সাধারণভাবে ঐতিহাসিকেরা বলে থাকেন যে, সেই সুপ্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় তন্ত্র ও তান্ত্রিকধর্মের প্রবাহ গতিমান রয়েছে, এবং সমগ্র ভারতভূমির মধ্যে বাংলাই হল তন্ত্রসাধনার সবিশেষ উল্লেখযোগ্য বিকাশক্ষেত্র। বস্তুতঃ ভারতের প্রায় সর্বত্রই তন্ত্রশাস্ত্র এবং তান্ত্রিক সাধনার ঐতিহাসিক পরিচয় পাওয়া গেলেও এদেশের কতগুলি বিশেষ অঞ্চল শুধুমাত্র তান্ত্রিক সাধনার জন্যই অতীত থেকে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে বলে দেখতে পাওয়া যায়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্যের উপরে ভিত্তি করে ভারতের উত্তর-পশ্চিমে কাশ্মীর থেকে আরম্ভ করে নেপাল, তিব্বত, ভুটান, কামরূপ, বাংলা এবং হিমালয় পর্বত-সংশ্লিষ্ট ভূভাগকে ঐতিহাসিকেরা সাধারণভাবে তান্ত্রিক-অঞ্চলরূপে চিহ্নিত করেছেন। তবে উপেন্দ্রনাথ দাসের মতে, এদেশে তন্ত্রসাধনা শুরু হওয়ার প্রথমদিকে ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলই তন্ত্রের প্রধান কেন্দ্রস্থল ছিল, এবং এরপরে উত্তর-পূর্ব ভারতে তন্ত্রের প্রভাব বিস্তৃত হয়েছিল, আর বাংলা ক্রমে তন্ত্রমতের প্রধান কেন্দ্র হয়ে পড়েছিল। (শাস্ত্রমূলক ভারতের শক্তিসাধনা, উপেন্দ্রনাথ দাস, বিশ্বভারতী) প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, সেই প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা ও কামরূপ ভারতের তান্ত্রিক-সাধনার পীঠস্থানরূপে প্রসিদ্ধি লাভ করতে পেরেছিল। আর বর্তমানে কামরূপ আসাম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলেও এর আগে কামাখ্যা মহাপীঠ কিন্তু বাংলারই অন্তর্গত ছিল।
অন্যদিকে ভারতের ভৌগোলিক বিভাগ অনুসারে তন্ত্রের যে শ্রেণীবিভাগ করা হয়, এতেও অতীত থেকেই বাংলায় তন্ত্র-প্রাধান্যই প্রমাণিত হয়। একথার উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, প্রাচীন তন্ত্রশাস্ত্রে অশ্বক্রান্তা বা গজক্রান্তা, বিষ্ণুক্রান্তা ও রথক্রান্তা—এই তিনটি বিভাগের মধ্যে বিন্ধ্যপর্বত থেকে চট্টল পর্যন্ত অঞ্চল হচ্ছে বিষ্ণুক্রান্তার সীমা; কাজেই বাংলাও এর অন্তর্গত। এছাড়া প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থে ‘কেরলশ্চৈব কাশ্মীরো গৌড়শ্চৈব তৃতীয়কঃ’ বলে ভারতের যে প্রধান তিনটি তান্ত্রিক-সংস্কৃতির স্থান নির্দিষ্ট হয়েছে, তাতেও বাংলার উল্লেখ পাওয়া যায়। (তান্ত্রিকভাবধারা ও বাংলা, গোবিন্দলাল মুখোপাধ্যায়, মাসিক বসুমতী, আশ্বিন-কার্ত্তিক, ১৩৭৯, পৃ- ৭১৪) তাছাড়া অনেকের অনুমান করেন যে, সুদূর অতীতে বাংলা থেকেই যবদ্বীপ বা জাভা, কম্বোজ প্রভৃতি দেশে তন্ত্রের প্রভাব বিস্তৃত হয়েছিল। (তান্ত্রিকভাবধারা ও বাংলা, গোবিন্দলাল মুখোপাধ্যায়, মাসিক বসুমতী, আশ্বিন-কার্ত্তিক, ১৩৭৯, পৃ- ৭১৪) সুতরাং এই ঐতিহাসিক আলোচনা থেকে একথা স্পষ্টভাবেই বুঝতে পারা যায় যে, সেই সুদূর অতীত থেকেই বাংলার সঙ্গে তন্ত্র ও তান্ত্রিকধর্মের একটি সুগভীর সম্পর্ক রয়েছে, এবং বাংলায় বৈদিক ধর্মের প্রভাবের থেকে তন্ত্রধর্ম ও তান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয়ই ইতিহাসে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। আসলে বাংলার সমাজ ও বাঙালি হিন্দু অতীত থেকেই তান্ত্রিক ভাবধারায় পুষ্ট ও বর্ধিত হয়েছে বলেই বাঙালি হিন্দুর ধর্মীয় জীবন, দৈনন্দিন জীবনের আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তান্ত্রিক ভাবধারার সুস্পষ্ট প্রভাব সেই সুপ্রাচীনকাল থেকে এখনো পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন ধারায় বিদ্যমান রয়েছে বলেই দেখতে পাওয়া যায়। এমনকি বাংলার ইতিহাস থেকেও বাংলা ও বাঙালি হিন্দুর সঙ্গে তন্ত্রের এই নিগূঢ় সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে অতীত থেকেই বাংলার লোকসাহিত্য হল বাঙালির ঐতিহ্যগত প্রাণসম্পদ। আর একারণেই বাংলায় প্রচলিত থাকা ছেলেভুলানো ছড়া, রূপকথা-উপকথা, ব্রতকথা, জারি-ভাটিয়ালী, গম্ভীরা, টুসু, ঝুমুর, ঘাটু, বাউল প্রভৃতি লোকগীতি এবং ধাঁধাঁ-প্রবাদ ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে বাংলার লোকসাহিত্যের বহু বিচিত্র যে বলয়টি অতীত থেকেই গড়ে উঠেছে, সেটাকে লোকসংস্কৃতির গবেষকরা বাংলার লোকসংস্কৃতি, লোকমানস ও লোকজীবনের বর্ণোজ্জ্বল একটি স্মারক বলেই মনে করে থাকেন। অতীতে এপ্রসঙ্গে ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য তাঁর ‘বাংলার লোকসাহিত্য’ নামক গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ২৯নং পৃষ্ঠায় (কলকাতা, ১৯৬২) বলেছিলেন—
“লোকসাহিত্য যেন এক বিরাট মহীরুহ—ইহার মূল অতীতের মধ্যে নিহিত, কিন্তু ইহার কাণ্ডের মধ্যে যে নিত্য-নূতন শাখা-পল্লব সঞ্চারিত, ফুলফল বিকশিত হইতেছে, তাহা বর্তমানের মধ্যে সমাহিত।”
আর যেহেতু—‘লোকসাহিত্য সামগ্রিক সমাজ-চৈতন্যেরই বাহন’ (বাংলার লোকসাহিত্য, ১ম খণ্ড, ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য, কলকাতা, ১৯৬২, পৃ- ১২), সেহেতু একে বাংলার সমাজ মানসের সামগ্রিক প্রতিফলনও বলা যেতে পারে। বস্তুতঃ, বহুযুগ ধরে বাংলা ও বাঙালি হিন্দুর জাতীয় জীবন ও গণমানসে যেসব আচার অনুষ্ঠান, রীতি-নীতি, সংস্কার-বিশ্বাস, কামনা-বাসনার সঞ্চরণ ঘটছে,—বাংলার লোকসাহিত্যের বহু বিচিত্র শাখায় এর মূর্ত আলিম্পন লক্ষ্য করা যায়। আরো ভালো করে বললে, সুপ্রাচীনকাল থেকেই বাংলার সমাজজীবনে ও লোকসংস্কৃতিতে যেসব তান্ত্রিক সংস্কার ও ভাবনা বিজড়িত হয়েছিল, বাংলার লোকসাহিত্যে সেসবেরই প্রতিফলন ঘটেছে বলা চলে। তবে প্রসঙ্গতঃ একথাও স্মরণীয় যে, বাংলার লোকসাহিত্যে এই তান্ত্রিক সংস্কার কিন্তু কোন ধরণের তন্ত্রচর্চার ফল নয়; বরং এটা বাংলার জনমানসে বহুকাল ধরে প্রচলিত থাকা ধ্যান-ধারণা ও সংস্কারেরই প্রভাবজাত। ঐতিহাসিকেরা বলেন যে, প্রাগার্যযুগের বাংলার গণজীবনে যেসব আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় সংস্কার বিদ্যমান ছিল, সেসবের সঙ্গে বিভিন্ন তান্ত্রিক সংস্কারেরও সংযোগ ছিল। আর একারণেই বাংলার আদিম অধিবাসীদের মন্ত্রবিশ্বাস, ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়াকলাপে আগ্রহ, নানাধরণের দেবদেবীর পূজা, বিভিন্ন গুহ্যক্রিয়া ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে এখনো তান্ত্রিকতার প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। আসলে বাংলার লোকজীবন ও লোকমানসে সেই প্রাচীনকাল থেকেই তান্ত্রিকতার যে সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান লালিত ও পরিপোষিত হয়েছিল, বাংলার লোকসাহিত্যের বিভিন্ন ধারায় ক্ষণে ক্ষণে সেগুলিই উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। কখনও মন্ত্রবিশ্বাস ও ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়ার মাধ্যমে, কখনও তন্ত্রের ‘পিণ্ড-ব্রহ্মাণ্ডতত্ত্ব’ ও ষটচক্রভেদকে কেন্দ্র করে, তো কখনও আবার শক্তিদেবীর মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলার লোকসাহিত্যে তন্ত্রভাবনার পরিচয় ফুটে উঠেছে বলে গবেষকরা মনে করে থাকেন। (বাংলার বাউল ও বাউল গান, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, কলকাতা, ১৩৬৪ বঙ্গাব্দ, পৃ- ১৮২) আর তাই আলোচ্য প্রসঙ্গে প্রথমেই এখানে বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত থাকা ব্রতকথাগুলি নিয়ে আলোচনা করা আবশ্যক।
লোকসংস্কৃতির গবেষকদের মতে, বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত থাকা ব্রতকথাগুলিকে বাংলার লোকসংস্কৃতিরই প্রতিবিম্বন বলা যেতে পারে। অতীতে এপ্রসঙ্গে ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেছিলেন যে, বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত থাকা—
“ব্রতকথাগুলির সমাজচিত্রের একটা ঐতিহাসিক মূল্য অস্বীকার করিতে পারা যায় না। কেবলমাত্র ঐতিহাসিক মূল্যই নহে,—প্রাগৈতিহাসিক কিংবা আদিম সমাজের বহু উপকরণ ইহাদের মধ্য দিয়া আত্মরক্ষা করিয়া বাঁচিয়া আছে। তাহাদের মধ্যে নরবলি ও ঐন্দ্রজালিক শক্তিতে (Magical power) বিশ্বাস অন্যতম।” (বাংলার লোকসাহিত্য, ১ম খণ্ড, ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য, কলকাতা, ১৯৬২, পৃ- ৫৫১)
আর বাঙালি হিন্দুদের সাধারণ নারীসমাজই এই ব্রতকথাগুলির উৎসমুখ। কারণ, মূলতঃ পরিবারের এবং নিজের পারত্রিক কল্যাণ-চেতনা থেকেই বাঙালি হিন্দুসমাজের নিরক্ষর ও সাধারণ নারীদের দ্বারাই অতীত থেকেই বাংলার ব্রতকথাগুলি সৃষ্ট ও অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে। তাই এই ব্রতকথাগুলির মধ্যে যে, বাংলায় বহুকাল ধরে প্রচলিত থাকা জীবন-সংস্কারই প্রোজ্জ্বল হয়ে রয়েছে, একথা বলাই বাহুল্য। এছাড়া আরো লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, বাংলার অধিকাংশ ব্রতকথাগুলিই কিন্তু লৌকিক। এমনকি এগুলির নাম যেমন লৌকিক, তেমনি এগুলির রূপ-প্রকৃতি ও অনুষ্ঠান-পদ্ধতিও লোকায়ত-জীবনপ্রবাহের অনুষঙ্গী। এর কারণ হিসেবে গবেষকরা অনুমান করেন যে, অতীত থেকেই বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে বিভিন্ন ধরণের শাক্ততান্ত্রিক সংস্কার মজ্জাগত হয়ে গিয়েছে বলেই শক্তিদেবীর মহিমাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে এই ব্রতকথাগুলি সৃষ্টি হয়েছে। একথার উদাহরণস্বরূপ বলা চলে যে, বর্তমানসময়ে বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত থাকা বেশিরভাগ ব্রতকথাই কিন্তু কোন না কোন শক্তিদেবীর মাহাত্ম্যসূচক; যথা—সঙ্কটার ব্রত, উদ্ধারচণ্ডীব্রত, কুক্কুটিব্রত, লোটনষষ্ঠীব্রত, কুলকুলতিব্রত, কুলাইমঙ্গলচণ্ডীর ব্রত, সুবচনীব্রত ইত্যাদি; আর এসমস্ত ব্রতের আরাধ্যা ষষ্ঠী, সঙ্কটা, চণ্ডী, বুড়াঠাকুরানী, নাটাই দেবী প্রমুখ সকলেই কিন্তু শক্তিদেবী। আসলে পারিবারিক ও জাগতিক বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য বাঙালি হিন্দুদের নারীসমাজ সেই অতীত থেকেই বিভিন্ন শক্তিদেবীকেই আকুলভাবে স্মরণ করে আসছেন। আর বাংলার জাতীয় মানসে তন্ত্রের শক্তিতত্ত্বের যে প্রভাব মধ্যযুগের বাংলা মঙ্গলকাব্যের বিকাশ ঘটিয়েছিল, বৈষ্ণবসাহিত্যে রাধাতত্ত্বের বিস্তার করেছিল, এবং কৃত্তিবাসী রামায়ণে দুর্গা ও কাশীরাম দাসের মহাভারতে চামুণ্ডার আবির্ভাব ঘটিয়েছিল, সেই শাক্তচেতনাই অন্যদিকে বাংলার ব্রতকথাগুলিতে শক্তিদেবীর বিভিন্ন রূপ ও নামেরও কল্পনা করেছিল।
এছাড়া বিভিন্ন ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়াকলাপও বাংলায় প্রচলিত থাকা এসব ব্রতকথাগুলির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবে শুধুমাত্র ব্রতকথা অবশ্য নয়; বরং বাংলায় প্রচলিত থাকা রূপকথা, উপকথা প্রভৃতি বাংলার লোককথার প্রধান বৈশিষ্ট্যও হচ্ছে মন্ত্রশক্তি, ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়াকলাপ ও অলৌকিক আচার-অনুষ্ঠান প্রভৃতির দ্বারা মনোভীষ্ট পূরণ। আর গবেষকদের মতে ব্রতকথা ও লোককথাগুলিতে অলৌকিক উপায়ে কার্যসিদ্ধি নিঃসন্দেহে বাঙালি হিন্দু-মানসে তান্ত্রিক সংস্কারেরই প্রভাবজাত। অতীতে এপ্রসঙ্গে ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য তাঁর মতপ্রকাশ করতে গিয়ে বলেছিলেন—
“কামরূপের অন্তর্গত কামাখ্যাতীর্থ একদিন তান্ত্রিকসাধনার পীঠস্থান ছিল। তন্ত্রশাস্ত্রও ঐন্দ্রজালিক বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত বলিয়া তান্ত্রিক প্রভাবিত বাংলাদেশ হইতেই একদিন যাদুবিদ্যা ভারতের সর্বত্র এবং ভারত হইতে ভারতের বাহিরেও প্রচারলাভ করিয়াছিল। সেই সূত্রেই ঐন্দ্রজালিক বিশ্বাস সম্পন্ন লোককথা দেশ-দেশান্তরে প্রচারিত হইয়াছিল। সুতরাং বাংলার লোককথায় ঐন্দ্রজালিক প্রাধান্য থাকিবে, ইহা অত্যন্ত স্বাভাবিক।” (বাংলার লোকসাহিত্য, ১ম খণ্ড, ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য, কলকাতা, ১৯৬২, পৃ- ১৪৬)
একারণেই বাংলায় প্রচলিত থাকা সঙ্কটার ব্রতকথা, মঙ্গলচণ্ডীর ব্রতকথা, অশ্বত্থপাতাব্রত প্রভৃতিতে এই ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়া ও অলৌকিক উপায়ে ফললাভের কথা বর্ণিত হয়েছে বলে লক্ষ্য করা যায়। আর একথার উদাহরণস্বরূপ এখানে জয়মঙ্গলচণ্ডীর ব্রতকথার অংশবিশেষ উল্লেখ করা যেতে পারে, যা নিম্নরূপ—
“হারালে পাওয়া যায়, মরলে জিয়ানো যায়, খাঁড়ায় কাটে না, আগুনে পোড়ে না, জলে ডোবে না, সতীন মেরে ঘর হয়, রাজা মেরে রাজ্য পায়।”
অন্যদিকে সঙ্কটার ব্রত প্রভৃতি কয়েকটি ব্রতকথায় নরবলি, সন্ন্যাসী কর্তৃক কালীপূজা, রক্তের পুকুরে ভাসমান নরমুণ্ড এবং অলৌকিকভাবে মৃত মানুষদের পুনর্জীবন লাভ প্রভৃতি বর্ণনার মধ্যে দিয়ে বাঙালি হিন্দুদের জীবনের যে আদিম সংস্কার উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে বলে লক্ষ্য করা যায়, গবেষকরা সেটাকে তান্ত্রিক সংস্কার ও চেতনার ফল বলে মনে করে থাকেন। আবার বাংলায় প্রচলিত থাকা শক্তিপূজায় যেমন কোন কোন জায়গায় স্বগাত্র-রুধিরাদির মাধ্যমে দেবীর তৃপ্তি-সাধনের প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়, বাংলার লৌকিক সূর্যপূজার একটি ব্রত কাহিনীতেও কিন্তু প্রায় একইরকমের আচারের ইঙ্গিত পাওয়া যায়—
“পাত্রের রানী আপনার জিব কেটে সলতে করে প্রদীপ দিলেন, হাঁটুর মালুই চাকি কেটে তাইতে করে ধূপ দিলেন, মাথার চুল দিয়ে চামর ঢুলাইতে লাগিলেন।” (বঙ্গে সূর্যপূজা ও সূর্যের নূতন পাঁচালী, চিন্তাহরণ চক্রবর্তী, সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা, ১ম সংখ্যা, ১৩৪০ বঙ্গাব্দ, পৃ: ১-১১)
এসব ছাড়া বাংলার ব্রতকথাগুলিতে পাঁচ-আট ইত্যাদি নির্দিষ্ট সংখ্যক ফল, ফুল বা অন্যান্য দ্রব্যের সঙ্গে বিশেষ ধরণের মন্ত্রোচ্চারণে ফললাভের যে কথা বর্ণিত হয়েছে বলে দেখতে পাওয়া যায়, সেসবের মধ্যে দিয়েও বাঙালি হিন্দুর গণজীবনে তন্ত্রোক্ত দ্রব্যগুণ ও মন্ত্রশক্তিতে বিশ্বাসের সংস্কারই ফুটে উঠেছে বলেও গবেষকরা মনে করে থাকেন। প্রসঙ্গতঃ বাংলার বিভিন্ন ব্রতে নানাধরণের মণ্ডল অঙ্কণের প্রথার কথাও এখানে অবশ্য উল্লেখ্য। কারণ—ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, বৃত্তাকার প্রভৃতি বিভিন্ন ধরণের যন্ত্র-অঙ্কনকে বিভিন্ন তান্ত্রিক অনুষ্ঠান ও আচারেরও একটা প্রধান অঙ্গ বলে মনে করা হয়ে থাকে। তন্ত্রে এই যন্ত্রগুলি কাম্যকর্ম ও অনুষ্ঠানের প্রতীক।
অনুরূপভাবে বাংলার বিভিন্ন ব্রতকথাগুলি পালন করবার সময়েও প্রায় একই ধরণের মণ্ডলাদি অঙ্কন করবার রীতি দেখতে পাওয়া যায়; যেমন—মাঘব্রত পালন করবার সময়ে বৃত্তাকার ও চতুষ্কোণ গর্তঅঙ্কন করা হয়ে থাকে, বুড়ো ঠাকুরাণীর ব্রত পালন করবার সময়ে আতপ চালসহ ত্রিভুজাকার কলাপাতাকে ভাঁজ করে বিশেষ দ্রব্য তৈরি করা হয় ইত্যাদি। আর বাংলায় প্রচলিত থাকা বিভিন্ন ব্রতকথায় মনোবাসনার ও কাম্যরূপের প্রতীকস্বরূপ বিভিন্ন ধরণের মণ্ডলাদি অঙ্কন নিঃসন্দেহে বাঙালি জনজীবন ও লোকসংস্কৃতিতে যে বহুযুগপ্রচলিত সুপ্রাচীন তান্ত্রিক সংস্কার ও ধ্যান-ধারণার ঐতিহ্যের দ্যোতক, একথা প্রমাণ করতে গিয়ে অতীতে ডঃ চিন্তাহরণ চক্রবর্তী বলেছিলেন—
“It is … abundantly clear that rites similar to many of those prescribed in the Tantras were quite well-known among primitive peoples of all countries … According to scholars some at least of these or similar ones were known to Dravidian and other Non-Aryan peoples of India from whom they were borrowed by the Aryans and systematised in the Tantras.” (Tantras, Studies on their Religion and Literature; Chintaharan Chakraborty, Kolkata, 1972, P- 9)
সুতরাং বাংলার ব্রতকথা ও লোককথাগুলির মধ্যে যে মন্ত্রশক্তি ও দ্রব্যগুণের প্রতি বিশ্বাস, ঐন্দ্রজালিক ও অভিচারিক ক্রিয়াদির পরিচয় লক্ষ্য করা যায়, সেসব যে আসলে বাংলার অধিবাসীদের মধ্যে সুপ্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ও অনুশীলিত তন্ত্রাচার ও সংস্কারেরই পরিচয়বাহী, একথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে।
অন্যদিকে যে বাউল গানকে বাংলার লোকসাহিত্যের সার্থক পরিচয়বাহী বলে মনে করা হয়ে থাকে, সেই বাউল গানেও কিন্তু সুস্পষ্টভাবেই তান্ত্রিকতার প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। আর গবেষকদের মতে, যদিও বাংলার বাউল সম্প্রদায়ের সাধনপদ্ধতির একটা স্বকীয় বৈশিষ্ট্য আছে—একথা সত্যি, কিন্তু তবুও বাউলদের গুহ্যসাধন প্রক্রিয়া মূলতঃ তন্ত্রভিত্তিক। এজন্যই তন্ত্রের গুরুবাদ, শিব-শক্তি বা পুরুষ-প্রকৃতিতত্ত্ব, ভাণ্ডাব্রহ্মাণ্ড তত্ত্ব এবং ধর্মসাধনায় রমণীর প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বাউলধর্ম ও সঙ্গীতে মূর্ত হয়ে উঠেছে বলেও লক্ষ্য করা যায়। প্রসঙ্গতঃ একথাও স্মরণীয় যে, তন্ত্র-সাধনার মতোই বাউলদের সাধনাও কিন্তু গুরুমুখী। গবেষকদের মতে, যেহেতু বাউলরা অতীতে তন্ত্রের গুহ্যসাধন প্রক্রিয়াকে নিজেদের সাধনার একটি বিশেষ অঙ্গরূপে গ্রহণ করেছিলেন, সেহেতু বাউলসঙ্গীতে তান্ত্রিক গুরুবাদের প্রতিধ্বনি পুনঃ পুনঃ ঘোষিত হয়েছে বলেই লক্ষ্য করা যায়। একথার উদাহরণস্বরূপ এখানে দুটি বাউল গানের অংশবিশেষ উল্লেখ করা যেতে পারে, যেগুলি নিম্নরূপ—
(১) “গুরু, তুমি তন্ত্রের তন্ত্রী,
গুরু, তুমি মন্ত্রের মন্ত্রী,
গুরু, তুমি যন্ত্রের যন্ত্রী,
না বাজাও বাজবে কেনে।”
এবং—
(২) “গুরুকে মনুষ্য জ্ঞান যার,
অধঃপাতে গতি হয় তার।”
আসলে পরমসত্য লাভ করবার জন্য বাউলরা অতীত থেকেই মানবদেহকেই মূল আধার বলে মনে করে আসছেন। তাঁদের মনের মানুষ মানব দেহেই বিরাজিত রয়েছেন। গবেষকদের মতে, বাউলদের এই দেহতত্ত্বকেন্দ্রিক সাধনা সম্পূর্ণভাবেই তন্ত্রাশ্রয়ী; কারণ, তন্ত্রের মৌলিক সিদ্ধান্তই হচ্ছে—
“ব্রহ্মাণ্ডে যে গুণাঃ সন্তিতে তিষ্টন্তি কলেবরে।”
অর্থাৎ—ব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় গুণ ও বস্তুনিচয় দেহেই বিদ্যমান রয়েছে। আরো ভালো করে বললে, মানব দেহের মধ্যেই নদ-নদী, পর্বত-সমুদ্র, অগ্নি, বায়ু, জল, ব্যোম, চন্দ্র, সূর্য, স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল প্রভৃতি চতুর্দশ ভুবন বর্তমান রয়েছে। আর তন্ত্রের এই ‘ভাণ্ড-ব্রহ্মাণ্ডতত্ত্ব’, অর্থাৎ—দেহের সঙ্গে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ঐক্যানুভূতিই বাউলগানের মধ্যে শতধারে উৎসারিত হয়ে উঠেছে বলে লক্ষ্য করা যায়। একথার উদাহরণস্বরূপ এখানে কয়েকটি বাউল গানের অংশবিশেষ উল্লেখ করা যেতে পারে, যেগুলি নিম্নরূপ—
(১) “আছে আদি মক্কা এই মানবদেহে
দেখ না মন ভেয়ে।
দেশ-দেশান্তর দৌড়ে এবার
মরিস কেন হাপায়ে॥”
(২) “আগে দেহের খবর জান গে রে মন,
তত্ত্ব না জেনে কি হয় সাধন।
দেহে সপ্ত স্বর্গ, সপ্ত পাতাল,
চৌদ্দ ভুবন কর ভ্রমণ।”
(৩) “সে তো এই ভাণ্ডে আছে, ব্রহ্মাণ্ডে খুঁজলে পাবি কিরে।”
এসব ছাড়া বাউলেরা যে মনের মানুষ বা পরম সত্যের অনুসন্ধানের জন্য তন্ত্রের ষটচক্রভেদ, কুণ্ডলিনী-যোগক্রিয়া, নাড়ীতত্ত্ব প্রভৃতিকে ভিত্তি করেই অগ্রসর হয়েছেন, একথার প্রমাণস্বরূপও কয়েকটি বাউলগীতির অংশবিশেষ উদ্ধৃত করা যেতে পারে—
(১) “দ্বিদলে হয় বারামখানা।
চতুর্দলে সাঁই বিরাজ করে, মৃণালে হয় সদরখানা।”
(২) “ষটচক্রীভেদী যবে হবে পাবে তব ঠিকানা।
দেখবে আলোর ভিতর কালো মাণিক
ঘুচবে ভবের যন্ত্রণা॥”
(৩) “কুণ্ডলিনী সহায় রেখে ঊর্ধ্বে বাদাম তোল,
দশ-ইন্দ্রিয়কে শিষ্য করে জ্ঞান-বড়শিতে টান।”
(৪) “মনের মানুষ হয় রে জনা,
(ও সে) দ্বিদলে বিরাজ করে এই মানুষে,
তুমি সহজ মানুষ চিনলে না।
ষোড়শদল আর দশম দলে,
তার পিছে মানুষ দোলে নর্মদার কূলে,
বামে কুলকুণ্ডলিনী, যোগেশ্বরী, যোগরূপিণী।”
(বাংলার বাউল ও বাউল গান, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, কলকাতা, ১৩৬৪ বঙ্গাব্দ)
উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য জানিয়েছিলেন যে, এই বাউলগানগুলিতে ত্রিবেণী, মৃণাল, মণিপুর, বারুণী-যোগ, কামব্রহ্ম, ষটচক্রভেদী, অষ্টপাশ, ইড়া, পিঙ্গলা, কুণ্ডলিনী প্রভৃতি তান্ত্রিক পারিভাষিক শব্দগুলি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যবহৃত হয়ে তন্ত্রসাধনার গূঢ় তত্ত্বসমূহকেই নির্দেশিত করেছে। এথেকে বুঝতে পারা যায় যে, বাউলগান ও সাধনমার্গে রমণীকে সঙ্গিনী করবার অপরিহার্যতার মধ্যে আসলে তান্ত্রিক সংস্কারই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। এমনকি বাউলগানের মধ্যে সর্বসংস্কারমুক্তি ও তথাকথিত বাহ্য আচারাদির ঊর্ধ্বে উপনীত হওয়ার যে আকুল আহ্বান উদ্গীত হয়েছে, সেসবের মূলেও বাংলার জীবন-প্রবাহের মূলগত তান্ত্রিক সংস্কার ও ভাবনাই রয়েছে।
এসব ছাড়া অতীত থেকেই বাঙালি হিন্দুদের বিভিন্ন পূজা-পার্বণকে কেন্দ্র করে একশ্রেণীর লোকসঙ্গীত প্রচলিত রয়েছে, যেগুলিকে আনুষ্ঠানিক সঙ্গীতও বলা হয়ে থাকে। গবেষকদের মতে, বছরের বিভিন্ন মাসে অনুষ্ঠিত বিবিধ পূজা-পার্বণ ও উৎসবকে কেন্দ্র করেই অতীতে বাংলা লোকসঙ্গীতের এই ধারার উদ্ভব ঘটেছিল। এই পার্বণ সঙ্গীতগুলির মধ্যে একদিকে যেমন পূজা-পার্বণের পৌরাণিক আচার অনুষ্ঠানের পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি অন্যদিকে মানবিক গুণসম্পন্ন লৌকিক রূপটিও বিচিত্র রসরূপ লাভ করেছে বলে লক্ষ্য করা যায়। এমনকি পার্বণ-সঙ্গীতের এই লৌকিক রূপটির মধ্য দিয়ে বাঙালি হিন্দুর মজ্জাগত শাক্ত-তান্ত্রিক চেতনারও স্ফুরণ দেখতে পাওয়া যায়। একথার উদাহরণস্বরূপ এখানে অতীতে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় শ্রাবণ মাসে অনুষ্ঠিত মনসাপূজা উপলক্ষ্যে যে মেয়েলী গীত শুনতে পাওয়া যেত, সেটিকে উপস্থাপিত করা যেতে পারে। এতে মনসার পূজায় বলিদানের উল্লেখ বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়—
“আলিম্পন চিত্রপটে রক্ত পদ্মপাতে।
আতপ-তণ্ডুল ক্ষীর ঘৃত মধু তাতে॥
স্থানে স্থানে পাতিয়াছে রক্ত পদ্মপাতে।
কুশিয়ারী খণ্ড খণ্ড শোভিয়াছে তাতে॥
হংস কবুতর বলি ছাগ মেষ সনে।
ব্রাহ্মণ সজ্জনে পূজে কল্যাণ কারণে॥
রুধিরে বহন্তি নদী মাংস পক্ষকুলে।
চৌদিকে থাকিয়া লোক হরি হরি বলে॥”
গবেষকদের মতে, বাংলার হিন্দুসমাজে তান্ত্রিক সংস্কারের প্রাবল্যের ফলেই মনসাপূজার এই লোকগীতিতে ‘হরি’ নামের সঙ্গে ‘রুধিরের নদী’ ও বলিদানের প্রসঙ্গটি অবলীলাক্রমে উচ্চারিত হতে পেরেছিল।
আবার অতীতে কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে কালীপূজা উপলক্ষ্যে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষতঃ ময়মনসিংহ অঞ্চলে যে মেয়েলী গীত গাওয়া হত, তাতে দেবী কালীর তান্ত্রিকী রূপটিই ফুটে উঠেছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। উদাহরণ নিম্নরূপ—
“বাম হস্তে রুধির ভাণ্ড ডাইন হস্তে অসি।
কাটিয়া অসুরের মুণ্ড করছ রাশি রাশি॥
জিহ্বায় রুধির ধারা গলে মুণ্ডমালা।
হেমুখে চাইয়া দেখ, মা, পদতলে ভোলা॥”
এছাড়া ফাল্গুন মাসে দোলযাত্রার উৎসবকে কেন্দ্র করেও অতীতের বাংলায় কিছু লোকসঙ্গীত রচিত হয়েছিল। এক্ষেত্রে লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, এধরণের গানে সাধারণতঃ রাধাকৃষ্ণের লীলা-প্রসঙ্গ ও বসন্ত ঋতুর বর্ণনা গীত হওয়ার কথা থাকলেও, ময়মনসিংহ জেলার বাঙালি হিন্দুদের সংস্কারে শক্তি-ভক্তি এতটাই প্রবল ছিল যে, এই গানেও তাঁরা তখন দেবী সরস্বতীকে আহ্বান জানিয়েছিলেন—
“এস গো জননী, বাণী বীণাপাণি অম্বিকে,
অজ্ঞান সন্তানে ডাকে, দয়া কর বরদে।
…
তব সন্তানে সান্ত্বা কর, মা বিনে আর করে কে।
এস গো জননী, বাণী বীণাপাণি অম্বিকে।”
আবার গম্ভীরা গানকে বাংলার লোকসঙ্গীতের একটা উল্লেখযোগ্য শাখা বলে মনে করা হয়ে থাকে। অতীতের কোন একসময়ে পূর্ববঙ্গের রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর; এবং পশ্চিমবঙ্গের মালদহ, দিনাজপুর প্রভৃতি অঞ্চলে গম্ভীরা গানের ব্যাপক প্রভাব ছিল। আদ্য বা শিবঠাকুরকে কেন্দ্র করেই তখন এই গম্ভীরা গানগুলি রচিত হয়েছিল। প্রসঙ্গতঃ স্মরণীয় যে, শিব হলেন প্রাগার্য যুগের দেবতা; এবং অতীত থেকেই ভারতের ও বাংলার আদিম অধিবাসীদের মধ্যে শিবের উপাসনা ব্যাপকভাবে নানা আকারে প্রচলিত রয়েছে। বিশেষতঃ বাংলার লোকসংস্কৃতির পরিমণ্ডলে—লোকধর্ম, লোকগীতি প্রভৃতিতে তো শিবের প্রাধান্য বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। গবেষকদের মতে, শিবের পূজা অনুষ্ঠানাদিকে কেন্দ্র করে সেই কোন সুদূর অতীতকাল থেকেই বাংলার লোকজীবনে নানাধরণের আচার ও সংস্কার প্রচলিত রয়েছে। আর শিবই যেহেতু বাঙালি হিন্দুর সর্বশ্রেণীর মানুষের প্রাণের দেবতা, সেহেতু সংসারের নানা অভাব-অভিযোগে ক্লিষ্ট মানুষের সকাতর আর্তি এই গম্ভীরা গানগুলির মধ্যে সমসাময়িক সমাজজীবনের পটভূমিকায় ধ্বনিত হয়েছিল বলে লক্ষ্য করা যায়। শুধু তাই নয়, অতীতের সাধারণ গ্রাম্য লোকজীবনেও যে কি অপূর্ব তত্ত্বজ্ঞানের অস্তিত্ব ছিল, তা নিম্নোক্ত গম্ভীরা গানের ছত্রক’টিতে অনুরণিত হয়ে উঠেছে বলেও দেখতে পাওয়া যায়—
“তুমি হয়ে চাষী কাশীবাসী কেন কাশীশ্বর
কর্মক্ষেত্র এ ব্রহ্মাণ্ড ক্ষেত্র তব হর।
মন আত্মা দুই বলদে বেঁধে
কর্ম-জুয়াল চাপিয়ে কাঁধে
মায়া-রজু নাসায় ছেঁদে কতই বা আর তাড়?
সুখ-দুঃখ দুই শক্ত জোতা
সেই জোয়ালে আছে যোতা
আশা লাঠির দিচ্ছ গুঁতা ওহে দিগম্বর।”
লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, এই গানটির মধ্যে অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় যে কথাটি উচ্চারিত হয়েছে, সেটার মধ্যে মায়া-মোহযুক্ত মানুষের সংসার-বন্ধন সম্পর্কে তান্ত্রিক সংস্কার ও ভাবনার পরিচয় রয়েছে। এতে জাতীয় জীবনের বহুকালের ধারণা ও সংস্কারের মাধ্যমে পাশবদ্ধ মানুষ পাশমুক্ত শিবের কাছে অভিমান করেছেন।
পরিশেষে বাংলার বিভিন্ন লৌকিক দেবদেবী, লৌকিক ধর্মাচার ও লোকসমাজের কল্যাণ-অকল্যাণমূলক বিবিধ প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে অতীতে যেসব অজস্র লৌকিক মন্ত্রমূলক ছড়ার সৃষ্টি হয়েছিল, সেগুলির কথাও এখানে উল্লেখ্য। সুপ্রাচীনকাল থেকেই বাংলার লোকসমাজে গুণিন সম্প্রদায়ের একটা প্রাধান্য রয়েছে। অতীতে এঁরা সাধারণতঃ ওঝা, সাপুড়ে, ভৈরবী, পীর-ফকির, হিরালী, বিবি, বহরদার প্রভৃতি নামে অভিহিত হতেন; এবং এঁদের দ্বারাই তখন বিভিন্ন ঘটনা, সমস্যা, আপদ-বিপদ অভীষ্টপুরণ প্রভৃতি কার্যে লৌকিক মন্ত্রের প্রয়োগ হত। গবেষকদের মতে, প্রাগার্যযুগের লোকায়ত সমাজজীবনের সংস্কার ও বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই এই লৌকিক মন্ত্রগুলির সৃষ্টি হয়েছিল। এগুলি বাংলার বিভিন্ন উপভাষায় রচিত হয়েছিল, আর এগুলির সঙ্গেও তন্ত্রের ঘনিষ্ট সম্পর্ক দেখতে পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, তন্ত্রসাধনার মন্ত্র-প্রাপ্তির ক্ষেত্রে যেমন গুরুর উপরে নির্ভর করতে হয়, এসব লৌকিক মন্ত্রের সাধনা ও অনুশীলনের জন্যও অতীতে ঠিক একইরকমভাবে গুরু বা উপযুক্ত গুণিনকে অবলম্বন করতে হত বা আজও করতে হয়। আর এসব লৌকিক মন্ত্রের প্রয়োগকারী গুণিনকে শান্ত, সংযমী, শুদ্ধাচারী, দৃঢ়চেতা, ঈশ্বর-বিশ্বাসী ও গুরুভক্ত হতে হত বা হতে হয়। গবেষকদের মতে, গুণিনের এসব গুণাবলী বা বৈশিষ্ট্য আসলে তন্ত্রোক্ত ধ্যান-ধারণারই অনুবর্তী। একারণেই তন্ত্রে মন্ত্র-সাধন তৎপর ব্যক্তিকে যেসব নির্দেশাদি সাধারণভাবে পালন করতে হয়, অতীতে তো বটেই, এমনকি এখনও লৌকিকমন্ত্রের প্রয়োগকারী গুণিনকেও একইরকমের নির্দেশ ও আচার অনুশীলন করতে হয়। একইসাথে তন্ত্রমার্গে অভীষ্ট সিদ্ধির ক্ষেত্রে অতীতে যেমন মন্ত্রশক্তি ও দ্রব্যশক্তির যথার্থ সমাহার অপরিহার্য ছিল বা এখনো রয়েছে, ঠিক তেমনি লৌকিক মন্ত্রগুলি সুপ্রাচীন তান্ত্রিক সংস্কার ও বিশ্বাস থেকে উদ্ভুত হওয়ার ফলে অতীতে গুণিনেরা যেমন বিভিন্ন ধরণের লতা-পাতা, গাছ-গাছড়া প্রভৃতি দ্রব্যের যথাযথ ব্যবহার-বিধির সঙ্গে মন্ত্রশক্তির প্রয়োগ করতেন, তেমনি আজও করে থাকেন। মোটকথা হল যে, তন্ত্রে মন্ত্রের যথার্থ উচ্চারণের উপরেই যেমন ফল নির্ভর করে বলা হয়ে থাকে, এখনও লৌকিক মন্ত্রগুলিও ঠিক তেমনি একটি নির্দিষ্ট ক্রম-অনুযায়ী বিশিষ্ট প্রক্রিয়ায় উচ্চারণ করতে হয়। এখানে আলোচ্য প্রসঙ্গে অতীতে ব্যবহৃত কয়েকটি লৌকিকমন্ত্রে তন্ত্র-প্রভাবের নিদর্শনস্বরূপ সুভাষ মিস্ত্রি রচিত ‘দক্ষিণবঙ্গের লোকসমাজে মন্ত্র’ নামক গ্রন্থ থেকে কয়েকটি মন্ত্র উল্লেখ করা যেতে পারে, যেগুলি নিম্নরূপ—
(১) প্রসব বেদনায় জলপড়া মন্ত্রের অংশবিশেষ—
“ওরে ব্যথা খারে রক্ত
রক্ত খা ওরে ব্যথা।
যদি নড়িস চড়িস
কালীর নাম স্মরণ করিস।
ওরে ব্যথা চেয়ে দ্যাখ
কালীর চরণে ভস্ম হয়ে থাক।
কার আজ্ঞে দহাই মা কালীর আজ্ঞে
অমুকের ব্যথা ভস্ম হয়ে যাকগে।”
(দক্ষিণবঙ্গের লোকসমাজে মন্ত্র, সুভাষ মিস্ত্রি, কলকাতা, ২০০০, পৃ- ৮৫)
(২) রমণী-বশীকরণ মন্ত্র (সিন্দুর মন্ত্র)—
“সিন্দুর সিন্দুর সিন্দুর পাতি।
কামুক্ষা পর্বতে তোমার উৎপত্তি॥
সিন্দুর সিন্দুর সিন্দুর কপাট।
কালীর বদনে রক্ত হয় দোপাটি॥
হৃদয়ের সিন্দুর এই কপালে পরি।
শিব দুর্গা আর রতি কামের স্মরণ করি॥”
(দক্ষিণবঙ্গের লোকসমাজে মন্ত্র, সুভাষ মিস্ত্রি, কলকাতা, ২০০০, পৃ- ১০১)
(৩) ভূতঝাড়ান মন্ত্র (সরিষা বাণ)—
“সরিষা বাণের চোটে গগন ফাটে
ঈশ্বর মহাদেবের জটা কাটে।
ডাকিনী যোগিনী পালায় পালায় দানব দূত
সরিষার বাণে পালায় যত প্রেত ভূত।
মন্ত্রের মান্য যদি রাখিবারে চাও
যথা হইতে আসিয়াছিলে তথা চলি যাও।
কার আজ্ঞে—কাঁউরের কামাক্ষ্যার আজ্ঞে
হাড়ির ঝি চণ্ডীর আজ্ঞে।”
(দক্ষিণবঙ্গের লোকসমাজে মন্ত্র, সুভাষ মিস্ত্রি, কলকাতা, ২০০০, পৃ- ১০২)
এমনকি এসব মন্ত্রের কোথাও কোথাও তান্ত্রিক বীজমন্ত্রের অনুসরণেও মন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল; যেমন—
“ওঁ হ্রীং হং ফট্ স্বাহা।
তিন চাপড়ে বিষ পালা॥”
(দক্ষিণবঙ্গের লোকসমাজে মন্ত্র, সুভাষ মিস্ত্রি, কলকাতা, ২০০০, পৃ- ২১৮)
এসব থেকে একথাই প্রমাণিত হয় যে, সুদূর অতীতে দ্রাবিড়াদি বিভিন্ন অনার্যজাতির মধ্যেও তান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠান ও মন্ত্রের অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। আর বাংলার লোকসংস্কৃতির সেই সুপ্রাচীন তান্ত্রিক সংস্কার ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক লৌকিক মন্ত্রগুলিতেও সেসবের স্বাক্ষর এখনো বিদ্যমান রয়েছে।
সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে পরিশেষে বলা চলে যে, অতিপ্রাচীন কাল থেকেই বাংলার লোকজীবন ও লোকমানসের নানাস্তরে তান্ত্রিকতার ধারা নিরবচ্ছিন্ন গতিতে বয়ে চলেছে। আর বাঙালি হিন্দুর মানস-চৈতন্যে উচ্চ-নীচ নির্বিশেষে বহুযুগব্যাপী যে তন্ত্রাচার ও তান্ত্রিক-সংস্কার সেই অতীত থেকে প্রবাহিত হয়ে চলেছে, এবং প্রাগাধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তন্ত্রপ্রভাবের যে গভীর ও ব্যাপক স্বাক্ষর বিদ্যমান রয়েছে, সেই তান্ত্রিক সংস্কার ও চেতনার প্রতিফলনই বাংলার লোকসাহিত্যের ব্রতকথা, উপকথা, লোকগীতি, ছড়া প্রভৃতি বিভিন্ন ধারায় এখন লক্ষ্য করা যায়। আসলে সুদূর অতীতেই তন্ত্রের শক্তিতত্ত্ব, যৌগিক প্রক্রিয়া, মন্ত্র ও দ্রব্যশক্তিতে বিশ্বাস, বিশেষ বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান প্রভৃতি বাঙালি হিন্দুর জাতীয় জীবন ও সংস্কৃতিতে গভীর ও ব্যাপকভাবে মিশ্রিত হয়ে গিয়েছিল বলেই আজও বাংলার লোকজীবন সম্ভূত লোকসাহিত্যে এর সুরমূর্ছনা ক্ষণে ক্ষণে ধ্বনিত হয়ে উঠেছে বলেই দেখতে পাওয়া যায়।#




