলেন, যিনি একথা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, মধ্যযুগীয় টোল ও মক্তবভিত্তিক মুখস্থনির্ভর শিক্ষা মানুষকে আধুনিকযুগের উপযোগী করে তুলতে পারছে না। যুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্কতাই মানুষকে অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত করতে পারে। আর তাই ১৮২৩ সালে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড আমহার্স্টকে লেখা তাঁর ঐতিহাসিক পত্রে রামমোহন সংস্কৃত শিক্ষা তহবিলের অর্থ প্রাচীন ব্যাকরণ বা ন্যায়শাস্ত্রের পেছনে ব্যয় করবার বিরোধিতা করেছিলেন। এর বদলে তিনি দাবি করেছিলেন যে, এ অর্থ যেন গণিত, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, রসায়ন, শারীরবিদ্যা ও পাশ্চাত্য দর্শনের মত বাস্তবমুখী শিক্ষার জন্যই ব্যয় করা হয়। আসলে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, বিজ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর শিক্ষাই তরুণদের মধ্যে বিচারবুদ্ধি ও প্রশ্ন করবার মানসিকতা জাগ্রত করতে পারে। একারণেই তাঁর সময়কার সাধারণ মানুষের কাছে জটিল দার্শনিক ও সামাজিক তত্ত্ব সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি বাংলা গদ্যকে সংস্কার করেছিলেন। আর ‘বেদান্ত গ্রন্থ’ (১৮১৫) বা সতীদাহ বিরোধী বিভিন্ন নিবন্ধে তিনি কোনো আবেগপ্রবণ কথা না বলে কঠোর শাস্ত্রীয় ও যুক্তিনির্ভর আলোচনা উপস্থাপন করেছিলেন। তবে রামমোহনের ধর্মভাবনা কোনো নতুন ধর্মমত তৈরি করবার প্রচেষ্টা ছিল না; বরং, তা আসলে ধর্মের নামে প্রচলিত ভণ্ডামি, পুরোহিততন্ত্র ও পৌত্তলিক অন্ধত্ব দূর করবার এক বৈপ্লবিক উদ্যোগ ছিল। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, প্রাচীন হিন্দুধর্মগ্রন্থ—বিশেষ করে উপনিষদ ও বেদান্তের মূল কথাই হল একেশ্বরবাদ; এবং মূর্তিপূজা, দেবদেবীর তোষণ ও পশু বলিদান মূলতঃ পরবর্তীকালের স্বার্থান্বেষী পুরোহিত শ্রেণীর তৈরি। ১৮২৮ সালে রামমোহন প্রতিষ্ঠিত ‘ব্রাহ্মসভা’—যা পরে ‘ব্রাহ্মসমাজ’ নামে পরিচিত হয়েছিল, তা কোনো বিশিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি এমন এক উপাসনাকেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে কোনো বর্ণ, জাতি বা ধর্মীয় প্রতীক ছাড়াই যে কোনো মানুষ এক পরমেশ্বরের ধ্যান করতে পারতেন। সেযুগে এটি প্রাচ্যের ধর্মীয় চিন্তায় চরম সহনশীলতা ও উদারতার বার্তা নিয়ে এসেছিল। এছাড়া তিনি আরবি, ফারসি, হিব্রু ও গ্রিক ভাষা শিখে ইসলাম, খৃষ্টধর্ম ও হিন্দুধর্মের মূল গ্রন্থসমূহ পাঠ করেছিলেন; এবং একথা প্রচার করেছিলেন যে, সব ধর্মের মৌলিক সত্যি একই—তফাৎ শুধু বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানে। গবেষকদের মতে, রামমোহনের কাছে যুক্তি ও ধর্মের শেষ লক্ষ্য ছিল মানবকল্যাণ। তিনি সমাজকে সেই মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চেয়েছিলেন, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তির মর্যাদা স্বীকৃত হবে। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, তৎকালীন বাংলায় নারীদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ ছিল। সেযুগে রামমোহনই প্রথম ব্যক্তি ছিলেন, যিনি তখন নারী অধিকারকে সমাজের নৈতিকতার প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। আর এজন্যই ১৮২৯ সালে সতীদাহপ্রথা নিবারণে লর্ড বেন্টিঙ্ককে আইনি সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি তিনি কন্যাশিশু হত্যা, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরোধিতাও করেছিলেন। একইসাথে সেযুগে দাঁড়িয়ে তিনি নারীদের শিক্ষার অধিকার এবং পিতার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার নিশ্চিত করবার জন্যও জোর দাবি জানিয়েছিলেন। সুতরাং, এসব দিক থেকে রামমোহন ভারতের প্রথম আধুনিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার সংগঠক ছিলেন বললেই সঠিক কথা বলা হয়। তাছাড়া ১৮২৩ সালে জন অ্যাডাম সংবাদপত্রের ওপরে বিধিনিষেধ আরোপ করলে তিনি সুপ্রিম কোর্ট ও প্রিভি কাউন্সিলে এবিষয়ে প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছিলেন; কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মুক্ত সংবাদমাধ্যমই সরকারের ভুলত্রুটি শুধরে একটি সভ্যসমাজ তৈরি করতে পারে। এমনকি রামমোহন রায় শুধুমাত্র বাংলার সীমানায় আবদ্ধ ছিলেন না; আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ, কিংবা স্প্যানিশ আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলন—সব কিছুতেই তিনি আনন্দিত হয়েছিলেন। আর তিনি দৃঢ়ভাবে একথা তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে, প্রাচ্যের ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্যের উদার মানবতাবাদ মিলেমিশেই বিশ্বব্যাপী এক একক মানবসমাজ গড়ে তুলতে পারে। গবেষকদের মতে, রামমোহন রায়ের এ ত্রিমুখী সমন্বয় তখন বাংলা তথা সমগ্র ভারতের চিন্তাজগতে এক অভূতপূর্ব আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। তাঁর সংস্কার আন্দোলন তৎকালীন বাংলায় যে বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরি করেছিল, সেটার ওপরে দাঁড়িয়েই প্রথমে ডিরোজিও ও ইয়ংবেঙ্গল, এবং এরপরে ক্রমান্বয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেন এবং পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও স্বামী বিবেকানন্দের মত যুগপুরুষদের বিকাশ সম্ভব হয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, ইউরোপীয়রা তৎকালীন ভারতীয়দের অনগ্রসর ও অন্ধবিশ্বাসী বলে মনে করতেন। আর রামমোহনই প্রথম একথা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, প্রাচ্যের দর্শন (বেদান্ত) ইউরোপের আলোকপ্রাপ্ত আধুনিকতার থেকে কোনো অংশে কম নয়, যদি তাকে কুসংস্কারমুক্ত করা যায়। বস্তুতঃ ইউরোপীয় প্রভাবকে অন্ধভাবে অনুকরণ না করে কিভাবে নিজেদের ঐতিহ্যকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত রূপে গড়ে তোলা যায়, তিনিই বাংলায় এর দিকনির্দেশনা সর্বপ্রথম দিয়েছিলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, শুধুমাত্র অন্ধ ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে থাকলে বাংলা স্থবির হয়ে পড়বে, আবার নিজের শিকড় ভুলে পাশ্চাত্যকে অন্ধ অনুকরণ করলেও আত্মপরিচয় নষ্ট হবে। আর তাই তিনি যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করা শিক্ষা, একেশ্বরবাদী উদার ধর্মনীতি এবং নারীর অধিকারসহ সার্বজনীন মানবিকতাকে একসূত্রে গেঁথেছিলেন। তাঁর এ সমন্বিত সমাজভাবনাই ঊনিশ শতকে বাংলাকে গোটা প্রাচ্যের আধুনিক চিন্তা ও নবজাগরণের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করেছিল।
রামমোহন রায়ের সময়ে বাংলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। ইতিহাস বলে যে, নবাবী আমলের অবসান এবং বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পরে বাংলার প্রশাসনিক ও সামাজিক অবকাঠামো ভেঙে পড়েছিল। আর রামমোহন এ পরিবর্তনকে অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের পরে বাংলায় যে নৈরাজ্য ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছিল, বৃটিশ শাসন সেখানে একধরণের আইনি ধারাবাহিকতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। বস্তুতঃ, তাঁর ইতিহাসভাবনায় এদেশে মোঘল শাসনের শেষ অধ্যায় ছিল প্রজার জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তাহীনতার সময়। ১৭৫৭ সালের পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রবর্তিত আদালত ব্যবস্থা, রেগুলেশন এবং সিভিল আইন প্রয়োগের ফলে বাংলায় একধরণের প্রাতিষ্ঠানিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা রামমোহনকে আশান্বিত করে তুলেছিল। আর একারণেই ১৮২৩ সালে প্রেস অর্ডিন্যান্সের বিরুদ্ধে ইংল্যাণ্ডের রাজার কাছে পাঠানো একটি আবেদনে এবং তাঁর বিভিন্ন লেখায় তিনি মোঘল শাসনের পতন ও বৃটিশ শাসনের আগমনকে ঈশ্বরীয় বিধান বা ‘ডিভাইন প্রভিডেন্স’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছিলেন—
“Divine Providence at length, in compassion to the complaints of these people, delivered them from the yoke of the former tyrants, and placed them under the government of the English–a nation who, above all others, are distinguished for their love of civil and political liberty …” (The English Works of Raja Rammohun Roy, Vol. 1, ‘Appeal to the King in Council against the Press Regulation’, Edited by Kalidas Nag and Debajyoti Burman, Sadharan Brahmo Samaj, 1945, p- 435)
অর্থাৎ—অবশেষে পরম করুণাময় ঈশ্বর এ দেশের মানুষের আর্তনাদে সদয় হয়ে পূর্বতন অত্যাচারী শাসকদের শৃঙ্খল থেকে এঁদের মুক্ত করলেন এবং ইংরেজ শাসনের অধীনে ন্যস্ত করলেন—যে জাতি বিশ্বের সমস্ত জাতির মধ্যে তাঁদের নাগরিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতি অনুরাগের জন্য বিশেষভাবে খ্যাত …”
এমনকি এরপরেও ১৮৩১ সালে ইংল্যাণ্ডে অবস্থান করবার সময়ে বৃটিশ পার্লামেন্টের সিলেক্ট কমিটির সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার সময়েও রামমোহন স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন যে, কিভাবে বৃটিশ আইনি প্রথা ভারতে ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
“I record my bold and fearless opinion, that the peasantry are in a far structure of security under the British Rule, in comparison with what they were under the Mahomedan Government, which exercised an absolute despotic power over their lives and properties.” (Exposition of the Practical Operation of the Judicial and Revenue Systems of India, Raja Rammohun Roy; Smith, Elder and Co., London, 1932, p: 68–69)
অর্থাৎ—আমি নির্ভীকভাবে আমার এ মতামত লিপিবদ্ধ করছি যে, মুসলমান বা মোঘল শাসনের অধীনে সাধারণ কৃষকদের জীবন ও সম্পত্তির উপর যে নিরঙ্কুশ স্বৈরাচার চলত, তার তুলনায় বৃটিশ শাসনে প্রজা ও কৃষকরা অনেক বেশি নিরাপত্তা ও সুশাসনের মধ্যে রয়েছে।
এছাড়া রামমোহন রায়ের এ দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর প্রধান জীবনীকারদের রচনাতেও অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উদঘাটিত হয়েছিল বলেই দেখতে পাওয়া যায়। তাঁরা দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, রামমোহন বৃটিশ শাসনকে অন্ধ দাসত্বের চোখে না দেখে ভারতবাসীর আধুনিকায়নের একটি মধ্যবর্তী ‘শিক্ষানবিশ পর্ব’ (Period of Apprenticeship) হিসেবেই মনে করেছিলেন। যেমন—অতীতে রামমোহনের জীবন ও রচনার সবথেকে নির্ভরযোগ্য এবং প্রথম দিকের পূর্ণাঙ্গ জীবনীকার সোফিয়া ডবসন কোলট তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছিলেন—
“Rammohun’s ideal was not the restoration of the old native despotism, whether Hindu or Musalman. He saw in the English Rule a necessity for the political education of India, a guarantee for civil order, and a bridge to European science and freedom.” (The Life and Letters of Raja Rammohun Roy, Sophia Dobson Collet, Edited by Dilip Kumar Biswas and Prabhat Chandra Ganguli, Sadharan Brahmo Samaj, Calcutta, 1962, p: 379–380)
অর্থাৎ—রামমোহনের আদর্শ কোনো প্রাচীন দেশীয় স্বৈরাচার—তা হিন্দু হোক বা মুসলমান—এর পুনরুত্থান ঘটানো ছিল না। তিনি বৃটিশ শাসনের মধ্যে ভারতের রাজনৈতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, নাগরিক শৃঙ্খলার নিশ্চয়তা এবং ইউরোপীয় বিজ্ঞান ও স্বাধীনতার দিকে পৌঁছানোর এক সেতু প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
অন্যদিকে অতীতের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অমলেশ ত্রিপাঠী রামমোহনের ঔপনিবেশিক আধুনিকতা ও রাজনৈতিক ভাবনার মূল্যায়ন করতে গিয়ে মোঘল উত্তরকাল ও বৃটিশ আইন প্রবর্তনের বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরে বলেছিলেন—
“রামমোহন মোঘল শাসনের শেষ পর্বের অরাজকতাকে দেখেছেন ইতিহাসের এক চরম বিপর্যয় হিসেবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, ব্রিটিশদের ‘Rule of Law’ বা আইনের শাসন প্রবর্তন ভারতীয়দের আইনি নিরাপত্তা দিয়েছে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার সেই ভিত্তি স্থাপন করেছে, যার ওপর ভর করে আধুনিক নাগরিক অধিকারের দাবি গড়ে তোলা সম্ভব।” (ইতালির রেনেসাঁস ও বাঙালির সংস্কৃতি, অমলেশ ত্রিপাঠী, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৯৪, পৃ: ৪২–৪৪ দ্রষ্টব্যঃ)
আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ভারতপথিক রামমোহন রায়’ নামক প্রবন্ধে রামমোহনের এ বৃটিশ আইনি কাঠামো গ্রহণ ও মোঘল নৈরাজ্য থেকে উত্তরণের মানসিকতাকে ব্যাখ্যা করে জানিয়েছিলেন—
“রামমোহন যখন দেখিলেন ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় জট পাকাইয়া কেবলি অরাজকতা ও আবর্তের সৃষ্টি করিতেছে, তখন তিনি ইংরেজকে ভারতের বিধাতাপ্রেরিত বন্ধু বলিয়া গ্রহণ করিতে কুণ্ঠিত হন নাই। তিনি বুঝিয়াছিলেন, ইংরেজের আইন ও শাসনপ্রণালীর মধ্য দিয়া ভারতের বিক্ষিপ্ত শক্তি এক আইনি ঐক্যে বাঁধিবে।” (চারিত্রপূজা, ‘ভারতপথিক রামমোহন রায়’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা, ১৯৮৮, পুনর্মুদ্রিত সংস্করণ, পৃ: ২১–২৩)
তবে গবেষকদের মতে, রামমোহন রায়ের এ বিশ্বাস কিন্তু বৃটিশ ঔপনিবেশিকতার অন্ধ তোষামোদ ছিল না। আদতে তাঁর এ দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে প্রধানতঃ দুটি বিচারবুদ্ধি কাজ করেছিল।
প্রথমতঃ, মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের পরে বাংলায় যে বর্গীর হামলা, স্থানীয় জমিদারদের অত্যাচার ও সুবাদারদের স্বেচ্ছাচারিতা তৈরি হয়েছিল, বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি ও আদালত প্রতিষ্ঠা সেযুগের সাধারণ মানুষের মনে আইনি ধারাবাহিকতার ধারণা তৈরি করেছিল।
দ্বিতীয়তঃ, রামমোহন এসময়ে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, আইনের শাসন থাকলে সরকারের বিরুদ্ধেও নাগরিকরা সুপ্রিম কোর্টে যেতে পারে (যা তিনি নিজে একাধিকবার করেছিলেন)। এ ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণা এর আগে মোঘল আমলে অনুপস্থিত ছিল।
তবে তিনি কখনোই ইংরেজদের অন্ধ সমর্থক ছিলেন না। আর তাই কোম্পানির নীলকরদের অত্যাচার, অতিরিক্ত ভূমিরাজস্ব আদায় এবং ভারতীয়দের প্রশাসনিক উচ্চপদে নিয়োগ না দেওয়ার বিরুদ্ধে বারবার সোচ্চার হয়েছিলেন। তাঁর স্পষ্ট মত ছিল যে, কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যনীতির কারণেই বাংলা তখন অর্থনৈতিকভাবে ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছিল। আর একারণেই ১৮৩১ সালে ইংল্যাণ্ড সফরকালে তিনি বৃটিশ পার্লামেন্টের সিলেক্ট কমিটির সমক্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিচারব্যবস্থা, রাজস্ব নীতি এবং অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে লিখিত সাক্ষ্য ও স্মারকপত্র প্রদান করেছিলেন। তাঁর প্রদত্ত এ দলিলগুলিকেই আজও বাংলায় কোম্পানির শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র প্রতিবাদের ঐতিহাসিক প্রমাণ বলে গণ্য করা হয়ে থাকে। এসময়ে তিনি কোম্পানির শাসনের কারণে দেশ থেকে কিভাবে বিপুল ধনসম্পদ বৃটেনে পাচার হচ্ছিল এবং এতে বাংলার অর্থনীতি পঙ্গু হচ্ছিল, তা অত্যন্ত নিখুঁত পরিসংখ্যানসহ তুলে ধরে বলেছিলেন—
“The annual drain of wealth from India to Great Britain, for which no equivalent return is made, has reduced the country to a state of extreme poverty … The monopoly of trade and the remittance of huge fortunes acquired by individuals, as well as the Company’s revenues, have gradually exhausted the resources of Bengal.” (The English Works of Raja Rammohun Roy, Vol. 3, ‘Remarks on Settlement in India by Europeans’ & ‘Evidence before the Select Committee’, Edited by Kalidas Nag and Debajyoti Burman, Sadharan Brahmo Samaj, Calcutta, 1947, p: 23–25)
অর্থাৎ—ভারত থেকে প্রতি বছর গ্রেট বৃটেনে বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ পাচার হচ্ছে, যার বিনিময়ে ভারত কিছুই ফেরত পাচ্ছে না। এটি দেশকে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে … বাণিজ্যে কোম্পানির একচেটিয়া আধিপত্য এবং ব্যক্তিবিশেষের উপার্জিত অর্থ ও কোম্পানির রাজস্ব থেকে বৃটেনে প্রেরিত অর্থ বাংলার অর্থসম্পদ ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে দিন দিন নিঃশেষ করে দিচ্ছে।
ইতিহাস বলে যে, ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদারদের সুবিধা দিলেও সাধারণ প্রজা ও কৃষকদের চরম শোষণের মুখে ফেলে দিয়েছিল। এসময়ে রামমোহন রায় প্রস্তাব করেছিলেন যে, জমিদারদের ওপর থেকে সরকারের রাজস্ব নির্দিষ্ট রাখবার পাশাপাশি সাধারণ কৃষক বা রায়তদের রাজস্বের পরিমাণও চিরদিনের জন্য স্থির করে দেওয়া হোক। তিনি বলেছিলেন—
“Under the present system, the rent demanded from the cultivators is so high that they are reduced to a state of misery and absolute destitution… The government extracts as much as possible, while the zamindars leave barely enough for the cultivators to keep body and soul together.” (Exposition of the Practical Operation of the Judicial and Revenue Systems of India, ‘Revenue System of India’, Raja Rammohun Roy, Smith, Elder and Co., London, 1832, p: 41–43)
অর্থাৎ—বর্তমান ব্যবস্থায় কৃষকদের কাছ থেকে যে অতিরিক্ত খাজনা দাবি করা হয়, তা তাঁদের চরম দুর্দশা ও সীমাহীন অভাবের মধ্যে নিপতিত করেছে … সরকার এর সর্বোচ্চ অংশ চুষে নিচ্ছে, অন্যদিকে জমিদাররা কৃষকদের জন্য কেবল বেঁচে থাকবার মত নূন্যতমটুকু রেখে বাকি সব কেড়ে নিচ্ছে।
এছাড়া তৎকালীন বাংলার কৃষক ও গ্রামীণ সামাজিক জীবনের ওপরে ইউরোপীয় নীলকরদের নৃশংস অত্যাচারও রামমোহনকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। আর তাই যদিও তিনি ইউরোপীয় পুঁজি ও উন্নত কৃষিপ্রযুক্তির সমর্থক ছিলেন, কিন্তু তবুও জোর করে নীলচাষ এবং চাষীদের উৎপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়েছিলেন।
“I regret to say that the conduct of many of the Indigo Planters towards the natives is harsh and oppressive … They frequently take the law into their own hands, force the cultivators to accept advances on unfair terms, and subject them to severe personal violence.” (The English Works of Raja Rammohun Roy, Vol. 3, ‘On the Indigo Planters and European Settlers’, Edited by Kalidas Nag and Debajyoti Burman, Sadharan Brahmo Samaj, Calcutta, 1947, p: 77–79)
অর্থাৎ—আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলছি যে, দেশীয় অধিবাসীদের প্রতি বহু নীলকরের আচরণ অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী … তাঁরা প্রায়শঃই আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, কৃষকদের অন্যায় শর্তে দাদন নিতে বাধ্য করে এবং তাঁদের ওপরে শারীরিক নির্যাতন চালায়।
এমনকি সেযুগের কোম্পানির প্রশাসনে শুধুমাত্র ইউরোপীয়দের উচ্চপদে বসানো এবং যোগ্য ভারতীয়দের নিম্নপদস্থ কর্মচারীতে পরিণত করে রাখবার নীতিকেও রামমোহন তীব্র আক্রমণ করে বলেছিলেন—
“The total exclusion of native Indians from all positions of trust and high responsibility in the administration of their own country is not only unjust, but degrades the character of the people and destroys their self-respect.” (Exposition of the Practical Operation of the Judicial and Revenue Systems of India, ‘Judicial System of India’, Raja Rammohun Roy, Smith, Elder and Co., London, 1832, p: 58–59)
অর্থাৎ—নিজেদের দেশ পরিচালনায় দায়িত্বশীল ও উচ্চ প্রশাসনিক পদগুলি থেকে দেশীয় ভারতীয়দের সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত রাখা কেবল চরম অন্যায়ই নয়, এটি ভারতীয় জাতির চরিত্রকে অবনমিত করে এবং তাদের আত্মমর্যাদা ধূলিসাৎ করে দেয়।
অন্যদিকে রামমোহনের এ অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও কোম্পানি শাসনের সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর পরবর্তী জীবনীকার ও প্রখ্যাত ঐতিহাসিকদের রচনাতেও বিশদভাবে উদঘাটিত হয়েছিল বলে লক্ষ্য করা যায়। এঁদের মধ্যে তাঁর প্রধান জীবনীকার সোফিয়া ডবসন কোলট দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, রামমোহন রায় কিভাবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কাছে ভারতীয় কৃষকদের রক্ষা ও অর্থনৈতিক মুক্তির দাবি পেশ করেছিলেন। তিনি এপ্রসঙ্গে নিজের গ্রন্থে লিখেছিলেন—
“Rammohun was no blind admirer of the East India Company. He stood before the British Parliament as the champion of the oppressed Ryots. He exposed the economic drain of Bengal and demanded a permanent limitation of the land tax on the actual cultivators.” (The Life and Letters of Raja Rammohun Roy, Sophia Dobson Collet, Edited by Dilip Kumar Biswas and Prabhat Chandra Ganguli, Sadharan Brahmo Samaj, Calcutta, 1962, p: 385–387)
অর্থাৎ—রামমোহন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কোনো অন্ধ প্রশংসাকারী ছিলেন না। তিনি শোষিত ও নিপীড়িত কৃষকদের পক্ষে তাদের রক্ষক হিসেবে বৃটিশ পার্লামেন্টের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বাংলার অর্থনৈতিক ক্ষয় বা ধনসম্পদ পাচারের চিত্র উন্মোচিত করেছিলেন এবং প্রকৃত চাষীদের ওপরে ভূমিসংক্রান্ত কর স্থায়ীভাবে সীমাবদ্ধ করবার দাবি জানিয়েছিলেন।
একইরকমভাবে বাঙালির নবজাগরণ ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক সুশোভন সরকার রামমোহনের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গির মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখেছিলেন—
‘রামমোহনই প্রথম ভারতীয় যিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যিক শোষণ এবং দেশ থেকে বিপুল অর্থ নিষ্ক্রমণের (Drain of Wealth) বিরুদ্ধে বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন। তিনি স্পষ্ট বুঝেছিলেন যে কোম্পানির বাণিজ্যনীতিই বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।’ (On the Bengal Renaissance, Susobhan Sarkar, People’s Publishing House, New Delhi, 1970, p: 26–28)
এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও রামমোহন রায়ের রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক দূরদর্শিতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন যে, রামমোহন কখনোই কোম্পানির অবিচারকে মেনে নেননি—
“রামমোহন ইংরেজকে গ্রহণ করিয়াছিলেন কিন্তু ইংরেজের অন্যায় ও শোষণকে কোনোদিন মাথা নোয়াইয়া স্বীকার করেন নাই। দেশের কৃষকের ওপর যে নিপীড়ন এবং ভারতের রাজকোষ হইতে বিলাতে যে অর্থ হরণ চলিতেছিল, তাহার বিরুদ্ধে তিনিই প্রথম রাজদ্বার পর্যন্ত প্রজার অভিযোগ পৌঁছাইয়া দিয়াছিলেন।” (চারিত্রপূজা, ‘ভারতপথিক রামমোহন রায়’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা, ১৩১৪ বঙ্গাব্দ, পুনর্মুদ্রণ ১৯৮৮, পৃ: ২৫–২৭ দ্রষ্টব্যঃ)
সুতরাং, সংক্ষেপে বলা যেতে পারে যে, রাজা রামমোহন রায়ের জাতীয়তাবাদী চেতনা কখনোই শুধুমাত্র সামাজিক সংস্কার বা ধর্মীয় আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং, তিনিই আধুনিক ভারতের প্রথম অর্থনৈতিক চিন্তাবিদ ও জাতীয়তাবাদী প্রবক্তা ছিলেন। বস্তুতঃ, কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যনীতি যে বাংলার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে, কৃষকরা অতিরিক্ত রাজস্ব ও নীলকরদের অত্যাচারে পিষ্ট হচ্ছে, এবং প্রশাসনিক বৈষম্যের কারণে দেশীয় বুদ্ধিজীবী সমাজ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে—এ কথাগুলি বৃটিশ শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রস্থলে গিয়ে সাহস ও তথ্যের সাথে তুলে ধরবার প্রথম ঐতিহাসিক দায়িত্ব তিনিই পালন করেছিলেন।
প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, ভারতে বৃটিশ শাসন ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রবর্তন নিয়ে রাজা রামমোহন রায়ের রাজনৈতিক ভূমিকা ও লেখালিখি পর্যালোচনা করলে আপাতদৃষ্টিতে তাঁর মধ্যে একধরণের বৈপরীত্য বা দ্বিচারিতা সহজেই চোখে পড়ে। কারণ, একদিকে তিনি যেমন বৃটিশ শাসনকে ‘ঈশ্বরপ্রেরিত আশীর্বাদ’ বলে প্রশংসা করেছিলেন, তেমনি অন্যদিকে আবার কোম্পানির শোষণ, নীলকরদের অত্যাচার, অর্থ নিষ্ক্রমণ এবং অধিকার হরণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এটি রামমোহনের ব্যক্তিস্বার্থজনিত কোনো ভণ্ডামি বা নৈতিক দ্বিচারিতা ছিল না; বরং এটি আসলে ঊনিশ শতকের সূচনালগ্নে তৎকালীন সামাজিক-ঐতিহাসিক পরিস্থিতি এবং রামমোহনের নিজস্ব মধ্যবিত্ত ও প্রবুদ্ধ সংস্কারমুখী দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতাজাত দ্ব্যর্থতা ছিল। এক্ষেত্রে প্রথমেই লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, মোঘল সাম্রাজ্যের পতন-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অরাজকতা প্রত্যক্ষ করবার পরেই রামমোহন বৃটিশদের আইনের শাসন, জুরি প্রথা এবং আইনি ধারাবাহিকতাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন যে, এটি ভারতবাসীকে ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বাদ দেবে। কিন্তু এর বদলে কিছু সময় পরেই তিনি নিজেই প্রত্যক্ষ করেছিলেন যে, এ আইনের শাসন শুধুমাত্র ইউরোপীয়দের নিরাপত্তার স্বার্থেই ব্যবহৃত হচ্ছে। আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একচেটিয়া বাণিজ্য ও অতিরিক্ত রাজস্বের মাধ্যমে বাংলাকে অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করছে। একারণেই ১৮৩১ সালে বৃটিশ পার্লামেন্টের সিলেক্ট কমিটির সামনে দাঁড়িয়ে রামমোহন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে কৃষকদের ওপরে জমিদার ও সরকারের অতিরিক্ত রাজস্বের চাপ এবং দারিদ্র্যের চিত্র অত্যন্ত সাহসের সাথে উন্মোচন করেছিলেন। কিন্তু একইসাথে ১৮২৯–১৮৩১ সাল নাগাদ তিনি আবার ভারতে মুক্ত বাণিজ্য এবং ইংরেজদের অনিয়ন্ত্রিত জমি কেনা ও বসতি স্থাপনের বিষয়টিকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। এসময়ে তাঁর যুক্তি ছিল যে, ইউরোপীয় মূলধন ও বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি এলে কৃষির উন্নতি হবে। কিন্তু বাস্তবে ইউরোপীয় নীলকররা যখন বাংলার কৃষকদের ওপরে চরম নির্যাতন চালাচ্ছিলেন, তখন রামমোহনের মত একজন দূরদর্শী সংস্কারক কেন তা পূর্ণাঙ্গ উচ্ছেদের বদলে নিয়ন্ত্রিত সমর্থনের পথে হেঁটেছিলেন—তা ইতিহাসবিদদের কাছে আজও এক বিতর্কিত ও দ্বিচারিতা হিসেবেই প্রতিভাত হয়।
রামমোহন নিজে আন্তর্জাতিকতাবাদী ছিলেন। ফরাসি বিপ্লব, আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা কিংবা নেপলসের মুক্তিসংগ্রামে তিনি আনন্দ মিছিল করেছিলেন, এবং এমনকি রাজকীয় ভোজের আয়োজনও করেছিলেন। অথচ নিজের দেশ ভারতের ক্ষেত্রে তিনি বৃটিশ শাসন দ্রুত শেষ হোক তা চাননি। বস্তুতঃ, ১৮২৩ সালে প্রকাশিত তাঁর বিভিন্ন লেখায় তিনি আরও বহু দশক ধরে ভারতের স্বার্থেই বৃটিশ শাসনের স্থায়িত্ব প্রার্থনা করেছিলেন বলেই দেখা যায়।
অতীতের অনেক ঐতিহাসিক রামমোহনের এ রাজনৈতিক অবস্থানকে ঊনিশ শতকের প্রথমার্ধের ঐতিহাসিক পরিস্থিতির আলোকে বিশ্লেষণ করেছিলেন। তাঁদের মত ছিল যে, রামমোহন একথা বিশ্বাস করতেন যে, শত শত বছরের সামাজিক গোঁড়ামি, বর্ণপ্রথা, কুসংস্কার এবং রাজনৈতিক সামন্ততন্ত্রে আচ্ছন্ন ভারতীয় সমাজ তখনও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মতো প্রস্তুত নয়। তিনি মনে করেছিলেন যে, বৃটিশদের অধীনতা হল ভারতের জন্য একধরণের শিক্ষানবিশ পর্ব। ইউরোপীয় বিজ্ঞান, গণিত, রাজনৈতিক দর্শন এবং আইনি অধিকার না শেখা পর্যন্ত বৃটিশদের বিদায় হলে ভারত আবার মধ্যযুগীয় অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
রামমোহন রায়ের জীবনেতিহাস থেকে জানা যায় যে, তিনি নিজে তাঁর সময়কার এক উদীয়মান বুর্জোয়া বা আধা-জমিদার ও বণিক শ্রেণীর প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে চাকরি করেছিলেন, কোম্পানির শেয়ার ও কাগজের কারবারে যুক্ত ছিলেন এবং জমিদারিতে অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। ফলে, সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার থেকে ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথেই তখন তাঁর শ্রেণীস্বার্থ ও আধুনিক ভাবনার একধরণের পরোক্ষ সংযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।
অন্যদিকে ঊনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ মূলতঃ শহরকেন্দ্রিক এবং প্রধানতঃ ইউরোপীয় ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ ছিল। তৎকালীন বুদ্ধিজীবীদের পক্ষে সাম্রাজ্যবাদের পূর্ণাঙ্গ শোষক চরিত্রটি অনুধাবন করা সম্ভব হয়নি; কারণ, বিশ্বজুড়ে আধুনিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ধারণা তখনও দানা বাঁধেনি। পরে বৃটিশ শাসনের ভালো দিক এবং খারাপ দিককে আলাদা করে দেখবার চেষ্টার ফলেই এ রাজনৈতিক দ্বৈততার সৃষ্টি হয়েছিল। অতীতে গবেষক বিনয় ঘোষ উল্লেখ করেছিলেন যে, রামমোহনের মত মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীরা তখন ইউরোপীয় ধনতন্ত্রের প্রগতিশীল রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন; কিন্তু ভারতে সে ধনতন্ত্র যে ঔপনিবেশিক রূপ নিয়ে শুধুই যে শোষণ চালাবে, একথা তাঁরা শুরুতে পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেননি। তাই তাঁদের চরিত্রে আইন মান্য করা ও একইসাথে অন্যায়ের প্রতিবাদ করবার দ্বিমুখী টানাপোড়েন লক্ষ্য করা যায়।
একইরকমভাবে ইতিহাসবিদ সুশোভন সরকারও জানিয়েছিলেন যে, এটি রামমোহনের কোনো ব্যক্তিগত ত্রুটি ছিল না; বরং, এটি তৎকালীন ঐতিহাসিক পরিস্থিতির এক অনিবার্য ফল ছিল। রামমোহন আসলে বৃটিশদের উদারনৈতিক ভাবধারা এবং বাস্তব ঔপনিবেশিক শোষণ—এ দুটির মধ্যেকার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
আর ডঃ রমেশচন্দ্র দত্ত ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, রামমোহন বৃটিশ শাসনের রাজনৈতিক রাজনৈতিক অবকাঠামো পছন্দ করলেও এর অর্থনৈতিক রাজস্বনীতিকে মেনে নেননি। তাই একাধারে প্রশংসাকারী ও সমালোচকের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে তাঁর মধ্যে আপাত-দ্বিচারিতার উদ্ভব হয়েছিল।
পরিশেষে বলা চলে যে, রামমোহন রায়ের চরিত্রে বা বক্তব্যে যে দ্বিচারিতা দেখা যায়, তা কোনো কপটতা বা ব্যক্তিগত সুবিধাবাদ ছিল না। এটি আসলে এক সন্ধিক্ষণের দূরদর্শী চিন্তাবিদের ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা ছিল বললেই ঠিক কথা বলা হয়। রামমোহন বৃটিশদের আধুনিক জ্ঞান, বিজ্ঞান ও আইনি কাঠামো ব্যবহার করে ভারতকে আধুনিক করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে এসেছিল নিছক মুনাফা লুটতে—সমাজ সংস্কার করতে নয়। আর এ দু’ ভিন্ন মেরুর সংঘাতের কারণেই রামমোহনের বক্তব্যে একদিকে বৃটিশ শাসনের প্রশংসা এবং অন্যদিকে এ শাসনের শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের দ্বৈত রূপ প্রত্যক্ষ করা যায়।




