ডিপ স্টেটের কালি বিশ্বকবির প্রতিকৃতিতে

জগতের বিচিত্র আয়োজনের মধ্যে বাংলাদেশ নিয়ে যা-সব হচ্ছে, তা লাখ লাখ পবিত্র শহীদের রক্তকে উপহাস করছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম থেকে বর্তমান অবধি যা হচ্ছে, তার মধ্যে মিশে আছে শোষক গোষ্ঠী, পুঁজিবাদীদের নির্মম নৃশংসতার ইতিহাস। পরিত্রাণ পায়নি বৃহৎ ভারতের বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান। সেইসব আলোচনা মূল লক্ষ্য নয়। সম্প্রতি বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ঘটনা ও ডিপ স্টেটের কারসাজি নিয়ে একটু আলোকপাত করব। একই সাথে রবীন্দ্রনাথকে কিভাবে জাতীয় কবি দেখেছেন, তা উল্লেখ করব।

ডিপ স্টেটের কলাকৌশলে কবিগুরুর প্রতিকৃতিকে ব্যবহার করা হলো। সাম্রাজ্যবাদীরা যে কতটা ধূরন্ধর, তা বলে বোঝানো যাবে না। আমরা সবাই কবিগুরুর দেয়ালের প্রতিকৃতিতে আঁকা ছবির উপর কালি দেয়াকে নিয়ে প্রতিবাদ প্রতিরোধ করতে গিয়ে ডিপ স্টেট চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে যা করার ছিল, তা করে ফেলেছে।

চট্টগ্রামের বন্দর নিয়ে সরকার যাতে চুক্তি করতে না পারে, সেজন্য বামপন্থী শ্রমিক সংগঠনগুলো আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। এই সব শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে বৃহৎ শক্তিশালী সংগঠন ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ ও তার সহযোগী সংগঠন নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন। আন্দোলনে অন্যসব বামপন্থী সংগঠন সম্মিলিতভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। সরকারি দলের নামসর্বস্ব সংগঠন থাকে। বিগত সময়ের সরকারের শ্রমিক সংগঠনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, তারা কেউ শ্রমিক ছিল না। এমনকি ট্রেড ইউনিয়ন বিষয়ক ধারণাও স্বচ্ছ ছিল না। তাদের কাজ ছিল, লুটপাট, চাঁদাবাজি, ঘাট দখল, বন্দরে আধিপত্য, টেন্ডারে নিয়ন্ত্রণ। এইসব করতে গিয়ে শ্রমিকদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সরকারি দলের শ্রমিক সংগঠন। আর শ্রমিক নেতারা ফুলেফেঁপে ওঠে। শ্রমিকদের সাথে ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের নেতাদের নিঃস্বার্থ সম্পর্ক ছিল। কারণ তারা শ্রমিক শ্রেণির সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়। তাদের অন্তর্ভুক্ত সংগঠন নৌযান, লাইটারেজ, বন্দর, ঘাট যা আছে, তারা শ্রমিকদের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে লড়াই করে।

অন্য বামপন্থী শ্রমিক সংগঠনগুলো আস্থার সংকটে ভোগে। তাদের নিয়ন্ত্রণকারী রাজনৈতিক দলের কর্মকৌশলে আপসকামিতা প্রকটতর থাকার ফলে একটা আস্থার সংকট বিদ্যমান রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে তীব্র আন্দোলন চলছে। সেই সময় ডিপ স্টেটের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারীরা কৌশল নেয়। তাদের কৌশল বাস্তবায়নে এবার ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’কে ব্যবহার করা হলো। ওদের নেতা ও অন্যান্যরা রাষ্ট্র কি, এটাই তো জানে না।

রাষ্ট্র সংলাপ গ্রুপ ইতিহাসের সংগ্রামী বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেতাদের ছবি টাঙিয়ে (শাহবাগে) জুতো নিক্ষেপ করে। সেই ব্যানারে ছবি ছিল, কমরেড আব্দুল হক, কমরেড সাজ্জাদ জহির, কমরেড আমজাদ হোসেন, কমরেড মোহাম্মদ আফজালসহ প্রমুখের।

কিন্তু এরপরেও আন্দোলন তো থেমে নেই। এবারের কৌশলে এলো বিশ্বকবির ছবি। তারপরের ঘটনা তো সকলেই দেখছেন। তর্ক-বিতর্ক, মূর্খতার, বিদ্বেষের ছড়াছড়ি। যা কিছু ঘটছে সবকিছুই রাজনৈতিক কলাকৌশল। এর পেছনে সাম্রাজ্যবাদী ডিপ স্টেটের ভূমিকা অগ্রাহ্য করা যাবে না। এইসব কৌশলে বামপন্থী সেজে থাকা বুদ্ধিজীবীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। বামপন্থী লেজুড়বৃত্তিদের মাঠে নামানো হচ্ছে।
ডিপ স্টেট মহাখুশি।

ফেসবুকে মহাপণ্ডিতদের উত্তাল জাগরণ চলছে। সবাই নেমেছে কবিগুরুর ছবিকে নিয়ে, কিন্তু তার আড়ালে যা হবার তা হয়ে গেল। চুক্তি হবার, তা হয়ে গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ডিপস্টেটের পলিসি ও গাইডলাইন এমনভাবে রেখে গেছে, সরকারকে তা শুধু অনুমোদন দিতে হবে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এতটাই ভয়ংকর, তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে প্রয়োজনে যুদ্ধ করতেও দ্বিধা করবে না।

সারাদেশের দিকে তাকালে একটা বিধ্বস্ত দেশ দেখতে পাই। লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে গেছে। কৃষকরা ফসল ফলানোর ব্যয়ে জমিতে বসে কাঁদে। ফড়িয়া ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীরা লুটপাট করছে। তরুণরা বেকারত্বে ভুগছে। জিনিসপত্রের দাম, নিত্য ব্যবহার্য যা কিছু আছে, তার খরচ ২০ ভাগ বেড়ে গেছে।

দেশ পরিচালনায় সরকার সঠিক নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। দেশের রাজনীতিতে লুটেরা ব্যবসায়ী যতদিন থাকবে, রাজনীতিবিদরা দেশকে উন্নতির দিকে নিতে ব্যর্থ হবে। বিগত সরকারের সময় লুটেরা ব্যবসায়ীরা, দুর্নীতিবাজরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতো। সেইসব লুটেরাচক্র কেউ দেশে নেই। হতভাগ্য মাঠে-ময়দানে স্লোগান দেয়া কর্মীরা অসহায় জীবনযাপন করছে।

রাজনৈতিক দূরদর্শিতা তখনো দেখতে পাইনি, এখনো কি দেখা সম্ভব? তখনকার ধারাবাহিকতা থেকে এই সরকার কি বেরিয়ে আসতে পারবে? মনে হয় কঠিন হবে। রাষ্ট্রকে ক্ষত-বিক্ষত করে ভেতরের সম্পদকে, ভূ-রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনার কৌশলে ডিপ স্টেট দেশের ভেতর অনাচার, বিভেদ, লুটপাটের নতুন কৌশলের বীজ বপন করে গেছে। যাতে তারা নির্বিঘ্নে দেশকে কুক্ষিগত করতে পারে। সেই কুক্ষিগত করার বৃহৎ পরিকল্পনা ‘বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি’। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহম্মদ ইউনুস কতটা পরিপক্ক তা আর নতুন করে বলার দরকার নেই।

শিক্ষাব্যবস্থা এমন হবে কেন? প্রশ্নটা বিগত সরকারের সময়ে রেখেছি, এখনো রাখছি। এত এত বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল কলেজ করে কি হবে? কে/কারা পড়াবেন? তাদের দক্ষতা কি? লক্ষ্য করলাম একটা বিষয়কে ভেঙে ভেঙে কয়েকটি বিভাগে পরিণত করা হয়েছে। তার কি দরকার ছিল? উচ্চতর গবেষণার জন্য বিভাগের ভেতরেই সেল করা যায়। দেশের কল্যাণে কোন কোন বিষয় অপরিহার্য, তা কি ভেবে দেখা হয়েছে? অর্থাৎ শিক্ষাব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছিল।

মন্ত্রী মহোদয়রা যদি দক্ষ না হন, তার খেসারত তো দিতে হবে। বিগত সময়ে শিক্ষামন্ত্রীদের কার্যক্রম নিয়ে পর্যালোচনা করুন। সেই সময়ের কর্মকর্তাদের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করুন। তদ্বিরবাজ, জ্ঞানান্ধরা যদি দায়িত্ব পায়, তাদের দ্বারা ফসল ফলবে না। ঘুষ, দুর্নীতি, নিয়োগবাণিজ্য বেড়ে গিয়েছিল। তবে ধারণাটি কারো কারো ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। সরকারি দলের রাজনীতিতে উদ্ভব ঘটে যায়, কিছু ভেল্কিবাজের। সুন্দর সুন্দর ব্র্যান্ডের পোশাকের উপর বিদেশি পারফিউম, ঘড়ি, সানগ্লাস। রাজপথের সেইসব ভাইয়াদের কাছে যেতে পারে না, তারা সারাক্ষণ ব্যতিব্যস্ত। বড় বড় প্রকল্প, বড় বাজেট, বড় পারসেনটেজ। আর এমন সব নায়ক-নায়িকারা সামনে এসে যায়। সেলিব্রেটিদের ধাক্কায় নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে। রাজনীতিকরা কি করবে হতভম্ব হয়ে যায়! কি সব রাজনীতির ফতোয়া দেয়? সংস্কৃতি অঙ্গনেও একই অবস্থা। রেষারেষি, দলাদলি তো আছেই।

বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কার্যক্রমগুলো আলোচনা নিয়ে আসুন। হতাশ হবেন। বেশ কয়েকজন বাদে তোষামোদকারী ধূরন্ধররা নষ্ট করে গেছে। বাংলা একাডেমির পুরস্কার কতটা বিতর্কিত করা যায়, তা তো সবাই দেখছে।
দীর্ঘ বছর ধরে যেসব সংকট সমস্যা চলে এসেছে, তা কি সহজে দূর হবে?
কারা দূর করতে পারবে?
শিল্পকারখানা গড়ে না উঠলে, রপ্তানি না হলে, দেশের উন্নতি কিভাবে হবে?
প্রশ্নটা সকলের প্রতি। দেশের সামনে প্রতিচ্ছবিগুলো দেখুন। ডেঙ্গু মহামারির দিকে চলে গেছে। ছয় কোটি মানুষ মধ্যবিত্ত থেকে দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। আরও কতকিছু আছে। বেকারত্ব বেড়েই চলেছে।

অথচ ডিপ স্টেট তাদের কাজ করে যাচ্ছে। ‘চট্টগ্রাম বন্দরে ১৫ বছর টার্মিনাল চালানোর সুযোগ পেলো দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড’, ‘এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করল বাংলাদেশ’, ‘যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস’, ইত্যাদি পাবেন বিবিসির সংবাদে।

এই অবস্থায় কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে মানুষ? হিংসা, বিদ্বেষ, ধর্মীয় বিভেদ ভুলে দেশের জনগণকে বাঁচাতে সরকার কি কি পদক্ষেপ নেন, তা দেখার বিষয়। ডিপ স্টেট তথা ধূরন্ধর সাম্রাজ্যবাদীদের নীলনকশা ভেদ করে বাংলাদেশ জেগে উঠবে। দুর্ভিক্ষ, দুর্যোগ ও হানাহানির ভেতর অমূল্য জীবন যাদের চলে যায়, তাদের কষ্ট কে বুঝবে? সাময়িক শোকবার্তা দিয়ে কি নিহতদের পরিবারের ছন্দ ফিরে আসবে?
আসুন, আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেই। ডিপ স্টেটের কালি বিশ্বকবির মুখাবয়বে। মাঝখানে বলির পাঁঠা হতে হলো আয়াস গংদের।
মনে রাখবেন, বিশ্বকবিকে যতই আটকাতে চাইবেন, তিনি ততই উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে, মানবিক চেতনায় ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। ১৯৩৭ সালে বিশ্বকবির সভাপতিত্বে ব্রিটিশ-ভারতে ‘ফ্যাসিবাদ ও যুদ্ধবিরোধী সংঘ’ গঠিত হয়েছিল। ইতিহাসে দেখুন, বিশ্বকবি সাম্রাজ্যবাদ, ফ্যাসিস্ট ও উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম ভূমিকা রেখেছেন। ইতালির আবেসিনিয়া (১৯৩৬ সালে) আক্রমণে কবি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। ১৯২৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্মেলন প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে ব্রিটিশ-ভারত থেকে একমাত্র কবিগুরু স্বাক্ষর করেন। এটা হয়তো এই প্রজন্ম শোনেওনি।

কবিগুরু কেমন ছিলেন, তা সকলের থেকে বেশি অনুভব করেছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ‘রবিহারা’ কবিতায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কি বলতে চেয়েছেন! একবার ভাবুন। আত্মগ্লানিমুক্ত হবেন।
“দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্ত-পথের কোলে
শ্রাবণের মেঘ ছুটে এল দলে দলে
উদাস গগন-তলে,
বিশ্বের রবি, ভারতের কবি, শ্যাম বাংলার হৃদয়ের ছবি
তুমি চলে যাবে বলে।…
শ্রাবণ মেঘের আড়াল টানিয়া গগনে কাঁদিছে রবি,
ঘরে ঘরে কাঁদে নর-নারী, “ফিরে এস আমাদের কবি।”
ভারত-ভাগ্য জ্বলিছে শ্মশানে, তব দেহ নয়, হায়।
আজ বাংলার লক্ষ্মীশ্রীর সিঁদুর মুছিয়া যায়।….
তোমার বাণীর সুরের অধিক প্রিয়তম ছিলে তুমি,
বাংলার শ্রীর চেয়ে ভালোবেসেছিলে বঙ্গভূমি।
শুনেছি, সূর্য নিভে গেলে হয় সৌরলোকের লয়;
বাংলার রবি নিভে গেল আজ, আর কাহারও নয়।
বাঙ্গালি ছাড়া কি হারালো বাঙ্গালি কেহ বুঝিবে না আর,
বাংলা ছাড়া এ পৃথিবীতে এত উঠিবে না হাহাকার।….
এত বড়, এত মহৎ বিশ্ববিজয়ী মহামানব
বাংলা দীন হীন আঙ্গিনায় এত পরমোৎসব
স্বপ্নেও আর পাইব কি মোরা? তাই আজি অসহায়
বাংলার নরনারী, কবিগুরু, সান্ত্বনা নাহি পায়।
আমরা তোমারে ভেবেছি শ্রীভগবানের আশীর্বাদ,
সে আশিস যে লয় নাহি করে মৃত্যুর অবসাদ।
বিদায়ের বেলা চুম্বন লয়ে যাও তব শ্রীচরণ,
যে লোকেই থাক হতভাগ্য এ জাতিরে রাখিও মনে।”
কবিতার কিছু অংশ তুলে ধরলাম। আশা করি বোধোদয় হবে।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণের ১৫ দিন পর ১৯৪১ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর কলকাতার হাওড়ায় রবীন্দ্র স্মরণসভায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ভাষণ দেন। তার অংশবিশেষ তুলে ধরছি– “শিল্পী যে দেশেরই অধিবাসী হোন না কেন শিল্পী শিল্পীই। তার শিল্প জগতের আপামর জনসাধারণকে আনন্দ দান করবে।… তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিরভিমান, নিরহঙ্কার। তাকে দেখেছি উপনিষদের গুরুরূপে, প্রাচীনকালের পবিত্র আর্য ঋষিরূপে। তার জীবন ছিল জীবন্ত উপনিষদ। তাই তিনি অন্যান্য সন্ন্যাসীর মতো উপনিষদ পাঠ করেননি। প্রকৃত উপনিষদ তার মধ্যেই সুপ্ত ছিল। তিনি অবতার অন্তত আমি তাকে সত্যধামের মানুষ বলতে রাজি নই।… রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন বৃহত্তর ভারতের স্বপ্ন। সেই মহাভারতের মধ্যে জগৎকে এনে ফেলেছিলেন প্রায় ঘরের কাছে।” কবি নজরুল বক্তৃতায় তরুণদের উদ্দেশ্যে আরও বলেন– “শক্তি চাই, তবেই রবীন্দ্রনাথকে বোঝা যাবে।… ছেলেদের মধ্যে যেদিন আমি সত্যকার শক্তির পরিচয় পাব সেদিন আমিও হব তাদের সঙ্গের একজন পদাতিক সৈনিক। হে ভগবান, যেন সেনাধ্যক্ষ হবার বাসনা না জাগে। শক্তির পূজারী রবীন্দ্রনাথকে এই দিক দিয়ে জানতে হবে তবেই তাকে ঠিক ঠিকভাবে শ্রদ্ধা করা যাবে।” (নজরুল-রচনাবলি, অষ্টম খণ্ড, বাংলা একাডেমি, পৃ. ৫৩-৫৫)।

ডিপ স্টেট বিদ্বেষ তর্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। অসৎ মূর্খরা রবীন্দ্রনাথকে কতটা নিচে নামানো যায়, তাই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়ে লেগেছে। আবার গুণধর সুশীল বুদ্ধিজীবী প্রশ্ন তুলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথকে কটাক্ষ করছেন। ‘গাঁয়ে মানে না, আপনি মোড়ল’ এই প্রবাদটি মনে পড়ে গেল। রাজনৈতিক মতবিরোধ, কৌশল ইত্যাদি লক্ষ্যবস্তু হয়ে গেছে। এইসব বিরোধ যত থাকবে, ডিপ স্টেট তার চুক্তিপত্র বাস্তবায়ন নির্বিঘ্নে করতে সক্ষম হবে। তাহলে কি করা উচিত? একটাই পথ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জনসচেতনতা গড়ে তোলা।

সারা দেশে রবীন্দ্র-নজরুল চর্চা বাড়ানো, রামমোহন-বিদ্যাসাগর-ডিরোজিও-শরীয়তউল্লাহ- মোজাফ্ফরদের ভূমিকা তুলে ধরা, সাহিত্যের দিকপালদের নিয়ে আলোচনা করা, রাজনৈতিক নেতাদের তথ্য তুলে ধরা। দেশের শ্রমজীবী মানুষের বিদ্রোহ সংগ্রাম, ভাষা শহীদ ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রাম, সকল বীরের ত্যাগ-মহিমাকেও তুলে ধরতে হবে। দেশকে গড়তে হলে ‘বৈষম্য ও অসম ব্যবস্থাকে’ জোর করে হলেও পরিত্যাগে বাধ্য করার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। বিশ্বের গতিপ্রকৃতি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, শিল্প-কারখানা, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে জানার জন্য দক্ষ পেশাদার বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। দেশের কৃষি, মাছ চাষকে অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে। কর্পোরেটদের নিকট সরকারি জমি বন্দোবস্ত বাতিল, ব্যবসায়ী-আমলা-কামলা-ফড়িয়াদের চক্র কঠোরভাবে ভেঙে ফেলতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। ‘অর্থনৈতিক জোন’ নামে পুঁজিবাদী দেশের ব্যবসায়ীদের নিকট দুর্বল শর্তে জমি বন্দোবস্ত দেয়া বন্ধ করতে হবে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য ‘মার্কসীয় মতবাদ’-এর আলোকে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দেশগুলো কিভাবে অগ্রগতি করেছে, সেই আলোকে পরিকল্পনা নিতে হবে। সকল ক্ষেত্রেই জনগণের ধর্মীয় স্বাধীনতা সমানভাবে প্রযোজ্য রাখতে হবে। সংখ্যালঘিষ্ঠদের উপর আধিপত্য বন্ধ করতে হবে। সমাজে যেসব অনাচার, সহিংসতা, ধর্ষণ, লুটপাট, মবসন্ত্রাস, চাঁদাবাজি চলছে, তা কঠোরভাবে দমন করতে হবে। রাজনৈতিক মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা প্রকাশের সুযোগ থাকতে হবে। স্বাধীনতা অর্থ অপরকে গালিগালাজ, শক্তিমত্তা প্রদর্শন নয়। যাহোক, তাৎক্ষণিকভাবে কিছু মতামত তুলে ধরা হলো।

সাম্য শান্তির বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সকলের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on print
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!