ঔপনিবেশিক কলকাতার বাবুসংস্কৃতি ও পোষা প্রাণীর বিবাহ-উৎসব

ইতিহাস বলে যে, খৃষ্টীয় আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পলাশীর যুদ্ধের পরে ভাগীরথী নদীর পূর্বতীরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে কলকাতা নগরের দ্রুত উত্থান ঘটেছিল। আর অতঃপর বাংলায় স্থায়ীভাবে বৃটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই এ শহরে এক নতুন সামাজিক গোষ্ঠীর বিকাশ ঘটেছিল, যাঁরা ইতিহাসে ‘বাবু’ হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। তবে আক্ষরিক অর্থে এটি তখন একটি সম্মানসূচক শব্দ হলেও ‘colonial Calcutta’–র প্রেক্ষাপটে ‘বাবু’ শব্দটি শুধু একটি শ্রেণী বা পদবি ছিল না; বরং, তা এক বিশেষ জীবনধারা, রুচি, মানসিকতা এবং সামাজিক ব্যবস্থারও প্রতীক ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, কলকাতা যখন কোম্পানির প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক রাজধানী হয়ে উঠছিল, তখন এখানে বৃটিশ বণিকদের দেশীয় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে একদল বাঙালির প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। এঁরা মূলতঃ কোম্পানির মুৎসুদ্দি, দেওয়ান, বেনিয়ান ও ইজারাদার ছিলেন। এরপরে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ভূমিনির্ভর আভিজাত্যকে শহরের নগদ অর্থনির্ভর ব্যবসায়িক আভিজাত্যে রূপান্তরিত হতে সাহায্য করলে বৃটিশদের সঙ্গে বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব এবং জমিদারি ক্রয় করে শোভাবাজার রাজবাড়ির নবকৃষ্ণের মত ব্যক্তিত্ব, দেওয়ান রামদুলাল দে, মতিলাল শীল, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রমুখ বিপুল ধনসম্পদের মালিক হয়ে উঠেছিলেন; এবং এ বিপুল পুঁজিনির্ভর নব্য ধনী সমাজই তৎকালীন কলকাতায় বাবু সংস্কৃতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। ঊনিশ শতকের কলকাতার এসব বাবুদের জীবনযাত্রা চরম বৈপরীত্য ও বাহ্যিক আড়ম্বরে ভরা ছিল। একইসাথে এসময়ে তাঁদের দৈনন্দিন জীবনচর্চার কিছু কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্যের কথাও ইতিহাসে পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে প্রথমেই এখানে ইউরোপীয় ও দেশীয় স্থাপত্যের মিশ্রণে তৈরি বাবুদের বিশাল বিশাল প্রাসাদোপম অট্টালিকা বা বাগানবাড়ির কথা উল্লেখ্য; যেগুলোর মধ্যে আজও শোভাবাজার, জোড়াসাঁকো, পাথুরিয়াঘাটা, মার্বেল প্যালেস ইত্যাদিকে এর অন্যতম উদাহরণ বলে গণ্য করা হয়ে থাকে। এছাড়া নিজস্ব ধনসম্পদের প্রদর্শনীও এ বাবু সংস্কৃতির প্রধান অঙ্গ ছিল। বিশেষ করে তাঁদের দুর্গাপূজায় বিপুল অর্থব্যয়, বাঈজি নাচ, বুলবুলি পাখির লড়াই, পায়রা ওড়ানো, এমনকি বেড়ালের বিবাহ থেকে শুরু করে নিজের পুত্রের বিবাহে লক্ষাধিক টাকা খরচের মত চরম অপব্যয়ের কথাও ইতিহাসে নথিবদ্ধ রয়েছে। আবার এসব বাবুরা পোশাকে ও চালচলনে সাহেবি অনুকরণ ও দেশীয় ঐতিহ্যের এক বিচিত্র সংমিশ্রণ ছিলেন; এবং তাঁদের ধুতি-পাঞ্জাবির সঙ্গে কোঁচানো চাদর, পাম্প শু এবং অনেক ক্ষেত্রে বিলিতি আতর বা মদের ব্যবহারও এসময়ে অনেকের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করেছিল বলে জানা যায়। তবে এ বাবুসমাজ অবশ্য তখন শুধু আমোদ-প্রমোদেই লিপ্ত ছিল না; বরং, তৎকালীন কলকাতার সমাজ-রাজনীতিতেও তাঁদের প্রভাব অত্যন্ত গভীর ছিল। কিন্তু একইসাথে এ সমাজ একক কোনো আদর্শে পরিচালিত হয়েছিল বলে ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায় না। যেমন—সেযুগে রাজা রাধাকান্ত দেবের নেতৃত্বে রক্ষণশীল গোষ্ঠী যেমন প্রাচীন হিন্দুরীতি ও সমাজকাঠামো রক্ষা করবার বিষয়ে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল, অন্যদিকে তেমনি প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের মত প্রগতিশীল বাবুরা পাশ্চাত্য শিক্ষা, আধুনিক বাণিজ্য এবং রামমোহন রায়ের সামাজিক সংস্কার আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। তাছাড়া শিক্ষাবিস্তার ও সংস্কৃতিচর্চার পৃষ্ঠপোষকতাও তৎকালীন কলকাতার বাবুদের একটি উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক দিক ছিল বলা চলে। যেমন—১৮১৭ সালে হিন্দুকলেজ বা বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মতিলাল শীল, গোপীমোহন দেব প্রমুখ বাবুদের অবদান অপরিসীম ছিল। অন্যদিকে যাত্রা, কথকতা, কবিগান এবং পরবর্তীতে থিয়েটার বা নাট্যমঞ্চ গড়ে তোলবার ক্ষেত্রেও এসব বাবুদের আর্থিক সহায়তাই তখন মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল। আবার বাংলা মুদ্রণ শিল্পের বিকাশ এবং সংবাদ কৌমুদী, সমাচার দর্পণ ইত্যাদি ধরণের পত্রিকা পরিচালনা করবার ক্ষেত্রেও এসব বাবুরাই তখন সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন বলে ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই এ বাবু সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ ও নৈতিক অবক্ষয় তৎকালীন তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গসাহিত্যে প্রতিফলিত হতে শুরু করেছিল। যেমন—১৮৬২ সালে প্রকাশিত কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’, এবং ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’–এ বাবুদের অসারতা, মদ্যপান ও ভণ্ডামির কঠোর সমালোচনা করা হয়েছিল। এসব ছাড়া তখন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ব্যঙ্গাত্মক কবিতায় এবং পরবর্তীতে পটুয়া চিত্রশিল্পেও (কালীঘাট পট) বাবু সংস্কৃতির বিকৃতিকে তুলে ধরা হয়েছিল। যাই হোক, ইতিহাস বলে যে, ঊনিশ শতকের শেষের দিক থেকেই যৌথ কারবারে বৃটিশ নীতিগত বৈষম্য, জমিদারির আয় হ্রাস এবং পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত আধুনিক পেশাদার মধ্যবিত্ত শ্রেণির (শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সিভিল সার্ভিস কর্মী) উত্থানের ফলে পুরোনো বাবুসংস্কৃতি শেষপর্যন্ত নিজের প্রভাব হারাতে শুরু করেছিল। তবে এসব সত্ত্বেও বলা চলে যে, ঔপনিবেশিক কলকাতার বাবুরা এক সন্ধিক্ষণের সৃষ্টি ছিলেন। তখন একদিকে ঔপনিবেশিক শাসনের অনুগ্রহপুষ্ট হয়ে পরজীবী বিলাসিতা ও অপব্যয়ে মেতে থাকা, আর অন্যদিকে আধুনিক কলকাতার শিক্ষা, নগর সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করা—এ দুটি মিলেই ইতিহাসে তাঁদের পাকাপাকিভাবে একটা জায়গা হয়ে গিয়েছিল। আর তাঁদের হাত ধরেই কলকাতা তখন এক গ্রামীণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র থেকে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় নগরী এবং আধুনিক বাঙালি সংস্কৃতি সৃষ্টির কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল।

সুতরাং, উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা চলে যে, খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধ থেকে ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজধানী কলকাতাকে কেন্দ্র করে যে অভূতপূর্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক এক শ্রেণীর বিকাশ ঘটেছিল—তাঁরাই ইতিহাসে ‘কলকাতা বাবুসমাজ’ বা ‘বাবু সংস্কৃতি’ নামে পরিচিত। দেওয়ানি লাভ, কোম্পানির হয়ে ও ব্যক্তিগতভাবে ইংরেজ ব্যবসায়ীদের মুৎসুদ্দিগিরি, বেনিয়ানি এবং বাজার ইজারাদারির মাধ্যমে এ নব্যধনী শ্রেণীর প্রতিনিধিরা তখন স্বল্প সময়েই বিপুল ধনসম্পদের মালিক হয়ে উঠেছিলেন। আর সেসময়ে তাঁদের নিজেদের আভিজাত্য জাহির করা, সামাজিক প্রতিপত্তি প্রদর্শন এবং বৃটিশ প্রশাসনিক মহলে প্রভাব বিস্তারের তাগিদে ব্যক্তিগত আমোদ-প্রমোদ ও উৎসবে যে বেহিসাবি অর্থের অপচয় ঘটেছিল, সেটার অন্যতম বিস্ময়কর ও অদ্ভুত দৃষ্টান্ত ছিল নিজেদের পোষা প্রাণী—বিশেষ করে বেড়াল ও বানরের—ঘটা করে বিবাহ দেওয়া। অন্যভাবে বললে, সেযুগে পূজাসংক্রান্ত উৎসবের বাইরে নিজের পোষা বেড়াল বা বানরের জাঁকজমকপূর্ণ বিবাহ-উৎসবই ঔপনিবেশিক কলকাতায় বাবুদের বিলাসব্যসনের অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন ছিল। যেমন—শোভাবাজার রাজবাড়ির রাজা রাজকৃষ্ণ দেব (১৭৮২–১৮২৩; যিনি রাজা নবকৃষ্ণের দত্তক পুত্র ছিলেন) তাঁর পোষা বেড়ালের বিবাহ দিতে গিয়ে তৎকালীন সময়ে ২৫,০০০ টাকারও বেশি খরচ করেছিলেন। ঊনিশ শতকের সূচনালগ্নের এ ২৫,০০০ টাকার ক্রয়ক্ষমতা বর্তমানে কয়েক কোটি টাকার সমতুল্য। অতীতে তৎকালীন বাংলা সাময়িকপত্র ও সংবাদপত্রের আর্কাইভ থেকে তথ্য সংকলন করে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর আকর গ্রন্থে রাজকৃষ্ণের এ বেড়াল বিবাহের কথা নথিভুক্ত করে জানিয়েছিলেন—
“রাজা নবকৃষ্ণের দত্তকপুত্র রাজকৃষ্ণ দেব পোষ্য বিড়ালের বিবাহে পঁচিশ হাজার টাকার অধিক ব্যয় করিয়াছিলেন। এই বিবাহে কলিকাতার তাবৎ গণ্যমান্য হিন্দু আমন্ত্রিত হন এবং নিমন্ত্রিত অভ্যাগতদিগকে নানা প্রকার উপঢৌকন ও নানাবিধ মিষ্টান্ন দ্বারা পরিতুষ্ট করা হয়। উক্ত উৎসবে নাচগান, রোশনাই ও বাজির যে আড়ম্বর হইয়াছিল, তাহা তৎকালীন সাহেবদিগকেও তাক লাগাইয়া দেয়।” (সংবাদপত্রে সেকালের কথা, প্রথম খণ্ড, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সংকলিত ও সম্পাদিত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯৩২, পুনর্মুদ্রণ ১৩৭৭ বঙ্গাব্দ/১৯৭০, পৃ: ৩৫০–৩৫২ দ্রষ্টব্যঃ)

তৎকালীন ইংরেজি পত্রিকা ‘Calcutta Gazette’ এবং সামাজিক নথির তথ্যের ওপরে ভিত্তি করে ইতিহাসবিদ প্রমথনাথ মল্লিক এ অদ্ভুত খরচের বর্ণনা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছিলেন—
“রাজা রাজকৃষ্ণ দেব বাহাদুর তাঁহার গৃহপালিত মার্জারের পরিণয় উৎসবে যে টাকার শ্রাদ্ধ করিয়াছিলেন, তাহার পরিমাণ তৎকালীন সময়ে প্রায় ২৫,০০০ টাকার অধিক ছিল। নিমন্ত্রিতদের জন্য সুদূর বারাণসী ও নদীয়া হইতে পণ্ডিতদের আনয়ন করা হয় এবং তাঁহাদিগকে বিদায়দণ্ড স্বরূপ মোটা টাকা প্রদান করা হয়। এই বিবাহে অন্নসংস্থান ও যাত্রাগানের যে বিপুল আয়োজন হইয়াছিল, তাহা ব্রিটিশ সংবাদপত্রের সাংবাদিকদিগকেও বিস্মিত করিয়াছিল।” (কলিকাতার কথা, দ্বিতীয় খণ্ড: সামাজিক ইতিহাস, প্রমথনাথ মল্লিক, প্রমথ প্রকাশনী, কলকাতা, ১৯৩১, পৃ: ৯২–৯৪ দ্রষ্টব্যঃ)

পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর গ্রন্থে ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের কলকাতার সামাজিক চরিত্র উন্মোচন করতে গিয়ে শোভাবাজার রাজবাড়ির এ বেড়াল বিবাহের বিশদ বর্ণনা দিয়ে মন্তব্য করেছিলেন—
“শোভাবাজারের রাজবাটিতে রাজা রাজকৃষ্ণ দেব মহাশয়ের বিড়ালের বিবাহ এক ঐতিহাসিক ঘটনায় পরিণত হইয়াছিল। প্রায় ২৫,০০০ টাকার উপর ব্যয় করিয়া এই বিবাহ দেওয়া হয়। কলিকাতার সমস্ত নামজাদা লোক সেই বিবাহে উপস্থিত হইয়াছিলেন। ঢাকা ও মুরশিদাবাদ হইতে বৈষ্ণব ও বাউল আনাইয়া গান করানো হইয়াছিল। রাজপরিবারের এই অর্থপ্রদর্শনী তৎকালীন সমাজের নৈতিক অবক্ষয়কেই নির্দেশ করে।” (রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ, শিবনাথ শাস্ত্রী, নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯০৩, পরবর্তী সংস্করণ ১৯৮৩, পৃ: ৪৩–৪৪ দ্রষ্টব্যঃ)

আর তৎকালীন সাময়িকপত্র এবং ক্যালকাটা রিভিউয়ের রিপোর্ট উদ্ধৃত করে গবেষক বিনয় ঘোষ এপ্রসঙ্গে লিখেছিলেন—
“উনিশ শতকের সূচনালগ্নে নব্য বাবুদের অর্থপ্রদর্শনের যে উন্মাদনা দেখা যায়, রাজা রাজকৃষ্ণের বিড়াল বিবাহ তাহার শীর্ষবিন্দু। ২৫,০০০ টাকার অধিক মূল্যের এই বিলাসব্যসন কেবল একটি বিড়ালের বিয়েই ছিল না, তাহা ছিল তৎকালীন ঔপনিবেশিক কলকাতার হঠাৎ-ফুলেফেঁপে ওঠা আভিজাত্যের এক কদর্য প্রতিযোগিতা। স্থানীয় ইংরেজি পত্রিকায় এই ঘটনাকে ‘অদ্ভুত প্রাচ্য অপব্যয়’ (Extravagant Oriental Luxury) বলে আখ্যা দেওয়া হইয়াছিল।” (সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, দ্বিতীয় খণ্ড, বিনয় ঘোষ, প্যাপিরাস, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯৬৩, পুনঃপ্রকাশ ১৯৭৮, পৃ: ১১২–১১৪ দ্রষ্টব্যঃ)

অনুরূপভাবে সমকালে রামদুলাল দে সরকারের দু’পুত্র—আশুতোষ দেব (ছাতুবাবু) এবং প্রমথনাথ দেব (লাটুবাবু)–এর মত ধনকুবেরদের প্রাসাদেও তখন পোষা প্রাণী ও পাখিদের (যেমন—বুলবুলির লড়াই বা বেড়ালের বিবাহের) পেছনে দেদার অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল বলে জানা যায়। এবিষয়ে তখন ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকায় যে সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছিল, তা নিম্নরূপ ছিল বলে দেখা যায়—
“কলিকাতার ধনকুবের রামদুলাল দেব মহাশয়ের তনয় শ্রীযুত আশুতোষ দেব ও প্রমথনাথ দেব বাটিস্থিত পোষ্য মার্জার ও পক্ষীদিগের নিমিত্ত যে বিপুল অর্থ ব্যয় করিতেছেন, তাহা সাধারণের বিস্ময় উৎপাদন করিয়াছে। বিশেষতঃ বুলবুলির লড়াই ও মার্জারের বিবাহ উপলক্ষে যে বিচিত্র আয়োজন ও আহারাদির ব্যবস্থা করা হয়, তাহাতে সহস্র সহস্র মুদ্রা অকাতরে ব্যয় হইতেছে। এ প্রকার আমোদ-প্রমোদের উদ্দেশ্যে নদীয়া ও বারাণসী হইতে সমাগত পণ্ডিতদিগকে প্রচুর বিদায়দণ্ড প্রদান ও নর্তকীদিগের নাচগানের বায়না প্রদান করা হইয়াছে।” (সংবাদপত্রে সেকালের কথা, প্রথম খণ্ড, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সংকলিত ও সম্পাদিত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯৩২, পুনর্মুদ্রণ ১৯৭০, পৃ: ৩৫৪–৩৫৬ দ্রষ্টব্যঃ)
অন্যদিকে, শ্রীরামপুর থেকে প্রকাশিত সমকালীন ইংরেজি পত্রিকা ‘Friend of India’–তে ছাতুবাবু-লাটুবাবুদের বুলবুলির লড়াই ও আমোদ-প্রমোদে অতিরিক্ত অর্থ অপচয়ের কড়া সমালোচনা করে যে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল—
“The heirs of the late Ramdulal Dey, Baboo Asutosh Deb and Promothonath Deb, are squandering vast sums of money on extravagant amusements involving their pets and birds, notably fighting bulbuls and cat nuptials …” (সাময়িকপত্রে বাংলার সমাজচিত্র, দ্বিতীয় খণ্ড, বিনয় ঘোষ, প্যাপিরাস, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯৬৩, পুনঃপ্রকাশ ১৯৭৮, পৃ: ১২৫–১২৭ দ্রষ্টব্যঃ)

অর্থাৎ—কলকাতার প্রখ্যাত ব্যবসায়ী রামদুলাল দে-র উত্তরসূরি বাবু আশুতোষ দেব ও প্রমথনাথ দেব তাঁদের বিপুল ধনসম্পদের সিংহভাগ পোষা প্রাণী ও পাখিদের কেন্দ্র করে আয়োজিত অদ্ভুত সব উৎসবে ব্যয় করছেন। সম্প্রতি তাঁদের গৃহে বুলবুলির লড়াই এবং পোষা বিড়ালের জমকালো উদযাপনে যে অর্থ শ্রাদ্ধ করা হয়েছে, তা ধনমদের এক আশঙ্কাজনক দৃষ্টান্ত। শহরের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এই অনর্থক আড়ম্বরে উপস্থিত হয়ে ভুরিভোজে অংশ নিয়েছেন।

পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী সমসাময়িক সংবাদপত্র ও প্রবীণদের স্মৃতিচারণ থেকে তাঁর গ্রন্থে ছাতুবাবু ও লাটুবাবুর বেড়ালের বিবাহ এবং বুলবুলির লড়াইয়ের নেশার বর্ণনা দিতে গিয়ে জানিয়েছিলেন—
“রামদুলাল দে মহাশয়ের দুই পুত্র ছাতুবাবু ও লাটুবাবু পিতৃধন উড়াইতে কৃপণতা করেন নাই। তাঁহাদের বাটীতে পোষা বিড়ালের বিয়ে ও বুলবুলির লড়াই এক মহোৎসবে পরিণত হইত। বুলবুলি পাখিকে যুদ্ধের কৌশল শিখাইবার জন্য অভিজ্ঞ লোক নিযুক্ত ছিল এবং জয়ের পর বিজয়ী পক্ষকে হাজার হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হইত। কেবল বিড়াল বা বুলবুলি নহে, নব্য বাবুদের এই পশুপ্রীতি মূলত ছিল নিজেদের বিত্ত ও সামাজিক প্রতিপত্তি প্রদর্শনের কদর্য প্রতিযোগিতা।” (রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ, শিবনাথ শাস্ত্রী, নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯০৩, পুনর্মুদ্রণ ১৯৮৩, পৃ: ৪৫–৪৭ দ্রষ্টব্যঃ)

আর তৎকালীন সময়ের অন্যতম প্রধান ইংরেজি পত্রিকা ‘Calcutta Gazette’–এ এবিষয়ে প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে প্রমথনাথ মল্লিক তাঁর গ্রন্থে লিখেছিলেন—
“ছাতুবাবু ও লাটুবাবুর বিডন স্ট্রিটের প্রাসাদে বুলবুলির যুদ্ধ ও পোষা মার্জারের বিবাহের আসরে যেসব সাহেব ও ভারতীয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি উপস্থিত হইতেন, তাঁহাদের অভ্যর্থনার চিত্র প্রেসের দৃষ্টি এড়ায় নাই। পত্রিকায় প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী—‘আশুতোষ দেবের বাটিতে পক্ষীযুদ্ধের উন্মাদনা এমন পর্যায়ে পৌঁছাইয়াছিল যে, এক একটি বুলবুলি পাখির খাদ্য ও পরিচর্যার পেছনেই মাসিক বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ থাকিত।’ …” (কলিকাতার কথা, দ্বিতীয় খণ্ড: সামাজিক ইতিহাস, প্রমথনাথ মল্লিক, প্রমথ প্রকাশনী, কলকাতা, ১৯৩১, পৃ: ৯৬–৯৮ দ্রষ্টব্যঃ)

বস্তুতঃ, এধরণের উৎসবে তখন শুধুই পশুর বিবাহ দেওয়া হত না; বরং, বর ও কনের রূপক ধরে দুটি পোষ্যকে মহামূল্যবান রেশমি পোশাক, সোনার অলঙ্কার ও রত্নে সজ্জিতও করা হত। এমনকি সুসজ্জিত পালকিতে করে এসব পশুগুলিকে এক বাড়ি থেকে অন্যবাড়িতে শোভাযাত্রা সহকারে নিয়ে যাওয়া হত। আর আলোকসজ্জা, বাজনা এবং শত শত নিমন্ত্রিত অতিথির ভুরিভোজে পুরো শহর এতে মুখরিত হয়ে উঠত। অতীতে ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত সমাজসংস্কারক ও লেখক শিবনাথ শাস্ত্রী কলকাতা বাবুদের এ চরম অপব্যয় ও বিকৃত মানসিকতার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তাঁর গ্রন্থে ছাতুবাবু-লাটুবাবুদের পিতা রামদুলাল দে’র বেড়ালের বিবাহের ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করে জানিয়েছিলেন—
“রামদুলাল দে মহাশয় স্বীয় প্রিয় বিড়ালের বিবাহের সময় বহু অর্থ ব্যয় করিয়াছিলেন। সেই বিবাহে কলিকাতা সহরের সমস্ত প্রধান প্রধান লোক আহূত হইয়াছিলেন এবং আহারাদিতে পরম পরিতুষ্ট হইয়াছিলেন। কেবল বিড়ালের বিবাহ নহে, বানরের বিবাহ দিবার জন্য লক্ষ টাকা ব্যয়ের ইতিহাসও পাওয়া যায়। ধনমদের এ এক অদ্ভুত প্রকাশ।” (রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ, শিবনাথ শাস্ত্রী, নিউ এজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯০৩, পরবর্তী সংস্করণ ১৯৮৩, পৃ: ৪২–৪৩ দ্রষ্টব্যঃ)

সমাজ-ইতিহাসবিদ বিনয় ঘোষ আঠারো-ঊনিশ শতকের কলকাতার নব্য আভিজাত্য শ্রেণি (যেমন—রামদুলাল দে, শোভাবাজার রাজবাড়ি বা মল্লিক পরিবার প্রমুখ) কিভাবে কোম্পানির দালালি ও মুৎসুদ্দিগিরি করে রাতারাতি ধনকুবের হয়ে উঠেছিল; এবং নিজেদের উপার্জিত অর্থ বেড়াল ও বানরের বিবাহে অপচয় করেছিল, এর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছিলেন—
“কোম্পানির আমলে মুৎসুদ্দি ও বেনিয়ানদের রাতারাতি যে হঠাৎ-ধন লাভ হয়েছিল, তার সামাজিক প্রভাব হয়েছিল প্রতিক্রিয়াশীল। নিজেদের সামাজিক আভিজাত্য ও নামডাক জাহির করার জন্য পোষা বিড়াল ও বানরের কোটি টাকার বিয়ে দেওয়া, সাধারণ মানুষের কাছে ধনসম্পদের এক অশালীন প্রদর্শন বৈ আর কিছু ছিল না।” (কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড, বিনয় ঘোষ, বাক-সাহিত্য, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯৭৫, পুনঃপ্রকাশ ১৯৯৯, পৃ: ১৫৪–১৫৬ দ্রষ্টব্যঃ)

কলকাতার স্থানীয় ইতিহাসবিদ প্রমথনাথ মল্লিক প্রাচীন কলকাতার বাবুসংস্কৃতি এবং তাঁদের অদ্ভুত শখ নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করে জানিয়েছিলেন—
“কলিকাতার নব্য ধনী ধনিকেরা যখন অর্থবলের চরম শিখরে, তখন ধর্মকর্ম অপেক্ষা ব্যক্তিগত শখ ও বৈচিত্র্য প্রদর্শনেই প্রতিযোগিতা চলিত। আড়ংঘাটার রাজবাড়ির বানরের বিয়েতে তৎকালীন সময়ে প্রভূত অর্থ অপব্যয় হইয়াছিল, যাহা বৃটিশ সাহেবদেরও বিস্মিত করিয়াছিল।” (কলিকাতার কথা, সামাজিক খণ্ড, প্রমথনাথ মল্লিক, প্রমথ প্রকাশনী, কলকাতা, ১৯৩১, পৃ: ৮৮–৯০ দ্রষ্টব্যঃ)

আর আধুনিক ইতিহাসবিদ স্বপন বসু ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের কলকাতার বাবুসংস্কৃতির সামাজিক অবক্ষয়কে চিহ্নিত করতে গিয়ে এ ঘটনাগুলোর কথা উল্লেখ করে মন্তব্য করেছিলেন—
“দেওয়ানি লাভ ও ব্রিটিশ বাণিজ্যের সূত্রে গড়ে ওঠা এই নব্যধনী বাঙালি শ্রেণিটি আভিজাত্যের আধুনিক মানদণ্ড অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়। ফলে পূজা-পার্বণ ও দানধ্যানের পাশাপাশি পোষা বিড়াল কিংবা বানরের বিয়ে দেওয়ার মতো উদ্ভট ও কুরুচিপূর্ণ আমোদ-প্রমোদে বিপুল অর্থ অপচয় করে তারা প্রশাসনিক মহলে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করত।” (বাঙালি সমাজ ও রেনেসাঁস, স্বপন বসু, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাদেমি, কলকাতা, ১৯৯৮, পৃ: ৬৭–৬৯ দ্রষ্টব্যঃ)

অনুরূপভাবে সেযুগের সংবাদপত্রগুলিতেও বাবুদের এহেন অহেতুক ও অদ্ভুত অর্থ অপচয়ের ঘটনা নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছিল বলেই লক্ষ্য করা যায়। বিশেষতঃ, সমাচার দর্পণ এবং ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় তখন কলকাতার বাবুদের পোষা প্রাণীর বিবাহ ও তজ্জনিত অপচয়ের নানা মুখরোচক ও সমালোচনামূলক খবর বিভিন্ন সময়ে ছাপা হয়েছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। যেমন—
“কলিকাতার কতিপয় ধনবান ব্যক্তি স্বকীয় বিত্তপ্রভাব দেখাইবার নিমিত্ত পুত্তলিকা ও বিড়্যালাদির বিবাহে সহস্র সহস্র মুদ্রা ব্যয় করিতেছেন, অথচ বিদ্যোৎসাহী কর্মে বা দরিদ্রের উপকারে এক কপর্দকও দান করিতে পরাঙ্মুখ হন।” (সংবাদপত্রে সেকালের কথা, ১ম খণ্ড, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সংকলিত ও সম্পাদিত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, কলকাতা, ১৩৩৯ বঙ্গাব্দ, ১৯৩২ সাল, পৃ: ৯৮–১০২ দ্রষ্টব্যঃ)

তবে তৎকালীন কলকাতায় বসবাসকারী বা ভ্রমণকারী ইউরোপীয় ধর্মপ্রচারক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও নাগরিকরা অবশ্য বাবুদের এ অদ্ভুত বিলাসিতাকে চরম বর্বরতা, মূর্খতা ও সামাজিক অবক্ষয় হিসেবেই পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। যেমন—সেযুগের শ্রীরামপুর মিশনের বিখ্যাত ব্যাপটিস্ট ধর্মপ্রচারক উইলিয়াম ওয়ার্ড, যিনি দীর্ঘকাল ধরে বাংলায় অবস্থান করে দেশীয় আচার-ব্যবহার ও সমাজনীতি গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন, তিনি তাঁর গ্রন্থে এসব নব্যধনী বাবুদের পশুপাখির পেছনে অনর্থক অর্থশ্রাদ্ধ করাকে চরম সামাজিক ও নৈতিক অধঃপতন হিসেবে বর্ণনা করে বলেছিলেন—
“The native merchants and baboos of Calcutta, having suddenly acquired immense riches by serving as banians and dewans to the English, know not how to spend it with dignity. I have known instances where a wealthy native expended upwards of twenty thousand rupees in celebrating the marriage of two monkeys, or the nuptials of a favourite cat. Hundreds of Brahmins were fed, and large presents given, to mark an event so utterly ridiculous and degrading. It shows to what depth of ignorance and moral degradation a society can sink when devoid of true enlightenment.” (A View of the History, Literature, and Religion of the Hindoos; Vol. II, William Ward, Mission Press, Serampore, 1818, Revised Edition 1822, London, p: 196–198)

অর্থাৎ—কলকাতার দেশীয় বণিক ও বাবুরা ইংরেজদের বেনিয়ান ও দেওয়ান হিসেবে কাজ করে রাতারাতি বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়ে কিভাবে মর্যাদার সঙ্গে তা ব্যয় করতে হয়, তা জানে না। আমি এমন দৃষ্টান্তও জানি যেখানে এক ধনী দেশীয় ব্যক্তি দুটি বানরের বিবাহ কিংবা প্রিয় বেড়ালের বিবাহের উৎসবে বিশ হাজার টাকারও বেশি খরচ করেছে। এ চরম হাস্যকর ও মর্যাদাহানিকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে শত শত ব্রাহ্মণকে ভোজন করানো হয়েছে এবং প্রচুর উপহার দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত আলোর অভাব থাকলে একটি সমাজ কতটা অজ্ঞতা ও নৈতিক অধঃপতনের গভীরে নিমজ্জিত হতে পারে, এটি তারই প্রমাণ।
অনুরূপভাবে, তৎকালীন কলকাতার দ্বিতীয় অ্যাংলিকান বিশপ রেজিনাল্ড হেবার—যিনি ১৮২৩ সাল থেকে ১৮২৪ সালের মধ্যে কলকাতা ও তৎকালীন ভারতের সমাজ খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, তিনি স্থানীয় ধনী বাঙালিদের অনর্থক অপব্যয় ও পশুপাখির পেছনে বিপুল পরিমাণে অর্থ নষ্ট করবার সামাজিক ব্যাধি নিয়ে নিজের তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে লিখেছিলেন—
“It is difficult to conceive a more absurd misapplication of wealth than what frequently takes place among the wealthier class of native inhabitants in Calcutta. Vast fortunes, accumulated through colonial agencies, are squandered not on public utility or permanent improvement, but on the most childish extravagances—such as the lavish marriages of pet animals, monkeys, and birds. To spend thousands of rupees on a feline nuptial or a bulbul fight, while surrounded by poverty, displays a lamentable absence of moral sense and rational judgment.” (Narrative of a Journey through the Upper Provinces of India, from Calcutta to Bombay, 1824–1825; Vol. I, Bishop Reginald Heber, John Murray, London, 1828, p: 53–55)

অর্থাৎ—কলকাতা শহরের দেশীয় ধনী সম্প্রদায়ের মধ্যে যেভাবে প্রায়শঃই অর্থের অপব্যবহার ঘটে, এর থেকে হাস্যকর ও অর্থহীন অন্য কিছু কল্পনা করা কঠিন। ঔপনিবেশিক এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে অর্জিত বিপুল সম্পত্তি কোনো জনকল্যাণ বা স্থায়ী উন্নতির কাজে ব্যয় করা হয় না; বরং, শিশুদের মত অতিশয় বালখিল্য বিলাসিতায়—যেমন পোষা প্রাণী, বানর ও পাখির জাঁকজমকপূর্ণ বিবাহে ব্যয় হয়। চারপাশে দরিদ্র মানুষের উপস্থিতি সত্ত্বেও একটি বেড়ালের বিবাহ বা বুলবুলির লড়াইয়ে হাজার হাজার টাকা উড়িয়ে দেওয়া নৈতিক বোধ ও যুক্তিযুক্ত বিবেচনার শোচনীয় অভাবকেই প্রকাশ করে।

অন্যদিকে ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কর্মকর্তার স্ত্রী ও দূরদর্শী ভ্রমণকারী ফ্যানি পার্কস চব্বিশ বছর ধরে ভারতে অবস্থান করবার সময়ে আলোচ্যযুগের কলকাতার ধনিক পরিবারের আমোদ-প্রমোদ ও উদ্ভট শখগুলো প্রত্যক্ষ করেছিলেন। আর তিনিও তাঁর স্মৃতিকথায় বাবুদের বেড়াল-বানরের বিবাহ এবং পশুপাখির লড়াইয়ের চরম সমালোচনা করে মন্তব্য করেছিলেন—
“The Baboos of Calcutta are famous for their extravagant and extraordinary amusements. Nothing can be more grotesque to an European eye than their custom of performing regular marital rites for their pet cats and monkeys. Sums that would support hundreds of starving families for years are thrown away in a single night of revelry, illuminations, and dancing for the marriage of a creature that has no soul. It is a spectacle of utter folly and barbaric display of wealth.” (Wanderings of a Pilgrim in Search of the Picturesque, Vol. I, Fanny Parkes, Pelham Richardson, London, 1850, p: 182–184)

অর্থাৎ—কলকাতার বাবুরা তাঁদের অপব্যয়ী ও অদ্ভুত আমোদ-প্রমোদের জন্য বিখ্যাত। একজন ইউরোপীয়ের চোখে তাঁদের পোষা বেড়াল ও বানরের আনুষ্ঠানিক বিবাহের নিয়ম পালন করবার রীতির চেয়ে অদ্ভুত আর কিছুই হতে পারে না। যেসব অর্থ দিয়ে শত শত অনাহারী পরিবারকে বছরের পর বছর প্রতিপালন করা যেত, তা আত্মাহীন এক প্রাণীর বিবাহে এক রাতের মদ্যপান, আলোকসজ্জা ও নাচগানের পেছনে উড়িয়ে দেওয়া হয়। এটি সম্পূর্ণ মূর্খতা এবং আভিজাত্যের এক বর্বর প্রদর্শনী।
একইরকমভাবে কলকাতার তৎকালীন প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক ‘The Bengal Hurkaru’–র সম্পাদক জে. এইচ. স্টোকলার প্রশাসনিক মহলের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নব্য আভিজাত্যদের এসব বিলাসব্যসনকে কটাক্ষ করে জানিয়েছিলেন—
“While the British administration strives to establish order and commerce, the native aristocracy of Calcutta presents a bizarre contrast of immense wealth coupled with supreme ignorance. Their idea of celebrating prosperity consists in fighting bulbuls or arranging grand nuptials for felines and simians with full oriental pomp. Such exhibitions of uncultivated opulence only serve to prove how far these ‘Baboos’ are removed from any real appreciation of European civilization.” (The Hand-Book of India: A Guide to the Stranger and the Traveller, J. H. Stocqueler, Wm. H. Allen and Co., London, 1844, p: 270–272)

অর্থাৎ—যখন বৃটিশ প্রশাসন শৃঙ্খলা ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠা করবার চেষ্টা করছে, তখন কলকাতার দেশীয় আভিজাত্য এক বিচিত্র বৈপরীত্য তুলে ধরে—যেখানে অপার ধনসম্পদের সঙ্গে চরম মূর্খতার মিল ঘটেছে। সমৃদ্ধি উদযাপনের বিষয়ে তাঁদের ধারণা হল বুলবুলির লড়াই করানো কিংবা পূর্ণ প্রাচ্য আড়ম্বরে বেড়াল ও বানরের জমকালো বিবাহের আয়োজন করা। অনভ্যাসের এ ধনসম্পদ প্রদর্শনী শুধু একথাই প্রমাণ করে যে, এসব বাবুরা ইউরোপীয় সভ্যতার প্রকৃত অনুধাবন থেকে কতটা দূরে অবস্থান করছেন।

সমকালীন ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকদের লেখনীতে উল্লিখিত সেযুগের কলকাতার এ উৎসবগুলির কথা থেকে একথা স্পষ্টভাবেই বুঝতে পারা যায় যে, স্থানীয় ধনাঢ্যরা সমাজে তখন কোনো গঠনমূলক কাজ না করে কিভাবে অবিদ্যা ও কুসংস্কারের পিছনেই নিজেদের বিপুল বিত্ত বিসর্জন দিয়েছিলেন।

প্রসঙ্গতঃ একথাও উল্লেখ্য যে, তখন পোষা বেড়াল বা প্রাণীর এধরণের বিবাহ-উৎসবের আয়োজন কিন্তু অন্য কোনো রাজকীয় সামাজিক বিবাহের থেকে কম কিছুই ছিল না। বস্তুতঃ এধরণের অনুষ্ঠানে তখন যে ধরণের খানাপিনার আয়োজন করা হত, তা সেযুগের ইউরোপীয়দের কোন অনুষ্ঠানের খানাপিনাকেও পিছনে ঠেলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত। যেমন—এধরণের অনুষ্ঠানে তখন প্রায়শঃই দেশীয় ও সমকালীন বিশিষ্ট ময়রাদের দিয়ে তৈরি রাজকীয় ভুরিভোজের ব্যবস্থা থাকত। এগুলির মধ্যে রাজভোগ, সন্দেশ, খাজা, মতিচুর, ছানার জিলিপি, পোলাও, ঘিয়ে ভাজা লুচি, মোহনভোগ, ক্ষীর এবং দুগ্ধজাত নানাবিধ পদ প্রধান ছিল; এগুলিই তখন এধরণের উৎসবে আমন্ত্রিত হাজার হাজার নিমন্ত্রিত অতিথিদের পরিবেশন করা হত। শুধু তাই নয়, আমন্ত্রিত অভিজাত বাবুদের জন্য সেরা বিলাতি ও দেশি সুরার ব্যবস্থাও রাখা হত; আর অতিথিদের স্বাগতম জানানোর জন্য তাঁদের গায়ে আতর, গোলাপজল ছিটানো থেকে শুরু করে রূপোর কৌটোয় পান পরিবেশন করা ইত্যাদি সবধরণের ব্যবস্থাই করা হত। এছাড়া এ উৎসব উপলক্ষ্যে তখন লখনউ ও বারাণসী থেকে নামজাদা বাঈজিদের নিয়ে এসে জলসাঘরের আসর বসানো হত, যেখানে নিশিভর মুজরা, ঠুমরি ও গজল চলত। তবে এগুলোও যথেষ্ট ছিল না বলেই হয়ত, এসবের সাথে পথঘাট তখন ঝাড়বাতি, মশাল ও আতশবাজিতে আলোকিত করা হত; এবং হাতি, ঘোড়া, সুসজ্জিত ব্যান্ডদল ও পালকি সহকারে বিশাল আড়ম্বরে পোষা প্রাণীকে নিয়ে শোভাযাত্রাও বের করা হত। তাছাড়া এ উৎসবে তখন শত শত পণ্ডিত ব্রাহ্মণকে আমন্ত্রণ জানিয়ে মোটা অঙ্কের দক্ষিণা ও বিদায়-প্রণামীও দেওয়া হত; এবং সবশেষে কাঙ্গালী বিদায়ের নামে আভিজাত্য প্রদর্শনের অংশ হিসেবে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও অন্ন বিতরণ করা হত। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড অকল্যান্ডের বোন এমিলি ইডেন ১৮৩৬ থেকে ১৮৪২ সালের মধ্যে ভারতে অবস্থানকালে তৎকালীন কলকাতার ধনিক বাবুদের প্রাসাদে অনুষ্ঠিত এধরণের একাধিক ভোজে অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে এসব বাবুদের রাজকীয় অনুষ্ঠানে মদ্যপান ও বাঈজি নাচের আড়ম্বর সম্পর্কে তিনি তাঁর চিঠিপত্র ও স্মৃতিকথায় বিশদে জানাতে গিয়ে লিখেছিলেন—
“We went last night to a grand entertainment given by one of the wealthiest native Baboos in Calcutta. The scene was straight out of the Arabian Nights, yet mixed with an odd European touch. The whole palace was illuminated with thousands of crystal chandeliers and glass lamps. Tables were groaning under the weight of the finest European wines, French champagne, and rich eastern delicacies.
The Baboo entertained his European guests with lavish hospitality. In the central courtyard, covered with rich velvet carpets, sat the famous nautch girls, adorned in silk and precious jewels. Their slow, graceful movements and haunting songs continued until the early hours of the morning. Champagne flowed freely, and many of the young officers and gentlemen drank to excess. It is staggering to think that thousands of rupees are thrown away on a single night’s spectacle—whether it be for a religious feast, or as I heard, even for the marriage of a pair of favourite animals.” (Up the Country: Letters Written to Her Sister from the Upper Provinces of India, Emily Eden, Richard Bentley, London, 1866, p: 27–29)

অর্থাৎ—গতকাল রাতে আমরা কলকাতার অন্যতম ধনী এক দেশীয় বাবুর দেওয়া এক জাঁকজমকপূর্ণ নৈশভোজে গিয়েছিলাম। পুরো দৃশ্যটি যেন সরাসরি আরব্য রজনীর পাতা থেকে উঠে এসেছে, যার সঙ্গে এক বিচিত্র ইউরোপীয় ছোঁয়া মেশানো ছিল। হাজার হাজার স্ফটিকের ঝাড়বাতি এবং কাঁচের প্রদীপে পুরো প্রাসাদটি আলোকিত হয়ে উঠেছিল। টেবিলগুলো সেরা ইউরোপীয় মদ, ফরাসি শ্যাম্পেন এবং সমৃদ্ধ প্রাচ্য দেশীয় মুখরোচক খাবারে উপচে পড়ছিল।

বাবু তাঁর ইউরোপীয় অতিথিদের পরম সমাদরে আপ্যায়ন করেন। মূল্যবান ভেলভেটের গালিচায় ঢাকা ভেতরের উঠোনে রেশমি পোশাক ও বহুমূল্য রত্নালঙ্কারে সজ্জিতা বিখ্যাত বাঈজিরা বসেছিল। ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত তাঁদের ধীর, মার্জিত নাচ এবং মোহময় গান চলতে থাকে। অবাধে ফরাসি শ্যাম্পেন পরিবেশন করা হচ্ছিল এবং অনেক তরুণ সাহেব ও কর্মকর্তা অতিরিক্ত মদ্যপান করেছিলেন। এটা ভেবে অবাক হতে হয় যে, একটিমাত্র রাতের এ প্রদর্শনীর পেছনে হাজার হাজার টাকা উড়িয়ে দেওয়া হয়—তা কোনো ধর্মীয় উৎসবেরই হোক কিংবা আমি যেমনটা শুনেছি, পোষা কোনো প্রিয় প্রাণীর বিবাহ উপলক্ষ্যেই হোক।
অনুরূপভাবে ফ্যানি পার্কসও তখন বহুবার কলকাতার বিভিন্ন ধনী বাবুদের (যেমন—শোভাবাজার রাজবাড়ি ও অন্যান্য বাগানবাড়িতে) বিলাসপূর্ণ নৈশভোজে উপস্থিত থেকেছিলেন। আর এসব জায়গায় পশুপাখির বিবাহ বা আমোদ-প্রমোদের নামে চলা বাঈজি নাচ, খাওয়া-দাওয়া ও অতিরিক্ত মদ্যপানের দৃশ্য অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে নিজের লেখনীতে তুলে ধরে তিনি জানিয়েছিলেন—
“I accepted an invitation to an entertainment at a wealthy Baboo’s residence. The illuminations were brilliant beyond description; the gardens were lit up with colored lamps hung from every tree. The European guests were conducted to a grand hall where a sumptuous dinner was provided—roast meats, turkeys, confectionery of all kinds, and the most expensive wines and brandy.
After dinner, we were led to the nautch. The dancers, wrapped in gold-embroidered shawls, swayed to the music of the sarangi and tabla. The Baboo stood near the entrance, showering the guests and even the dancers with rose-water and attar. The drinking among some of the European gentlemen and native hosts became quite unrestrained as the night advanced. When I asked about the occasion for such immense expenditure, I was told with utter gravity that it was to celebrate a domestic event—the marriage of the family’s pet cat! To expend a fortune on a feline wedding with such wine, revelry, and dancing seemed the very height of oriental folly.” (Wanderings of a Pilgrim in Search of the Picturesque, Vol. I, Fanny Parkes, Pelham Richardson, London, 1850, p: 216–218)

অর্থাৎ—আমি এক ধনী বাবুর প্রাসাদে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলাম। সেখানকার আলোকসজ্জা ছিল বর্ণনাতীত উজ্জ্বল; বাগানের প্রতিটি গাছে রঙ-বেরঙের বাতি ঝুলিয়ে পুরো স্থানটি আলোকিত করা হয়েছিল। ইউরোপীয় অতিথিদের একটি বিশাল হলে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে সুস্বাদু নৈশভোজের ব্যবস্থা ছিল—পোড়ানো মাংস, টার্কি পাখি, নানা পদের মিষ্টি এবং অত্যন্ত মহামূল্যবান মদ ও ব্র্যান্ডি। নৈশভোজের পর আমাদের বাঈজি নাচের আসরে নিয়ে যাওয়া হয়। সোনার সুতোয় কাজ করা শাল জড়িয়ে নর্তকীরা সারেঙ্গি ও তবলা-তরঙ্গের সঙ্গে তালে তালে নাচছিল। ঘরের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে বাবু অতিথিদের এবং এমনকি নর্তকীদের গায়ে গোলাপজল ও আতর ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন। রাত বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু ইউরোপীয় সাহেব এবং দেশীয় স্বাগতিকদের মদ্যপান বেশ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। এ বিপুল খরচের কারণ জিজ্ঞেস করতেই আমাকে চরম গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলা হল যে এটি একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান—পরিবারের পোষা বেড়ালের বিবাহ! একটি বেড়ালের বিবাহে মদ, অনিয়ন্ত্রিত আমোদ এবং নাচের পেছনে আস্ত এক রাজকোষ উড়িয়ে দেওয়াকে আমার প্রাচ্যদেশীয় মূর্খতার চরম পরাকাষ্ঠা বলে মনে হয়েছিল।

আর বৃটিশ সামরিক কর্মকর্তা টমাস বাউটন সমকালীন কলকাতার বাবুদের প্রাসাদে ইউরোপীয় কায়দায় দেওয়া এধরণের একটি ভোজে—যেখানে সাহেবি মদ ও খাঁটি প্রাচ্য দেশীয় বাঈজি নাচের বিচিত্র মিলন ঘটেছিল—অংশগ্রহণ করে মন্তব্য করেছিলেন—
“The Baboos of Calcutta spare no expense when entertaining British officers. At one such grand gathering, the tables were loaded with every delicacy that London or Calcutta could supply—claret, Madeira, and sherry of the finest vintages.
While the English guests indulged in rich food and intoxicating liquors, native dancers performed in the adjoining court. The atmosphere was thick with the scent of hookahs, attar of roses, and the fumes of wine. It was a strange spectacle to witness Englishmen of rank indulging in deep potations at the house of a native who spent equal sums on the marriages of his monkeys and birds as he did on entertaining the ruling race.” (Letters Written in a Mahratta Camp/Letters from India, Thomas Duer Broughton, John Murray, London, 1813, Reprint Version 1892, p: 142–144)

অর্থাৎ—বৃটিশ কর্মকর্তাদের আপ্যায়ন করবার ক্ষেত্রে কলকাতার বাবুরা খরচের বিষয়ে কোনো কার্পণ্য করতেন না। এমনই এক জমকালো সমাবেশে লণ্ডন বা কলকাতা থেকে সংগৃহীত সমস্ত সুস্বাদু খাবারে টেবিলগুলো ভরে গিয়েছিল—যেগুলির মধ্যে ছিল সেরা মানের ক্ল্যারেট, মাদেরা এবং শেরি মদ।

ইংরেজ অতিথিরা যখন দামি খাবার ও নেশাজাতীয় মদে বুঁদ হয়ে ছিলেন, তখন পাশের উঠোনে দেশীয় নর্তকীরা নাচ পরিবেশন করছিল। পুরো ঘরের আবহাওয়া হুকোর ধোঁয়া, গোলাপের আতর এবং মদের কড়া গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছিল। দেশীয় এক বাবুর বাড়িতে প্রভাবশালী ইংরেজদের এভাবে মদ্যপানে মগ্ন হতে দেখাটা এক বিচিত্র দৃশ্য ছিল—যে বাবুটি শাসক জাতিকে আপ্যায়ন করতে গিয়ে যতটা অর্থ ঢালতেন, ঠিক ততটাই অর্থ তাঁর পোষা বানর ও পাখিদের বিবাহ দিতে গিয়ে উড়িয়ে দিতেন।

তবে ঘটনাক্রম যাই হোক না কেন, তৎকালীন কলকাতার শিক্ষিত ও সচেতন দেশীয় সমাজসংস্কারক এবং সাহিত্যিকরা কিন্তু এসব উৎসবকে কখনোই ভালো চোখে দেখেননি; আর একারণেই তাঁরা তাঁদের রচনায় বাবুদের এ বিকৃত শখের বিশদ বিবরণ ও তীক্ষ্ণ রূপক লিপিবদ্ধ করেছিলেন বলে দেখতে পাওয়া যায়। বিশেষতঃ অতীতে শিবচন্দ্র বসু, কালীপ্রসন্ন সিংহ, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মহেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁদের রচনায় এ ঔপনিবেশিক বাবুসংস্কৃতির নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেছিলেন বলে লক্ষ্য করা যায়। এঁদের মধ্যে শিবচন্দ্র বসু তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে এ ঘটনাগুলির বর্ণনা দিয়ে লিখেছিলেন—
“It was by no means uncommon for a wealthy Hindoo Babu to spend thousands of rupees on the marriage of his pet cat or monkey. On such occasions, Pandits and Brahmans were invited from various parts of the country, and rewarded with handsome presents, while human beings in the neighborhood were starving.” (The Hindoos As They Are: A Description of the Manners, Customs, and Inner Life of Hindoo Society in Bengal, Shib Chunder Bose, Thacker, Spink & Co., Calcutta, 1881, p: 170–174)

অর্থাৎ—সেযুগে কোনো ধনাঢ্য হিন্দুবাবুর তাঁর পোষা বেড়াল বা বানরের বিবাহের পেছনে হাজার হাজার টাকা খরচ করাটা মোটেই অস্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। তখন এধরণের উপলক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পণ্ডিত ও ব্রাহ্মণদের আমন্ত্রণ জানানো হত এবং মোটা পুরষ্কারে ভূষিত করা হত, যেখানে প্রতিবেশী সাধারণ মানুষ অনাহারে দিন কাটাত।

এথেকে বুঝতে পারা যায় যে, সমকালীন দেশীয় সমাজসংস্কারক ও লেখকেরা বাবুদের এধরণের উৎসব এবং অপব্যয়কে তখন চরম ঘৃণা ও ব্যঙ্গাত্মক চোখেই দেখেছিলেন। আর একারণেই কালীপ্রসন্ন সিংহ তাঁর বিখ্যাত ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ গ্রন্থে বাবুদের এ মূর্খতা ও মানসিক দেউলিয়াপনাকে চরম ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন—
“বাবু হতে গেলে কুকুর-বিড়ালের বিয়েতে লাখ টাকা খরচা করতে হয়, চার ঘোড়ার গাড়ি চেপে ভেঁপু বাজিয়ে স্নান করতে যেতে হয়। … এনাদের ধর্মকর্ম কেবল সং সজ্জা আর ভণ্ডামী; নিজের ঘরে যখন হাড়িপাথরে কড়া পড়ে, তখনো বিড়ালের বিয়েতে সহস্র মুদ্রা উড়িয়ে বাহবা কুড়ানোই এদের বাহাদুরি।” (হুতোম প্যাঁচার নকশা, কালীপ্রসন্ন সিংহ, বিদ্যারত্ন প্রেস, কলকাতা, প্রথম সংস্করণ ১৮৬২, পৃ: ৪২–৪৫ দ্রষ্টব্যঃ)

অনুরূপভাবে স্বামী বিবেকানন্দের অনুজ মহেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন যে, তখন কিভাবে পুরোনো কলকাতার বাবুরা মনুষ্যত্বের থেকেও নিজেদের পোষা প্রাণীর বিলাসিতাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন—
“সেকালের কত যে বড়মানুষ বিড়ালের বিয়ে দিয়ে বা বুলবুলির লড়াই দেখে হাজার হাজার টাকা উড়িয়ে সর্বস্বান্ত হতেন, তাহার ইয়ত্তা নাই। অথচ সমাজের প্রকৃত উপকারে বা বিদ্যার প্রচারে তাঁহাদের হস্ত প্রসারিত হইত না।” (কলিকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা, মহেন্দ্রনাথ দত্ত, মহেন্দ্র পাবলিশিং কমিটি, ১৯৭৩, পৃ: ৬৪–৬৬ দ্রষ্টব্যঃ)

আসলে ঔপনিবেশিক শাসনের প্রথমযুগে হঠাৎ হাতে আসা কাঁচা টাকার গরমে এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের অভাবেই কলকাতার একশ্রেণীর বাবুসমাজ তখন বেড়াল ও বানরের বিবাহের মত অদ্ভুত কৌতুকাবহ অনুষ্ঠানে লিপ্ত হয়েছিল। তবে এরপরে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে রাজা রামমোহন রায়, ইয়ংবেঙ্গল আন্দোলন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং পরবর্তীকালে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণের ফলে মধ্যবিত্ত শিক্ষানুরাগী সমাজ জেগে উঠলে এ অবক্ষয়ী বাবুসংস্কৃতির শেষপর্যন্ত ইতি ঘটেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও আজও নিজেদের পোষা পশুদের পেছনে এভাবে অর্থ উড়ানোর এ সামাজিক কুপ্রথাটি বাঙালির কাছে চরম হাস্যরস, ব্যঙ্গ এবং অপচয়ের এক ঐতিহাসিক উপাখ্যান হয়েই থেকে গিয়েছে। অতীতে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ সালাহ্উদ্দীন আহমদ কিভাবে ঊনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদয় এবং রামমোহন-বিদ্যাসাগরের সংস্কার আন্দোলন নব্যধনী বাবুদের কুরুচিপূর্ণ এসব সংস্কৃতির মূলোৎপাটন করেছিল, এবিষয়ে জানাতে গিয়ে লিখেছিলেন—
“The early nineteenth-century Bengal saw a conflict between the uneducated, opulence-driven traditional aristocracy and the newly emerging educated middle class. As rationalism, sparked by Rammohun Roy and the Young Bengal movement, began to take root, the extravagant displays of wealth—such as the lavish marriages of pets—came to be viewed not as signs of status, but as symbols of ignorance and moral bankruptcy. The intellectual renaissance effectively brought an end to this decadent Baboo culture.” (Social Ideas and Social Change in Bengal 1818–1835, A. F. Salahuddin Ahmed, Riddhi-India, Calcutta, 1965, p: 145–148)

অর্থাৎ—উনিশ শতকের সূচনায় বাংলা এক চরম দ্বন্দ্ব প্রত্যক্ষ করেছিল—একদিকে ছিল অশিক্ষিত ও অর্থ উন্মাদনায় মত্ত ঐতিহ্যবাহী আভিজাত্য, অন্যদিকে নতুন উদীয়মান শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী। রামমোহন রায় ও ইয়ংবেঙ্গল আন্দোলনের মাধ্যমে যুক্তিবাদ যখন শিকড় গাড়তে শুরু করল, তখন পোষা প্রাণীদের ধুমধাম করে বিবাহ দেওয়ার মত বিত্তের দেখনি আর আভিজাত্যের প্রতীক রইল না; বরং, তা অজ্ঞতা ও নৈতিক দেউলিয়াত্বের চিহ্ন হিসেবে গণ্য হল। এ বুদ্ধিবৃত্তিক নবজাগরণই শেষপর্যন্ত অবক্ষয়ী বাবু সংস্কৃতির ইতি টেনেছিল।

ইতিহাসবিদ সুমিত সরকার ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং বিদ্যাসাগরীয় শিক্ষা ও সামাজিক আন্দোলন কিভাবে ‘হঠাৎ-ধনী’ হওয়া ক্ষয়িষ্ণু শ্রেণির প্রভাব কমিয়ে এনে একটি যুক্তিবাদী সামাজিক ভিত্তি তৈরি করেছিল, এবিষয়টি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছিলেন—
‘উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এসে কলকাতার সামাজিক নেতৃত্বে এক আমূল পরিবর্তন ঘটে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাণিজ্যের দালালি থেকে আসা কাঁচা টাকার গরম কমে আসার সাথে সাথে নব্য আভিজাত্যের বেড়াল-বানরের বিবাহ বা পশুপাখির লড়াইয়ের মত অনর্থক অপব্যয় বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্যাসাগরের শিক্ষা আন্দোলন, বিধবাবিবাহ প্রচার এবং সংবাদপত্রের প্রগতিশীল ভূমিকার কারণে একটি নতুন ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীর জন্ম হয়, যাঁদের কাছে পুরোনো বাবুদের অবক্ষয়ী আচরণ হাস্যাস্পদ ও নিন্দনীয় উপাখ্যানে পরিণত হয়েছিল।’ (Modern India: 1885–1947, Sumit Sarkar, Macmillan India Limited, New Delhi, 1983, p: 68–70)

আর সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ পার্থ চট্টোপাধ্যায় ঔপনিবেশিক কলকাতায় ‘বাবু’ থেকে ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীতে রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে এ সামাজিক পরিবর্তনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন—
“The transition from the 19th-century ‘Baboo’ to the modern ‘Bhadralok’ marked a decisive cultural shift in Bengal. The early Baboo, whose wealth was squandered on absurdities like animal weddings to gain social leverage, was replaced by an educated elite that valued cultural capital, literature, and social reform over grotesque displays of wealth. What was once a show of power became, in the collective memory of modern Bengal, an object of satirical mockery.” (The Nation and Its Fragments: Colonial and Postcolonial Histories, Partha Chatterjee, Oxford University Press, 1993, p: 35–37)

অর্থাৎ—ঊনিশ শতকের ‘বাবু’ থেকে আধুনিক ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণীতে রূপান্তর বাংলায় এক নির্ণায়ক সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। প্রাথমিক যুগের বাবুরা সামাজিক প্রতিপত্তি লাভের আশায় বেড়াল-বানরের বিবাহের মত অদ্ভুত বিষয়ে অর্থ উড়িয়ে দিত; কিন্তু তাঁদের স্থলাভিষিক্ত হয় এমন এক শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণী, যারা অর্থ প্রদর্শন করবার থেকে সাংস্কৃতিক পুঁজি, সাহিত্য এবং সমাজসংস্কারকে প্রাধান্য দিত। এককালে যা শক্তির মহড়া ছিল, আধুনিক বাঙালির যৌথ স্মৃতিতে তা শেষপর্যন্ত ব্যঙ্গাত্মক উপহাসের বস্তুতে পরিণত হয়।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!