অনুগল্প

আমি প্রতিদিন খুঁজে পেতাম চুলের কাঁটা এখানে আসার পরে। ঘর কুড়োতে গিয়ে খাটের নিচে, আমার আগে যে ইরাকী মেয়েটি থেকে গেছে এখানে তার অস্তিত্বের অংশ এখনও লেগে গেছে। আমি কিছুদিন হল প্রবাসে এসেছি। এসে, আমার পাড়ায় বিকেলবেলায় হাঁটতে বেরিয়ে অথবা পার্কে যখন পড়শিরা কুকুর নিয়ে খেলা করে তখন তারা জানতে চেয়েছে আমি কোথায় থাকি; ঠিকানা বললে তখন তারা বলেছে ইরাকী মেয়েটির কথা–যার চুলের কাঁটা আমি প্রায় খুঁজে পাই।
কখনো বা নতুন বান্ধবীর গাড়িতে লক্ষ্য করি পড়ে আছে তার চুলের কাঁটা। আমি অবাক হই আমার দেশের মেয়ের মতো একই রকম কালো চিকন চুলের কাঁটা এখানকার মেয়েরাও পড়ে। আমি গাড়ি থেকে আলিঙ্গন বা করমর্দন করে নেমে আসার আগে আগে গাড়ির ভেতরে পড়ে থাকা তার চুলের কাঁটাটি ফেরত দিই। সে হেসে ফেলে। হয়তো মনে মনে আশ্চর্য হয়, প্রকাশ করে না। হয়তো অবিশ্বাস করে, সন্দেহ করে, ভাবে এটা আমার কোন কৌশল কিনা তার সঙ্গে অন্তরঙ্গতা তৈরি করার। না। আমি সামান্য একটি চুলের কাঁটা ফেরত দিতে চাই, কেননা সে আমার যোগাযোগ সক্ষমতার মাঝে আছে বলে।
জ্যাজ মিউজিকের অনুষ্ঠানে আমার বাড়ির দুটো বাড়ির পরে, সে ইরাকী মেয়েটির সঙ্গে দেখা হয়, আমি তাকে বলি সে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে পারবে কিনা? সে বলে পারবে। আমি দৌড়ে এপার্টমেন্টের তালা খুলি, তার সবগুলো চুলের কাঁটা রাখা ছিল ড্রয়ারে। সবগুলো মুঠোয় পুরে দরজা আবারও লক করে তার কাছে আসি।
দেখি সে দেয়ালে হেলান দিয়ে সিগারেট টানছে। সরু চোখ। সে বুঝতে পারছে না আমি ঠিক কেন দৌড়ে ছুটে গেলাম আমার এপার্টমেন্টে, আবার চলেও এলাম কয়েক মিনিটের মধ্যে। আমি তাকে হাত বাড়াতে বললাম, সে কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো, চোখের কালো তারায় ও ভ্রু’তে ভাসছে প্রশ্নরাজি। আমি মৃদু হেসে তাকে হাত বাড়াতে বললাম। সে নিজে থেকে হাত বাড়াল চোখ বন্ধ করে। যেন অন্ধ।
আমি তার হাতে চুলের কাঁটাগুলো দিলাম। সে শুধু বললো:’এগুলো এখন কবিতার অক্ষর!’
তার ছায়া মিলিয়ে গেল গলির অন্ধকারে। তারপরে আমি আর তাকে কোনদিনও দেখিনি।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on print
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!