ইতিহাসের দীর্ঘ করিডরে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের পদচিহ্ন সময় মুছে ফেলতে পারে না। শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও তাঁদের চিন্তা ফিরে আসে নতুন আলোয়, নতুন প্রশ্নে, নতুন সংকটে। কার্ল মার্কস তেমনই এক নাম। তিনি একাধারে দার্শনিক, অর্থনীতির তাত্ত্বিক এবং মানুষের জীবন, শ্রম আর বঞ্চনার এক গভীর পাঠক।
১৮১৮ সালের ৫ মে, জার্মানির ট্রিয়ার শহরে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি এমন এক পৃথিবীতে বড় হয়েছিলেন, যেখানে শিল্পবিপ্লবের ঝলমলে আলো যেমন ছিল, তেমনি তার ছায়ায় জমে উঠছিল অসংখ্য মানুষের দীর্ঘশ্বাস। কারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া উঠছিল, নগরসভ্যতা এগিয়ে যাচ্ছিল দ্রুত গতিতে, কিন্তু সেই অগ্রগতির ভেতরেও শ্রমিকের ক্লান্ত শরীর, ক্ষুধার্ত মুখ আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ যেন চাপা পড়ে যাচ্ছিল।
মার্কস সেই চাপা পড়ে থাকা মানুষের গল্প পড়তে চেয়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, সভ্যতার চাকাটি ঘোরে শ্রমিকের হাতে, অথচ সেই শ্রমের ফল ভোগ করে অন্য কেউ। এই অসমতার ভেতর থেকেই জন্ম নেয় তাঁর প্রশ্ন, তাঁর ক্রোধ, তাঁর দর্শন।
তাঁর লেখায় তাই কেবল তত্ত্ব নেই, আছে সময়কে বুঝে ওঠার এক নিরন্তর চেষ্টা। দাস ক্যাপিটাল যেন পুঁজিবাদের অন্তর্গত বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করার এক সাহসী গ্রন্থ। আর ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস-এর সঙ্গে লেখা কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো হয়ে ওঠে এক যুগের প্রতিবাদী উচ্চারণ। “বিশ্বের মজদুর এক হও” এই আহ্বান ছিল, ইতিহাসের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মতো।
মার্কসকে নিয়ে বিতর্ক আছে, থাকবে। তাঁর ভাবনার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সমালোচনাও কম হয়নি। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই, সমাজে বৈষম্য, ক্ষমতা আর সম্পদের সম্পর্ককে তিনি যে নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখেছিলেন, তা আজও বিস্ময় জাগায়।
আজ পৃথিবী বদলেছে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে অভূতপূর্ব গতিতে এগিয়ে নিয়ে গেছে। তবু কোথাও না কোথাও পুরোনো প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে আগের মতোই। ধনী আরও ধনী হয়, প্রান্তিক মানুষ তার প্রাপ্যের জন্য এখনো লড়ে যায়। সভ্যতার বাহ্যিক রূপ বদলায়, কিন্তু মানুষের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা বদলায় না।
এই কারণেই কার্ল মার্কস কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় নন। তিনি যেন এক অস্থির সময়ের আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের সমাজকে নতুন করে দেখতে পাই। তাঁকে স্মরণ করা মানে মানুষের মর্যাদা, সমতা ও মুক্তির সেই চিরন্তন স্বপ্নকে আবারও চেতনায় পুনর্জীবিত করা।
হয়তো পৃথিবী এখনো তাঁর কল্পিত সাম্যের সমাজে পৌঁছাতে পারেনি। তবুও যতদিন অন্যায় থাকবে, যতদিন শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর ন্যায়ের দাবি তুলবে, ততদিন কার্ল মার্কস বেঁচে থাকবেন মানুষের অসমাপ্ত স্বপ্নে।#



