ধর্ম অবমাননায় মৃত্যুদণ্ডের প্রস্তাব: বাংলাদেশ কোন পথে?

বাংলাদেশ কি এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে অভিযোগই হয়ে উঠবে শাস্তির ভিত্তি, আর ভিন্নমত প্রকাশের ঝুঁকি হবে প্রাণঘাতী? সম্প্রতি সংসদে দাঁড়িয়ে খিলাফত মজলিসের নেতা এবং মাদারীপুর–১ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদউদ্দিন আহমেদ হানজালা কথিত ধর্ম অবমাননার জন্য মৃত্যুদণ্ড প্রবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)–কে অবমাননাকর মন্তব্যের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান এবং যারা মহানবী (সা.)–কে শেষ নবী হিসেবে স্বীকার করে না, তাদের অমুসলিম ঘোষণা করার জন্য আইন প্রণয়নেরও দাবি জানান। তার এই বক্তব্যের পর বিষয়টি নতুন করে জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।

“ধর্ম অবমাননা” একটি অস্পষ্ট ও ব্যাখ্যাভিত্তিক ধারণা। কোন বক্তব্য বা আচরণকে অবমাননা বলা হবে, তা ব্যক্তি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটভেদে ভিন্ন হতে পারে। এই অনির্দিষ্টতাই আইনকে সহজেই অপব্যবহারের ঝুঁকিতে ফেলে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায়, এ ধরনের আইন প্রায়ই ভিন্নমত দমন, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা উপেক্ষা করা যায় না। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত সংক্রান্ত আইন বিদ্যমান। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ২৯৫এ ও ২৯৮ ধারা এবং Cyber Security Ordinance-এর আওতায় এ ধরনের অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। ফলে মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম শাস্তি যুক্ত নতুন আইন প্রণয়ন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ বলেই প্রতীয়মান হয়।

আরও উদ্বেগজনক দিক হলো, প্রস্তাবে “অভিযুক্ত” ব্যক্তির জন্যই মৃত্যুদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি হলো অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ দোষী নয়। কিন্তু অভিযোগকেই যদি কার্যত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে মিথ্যা অভিযোগ, গুজব বা ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে কারও জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এছাড়া কোনো মুসলিম ব্যক্তিকে “অমুসলিম ঘোষণা” করার প্রস্তাব রাষ্ট্রের এখতিয়ার ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন তোলে। নাগরিকের বিশ্বাস নির্ধারণ করা রাষ্ট্রের কাজ নয়; এটি ব্যক্তির মৌলিক স্বাধীনতার অংশ। এমন ধারণা বাস্তবায়িত হলে সমাজে বিভাজন ও বৈষম্য আরও গভীর হতে পারে।

আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে সতর্কতামূলক বার্তা দেয়। পাকিস্তানের ব্লাসফেমি আইন বহু বছর ধরে বিতর্কিত, যেখানে সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীরা প্রায়ই অপব্যবহারের শিকার হয়েছেন। Amnesty International এবং Human Rights Watch বারবার উল্লেখ করেছে যে, এ ধরনের আইন মিথ্যা অভিযোগ, বিচারবহির্ভূত সহিংসতা এবং ভয়ভিত্তিক সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

এই ধরনের কঠোর আইন ভিজিলান্টিজম বা জনতা-নির্ভর বিচারকে উৎসাহিত করতে পারে। যখন অভিযোগই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচিত হয়, তখন মানুষ নিজেরাই আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখাতে পারে। এতে আইনের শাসন দুর্বল হয় এবং সমাজে সহিংসতা বৃদ্ধি পায়।

এই প্রস্তাবটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে শরিয়াভিত্তিক আইনের দাবি জোরালো হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ কি তার সংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে? বিভিন্ন মানবাধিকার ও সংবাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেশে একাধিক সহিংস ঘটনা ও মামলা ঘটেছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র হত্যা এবং কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দরবার প্রধান পীর আব্দুর রহমান ওরফে শামীম জাহাঙ্গীর হত্যার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্ট অন্তত ৭৩টি সহিংস ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে ৪৫টি হত্যাকাণ্ডসহ মোট ১,০৪৫টি নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি নিশ্চিত করে, যার অর্থ রাষ্ট্র সকল ধর্মের প্রতি সমান আচরণ করবে এবং কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে আইনের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে না। কিন্তু ব্লাসফেমি আইনে মৃত্যুদণ্ড প্রবর্তনের প্রস্তাব সেই নীতির সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। এর পাশাপাশি এ ধরনের আইন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ফেলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, যারা সহজেই অভিযোগের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন।

ধর্মীয় অনুভূতির সুরক্ষা নিশ্চিত করার উপায় যদি ভয়, দমন-পীড়ন এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম শাস্তির ওপর নির্ভর করে, তাহলে তা ন্যায়বিচারের ধারণাকেই দুর্বল করে দেয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি তার সহনশীলতা, যুক্তিবাদিতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় নিহিত, ভয়ের মধ্যে নয়।

বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে, সহনশীলতা ও অধিকারের পথে নাকি নিয়ন্ত্রণ ও আতঙ্কের পথে, এই সিদ্ধান্ত এখন শুধু নীতিনির্ধারকদের নয়, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি টিকে থাকার প্রশ্ন।#

Facebook
Twitter
LinkedIn
Print
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!