ট্র্যাজিক-নায়ক শ্রীমধুসূদন
কোনো কোনো মানুষের ভৌম জীবনের ঘটনা এতই অভাবিত-পূর্ব ও চমকপ্রদ যে, তার কাছে সহজেই হার মেনে যায় দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ নানাবিধ জটিলতাযুক্ত নাটকের কাহিনি। নাট্য-ঘটনার ক্ষেত্রে তাও একটা সান্ত্বনা থাকে যে সে-গল্প বানিয়ে-বলা গল্প; কিন্তু জীবনের গল্প সত্য বলেই তাতে সান্ত্বনা ও ভরসার কোনো স্থান থাকে না। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ৪৯ বছরের জীবন ও তাঁর শোচনীয় পরিণাম…
মাইকেল মধুসূদন দত্ত; প্রাচ্যের যুগমানস
উপনিবেশবাদের বৃটিশ আধিপত্যে ভারতবর্ষের জীবন ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, আর্থিক বাণিজ্য নীতি, উৎপাদন ব্যবস্থাসহ সকল ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়ে যায়। প্রাচ্যের সামন্তীয় জীবন ব্যবস্থায় বহুকাল যাবত ধর্মের ভেদাভেদ, জাতিভেদ প্রকটতর হয়ে সামাজিক বৈষম্য, পীড়ন, শোষণ অব্যাহত ছিলো। ভারতবর্ষে বৃটিশ আধিপত্যের ক্ষমতার বলপ্রয়োগের মধ্যেই পাশ্চাত্যের নবজাগরণের প্রবাহ সমাজে অনুপ্রবেশ করতে থাকে। কুসংস্কারে বিপন্ন প্রাচ্য সমাজের আত্মশক্তি ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত…
একটি অসম্পূর্ণ সংলাপ
কথা রেখেছি গোধূলি সন্ধা, যে বসন্তে দুজন হলুদ হয়ে ওঠার কথা হয়েছিল। আমি প্রতিক্ষা সাজিয়েছি কুঞ্জকুসুম, সাত সুতোর সুখ । প্রতিদিন যত্ন করে মাটি রেখেছি মুঠো করে। উড়িয়েছি দৃষ্টিমেঘ। প্রতিদিন বাতাসকে শুনিয়েছি লাজ রাঙা প্রজাপতির আলোকথা দীর্ঘশ্বাসকে হৃদয়ের সিন্দুকে অযত্নের সাথে জমতে দিয়েছি কথা রেখেছি তোমার অনিদ্রিত রাতের অন্ধকার হতে। কথা রেখেছি আমার অকাল স্বপ্ন…
বাংলা লিপি ও পাঠশালার উৎস
বর্তমানে সকলেই এবিষয়ে অবগত রয়েছেন যে, খৃষ্টীয় ঊনিশ শতকে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা লিপি এবং বাংলা গদ্যের বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনিই বর্তমান সময়ে প্রচলিত থাকা বাংলা বর্ণমালাকে সুসংহত ও সহজবোধ্য করবার জন্য প্রমিত রূপ দিয়েছিলেন, এবং একাজের জন্য ‘বর্ণপরিচয়’ নামক গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন, যা তখন ও পরবর্তীসময়ে বাংলা ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি…
আষাঢ় মাসের অন্যতম প্রধান উৎসব
রথযাত্রা বা রথদ্বিতীয়া একটি আষাঢ় মাসে আয়োজিত অন্যতম প্রধান হিন্দু উৎসব। ভারতের ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে এই উৎসব বিশেষ উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়। এছাড়া ইসকনের প্রচুর পরিমাণে প্রচারের জন্য এখন এটি বিশ্বব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর কৃষ্ণের বৃন্দাবন প্রত্যাবর্তনের স্মরণে এই উৎসব আয়োজিত হয়ে থাকে। ভারতের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ রথযাত্রা ওড়িশার পুরী…
আত্ম-উপলব্ধি
জীবনের অষ্টব্যাঞ্জন সময়ের ব্যবধানে এক এক রকম। কেউ হয়ত টক ঝাল মিষ্টি নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেন। কেউ বা হয়ত শুধুই নোনতা বা মিষ্টি আবার কারও কারও ক্ষেত্রে হয়ত শুধুই টক। যার জীবন যেমনই হোক না কেন। আমাদের প্রত্যেকেরই চেষ্টা থাকে যার যেমন ভাল লাগে সেরকম কিছুটা পরিবর্তন করে নেয়ার। আমাদের কোনও কিছুই অবধারিত নয়। পরিবর্তন…
কবিতার শৈলী: অমলেন্দু বিশ্বাস
শৈলীবিজ্ঞান অর্থাৎ রীতিবিজ্ঞান (stylistics) আমাদের দেশে শিল্পতত্ত্ব, রসতত্ত্ব ও ভাষাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অপরিচিত আগন্তুক বলে মনে হলেও প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের ক্ষেত্রে ‘রীতি’ কথাটি বহুল প্রচলিত। আমরা দেখেছি যে শুধুমাত্র রচনারীতি ও ভাষাভঙ্গির তির্যকতার গুণে কোনো কোনো কবি স্থায়িত্ব লাভ করে সাহিত্যের আসরে। যেমন, সপ্তদশ শতাব্দীর ওড়িয়া কবি উপেন্দ্র ভঞ্জ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর বাঙালি কবি ভারতচন্দ্র। অতি…
বহমান যুদ্ধ
লিখছি, মানুষের কথাই তো লিখছি কবিতা হয়নি তাতে কি— মানুষের জন্যে মানুষের পাশেই আছি বাংলাদেশের এমন কুরুক্ষেত্রে তবু লিখছি আমার দম বন্ধ হয়ে আসে শিশুদের আর্তচিৎকারে ধর্ষিতার শবদেহ যখন ভেসে ওঠে পুকুরে নদীর স্রোতে যখন ভাসে পোড়া মানুষের লাশ তখন আমি তোমাদের মতো নির্বিকার থাকতে পারি না সন্তানের রাজনীতি করার অপরাধে মা কাঁদে অঝোর নয়নে…
আধুনিক বাঙালির চোখে কবি জয়দেব
বাংলার বৈষ্ণব পদাবলীর আদি কবিকুলগুরু জয়দেব একজন ধর্মীয় কবিরূপে মধ্যযুগের ভক্তমাল গ্রন্থ থেকে শুরু করে গোবিন্দদাসের কবিপ্রণাম পদে সমভাবেই শ্রদ্ধা অর্জন করে এসেছিলেন বলে দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু তাঁকে নিয়ে প্রথম গোলমালের সূত্রপাত ঘটেছিল আধুনিকযুগে পৌঁছে। মধ্যযুগের মতোই, খৃষ্টীয় ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধের ইউরোপীয় সমালোচক ও অনুবাদকরাও প্রথমে জয়দেবের গীতগোবিন্দ কাব্যের লৌকিক বর্ণনায় মুগ্ধ হলেও, পরবর্তীসময়ে…
দেবগুরুর কবিতায় জাদুবাস্তবের অনন্যতা
“দুপুর ঝাঁপিয়েছিল ফুলের চাবুকে! এই যে বিষণ্ণ পথ, কবির পোশাক রুমালে চাবির গন্ধ, ছুরির পাহাড় তুমি কি হালকা শাড়ি, দূরের বাতাস? করবীর রক্ত দিয়ে আমাদের চাষ!” পড়ছিলাম দেবগুরু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জলের ঈশ্বর’ (ডিসেম্বর ২০২৩) কাব্যগ্রন্থটি। বাংলা কবিতার বৈচিত্র্যময়তায় বারবার বাঁক বদল ঘটেছে আর ঘটিয়ে চলেছেন সচেতন বাঙালি কবিরা। হ্যাঁ, দেবগুরু তাঁদেরই অন্যতম। নির্মেদ কাব্যের ৪০টি কবিতাতেই…
নরওয়ের নারী জাগরণের দীপ্ত শিখা: জিনা ক্রোগ
উনিশ শতকের শেষভাগে এবং বিংশ শতকের শুরুতে ইউরোপে নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের জোয়ার বইতে থাকে। সেসময়ে নরওয়েতেও এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও চিন্তক ছিলেন জিনা ক্রোগ (Gina Krog)। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে যদি নারী মুক্তির আন্দোলনের পথিকৃতদের নাম করা হয়, তবে নরওয়ের জিনা ক্রোগ (Gina Krog, 1847–1916) সে তালিকায় সর্বাগ্রে স্থান পাবেন। একাধারে তিনি ছিলেন…
