কালের সনেট
এখন এখানে কেউ কারও পরিণত বন্ধু নয়
জল ধর্মে নেমে আসে, উত্তাপ সম্পর্কে বাষ্পগামী।
শব কিংবা শবের বাহক রূপে তারা জড়ো হয়
লুঠ করে, দান করে ক্লান্তিকর অস্পষ্ট প্রণামী।
নারীর গোপন ক্ষতে পা নামিয়ে শিলালিপি আঁকে
নিজেকে ভ্রমর মনে করে উড়ে যায় অন্য ফুলে।
অবিশ্বাস জন্ম নেয় গাছে, বীজে, অস্তিত্বের ফাঁকে
পৃথিবীতে কারণ নির্দিষ্ট হয় সঙ্কটের মূলে।
মৃত্তিকার পরাজয় মেনে নেয় রাতের আকাশ
খোলস ফাটিয়ে ঢেলে দেয় অনিবার্য অন্ধকার
ঐতিহ্য নক্ষত্রগণ হাঁফ ছেড়ে ক্রমশ প্রকাশ
করে নিত্য সবিতাকে, দীপ্ত, বুদ্ধি, ভ্রম, নির্বিকার।
ঘুম থেকে ওঠে শিশু, পাখি এসে বসে তার কোলে
বন্ধু হয়, এমন নিশ্চয় হবে, ভালো হয় হলে।
কাঁকড়া কল্যাণ
আমার খাবার হবে বলে আজ একটা কাঁকড়া ঘরে উঠে এলো।
হাঁড়ি চাঁপা দিয়ে আমি ওকে বন্দী করে রেখেছি অনেকক্ষণ
হাঁড়িটা কিছুটা ফাঁক করে দেখি ইষ্টনাম জপছে হাঁটু মুড়ে।
কিছুক্ষণ শিকার ও শিকারীর খ্যালাটুকু খেলে নিতে নিতে
আমার স্নানের বেলা এসে যায়, তাড়া দেয় আমার শিকারি—
আমাকে নির্দেশ দেয়, আমি ভেঙে ফেলি তার আলিঙ্গন বাহু।
এমন সুযোগ বেশি আসে না, থানায় পুলিশের বেয়াদপি মনে পড়ে
মানবাধিকার চাপে এখন অবশ্য তারা সমাজবিরোধীদের কফি দিয়ে বসায় টেবিলে।
নিতান্ত জঙ্গলে থাকি, কাকে মারি কাকে খাই, কারোর দ্যাখার কথা নয়।
কাঁকড়ার কল্যাণে আমি দুপুরে দু-মুঠো ভাত বেশি খেয়ে ফেলি—
ডাক্তার বলেন নাকি এর ফলে ক্যানসার হবে না আর আমার কখনো
কিন্তু অপরাধবোধ বেড়ে গেলে হৃদযন্ত্র থেমে যেতে পারে।
রঙের তামাশা
মৃত্যু নিয়ে এখনও তামাশা করছ রাস্তায় দাঁড়িয়ে
রং খেলছ যে যেমন মৌতাতে রয়েছ
নীল লাল হলুদ বেগুনি কারও হাত সাদা নয়।
মাটি শুঁকে শুঁকে মেঘ ওড়াউড়ি করে
বৃষ্টি যে কখন কোন নদীকে বাহন করে সমুদ্রে পৌঁছবে
বালিকা সেসব জানে না, সে শুধু জানে
বৃষ্টি হলে পুকুরে সাঁতার দেবে এপাড় ওপাড়
স্কুলে গিয়ে ডিম না পাক, খিচুড়ি পাবে।
সে জানত না কালো মেঘ ঘিরে ধরবে তাকে
কাঠের আগুন জ্বেলে খিচুড়ি বানাবে
বনমানুষেরদল, তারা গিলে ফেলবে তাদের থাবায়
তারপর চারদিক আলো করে শুরু হবে
রঙের তামাশা, ঠিক আর একটা বনভোজনের
খেলা শুরু না-হওয়া পর্যন্ত।
মন্দাক্রান্তা
বন্ধন মুক্তির এখানে এত স্বাদ, বলব শুনবার কোথায় লোক
নির্বাক সঙ্গীত লিখেছি কবিতায়, ইচ্ছা পিঞ্জর প্রকাশ হোক।
ঝর্ণার উচ্ছ্বাস থাকে না সাগরের, দগ্ধ সৈকত বিরাম চায়
প্রস্তর পিণ্ডের ওপরে চলাচল, রক্ষা করবার আছেন সাঁই।
যক্ষের মেঘদূত নিজেকে মনে হয়, ছত্র রোদ্দুর, প্রেসার হায়
মারকেট নয় মল, হাটে ও বাজারের কিস্তি শুধবার থাকেও দায়।
তারপর ঈশ্বর দিয়েছে এত দান, স্বপ্ন-শৃঙ্খল লোপাট হয়
মন্দাক্রান্তায় করেছি বসবাস শঙ্খ-সত্যেন পথের জয়।
লতাগাছ
লতাগাছটি লেখাপড়া জানে না মোটেও
অথচ সবার মন জয় করে নেয় ছায়া দিয়ে
মা পুঁতেছিলেন, তাকে অনেকেই ভেবেছিল আগাছা, আপদ
মা কেবল বড়ো বড়ো চোখ করে তাকাতেন তাদের স্পর্ধায়।
তারাও নীরবে মেনে নিত, সরে যেত পাশ থেকে
নিজেদের অক্ষমতা ঢাকা দিতে দিতে—
আপন মানুষ চেনে না আপনজনকে!
মা কখনও উত্তাপে অস্থির হলে কিংবা একাকীত্বে
মায়ের যখন মন খারাপ হয়েছে
লতাগাছ ঠিক টের পেত, ছায়া দিয়ে, শোভা দিয়ে
আগলে রাখত মাকে, তারা একে অপরের সমব্যথী
হয়ে বসবাস করত ঘরে ও উঠোনে
মা চলে গেছেন, মাকে ছায়াসঙ্গী করে
একা একা সারা বাড়ি পাক খায় আর
দুয়ারের দিকে শুঁড় বাড়িতে অপেক্ষা করে থাকে
কে কখন আসবে, কাকে কীভাবে কতটা শোভা দেবে
কেউ তাকে আবার না ভাবতে পারে আগাছা আপদ!
আমি খুব লজ্জা পাই, দরদীয়া লতাগাছ না থাকলে আমি কি
প্রকৃত আপনজনকে কখনও চিনতাম!




